CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০২ জানুয়ারি, ২০২৬

ঢাকার 'শব্দঝড়': নীরব মহামারি ও শিশুদের ওপর ভয়াবহ প্রভাব

#
news image

রাজধানী ঢাকা শহর এখন বাস, অটোরিকশা, মোটরসাইকেলের হর্ন এবং নির্মাণকাজের একটানা শব্দে যেন 'চিৎকার' করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই লাগাতার ও উচ্চমাত্রার শব্দদূষণ শহরবাসীর অনুভূতিকে ধীরে ধীরে অসার করে দিচ্ছে এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি শব্দদূষণের কারণে শিশুদের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, ঘুম, শ্রবণক্ষমতা এবং মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শিশুদের ওপর শব্দের সরাসরি আঘাত
ঢাকার বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা শব্দের কারণে শ্রেণিকক্ষে ও বাড়িতে মনোযোগ ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে:

শারীরিক প্রতিক্রিয়া: নওয়াবপুর স্কুলের ছাত্র এহসান-এর মা ফিরোজা ইসলাম জানান, হর্নের কারণে ছেলের মাথাব্যথা ও ঘুমের সমস্যা বাড়ছে।

আচরণগত পরিবর্তন: লালবাগের তানহা (১৪) পড়ার সময় হর্ন বাজলে রাগ হয়, মাথা ধরে এবং কখনও কখনও কেঁদে ফেলে। তার মা জানিয়েছেন, তানহার আচরণ সাম্প্রতিক সময়ে বদলে গেছে।

ঘুমের ব্যাঘাত: বাংলামোটরের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী বর্ষা রাতভর হর্নের কারণে ঘুমাতে পারে না এবং ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়ে। বর্ষা বলেছে, "মাথা ব্যথা আর চোখ ব্যথা খুব হয়। পড়ায় একদম মনোযোগ দিতে পারি না। পরীক্ষার ফল খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”

নিরাপদ সীমার দ্বিগুণেরও বেশি শব্দ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৮০–৮৫ ডেসিবল শব্দে শ্রবণঝুঁকি তৈরি হয়। তবে ঢাকায় গড় শব্দের মাত্রা অনেক সময় ১২৫ ডেসিবল পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

WHO মানদণ্ড: বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, শিশুদের জন্য নিরাপদ শব্দসীমা ৪৫–৫০ ডেসিবল। কিন্তু ঢাকার স্কুল, বাড়ি ও খেলার জায়গায় এই মাত্রা দ্বিগুণেরও বেশি।

গবেষণায় উদ্বেগ: "পরিবেশগত শব্দদূষণের সংস্পর্শ এবং শেখার পারদর্শিতা" শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার স্কুলগুলোর শ্রেণিকক্ষের শব্দমাত্রা ৭৩ থেকে ৮১ ডেসিবল, যা মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফা রহমান বলেন, "৬০ ডেসিবেলের বেশি শব্দে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মৌখিক নির্দেশনা বোঝার সক্ষমতা ২৫–৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে।"

স্বাস্থ্যগত পরিণতি ও নীরব মহামারি
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম. কে. তালুকদার জানান, শব্দ শিশুদের দেহে স্ট্রেসের প্রতিক্রিয়া বাড়ায়, যা বিরক্তিভাব, উদ্বেগ, অতিচঞ্চলতা, মনোযোগের অভাব ও আচরণগত সমস্যা তৈরি করে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: রাতে শব্দে ঘুম নষ্ট হলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায় এবং শেখার সক্ষমতাও হ্রাস পায়। দীর্ঘমেয়াদি শব্দ এমনকি স্থায়ী শ্রবণহানি ঘটাতে পারে।

মানসিক অস্থিরতা: একজন অভিভাবক জানান, তাঁর ৯ বছর বয়সী ছেলে সবসময় অস্থির থাকে এবং স্নায়ুতন্ত্র সবসময় উত্তেজিত থাকে—ডাক্তারের মতে, এটি শব্দের কারণে সৃষ্ট 'হাইপার অ্যারাউজাল'।

শ্রবণঝুঁকি: পরিবেশ অধিদফতর ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ (২০২৫)-এর হিসাব অনুযায়ী, দেশের ১১.৭ শতাংশ মানুষ শব্দদূষণের কারণে শ্রবণঝুঁকিতে আছে।

প্রধান উৎস ও বিধিমালার লঙ্ঘন
ঢাকার শব্দের প্রধান উৎস হলো— যানবাহনের হর্ন এবং নির্মাণকাজ। ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, এবং সড়ক সম্প্রসারণের মতো মেগা প্রকল্পগুলো প্রতিদিন ঘণ্টায় ৮০–১০০ ডেসিবেল শব্দ ছড়াচ্ছে।

বুয়েটের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. দিপিতা হোসেন বলেন, নির্মাণস্থলে শব্দ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে তা কমই ব্যবহার হয়; কাজের সময় মানা হয় না এবং অনেক জায়গায় রাতভর কাজ চলে।

শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ অনুযায়ী, হাসপাতাল-স্কুল-অফিস-আদালতের আশপাশের ১০০ মিটার এলাকায় দিনে ৫০ এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল সীমা নির্ধারিত। তবে বাস্তবে এই বিধিনিষেধ কোথাও ঠিকভাবে পালন হচ্ছে না।

ড. দিপিতা হোসেন সতর্ক করে বলেন, শব্দদূষণকে আমরা তুচ্ছ ভাবি, কিন্তু এর প্রভাব গভীর। নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকাশ, আচরণ ও শেখার সক্ষমতা সবকিছুই ঝুঁকিতে পড়বে। শব্দদূষণ এক নীরব মহামারি।

