নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ জুন, ২০২৫, 7:35 PM
শাহ সিমেন্ট গিনেজ ওয়াল্ড রেকর্ডসে নাম উঠা নান্দনিক নির্মাণ গল্প ও সুপরিচিতির সিমেন্ট ব্র্যান্ড এর আড়ালে মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অসহায় হত-দরিদ্র মানুষের বসতবাড়িসহ জায়গা জমি দখল করছেন। ভূমিদস্যু রাঘববোয়াল আবুল খায়ের গ্রুপের প্রতিষ্ঠান শাহ সিমেট কোম্পানীর কাছে বাড়ি-ঘরসহ জায়গা-জমি হারা অবসহায় ভুক্তভোগিদের পক্ষে প্রধানউপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্রউপদেষ্টাসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুন্সিগঞ্জের ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যার নদীর মোহনায় বিশাল সিমেন্ট কারাখানা স্থাপন করছেন। শুধু মানুষের বাড়ি ঘরই নয়, লাগামহীনভাবে নদী দখলের ভয়াবহ নিদর্শন তৈরী হচ্ছে। দখলকৃত জায়গার অধিকাংশ মুন্সিগঞ্জের ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষার মোহনায় বিশাল স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২৩ সালে শাহ সিমেন্টকে ‘দখলদার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্ত, নদীগুলো রক্ষায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করেনি সরকার। তবে আবুল খায়ের গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান শাহ সিমেন্টে এর দায়িত্বরত ম্যানেজার সাজ্জাদ হোসেন মানুষের বাড়ি ঘর ও নদীর জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এছাড়া অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি তার অফিসে গিয়ে কাগজপত্র দেখার জন্য প্রতিবেদককে ডাকা হলেও তিনি কোন কাগজপত্র দেখাতে রাজী হননি।
জানা গেছে, শাহ সিমেন্ট ২০০২ সালে কারখানাটি নির্মাণ করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কারখানা দুই নদীর জায়গাসহ স্থানীয়দের বাড়ি ঘর দখল করে।
মুন্সিগঞ্জ সদর সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অফিসের সূত্র জানায়, শাহ সিমেন্ট মিরেরশ্বরাই মৌজায় আরএস দাগ নম্বর ১৮৪ এবং পূর্ব মুক্তারপুর মৌজায় আরএস দাগ নম্বর ৩০১ থেকে ৩০৮ পর্যন্ত একটি বড় নদী এলাকা দখল করা হয়েছে।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের মুন্সীগঞ্জের চর মিরেরশ্বরাই এলাকার ভুক্তভোগি মো. কিরণ লিখিত একটি অভিযোগ করেছেন। উক্ত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ৩৯ নম্বর মিরেরশ্বরাই মৌজাস্থিত আর.এস ১২৮, ১২৬,১২৭ নম্বর দাগের ২৪.৪২ শতাংশ সম্পত্তি শাহ সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড দীর্ঘ দিন ধরে অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গেলেও স্থানীয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী ছাড়াও কথিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন ম্যানেজার সাজ্জাদ হোসেন। শুধু তাই নয় ভুট্টু নামের একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহ সিমেন্টে বেতনভুক্ত ব্যক্তি অভিযোগকারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছেন।
উল্লেখিত সম্পত্তির বিষয়ে গত ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর ৪২৩/০৩-০৪ নম্বর কেইসমূলে নামজারী নম্বর ৯৫৪ এবং নিজ নামে ভুক্তভোগিরা নামজারী খতিয়ান মূলেব খাজনা প্রদান করে আসছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
সূত্র জানায়, মুন্সিগঞ্জ ভূমি অফিসের রিভিশনাল সার্ভে (আরএস) রেকর্ড অনুযায়ী, দাগ নম্বর ১৮৪ এবং ৩০১ থেকে ৩০৭ নম্বর দাগ নদী ও নদীর তীর হিসেবে চিহ্নিত এবং ‘বাংলাদেশ সরকারের মালিকানাধীন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত। যার আরএস দাগ নম্বর ৩০৮। গত দুই দশক আগে শাহ সিমেন্ট কারখানাটি স্থাপনের আগে ধলেশ্বরী ছিল একটি জীবন্ত নদী। স্থানীয়রা সেখানে মাছ ধরত, গোসল করত এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য নদীর ওপর নির্ভরশীল ছিল।
