নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ আগস্ট, ২০২৫, 6:48 PM
তীব্র আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর তিন দিন পর দায়িত্ব গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকার প্রধান হিসেবে ৮ আগস্ট শপথ নেন নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশি ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো। এর মধ্যে তাদের সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ছিল- দেশজুড়ে তৈরি হওয়া অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, গণপিটুনি, মব, ধর্ষণ, গণহারে মামলা এবং সংখ্যালঘু ইস্যুতে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের বছরজুড়ে দেওয়া প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়, ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কিছু কিছু সংগঠন বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছে। তার আগে ৫ আগস্টের পর দেশজুড়ে সহিংসতার বিরুদ্ধেও বিবৃতি দিয়েছে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো।
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সব ধরনের সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায় মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। এমএসএফের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতানা কামালের গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, গণ ও অসহযোগ আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর গত সোমবার (৫ আগস্ট) দুপুর থেকে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ বিজয়োল্লাস শুরু করেন। কিন্তু লক্ষ করা গেছে- বিজয়োল্লাসের মধ্যেই একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী দেশে ভয়ানক অরাজকতা সৃষ্টি করতে থাকে। এটা অনাকাক্সিক্ষত, দুঃখজনক, লজ্জাজনক এবং অর্জিত বিজয়কে ভূলুণ্ঠিত করছে।
শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর হামলা ও পুলিশের গুলিতে ৯ জেলায় প্রায় ১১২ জন নিহত হয়েছেন উল্লেখ করে এমএসএফ বলেছে, ধ্বংসাত্মক কাজ আন্দোলনের অর্জনকে কলুষিত করে তুলেছে। এ ঘটনাগুলোর পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন অবশ্যই অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত, যা নাগরিক জীবনে উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করছে।
এছাড়া একই সংগঠন ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছে। পাশাপাশি দেশজুড়ে সহিংসতা ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। সারা রাত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানান স্থাপনায় চলা ভাঙচুর ও হামলার ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। এই ঘটনাগুলোকে আইনের শাসন, আইনের সমান আশ্রয় লাভ ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের পরিপন্থি বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে।
৫ আগস্টের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামীপন্থিদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা ও তাদের উপাসনালয়ে হামলা নিয়ে নিন্দা জানায় সংগঠনটি। এছাড়া যাত্রাবাড়ীতে তিন শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু, গণপিটুনি, ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা, ধর্ষণ, বিশেষ আইনে গ্রেফতার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- নিয়েও প্রতিবাদ জানায় আসক। এছাড়া অন্যান্য সংগঠন শ্রমিক হত্যা, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন, খুন, নারী নির্যাতন নিয়েও সোচ্চার ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো এক বছরে আলোচনায় ছিল মব এবং গণপিটুনির ঘটনা। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে গণপিটুনির ১৪১টি ঘটনায় অন্তত ৬৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন ১১৯ জন। লক্ষ্মীপুরের মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধকে ‘চোর’ সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের ‘ডাকাত’ ঘোষণা দিয়ে দুই জামায়াত কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা-শতাধিক উদাহরণ দেখাচ্ছে জনরোষ কীভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাকে জুতার মালা পরানোর ঘটনাও নজরে এসেছে, যা নাগরিক নিরাপত্তা ও সহিষ্ণুতার সংকটকে সামনে আনে বলে মনে করে সংগঠনটি। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে পরবর্তী ১০ মাসে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ১৪৩ জন বলে জানিয়েছে তারা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত অন্তত ১৭৯ জন মব হামলায় নিহত হয়েছেন। গত ১০ মাসে গড়ে ১৭ দশমিক ৯ জন মব হত্যার শিকার হয়েছেন, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০১৫ সালে মাসিক গড় ছিল ১১ দশমিক ২৫।
