নিউজ ডেস্ক
১১ জুন, ২০২৬, 10:45 AM
প্রায় দুই দশক পর বিএনপি জোট ক্ষমতায়। নেতৃত্বেও আমূল পরিবর্তন। দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্থলে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে তারেক রহমান। দীর্ঘ এই সময়ে অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের পর দলটি চালকের আসনে। তাই রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণের অপার সুযোগ তাদের সামনে। মানুষের জন্য কত কী যে করার ইচ্ছা! কিন্তু বাদ সেধেছে সক্ষমতা।
অনেকটাই ভঙ্গুর অর্থনীতির বোঝা। এর মধ্যেই এলো বাজেট। তহবিলে টানাটানি। তাতে কী? প্রবৃদ্ধি টেনে তুলতে হলে খরচ তো করতে হবে।
তাই আগের ঋণের বোঝার পরও সরকার আরো ঋণ নেওয়ায় সাহসী হয়েছে। ফলে ঋণে ভর ঋণে ভর করেও ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মহা বাজেটের পরিকল্পনা। অর্থনীতি ও ব্যবসা-বিনিয়োগ যখন খাদের কিনারে, রাজস্ব আদায় হচ্ছে না ঠিকমতো, তার পরও বিপুল কর আদায়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা। কর থেকেই প্রায় সাত লাখ কোটি টাকা জোগাড়ের লক্ষ্য। আর তাই ঋণ ও করের সম্মিলিত তহবিলে বাজেটটি বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা আজই সংসদে তুলে ধরবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ওই পরিকল্পনার নথি ও আগাম তথ্য কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে। সেটি পর্যালোচনা করে জানা যায়, তারেক রহমানের সরকারের জনকল্যাণমুখী প্রচেষ্টা থাকছে বাজেটে। কিন্তু সক্ষমতা সীমিত। তাই ধারকর্জ আর রাজস্বের উচ্চাভিলাষী আদায়ের ওপর ভরসা করেই দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও ইচ্ছা পূরণ করতে চায় সরকার। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈদেশিক ঋণের চাপের মধ্যে ঘোষিত এই বাজেট বাস্তবায়নই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
করে পিষ্ট জনগণ, ঋণে কাবু দেশঅর্থমন্ত্রীর বাজেট বত্তৃদ্ধতা থেকে জানা যায়, ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধির দ্বৈত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। নীতিনির্ধারকদের আশা, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলে অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন গতি ফিরে আসবে।
এবারের বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘নতুন ব্যবসা, নতুন ধারণা ও নতুন প্রজন্ম’কে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখা। প্রথমবারের মতো ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’কে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ করা হচ্ছে। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, ডিজিটাল কনটেন্ট, সংস্কৃতি, গবেষণা, স্টার্টআপ ও জ্ঞানভিত্তিক শিল্পকে আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বাজেটে এসেছে ‘বিনিয়ন্ত্রণ’ বা ডিরেগুলেশনের ধারণা। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদার স্বাধীনতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। সরকারের মতে, নীতিগত স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।
জনজীবনের চাপ কমাতে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ওপর উৎস কর কমানোর ঘোষণা আসছে। বাজারে সরবরাহ ও প্রতিযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশলের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ ও ‘হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি। সরকারের ধারণা, ডিজিটালভিত্তিক এই কর্মসূচিগুলো সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থাকে আরো লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর করবে।
উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি, গবেষণা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রাজস্ব আহরণ। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি এরই মধ্যে এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, করজাল সম্প্র্রসারণ, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সরকার ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক উৎস থেকেও উল্লেখযোগ্য ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ব্যাংকব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করতে পারে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে সহায়তা অব্যাহত রাখতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ এক লাখ ২৭ হাজার ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্য অস্থিরতার মধ্যে এই ব্যয়কে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য মনে করছে সরকার।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিএনপি সরকারের জন্য যেমন অর্থনৈতিক পথনকশা, তেমনি রাজনৈতিক সক্ষমতারও প্রথম বড় পরীক্ষা। সৃজনশীল অর্থনীতি, বিনিয়ন্ত্রণ, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডের মতো নতুন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হতে পারে। তবে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, বড় বাজেট ঘাটতি এবং ঋণনির্ভর অর্থায়নের বাস্তবতা সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থাকবে।