স্থানীয়রা জানান, প্রথমে কারখানাটি ছোট্ট একটি জায়গায় গড়ে তোলা হয়। এরপর প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে নদীতে বালু ফেলে ধীরে ধীরে তারা জায়গা বাড়াতে থাকে। রাতের আঁধারেও সেই কাজ চালানো হতো। চলতি বছরের ৪ মার্চ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসনকে এক পত্রে জানানো হয়েছে, শাহ সিমেন্টের বালু ফেলার কার্যক্রম শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীপথে নাব্যতা সংকট সৃষ্টি করছে, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত করছে এবং পরিবেশের ক্ষতি করা হচ্ছে। এই কর্মকাণ্ড বন্দর আইন ১৯০৮, বন্দর বিধিমালা ১৯৬৬ এবং উচ্চ আদালতের আদেশ লঙ্ঘন করছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার গণমাধ্যমে বলেছেন, ২০১৯ সালে এলাকাটি পরিদর্শন করে কারখানাটিকে নদী দখলকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এতদিন ধরে কীভাবে তারা ওই জমি দখল করে থাকে? কারখানাটি গড়ে তোলা হয়েছে দুটি নদী ভরাট করে। সিএস ও আরএস রেকর্ড যাচাই করে অবৈধ দখলের একটি প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছিল। নদী রক্ষা কমিশনের গত ২০১৮ ও ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন এবং ২০২৩ সালের মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তালিকাটি কেবল আরএস দাগ নম্বর ১৮৪-ভিত্তিক। যেখানে শাহ সিমেন্ট ২৪ একর নদীর জমি দখল করে আছে। তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৫ সালের শুরুতে করা জরিপে অতিরিক্ত আরএস দাগ নম্বর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব থেকে দেখা যায়, বর্তমানে কোম্পানিটি ২৪ একরের বেশি নদীর জমি দখল করে আছে।
এই বিষয় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ্যাড. মনজিল মোরসেদ বলেন, আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। দেশের আইনের শ্বাসন দুর্বল, যারা নদী বা মানুষের জায়গা জমি সম্পত্তি দখল করেন, তারা যদি প্রভাবশালী হন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা যায় না। তবে তারা যদি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী হন, তাহলে তো তারা প্রশাসনের প্রভাব খাটিয়ে থাকেন। এজন্যই এদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। তিনি আরো বলেছেন, ‘হাইকোর্ট নদীগুলোকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছেন। এর মানে স্থানীয় প্রশাসনের এখতিয়ার রয়েছে অবিলম্বে দখলদারদের উচ্ছেদ করার। আমি বুঝতে পারছি না কেন তারা এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর।
মন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর দপ্তরের এক সূত্র জানায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ১৫টি প্রতিষ্ঠান ধলেশ্বরী নদীর ৩৪ দশমিক ৯৬ একর জায়গা দখল করেছে। এর মধ্যে শাহ সিমেন্ট একাই দখল করেছে ২৪ একর।এই ১৫টি কোম্পানীর মধ্যে শাহ সিমেন্ট কোম্পানী সবচেয়ে বড় দখলদার। এর আগে ২০১৯ সালের ৬ মে মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসন একটি তালিকা তৈরি করে এবং ৫০টি নদী দখলকারীর মধ্যে শাহ সিমেন্টকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর শাহ সিমেন্ট কোম্পানিটি মিরেরসরাই মৌজায় আরএস দাগ নম্বর ১৮৪-এর নদীর জমি দখল করেছে। তৎকালীন জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত এক পত্রে বলা হয়েছে, সেই তালিকাটি সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়, প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে। সেই পত্রটি দেশের সব নদীর আইনি অভিভাবক জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কাছেও পাঠানো হয়েছিল। ‘নদীর যেসব অংশ দখল হয়ে গেছে, তা পুনরুদ্ধারের উদ্দ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এলাকার ডিজিটাল জরিপ শেষ করা হয়েছে। সেখানে সীমানা নির্ধারণকারী খুঁটি বসানো হবে বলে বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের এক সূত্রে জানা গেছে।