সর্বশেষ গত জুলাই মাসে আইন ও সালিশ কেন্দ্র কুমিল্লার মুরাদনগরে মা এবং দুই সন্তানকে পিটিয়ে হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে বলছে, কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কড়ইবাড়ি গ্রামে প্রকাশ্যে মা ও দুই সন্তানকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দেশে ক্রমবর্ধমান গণপিটুনির সহিংসতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিগত এক বছরে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন নিয়েও বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। গত মার্চে দেশব্যাপী নারী ও শিশু ধর্ষণ বৃদ্ধি এবং ঢাকায় যৌন হয়রানি ও ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতন ও মামলা দায়ের নিয়েও বিবৃতি দিয়েছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি)।
বিবৃতিতে তারা জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে তিন বছর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মেয়েশিশু ও নারী ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও হেনস্তার ঘটনাগুলো আবারও সুস্পষ্ট করে তুলেছে-জনপরিসর, অনলাইন থেকে পারিবারিকমণ্ডল, কোথাও মেয়েশিশু বা নারীরা নিরাপদ নয়। নারীর স্বাধীনতা, চলাফেরার অধিকার, মত প্রকাশ, পছন্দ বা নির্বাচন করার অধিকার তথা নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন সংকুচিত করার একটা অপচেষ্টাও লক্ষ করা যাচ্ছে, যা মারাত্মক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার উদ্রেক করেছে। মেয়েশিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতা একটি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এবং যৌন সহিংসতার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবারের সদস্য ও নিকট আত্মীয়দের দ্বারা যৌন নির্যাতনের বিষয়ে নীরবতার সংস্কৃতি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সংবেদনশীলতা ও জবাবদিহির অভাব, বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগের অনুপস্থিতি এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতা নারীর প্রতি সহিংসতাকে স্থায়িত্ব প্রদান করছে।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতেও নারীর প্রতি ঘৃণা ও সহিংস আচরণ প্রকট আকারে লক্ষ করা যাচ্ছে বলে বিবৃতি দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। বিবৃতিতে সংগঠনটি বলে, এ ধরনের ঘৃণা ছড়ানো বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। কেননা, মাধ্যম যাই হোক না কেন নারীর প্রতি সহিংসতা অব্যাহত থাকতে পারে না। নির্যাতন শুধু সংখ্যাতেই বাড়ছে না, নির্যাতনের ধরনে পরিবর্তনও লক্ষ করা যাচ্ছে, যা সমাজে ভীতি ও উৎকণ্ঠা ছড়াচ্ছে।
নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি একইসঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বিষয়। কাজেই সহিংসতা বন্ধের জন্য যথাযথ দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানাচ্ছি। পাশাপাশি সংঘটিত সব ধরনের সহিংসতায় প্রচলিত আইনে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানায় আসক। এছাড়া নারী ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায়ও উদ্বেগ জানায় সংগঠনটি।
জুলাই আন্দোলনে শহীদ ব্যক্তিদের পক্ষে করা বিভিন্ন মামলায় গণহারে আসামি করায় মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল এক বিবৃতিতে জানায়, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে জুলাই ও আগস্ট ২০২৪ সময়কালীন আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আহত ও নিহতের ওপর আধিপত্য এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি অনেককে জড়ানো হয়েছে। যাদের কারও কারও রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ মনে হয়, বা যাদের সঙ্গে কারও কারও ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গতা আছে। এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক মামলা দায়েরের ঘটনায় হিউম্যান রাইটস ফোরাম (এইচআরএফবি) বাংলাদেশ তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ জানাচ্ছে। জুলাই হত্যাকা-ের দ্রুত তদন্ত ও বিচার এবং পাশাপাশি যারা এভাবে আইনের অপব্যবহার করছে, তাদের ব্যাপারে জরুরি তদন্ত এবং ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছে।
বিবৃতিতে ফোরাম জানায়, জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে হতাহতের বিচার চেয়ে দেশজুড়ে যেসব মামলা হচ্ছে, এতে ভুক্তভোগীর পরিবার সঠিক বিচার পাবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা থেকে যায়। গণহারে আসামি করায় মামলার তদন্ত ও বিচার বিঘ্নিত হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দিতেও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে বলে ধারণা করা যায়। এ পরিস্থিতিতে এটি স্পষ্ট যে হয়রানি করার জন্য এ ধরনের মামলা দায়ের করা হচ্ছে, যার প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।
চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল আইন ও সালিশ কেন্দ্র এক বিবৃতিতে জানায়, বিগত সরকারের সময় বিভিন্ন সময়ে ‘গায়েবি’ মামলার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমান সরকারের সময়েও ‘গায়েবি মামলা’ ফিরে এসেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কেননা, ঘটনাস্থলে কখনোই উপস্থিত ছিলেন না-এমন ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে বেশ কিছু মামলার এজাহার ও আসামি একই। জুলাই-আগস্টের ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকা-সহ প্রতিটি অপরাধের বিচার করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য। কিন্তু এসব হত্যাকা- নিয়ে যেভাবে ঢালাও মামলা হচ্ছে, তা অগ্রহণযোগ্য। হত্যা মামলার বিচার হয় সুষ্ঠু তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আলামতের ভিত্তিতে। অথচ অনেক মামলায় আসামি করা হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে, অথবা ভিন্ন উদ্দেশ্যে। কেননা, মামলায় এমন অনেক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, যার সঙ্গে ঘটনার ন্যূনতম সম্পর্ক নেই।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে, ঘটনার সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক নেই, এমনকি বিদেশে অবস্থানকালীন সময়ের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় এজাহারভুক্ত এবং গণমাধ্যমকর্মী যারা আসামি হয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অনতিবিলম্বে তদন্তসাপেক্ষে এ ধরনের হয়রানিমূলক মামলা থেকে তাদের নাম বাদ দিতে হবে।
চলতি বছরের গত ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের হামলার ঘটনার পর দুই দিনব্যাপী সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধানের পর আসক বলছে, গোপালগঞ্জে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক সমাবেশে হামলার ঘটনা নাগরিকের সভা-সমাবেশের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করেছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে আসক।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সময় মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- নিয়ে কথা বলেছে। বিভিন্ন সময় দেওয়া বিবৃতিতে তারা আইনি সংস্কার, মব, অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সংস্কারের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেছে। এইচআরডব্লিউ তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে- এক বছর ধরে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকলেও মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার মানবাধিকার রক্ষার চ্যালেঞ্জিং কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে। এইচআরডব্লিউর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে যে ভীতি, দমন-পীড়ন ও গুমের মতো ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতো, তার কিছুটা অবসান ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার কথিত রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে নির্বিচার আটক করছে। মানবাধিকার সুরক্ষায় তারা এখনও কাঠামোগত সংস্কার আনতে পারেনি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘মানবাধিকারভিত্তিক গণতন্ত্র গড়ার আশায় এক বছর আগে যারা শেখ হাসিনার নিপীড়নমূলক শাসনের বিরুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের সেই আশা এখনও পূরণ হয়নি।’ মীনাক্ষী গাঙ্গুলি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার যেন এক জায়গায় আটকে আছে। একদিকে সংস্কারবিহীন নিরাপত্তা বাহিনী, অপরদিকে মাঝে-মধ্যে সহিংস ধর্মীয় কট্টরপন্থি এবং এমন কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে সামলাতে হচ্ছে, যারা বাংলাদেশিদের অধিকার রক্ষার চেয়ে শেখ হাসিনার সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে বেশি আগ্রহী।’
আরেক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যক্তি মতামত এবং বাকস্বাধীনতা রক্ষার বিষয়ে আহ্বান জানায়। এছাড়া গুমের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিশনের স্বচ্ছতা নিশ্চিতেরও আহ্বান করে। এছাড়া সংস্কারের মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শুরুতে সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল কিংবা সংশোধনের আহ্বান জানায় তারা। এছাড়া জুলাই আগস্টের হত্যাকা- নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক কার্যালয়ের প্রতিবেদন নিয়ে পর্যবেক্ষণ, বিশেষ ক্ষমতা আইনে মডেল মেঘনা আলমকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায়ও উদ্বেগ জানায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ আগস্ট, ২০২৫, 6:48 PM