সর্বোচ্চ বরাদ্দের ১০ মন্ত্রণালয় : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর তালিকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রায় ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি টাকার বরাদ্দ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। একইভাবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪৯ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, মানুষের আয় কমেছে, কিন্তু নতুন করদাতা সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ফলে একই করদাতাই বারবার করের বোঝা বহন করছেন। এই পরিস্থিতিতে সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বর্তমানে পুরো অর্থনীতি নানা ধরনের চাপের মুখে রয়েছে, আর ব্যবসায়ীরাও কঠিন সময় পার করছেন। তাই ব্যবসা সহজীকরণের পাশাপাশি অর্থনীতিকে আরো উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে এবং বাস্তবসম্মত একটি বাজেট প্রণয়ন জরুরি। আর্থিক খাতও প্রত্যাশিত অবস্থানে নেই। এ কারণে ব্যবসা, সামগ্রিক অর্থনীতি এবং মানুষের ব্যয়ক্ষমতাকে বিবেচনায় রেখে নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রয়োজন হলে উপযুক্ত প্রণোদনার ব্যবস্থাও করা উচিত।
রাজস্ব খাত বিশ্লেষক ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, আগামী অর্থবছরে এনবিআরের ছয় লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জোরালো কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। তাঁর মতে, ভ্যাট ও আয়করে বিদ্যমান করছাড় যৌক্তিকীকরণ এবং বিপুল পরিমাণ বকেয়া রাজস্ব আদায়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি ভ্যাট ও করপোরেট করহার বাস্তবসম্মত করা, উৎস কর কর্তনের কার্যকর তদারকি, রিটার্ন দাখিলে পরিপালন নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে এই বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। লক্ষ্য বাড়ানোর চেয়ে করভিত্তি সম্প্রসারণ, নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তি, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং কর প্রশাসনের ডিজিটাল সক্ষমতা জোরদার করাই হবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
শেষ পর্যন্ত এই বাজেটের সাফল্য নির্ধারিত হবে ঘোষণার জৌলুসে নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতায়। কারণ আজকের বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের দলিল নয়, এটি নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের যাত্রার প্রথম বড় পরীক্ষা।
সোর্স: কালের কণ্ঠ
নিউজ ডেস্ক
১১ জুন, ২০২৬, 10:45 AM
প্রায় দুই দশক পর বিএনপি জোট ক্ষমতায়। নেতৃত্বেও আমূল পরিবর্তন। দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্থলে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে তারেক রহমান। দীর্ঘ এই সময়ে অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের পর দলটি চালকের আসনে। তাই রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণের অপার সুযোগ তাদের সামনে। মানুষের জন্য কত কী যে করার ইচ্ছা! কিন্তু বাদ সেধেছে সক্ষমতা।
অনেকটাই ভঙ্গুর অর্থনীতির বোঝা। এর মধ্যেই এলো বাজেট। তহবিলে টানাটানি। তাতে কী? প্রবৃদ্ধি টেনে তুলতে হলে খরচ তো করতে হবে।
তাই আগের ঋণের বোঝার পরও সরকার আরো ঋণ নেওয়ায় সাহসী হয়েছে। ফলে ঋণে ভর ঋণে ভর করেও ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মহা বাজেটের পরিকল্পনা। অর্থনীতি ও ব্যবসা-বিনিয়োগ যখন খাদের কিনারে, রাজস্ব আদায় হচ্ছে না ঠিকমতো, তার পরও বিপুল কর আদায়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা। কর থেকেই প্রায় সাত লাখ কোটি টাকা জোগাড়ের লক্ষ্য। আর তাই ঋণ ও করের সম্মিলিত তহবিলে বাজেটটি বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা আজই সংসদে তুলে ধরবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ওই পরিকল্পনার নথি ও আগাম তথ্য কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে। সেটি পর্যালোচনা করে জানা যায়, তারেক রহমানের সরকারের জনকল্যাণমুখী প্রচেষ্টা থাকছে বাজেটে। কিন্তু সক্ষমতা সীমিত। তাই ধারকর্জ আর রাজস্বের উচ্চাভিলাষী আদায়ের ওপর ভরসা করেই দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও ইচ্ছা পূরণ করতে চায় সরকার। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈদেশিক ঋণের চাপের মধ্যে ঘোষিত এই বাজেট বাস্তবায়নই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
করে পিষ্ট জনগণ, ঋণে কাবু দেশঅর্থমন্ত্রীর বাজেট বত্তৃদ্ধতা থেকে জানা যায়, ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধির দ্বৈত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। নীতিনির্ধারকদের আশা, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলে অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন গতি ফিরে আসবে।