তাছাড়া, উচ্চ আদালত ২০০৯ সালের ঐতিহাসিক এক রায়ে সিদ্ধান্ত দেন। তা হচ্ছে, নদীর জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে সিএস ও আরএস রেকর্ডের ভিত্তিতে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত রায়ে আদালত স্বীকার করেন, যে বাংলাদেশের প্রতিটি নদী সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রবাহপথ পরিবর্তন করে। ‘বাংলাদেশের নদীগুলোর এই প্রবাহপথ পরিবর্তনের বৈশিষ্ট্য এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। কাজেই অত্র রীট মোকদ্দমাটিতে উত্থাপিত সমস্যা সমাধানে সর্ব প্রথম আমাদের নদীগুলির সীমানা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নদীর সীমানা নির্ধারণ করতে কোন পদ্ধাতি আইন সম্মত হইবে সে সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত নিতে হইবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শাহ সিমেন্ট ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর থেকে নারায়ণগঞ্জ বিআইডব্লিউটিএ পোর্ট অফিসের লাইসেন্সে নদীর তীরবর্তী জমি ব্যবহার করছে, যা কারখানা স্থাপনের দুই বছর পর শুরু হয়। বর্তমানে কোম্পানিটির কাছে ১১ দশমিক ২৮ একর নদীর তীরবর্তী জমির ইজারা রয়েছে, যার মেয়াদ চলতি বছরের জুনে শেষ হচ্ছে। ইজারা চুক্তি অনুযায়ী, কোম্পানিটি নদী বা নদী-তীরবর্তী জায়গা ভরাট করতে পারবে না, অতিরিক্ত নদীর জমি ব্যবহার করতে পারবে না, নদীতীর পরিবর্তন করতে পারবে না। আর নাব্যতা ব্যাহত করতে পারবে না, ইচ্ছামতো জাহাজ ভেড়াতে পারবে না এবং নদীতে বর্জ্য ফেলতে পারবে না। নারায়ণগঞ্জ বিআইডব্লিউটিএ পোর্ট অফিসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, শাহ সিমেন্ট চুক্তির শর্ত মানছে না। তারা ধীরে ধীরে নদী ও নদীতীর ভরাট করছে। যার ফলে ওই এলাকায় নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে। আমরা মাঝে মাঝে সাইট পরিদর্শন করি, মৌখিকভাবে তাদের শর্ত মানতে বরা হচ্ছে এবং মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।
নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এক সফরে এলাকাটি পরিদর্শন করে অবৈধ দখল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ জুন, ২০২৫, 7:35 PM
শাহ সিমেন্ট গিনেজ ওয়াল্ড রেকর্ডসে নাম উঠা নান্দনিক নির্মাণ গল্প ও সুপরিচিতির সিমেন্ট ব্র্যান্ড এর আড়ালে মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অসহায় হত-দরিদ্র মানুষের বসতবাড়িসহ জায়গা জমি দখল করছেন। ভূমিদস্যু রাঘববোয়াল আবুল খায়ের গ্রুপের প্রতিষ্ঠান শাহ সিমেট কোম্পানীর কাছে বাড়ি-ঘরসহ জায়গা-জমি হারা অবসহায় ভুক্তভোগিদের পক্ষে প্রধানউপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্রউপদেষ্টাসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুন্সিগঞ্জের ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যার নদীর মোহনায় বিশাল সিমেন্ট কারাখানা স্থাপন করছেন। শুধু মানুষের বাড়ি ঘরই নয়, লাগামহীনভাবে নদী দখলের ভয়াবহ নিদর্শন তৈরী হচ্ছে। দখলকৃত জায়গার অধিকাংশ মুন্সিগঞ্জের ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষার মোহনায় বিশাল স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২৩ সালে শাহ সিমেন্টকে ‘দখলদার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্ত, নদীগুলো রক্ষায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করেনি সরকার। তবে আবুল খায়ের গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান শাহ সিমেন্টে এর দায়িত্বরত ম্যানেজার সাজ্জাদ হোসেন মানুষের বাড়ি ঘর ও নদীর জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এছাড়া অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি তার অফিসে গিয়ে কাগজপত্র দেখার জন্য প্রতিবেদককে ডাকা হলেও তিনি কোন কাগজপত্র দেখাতে রাজী হননি।
জানা গেছে, শাহ সিমেন্ট ২০০২ সালে কারখানাটি নির্মাণ করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কারখানা দুই নদীর জায়গাসহ স্থানীয়দের বাড়ি ঘর দখল করে।