তীব্র আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর তিন দিন পর দায়িত্ব গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকার প্রধান হিসেবে ৮ আগস্ট শপথ নেন নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশি ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো। এর মধ্যে তাদের সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ছিল- দেশজুড়ে তৈরি হওয়া অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, গণপিটুনি, মব, ধর্ষণ, গণহারে মামলা এবং সংখ্যালঘু ইস্যুতে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের বছরজুড়ে দেওয়া প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়, ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কিছু কিছু সংগঠন বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছে। তার আগে ৫ আগস্টের পর দেশজুড়ে সহিংসতার বিরুদ্ধেও বিবৃতি দিয়েছে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো।
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সব ধরনের সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায় মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। এমএসএফের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতানা কামালের গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, গণ ও অসহযোগ আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর গত সোমবার (৫ আগস্ট) দুপুর থেকে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ বিজয়োল্লাস শুরু করেন। কিন্তু লক্ষ করা গেছে- বিজয়োল্লাসের মধ্যেই একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী দেশে ভয়ানক অরাজকতা সৃষ্টি করতে থাকে। এটা অনাকাক্সিক্ষত, দুঃখজনক, লজ্জাজনক এবং অর্জিত বিজয়কে ভূলুণ্ঠিত করছে।
শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর হামলা ও পুলিশের গুলিতে ৯ জেলায় প্রায় ১১২ জন নিহত হয়েছেন উল্লেখ করে এমএসএফ বলেছে, ধ্বংসাত্মক কাজ আন্দোলনের অর্জনকে কলুষিত করে তুলেছে। এ ঘটনাগুলোর পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন অবশ্যই অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত, যা নাগরিক জীবনে উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করছে।
এছাড়া একই সংগঠন ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছে। পাশাপাশি দেশজুড়ে সহিংসতা ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। সারা রাত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানান স্থাপনায় চলা ভাঙচুর ও হামলার ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। এই ঘটনাগুলোকে আইনের শাসন, আইনের সমান আশ্রয় লাভ ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের পরিপন্থি বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে।
৫ আগস্টের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামীপন্থিদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা ও তাদের উপাসনালয়ে হামলা নিয়ে নিন্দা জানায় সংগঠনটি। এছাড়া যাত্রাবাড়ীতে তিন শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু, গণপিটুনি, ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা, ধর্ষণ, বিশেষ আইনে গ্রেফতার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- নিয়েও প্রতিবাদ জানায় আসক। এছাড়া অন্যান্য সংগঠন শ্রমিক হত্যা, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন, খুন, নারী নির্যাতন নিয়েও সোচ্চার ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো এক বছরে আলোচনায় ছিল মব এবং গণপিটুনির ঘটনা। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে গণপিটুনির ১৪১টি ঘটনায় অন্তত ৬৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন ১১৯ জন। লক্ষ্মীপুরের মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধকে ‘চোর’ সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের ‘ডাকাত’ ঘোষণা দিয়ে দুই জামায়াত কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা-শতাধিক উদাহরণ দেখাচ্ছে জনরোষ কীভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাকে জুতার মালা পরানোর ঘটনাও নজরে এসেছে, যা নাগরিক নিরাপত্তা ও সহিষ্ণুতার সংকটকে সামনে আনে বলে মনে করে সংগঠনটি। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে পরবর্তী ১০ মাসে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ১৪৩ জন বলে জানিয়েছে তারা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত অন্তত ১৭৯ জন মব হামলায় নিহত হয়েছেন। গত ১০ মাসে গড়ে ১৭ দশমিক ৯ জন মব হত্যার শিকার হয়েছেন, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০১৫ সালে মাসিক গড় ছিল ১১ দশমিক ২৫।