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৭ ডিসেম্বর, ২০২৫,  4:40 PM

news image

রাজধানী ঢাকা শহর এখন বাস, অটোরিকশা, মোটরসাইকেলের হর্ন এবং নির্মাণকাজের একটানা শব্দে যেন 'চিৎকার' করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই লাগাতার ও উচ্চমাত্রার শব্দদূষণ শহরবাসীর অনুভূতিকে ধীরে ধীরে অসার করে দিচ্ছে এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি শব্দদূষণের কারণে শিশুদের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, ঘুম, শ্রবণক্ষমতা এবং মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শিশুদের ওপর শব্দের সরাসরি আঘাত
ঢাকার বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা শব্দের কারণে শ্রেণিকক্ষে ও বাড়িতে মনোযোগ ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে:

শারীরিক প্রতিক্রিয়া: নওয়াবপুর স্কুলের ছাত্র এহসান-এর মা ফিরোজা ইসলাম জানান, হর্নের কারণে ছেলের মাথাব্যথা ও ঘুমের সমস্যা বাড়ছে।

আচরণগত পরিবর্তন: লালবাগের তানহা (১৪) পড়ার সময় হর্ন বাজলে রাগ হয়, মাথা ধরে এবং কখনও কখনও কেঁদে ফেলে। তার মা জানিয়েছেন, তানহার আচরণ সাম্প্রতিক সময়ে বদলে গেছে।

ঘুমের ব্যাঘাত: বাংলামোটরের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী বর্ষা রাতভর হর্নের কারণে ঘুমাতে পারে না এবং ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়ে। বর্ষা বলেছে, "মাথা ব্যথা আর চোখ ব্যথা খুব হয়। পড়ায় একদম মনোযোগ দিতে পারি না। পরীক্ষার ফল খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”

নিরাপদ সীমার দ্বিগুণেরও বেশি শব্দ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৮০–৮৫ ডেসিবল শব্দে শ্রবণঝুঁকি তৈরি হয়। তবে ঢাকায় গড় শব্দের মাত্রা অনেক সময় ১২৫ ডেসিবল পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

WHO মানদণ্ড: বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, শিশুদের জন্য নিরাপদ শব্দসীমা ৪৫–৫০ ডেসিবল। কিন্তু ঢাকার স্কুল, বাড়ি ও খেলার জায়গায় এই মাত্রা দ্বিগুণেরও বেশি।

গবেষণায় উদ্বেগ: "পরিবেশগত শব্দদূষণের সংস্পর্শ এবং শেখার পারদর্শিতা" শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার স্কুলগুলোর শ্রেণিকক্ষের শব্দমাত্রা ৭৩ থেকে ৮১ ডেসিবল, যা মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফা রহমান বলেন, "৬০ ডেসিবেলের বেশি শব্দে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মৌখিক নির্দেশনা বোঝার সক্ষমতা ২৫–৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে।"

স্বাস্থ্যগত পরিণতি ও নীরব মহামারি
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম. কে. তালুকদার জানান, শব্দ শিশুদের দেহে স্ট্রেসের প্রতিক্রিয়া বাড়ায়, যা বিরক্তিভাব, উদ্বেগ, অতিচঞ্চলতা, মনোযোগের অভাব ও আচরণগত সমস্যা তৈরি করে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: রাতে শব্দে ঘুম নষ্ট হলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায় এবং শেখার সক্ষমতাও হ্রাস পায়। দীর্ঘমেয়াদি শব্দ এমনকি স্থায়ী শ্রবণহানি ঘটাতে পারে।

মানসিক অস্থিরতা: একজন অভিভাবক জানান, তাঁর ৯ বছর বয়সী ছেলে সবসময় অস্থির থাকে এবং স্নায়ুতন্ত্র সবসময় উত্তেজিত থাকে—ডাক্তারের মতে, এটি শব্দের কারণে সৃষ্ট 'হাইপার অ্যারাউজাল'।

শ্রবণঝুঁকি: পরিবেশ অধিদফতর ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ (২০২৫)-এর হিসাব অনুযায়ী, দেশের ১১.৭ শতাংশ মানুষ শব্দদূষণের কারণে শ্রবণঝুঁকিতে আছে।

প্রধান উৎস ও বিধিমালার লঙ্ঘন
ঢাকার শব্দের প্রধান উৎস হলো— যানবাহনের হর্ন এবং নির্মাণকাজ। ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, এবং সড়ক সম্প্রসারণের মতো মেগা প্রকল্পগুলো প্রতিদিন ঘণ্টায় ৮০–১০০ ডেসিবেল শব্দ ছড়াচ্ছে।

বুয়েটের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. দিপিতা হোসেন বলেন, নির্মাণস্থলে শব্দ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে তা কমই ব্যবহার হয়; কাজের সময় মানা হয় না এবং অনেক জায়গায় রাতভর কাজ চলে।

শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ অনুযায়ী, হাসপাতাল-স্কুল-অফিস-আদালতের আশপাশের ১০০ মিটার এলাকায় দিনে ৫০ এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল সীমা নির্ধারিত। তবে বাস্তবে এই বিধিনিষেধ কোথাও ঠিকভাবে পালন হচ্ছে না।

ড. দিপিতা হোসেন সতর্ক করে বলেন, শব্দদূষণকে আমরা তুচ্ছ ভাবি, কিন্তু এর প্রভাব গভীর। নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকাশ, আচরণ ও শেখার সক্ষমতা সবকিছুই ঝুঁকিতে পড়বে। শব্দদূষণ এক নীরব মহামারি।