মুন্সিগঞ্জ সদর সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অফিসের সূত্র জানায়, শাহ সিমেন্ট মিরেরশ্বরাই মৌজায় আরএস দাগ নম্বর ১৮৪ এবং পূর্ব মুক্তারপুর মৌজায় আরএস দাগ নম্বর ৩০১ থেকে ৩০৮ পর্যন্ত একটি বড় নদী এলাকা দখল করা হয়েছে।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের মুন্সীগঞ্জের চর মিরেরশ্বরাই এলাকার ভুক্তভোগি মো. কিরণ লিখিত একটি অভিযোগ করেছেন। উক্ত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ৩৯ নম্বর মিরেরশ্বরাই মৌজাস্থিত আর.এস ১২৮, ১২৬,১২৭ নম্বর দাগের ২৪.৪২ শতাংশ সম্পত্তি শাহ সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড দীর্ঘ দিন ধরে অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গেলেও স্থানীয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী ছাড়াও কথিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন ম্যানেজার সাজ্জাদ হোসেন। শুধু তাই নয় ভুট্টু নামের একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহ সিমেন্টে বেতনভুক্ত ব্যক্তি অভিযোগকারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছেন।
উল্লেখিত সম্পত্তির বিষয়ে গত ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর ৪২৩/০৩-০৪ নম্বর কেইসমূলে নামজারী নম্বর ৯৫৪ এবং নিজ নামে ভুক্তভোগিরা নামজারী খতিয়ান মূলেব খাজনা প্রদান করে আসছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
সূত্র জানায়, মুন্সিগঞ্জ ভূমি অফিসের রিভিশনাল সার্ভে (আরএস) রেকর্ড অনুযায়ী, দাগ নম্বর ১৮৪ এবং ৩০১ থেকে ৩০৭ নম্বর দাগ নদী ও নদীর তীর হিসেবে চিহ্নিত এবং ‘বাংলাদেশ সরকারের মালিকানাধীন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত। যার আরএস দাগ নম্বর ৩০৮। গত দুই দশক আগে শাহ সিমেন্ট কারখানাটি স্থাপনের আগে ধলেশ্বরী ছিল একটি জীবন্ত নদী। স্থানীয়রা সেখানে মাছ ধরত, গোসল করত এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য নদীর ওপর নির্ভরশীল ছিল।
স্থানীয়রা জানান, প্রথমে কারখানাটি ছোট্ট একটি জায়গায় গড়ে তোলা হয়। এরপর প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে নদীতে বালু ফেলে ধীরে ধীরে তারা জায়গা বাড়াতে থাকে। রাতের আঁধারেও সেই কাজ চালানো হতো। চলতি বছরের ৪ মার্চ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসনকে এক পত্রে জানানো হয়েছে, শাহ সিমেন্টের বালু ফেলার কার্যক্রম শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীপথে নাব্যতা সংকট সৃষ্টি করছে, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত করছে এবং পরিবেশের ক্ষতি করা হচ্ছে। এই কর্মকাণ্ড বন্দর আইন ১৯০৮, বন্দর বিধিমালা ১৯৬৬ এবং উচ্চ আদালতের আদেশ লঙ্ঘন করছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার গণমাধ্যমে বলেছেন, ২০১৯ সালে এলাকাটি পরিদর্শন করে কারখানাটিকে নদী দখলকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এতদিন ধরে কীভাবে তারা ওই জমি দখল করে থাকে? কারখানাটি গড়ে তোলা হয়েছে দুটি নদী ভরাট করে। সিএস ও আরএস রেকর্ড যাচাই করে অবৈধ দখলের একটি প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছিল। নদী রক্ষা কমিশনের গত ২০১৮ ও ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন এবং ২০২৩ সালের মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তালিকাটি কেবল আরএস দাগ নম্বর ১৮৪-ভিত্তিক। যেখানে শাহ সিমেন্ট ২৪ একর নদীর জমি দখল করে আছে। তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৫ সালের শুরুতে করা জরিপে অতিরিক্ত আরএস দাগ নম্বর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব থেকে দেখা যায়, বর্তমানে কোম্পানিটি ২৪ একরের বেশি নদীর জমি দখল করে আছে।
এই বিষয় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ্যাড. মনজিল মোরসেদ বলেন, আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। দেশের আইনের শ্বাসন দুর্বল, যারা নদী বা মানুষের জায়গা জমি সম্পত্তি দখল করেন, তারা যদি প্রভাবশালী হন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা যায় না। তবে তারা যদি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী হন, তাহলে তো তারা প্রশাসনের প্রভাব খাটিয়ে থাকেন। এজন্যই এদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। তিনি আরো বলেছেন, ‘হাইকোর্ট নদীগুলোকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছেন। এর মানে স্থানীয় প্রশাসনের এখতিয়ার রয়েছে অবিলম্বে দখলদারদের উচ্ছেদ করার। আমি বুঝতে পারছি না কেন তারা এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর।