এবারের বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘নতুন ব্যবসা, নতুন ধারণা ও নতুন প্রজন্ম’কে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখা। প্রথমবারের মতো ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’কে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ করা হচ্ছে। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, ডিজিটাল কনটেন্ট, সংস্কৃতি, গবেষণা, স্টার্টআপ ও জ্ঞানভিত্তিক শিল্পকে আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বাজেটে এসেছে ‘বিনিয়ন্ত্রণ’ বা ডিরেগুলেশনের ধারণা। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদার স্বাধীনতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। সরকারের মতে, নীতিগত স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।
জনজীবনের চাপ কমাতে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ওপর উৎস কর কমানোর ঘোষণা আসছে। বাজারে সরবরাহ ও প্রতিযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশলের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ ও ‘হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি। সরকারের ধারণা, ডিজিটালভিত্তিক এই কর্মসূচিগুলো সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থাকে আরো লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর করবে।
উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি, গবেষণা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রাজস্ব আহরণ। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি এরই মধ্যে এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, করজাল সম্প্র্রসারণ, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সরকার ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক উৎস থেকেও উল্লেখযোগ্য ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ব্যাংকব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করতে পারে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে সহায়তা অব্যাহত রাখতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ এক লাখ ২৭ হাজার ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্য অস্থিরতার মধ্যে এই ব্যয়কে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য মনে করছে সরকার।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিএনপি সরকারের জন্য যেমন অর্থনৈতিক পথনকশা, তেমনি রাজনৈতিক সক্ষমতারও প্রথম বড় পরীক্ষা। সৃজনশীল অর্থনীতি, বিনিয়ন্ত্রণ, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডের মতো নতুন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হতে পারে। তবে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, বড় বাজেট ঘাটতি এবং ঋণনির্ভর অর্থায়নের বাস্তবতা সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থাকবে।
সর্বোচ্চ বরাদ্দের ১০ মন্ত্রণালয় : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর তালিকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রায় ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি টাকার বরাদ্দ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। একইভাবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪৯ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, মানুষের আয় কমেছে, কিন্তু নতুন করদাতা সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ফলে একই করদাতাই বারবার করের বোঝা বহন করছেন। এই পরিস্থিতিতে সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বর্তমানে পুরো অর্থনীতি নানা ধরনের চাপের মুখে রয়েছে, আর ব্যবসায়ীরাও কঠিন সময় পার করছেন। তাই ব্যবসা সহজীকরণের পাশাপাশি অর্থনীতিকে আরো উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে এবং বাস্তবসম্মত একটি বাজেট প্রণয়ন জরুরি। আর্থিক খাতও প্রত্যাশিত অবস্থানে নেই। এ কারণে ব্যবসা, সামগ্রিক অর্থনীতি এবং মানুষের ব্যয়ক্ষমতাকে বিবেচনায় রেখে নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রয়োজন হলে উপযুক্ত প্রণোদনার ব্যবস্থাও করা উচিত।
রাজস্ব খাত বিশ্লেষক ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, আগামী অর্থবছরে এনবিআরের ছয় লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জোরালো কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। তাঁর মতে, ভ্যাট ও আয়করে বিদ্যমান করছাড় যৌক্তিকীকরণ এবং বিপুল পরিমাণ বকেয়া রাজস্ব আদায়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি ভ্যাট ও করপোরেট করহার বাস্তবসম্মত করা, উৎস কর কর্তনের কার্যকর তদারকি, রিটার্ন দাখিলে পরিপালন নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে এই বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। লক্ষ্য বাড়ানোর চেয়ে করভিত্তি সম্প্রসারণ, নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তি, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং কর প্রশাসনের ডিজিটাল সক্ষমতা জোরদার করাই হবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
শেষ পর্যন্ত এই বাজেটের সাফল্য নির্ধারিত হবে ঘোষণার জৌলুসে নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতায়। কারণ আজকের বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের দলিল নয়, এটি নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের যাত্রার প্রথম বড় পরীক্ষা।
সোর্স: কালের কণ্ঠ