বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গণফোরাম সভাপতি মোস্তফা মোহসীন মন্টু আর নেই,(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং গণফোরামের সভাপতি মোস্তফা মোহসীন মন্টু ইন্তেকাল করেছেন। রবিবার (১৫ জুন) বিকাল ৫টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।
গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, দীর্ঘদিন ধরেই মোস্তফা মোহসীন মন্টু বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মোস্তফা মোহসীন মন্টু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন সৎ, নিবেদিতপ্রাণ ও নির্লোভ রাজনীতিবিদ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি ১৯৭০ এর গণআন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ এবং পরে গণফোরামের মাধ্যমে রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে এক শূন্যতা তৈরি হলো, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি এই অকুতোভয় দেশপ্রেমিককে।
মোস্তফা মোহসীন মন্টু: এক রাজনৈতিক সংগ্রামী পথচলার ইতিহাস
মোস্তফা মোহসীন মন্টু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯৪৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মীর জাহান ও মাতার নাম রাহেলা খাতুন। শৈশব থেকেই তিনি রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। শিক্ষাজীবনে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং সেসময় থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে তার অংশগ্রহণ শুরু হয়।
আওয়ামী লীগে কর্মজীবনের শুরু
মোস্তফা মোহসীন মন্টু ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ধীরে ধীরে তিনি দলীয় কাঠামোয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং একসময় ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন। দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তার দক্ষতা ও জড়িত থাকার কারণে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে দৃশ্যমান হন।
সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব
১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এই সময় তিনি সংসদে দলীয় ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরব ভূমিকা পালন করেন।
১৯৯২ সালে দলীয় সিদ্ধান্ত ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে মোস্তফা মোহসীন মন্টু আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন। পরে তিনি বিশিষ্ট আইনজীবী ও রাজনীতিক ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল গণফোরাম-এ যোগ দেন। দলটিকে গণতান্ত্রিক বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
২০০৯ সালে তিনি গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন এবং আজ পর্যন্ত সেই দায়িত্বে রয়েছেন। তার নেতৃত্বে গণফোরাম জাতীয় রাজনীতিতে ন্যায়বিচার, সুশাসন ও জবাবদিহিতার পক্ষে সোচ্চার থাকে।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন এবং ৬৬,২২০ ভোট পেয়ে বিএনপি প্রার্থী আমানউল্লাহ আমানের কাছে পরাজিত হন।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি গণফোরামের প্রার্থী হিসেবে ‘উদীয়মান সূর্য’ প্রতীকে ঢাকা-২ ও ঢাকা-৩ আসন থেকে এবং ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের হয়ে ঢাকা-৭ আসন থেকে নির্বাচন করেন। তিন ক্ষেত্রেই তিনি পরাজিত হন।
মোস্তফা মোহসীন মন্টু সবসময়ই একটি গণতান্ত্রিক, অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করেছেন। দলবদলের পরও তিনি ক্ষমতার রাজনীতির চেয়ে নীতির রাজনীতিতে বিশ্বাস রেখে পথ চলেছেন।
তিনি দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পক্ষে গণফোরামের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল, যা ২০১৮ সালের নির্বাচনকে একটি বিকল্প জোট রাজনীতির পথে পরিচালিত করেছিল।
তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্যে খুব বেশি কিছু জানা না গেলেও, তিনি একজন সাদাসিধে, দৃঢ়চেতা এবং মতাদর্শনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত।
জন্ম: ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৫, ঢাকা
দলীয় পরিচয়: সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা; বর্তমান গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক
সংসদ সদস্য: ঢাকা-৩ (১৯৮৬)
নির্বাচনী অংশগ্রহণ: ১৯৮৬, ১৯৯১, ২০১৮
বিশেষ অবদান: যুব রাজনীতিতে নেতৃত্ব, বিকল্প রাজনৈতিক ধারার চর্চা, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে সক্রিয়তা