মন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর দপ্তরের এক সূত্র জানায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ১৫টি প্রতিষ্ঠান ধলেশ্বরী নদীর ৩৪ দশমিক ৯৬ একর জায়গা দখল করেছে। এর মধ্যে শাহ সিমেন্ট একাই দখল করেছে ২৪ একর।এই ১৫টি কোম্পানীর মধ্যে শাহ সিমেন্ট কোম্পানী সবচেয়ে বড় দখলদার। এর আগে ২০১৯ সালের ৬ মে মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসন একটি তালিকা তৈরি করে এবং ৫০টি নদী দখলকারীর মধ্যে শাহ সিমেন্টকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর শাহ সিমেন্ট কোম্পানিটি মিরেরসরাই মৌজায় আরএস দাগ নম্বর ১৮৪-এর নদীর জমি দখল করেছে। তৎকালীন জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত এক পত্রে বলা হয়েছে, সেই তালিকাটি সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়, প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে। সেই পত্রটি দেশের সব নদীর আইনি অভিভাবক জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কাছেও পাঠানো হয়েছিল। ‘নদীর যেসব অংশ দখল হয়ে গেছে, তা পুনরুদ্ধারের উদ্দ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এলাকার ডিজিটাল জরিপ শেষ করা হয়েছে। সেখানে সীমানা নির্ধারণকারী খুঁটি বসানো হবে বলে বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের এক সূত্রে জানা গেছে।
তাছাড়া, উচ্চ আদালত ২০০৯ সালের ঐতিহাসিক এক রায়ে সিদ্ধান্ত দেন। তা হচ্ছে, নদীর জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে সিএস ও আরএস রেকর্ডের ভিত্তিতে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত রায়ে আদালত স্বীকার করেন, যে বাংলাদেশের প্রতিটি নদী সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রবাহপথ পরিবর্তন করে। ‘বাংলাদেশের নদীগুলোর এই প্রবাহপথ পরিবর্তনের বৈশিষ্ট্য এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। কাজেই অত্র রীট মোকদ্দমাটিতে উত্থাপিত সমস্যা সমাধানে সর্ব প্রথম আমাদের নদীগুলির সীমানা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নদীর সীমানা নির্ধারণ করতে কোন পদ্ধাতি আইন সম্মত হইবে সে সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত নিতে হইবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শাহ সিমেন্ট ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর থেকে নারায়ণগঞ্জ বিআইডব্লিউটিএ পোর্ট অফিসের লাইসেন্সে নদীর তীরবর্তী জমি ব্যবহার করছে, যা কারখানা স্থাপনের দুই বছর পর শুরু হয়। বর্তমানে কোম্পানিটির কাছে ১১ দশমিক ২৮ একর নদীর তীরবর্তী জমির ইজারা রয়েছে, যার মেয়াদ চলতি বছরের জুনে শেষ হচ্ছে। ইজারা চুক্তি অনুযায়ী, কোম্পানিটি নদী বা নদী-তীরবর্তী জায়গা ভরাট করতে পারবে না, অতিরিক্ত নদীর জমি ব্যবহার করতে পারবে না, নদীতীর পরিবর্তন করতে পারবে না। আর নাব্যতা ব্যাহত করতে পারবে না, ইচ্ছামতো জাহাজ ভেড়াতে পারবে না এবং নদীতে বর্জ্য ফেলতে পারবে না। নারায়ণগঞ্জ বিআইডব্লিউটিএ পোর্ট অফিসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, শাহ সিমেন্ট চুক্তির শর্ত মানছে না। তারা ধীরে ধীরে নদী ও নদীতীর ভরাট করছে। যার ফলে ওই এলাকায় নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে। আমরা মাঝে মাঝে সাইট পরিদর্শন করি, মৌখিকভাবে তাদের শর্ত মানতে বরা হচ্ছে এবং মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।
নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এক সফরে এলাকাটি পরিদর্শন করে অবৈধ দখল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।