সর্বশেষ গত জুলাই মাসে আইন ও সালিশ কেন্দ্র কুমিল্লার মুরাদনগরে মা এবং দুই সন্তানকে পিটিয়ে হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে বলছে, কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কড়ইবাড়ি গ্রামে প্রকাশ্যে মা ও দুই সন্তানকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দেশে ক্রমবর্ধমান গণপিটুনির সহিংসতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিগত এক বছরে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন নিয়েও বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। গত মার্চে দেশব্যাপী নারী ও শিশু ধর্ষণ বৃদ্ধি এবং ঢাকায় যৌন হয়রানি ও ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতন ও মামলা দায়ের নিয়েও বিবৃতি দিয়েছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি)।
বিবৃতিতে তারা জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে তিন বছর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মেয়েশিশু ও নারী ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও হেনস্তার ঘটনাগুলো আবারও সুস্পষ্ট করে তুলেছে-জনপরিসর, অনলাইন থেকে পারিবারিকমণ্ডল, কোথাও মেয়েশিশু বা নারীরা নিরাপদ নয়। নারীর স্বাধীনতা, চলাফেরার অধিকার, মত প্রকাশ, পছন্দ বা নির্বাচন করার অধিকার তথা নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন সংকুচিত করার একটা অপচেষ্টাও লক্ষ করা যাচ্ছে, যা মারাত্মক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার উদ্রেক করেছে। মেয়েশিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতা একটি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এবং যৌন সহিংসতার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবারের সদস্য ও নিকট আত্মীয়দের দ্বারা যৌন নির্যাতনের বিষয়ে নীরবতার সংস্কৃতি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সংবেদনশীলতা ও জবাবদিহির অভাব, বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগের অনুপস্থিতি এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতা নারীর প্রতি সহিংসতাকে স্থায়িত্ব প্রদান করছে।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতেও নারীর প্রতি ঘৃণা ও সহিংস আচরণ প্রকট আকারে লক্ষ করা যাচ্ছে বলে বিবৃতি দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। বিবৃতিতে সংগঠনটি বলে, এ ধরনের ঘৃণা ছড়ানো বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। কেননা, মাধ্যম যাই হোক না কেন নারীর প্রতি সহিংসতা অব্যাহত থাকতে পারে না। নির্যাতন শুধু সংখ্যাতেই বাড়ছে না, নির্যাতনের ধরনে পরিবর্তনও লক্ষ করা যাচ্ছে, যা সমাজে ভীতি ও উৎকণ্ঠা ছড়াচ্ছে।
নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি একইসঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বিষয়। কাজেই সহিংসতা বন্ধের জন্য যথাযথ দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানাচ্ছি। পাশাপাশি সংঘটিত সব ধরনের সহিংসতায় প্রচলিত আইনে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানায় আসক। এছাড়া নারী ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায়ও উদ্বেগ জানায় সংগঠনটি।
জুলাই আন্দোলনে শহীদ ব্যক্তিদের পক্ষে করা বিভিন্ন মামলায় গণহারে আসামি করায় মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল এক বিবৃতিতে জানায়, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে জুলাই ও আগস্ট ২০২৪ সময়কালীন আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আহত ও নিহতের ওপর আধিপত্য এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি অনেককে জড়ানো হয়েছে। যাদের কারও কারও রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ মনে হয়, বা যাদের সঙ্গে কারও কারও ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গতা আছে। এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক মামলা দায়েরের ঘটনায় হিউম্যান রাইটস ফোরাম (এইচআরএফবি) বাংলাদেশ তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ জানাচ্ছে। জুলাই হত্যাকা-ের দ্রুত তদন্ত ও বিচার এবং পাশাপাশি যারা এভাবে আইনের অপব্যবহার করছে, তাদের ব্যাপারে জরুরি তদন্ত এবং ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছে।
বিবৃতিতে ফোরাম জানায়, জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে হতাহতের বিচার চেয়ে দেশজুড়ে যেসব মামলা হচ্ছে, এতে ভুক্তভোগীর পরিবার সঠিক বিচার পাবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা থেকে যায়। গণহারে আসামি করায় মামলার তদন্ত ও বিচার বিঘ্নিত হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দিতেও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে বলে ধারণা করা যায়। এ পরিস্থিতিতে এটি স্পষ্ট যে হয়রানি করার জন্য এ ধরনের মামলা দায়ের করা হচ্ছে, যার প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।
চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল আইন ও সালিশ কেন্দ্র এক বিবৃতিতে জানায়, বিগত সরকারের সময় বিভিন্ন সময়ে ‘গায়েবি’ মামলার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমান সরকারের সময়েও ‘গায়েবি মামলা’ ফিরে এসেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কেননা, ঘটনাস্থলে কখনোই উপস্থিত ছিলেন না-এমন ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে বেশ কিছু মামলার এজাহার ও আসামি একই। জুলাই-আগস্টের ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকা-সহ প্রতিটি অপরাধের বিচার করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য। কিন্তু এসব হত্যাকা- নিয়ে যেভাবে ঢালাও মামলা হচ্ছে, তা অগ্রহণযোগ্য। হত্যা মামলার বিচার হয় সুষ্ঠু তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আলামতের ভিত্তিতে। অথচ অনেক মামলায় আসামি করা হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে, অথবা ভিন্ন উদ্দেশ্যে। কেননা, মামলায় এমন অনেক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, যার সঙ্গে ঘটনার ন্যূনতম সম্পর্ক নেই।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে, ঘটনার সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক নেই, এমনকি বিদেশে অবস্থানকালীন সময়ের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় এজাহারভুক্ত এবং গণমাধ্যমকর্মী যারা আসামি হয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অনতিবিলম্বে তদন্তসাপেক্ষে এ ধরনের হয়রানিমূলক মামলা থেকে তাদের নাম বাদ দিতে হবে।
চলতি বছরের গত ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের হামলার ঘটনার পর দুই দিনব্যাপী সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধানের পর আসক বলছে, গোপালগঞ্জে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক সমাবেশে হামলার ঘটনা নাগরিকের সভা-সমাবেশের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করেছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে আসক।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সময় মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- নিয়ে কথা বলেছে। বিভিন্ন সময় দেওয়া বিবৃতিতে তারা আইনি সংস্কার, মব, অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সংস্কারের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেছে। এইচআরডব্লিউ তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে- এক বছর ধরে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকলেও মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার মানবাধিকার রক্ষার চ্যালেঞ্জিং কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে। এইচআরডব্লিউর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে যে ভীতি, দমন-পীড়ন ও গুমের মতো ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতো, তার কিছুটা অবসান ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার কথিত রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে নির্বিচার আটক করছে। মানবাধিকার সুরক্ষায় তারা এখনও কাঠামোগত সংস্কার আনতে পারেনি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘মানবাধিকারভিত্তিক গণতন্ত্র গড়ার আশায় এক বছর আগে যারা শেখ হাসিনার নিপীড়নমূলক শাসনের বিরুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের সেই আশা এখনও পূরণ হয়নি।’ মীনাক্ষী গাঙ্গুলি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার যেন এক জায়গায় আটকে আছে। একদিকে সংস্কারবিহীন নিরাপত্তা বাহিনী, অপরদিকে মাঝে-মধ্যে সহিংস ধর্মীয় কট্টরপন্থি এবং এমন কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে সামলাতে হচ্ছে, যারা বাংলাদেশিদের অধিকার রক্ষার চেয়ে শেখ হাসিনার সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে বেশি আগ্রহী।’
আরেক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যক্তি মতামত এবং বাকস্বাধীনতা রক্ষার বিষয়ে আহ্বান জানায়। এছাড়া গুমের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিশনের স্বচ্ছতা নিশ্চিতেরও আহ্বান করে। এছাড়া সংস্কারের মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শুরুতে সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল কিংবা সংশোধনের আহ্বান জানায় তারা। এছাড়া জুলাই আগস্টের হত্যাকা- নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক কার্যালয়ের প্রতিবেদন নিয়ে পর্যবেক্ষণ, বিশেষ ক্ষমতা আইনে মডেল মেঘনা আলমকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায়ও উদ্বেগ জানায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।