CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬

রাজধানীর ‘গলার কাটা’ ব্যাটারি চালিত রিক্সা

#
news image

বেসরকারি চাকুরিজীবি তাজুল ইসলাম। প্রতিদিন খিলগাঁও থেকে মতিঝিল অফিস করেন। যাতায়াতে একমাত্র তার ভরসা রিক্সা। এক সময় টেম্পু থাকলেও এখন আর তা ঠিক মতো পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপশি ব্যাটারি চালিত রিক্সার দাপটে হাড়িয়ে গেছে প্যডেল চালিত রিক্সা। সঙ্গে বেড়েছে যানজটসহ অসহনীয় ভোগান্তি। এমন বক্তব্য প্রায় রাজধানীর সকল শ্রেনী-পেশার মানুষের। 
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর মূল সড়কের ক্রসিং পয়েন্টে আইনশৃখলা বাহিনির লোক দাঁড়িয়ে থাকলেও থোরাই কেয়ার করছেন রিক্সার ড্রাইভাররা। সিগনাল কি জিনিস তারা মানছেই না। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। আর এই দুর্ঘটনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন নারী-শিশুরা।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশের পট পরিবর্তনের পর সুযোগ বুঝে রাজধানীর সীমান্ত এলাকার অলিগলিসহ আশপাশের এলাকা থেকে ঢাকায় ঢুকে পড়েছে লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা। অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ।
নগরের আতঙ্ক: ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন নগরের এক অন্যরকম আতঙ্কের নাম। নগরীর রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, বাসাবো, বৌদ্ধ মন্দির, মুগদা, সিপাহীবাগ, মানিকনগর, মান্ডা, সায়েদাবাদ, কোনাপাড়া, বসিলাসহ বিভিন্ন এলাকাতেই আগে থেকেই চলত হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। দেশের পট পরিবর্তনের পর পুলিশ নিষ্ক্রিয় হওয়ায় এগুলো ঢাকার ভিআইপি এলাকাতেও প্রবেশ করে। শুধু তাই নয়, বিমানবন্দর সড়ক এমনকি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতেও এগুলো চলতে দেখা যায়। ট্রাফিক পুলিশ সক্রিয় হওয়ার পর ভিআইপি সড়ক ও এলাকাতে এগুলোর চলাচল কমলেও একেবারে বন্ধ হয়নি। মঙ্গলবার দুপুরেও বনানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলতে দেখা গেছে। একই চিত্র ছিল মতিঝিল, গুলিস্তান, আরামবাগ, কাকরাইল, পুরানা পল্টনসহ ব্যস্ততম এলাকাগুলোতেও।
নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করা ও বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি
রাজধানীর নিম্ন এলাকাগুলোয় এই ব্যাটারিচালিত রিকশা নামানোর ব্যাপারে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হয় না। যেমন গুলশান-বনানী কিংবা বারিধারায় চাইলেই এসব গাড়ি হুট করে নামানো যায় না; কিন্তু যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মুগদা, মানিকনগর, মান্ডা কিংবা সিপাহীবাগের মতো এলাকাগুলোতে যে কেউ যখন-তখন নামিয়ে ফেলতে পারে এসব রিকশা। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ এসব এলাকায় আরও যানজট বাড়ছে, বাড়ছে রাস্তায় বিশৃঙ্খলাও। অথচ, নিয়ম রয়েছে রাস্তার হিসাব করে যেকোনো যানবাহন নামানোর বিষয়টি। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা যেন রাস্তায় নামানোই এখন সহজ একটি প্রক্রিয়া।
এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকা, লালবাগ, হাজারীবাগ, আজিমপুরসহ ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর এবং উত্তরাতেও ব্যাপক সংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অবাধে চলাচল করছে।
দুর্ঘটনা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় প্রতিদিন রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের বেপরোয়া চলাচলে প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। কিছু কিছু ঘটনা আলোচনায় আসছে, বাকি অনেক ঘটনা জানতেও পারছে না মানুষ।
জানা গেছে, এসব রিকশা থেকে প্রতি মাসে বড় অঙ্কের চাঁদাবাজি হয়ে থাকে, যা স্থানীয় থানাসহ রাজনৈতিক পরিচয়ধারী নেতা-কর্মীরা ভাগ পেয়ে থাকেন। ঢাকা শহরের মতো দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন রাস্তার ‘গলার কাঁটা’। এলাকার ভেতরের রাস্তায় এসব রিকশা চলাচলের কথা থাকলেও এগুলো সব সময় মহাসড়কে উঠে আসে। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব নিয়ন্ত্রণ করা যায় না রাজনৈতিক কারণেই। কারণ দিনশেষে এ থেকে বড় অঙ্কের চাঁদাবাজি হয়ে থাকে, যার ভাগ রাস্তার পাতি নেতা থেকে শুরু করে প্রশাসন পর্যন্ত পেয়ে থাকে। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চাঁদাবাজি বন্ধ রয়েছে। অনেকের মতে, এগুলো নির্মূল করার এখনই উপযুক্ত সময়।
বিদ্যুৎ খরচ ও পরিবেশগত প্রভাব:
দেশের অনেক সড়কেই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলে থাকে ধীরগতির ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন, মাহিন্দ্রা গাড়িগুলো। অন্যদিকে, দূরপাল্লার পরিবহনগুলো দ্রুত গতির হয়ে থাকে। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনা। সরু রাস্তা ও ধীরগতির অবৈধ যানবাহনের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে দুর্ভোগও।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ট্রাফিক বিভাগের কাছে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও পুরো দেশজুড়েই চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। ধারণা করা হয় এ সংখ্যা ৫০ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকাসহ দেশের জেলা শহরগুলোতে চলাচল করছে। সারা দেশে এই অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও তিন চাকার অটোবাইকের ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। এতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের খরচ হচ্ছে। সাধারণত একটি ইজিবাইক চালানোর জন্য চার থেকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি প্রয়োজন। আর প্রতি সেট ব্যাটারি চার্জের জন্য গড়ে ৯০০ থেকে ১১০০ ওয়াট হিসেবে পাঁচ থেকে ছয় ইউনিট (দিনে বা রাতে কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা) বিদ্যুৎ খরচ হয়। সে হিসেবে এক লাখ ইজিবাইক বা ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জের জন্য জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন অন্তত ১১০ মেগাওয়াট এবং মাসে ৩৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হওয়ার কথা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ গ্যারেজ চুরি করে ও লুকিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এসব ব্যাটারি রিচার্জ করায় সরকার বিদ্যুতের বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও সমাধানের পথ:
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করেন বুয়েটের প্রফেসর ও গণপরিবহণ বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, রেজিস্ট্রেশনবিহীন যেসব গাড়ি যেমন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, নছিমন, করিমন সেগুলোর বিষয়ে করণীয় কী, এগুলো কেউ ভাবছেন বলে মনে হচ্ছে না।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রফেসর হাদিউজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সিঙ্গেল সড়কগুলো যখন সরাসরি মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়া হয় আর আইন করা হয় এসব তিন চাকার যান মহাসড়কে ওঠা নিষেধ, তাহলে বিকল্প রাস্তা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘গত ১৫ বছরে কয়েক লাখ মানুষের কর্মনির্ভর করে এখানে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সব মহাসড়কের দুই পাশে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সার্ভিস রোড চালু করতে হবে। এতে মহাসড়ক একদিকে ঝুঁকিমুক্ত হবে এবং থ্রি-হুইলারসহ অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল বন্ধ হবে। আনফিট যানবাহন সরিয়ে নিতে হবে।
এ বিষয় ডিএমপি থেকে বলা হয় ‘রাজধানীর যত্রতত্র চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। ট্রাফিক পুলিশ নগরীর ১০৯টি পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। কোনো কোনো দিন প্রায় ৩ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
‘শুধু আইন প্রয়োগ করে এ ধরনের রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব নয়। এ জন্য নগরীর সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুতগতির হওয়ায় দুর্ঘটনাও ঘটছে। সাধারণ মানুষ ব্যাটারিচালিত রিকশা ব্যবহার বন্ধ করলে বা কমিয়ে দিলে চালকদের মধ্যে আগ্রহ কমবে। সকলের সহযোগিতা থাকলে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে সফল হবে পুলিশ।

ইউসুফ আলী বাচ্চু

৩১ জুলাই, ২০২৫,  2:47 PM

news image
ব্যাটারি চালিত রিক্সা

বেসরকারি চাকুরিজীবি তাজুল ইসলাম। প্রতিদিন খিলগাঁও থেকে মতিঝিল অফিস করেন। যাতায়াতে একমাত্র তার ভরসা রিক্সা। এক সময় টেম্পু থাকলেও এখন আর তা ঠিক মতো পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপশি ব্যাটারি চালিত রিক্সার দাপটে হাড়িয়ে গেছে প্যডেল চালিত রিক্সা। সঙ্গে বেড়েছে যানজটসহ অসহনীয় ভোগান্তি। এমন বক্তব্য প্রায় রাজধানীর সকল শ্রেনী-পেশার মানুষের। 
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর মূল সড়কের ক্রসিং পয়েন্টে আইনশৃখলা বাহিনির লোক দাঁড়িয়ে থাকলেও থোরাই কেয়ার করছেন রিক্সার ড্রাইভাররা। সিগনাল কি জিনিস তারা মানছেই না। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। আর এই দুর্ঘটনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন নারী-শিশুরা।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশের পট পরিবর্তনের পর সুযোগ বুঝে রাজধানীর সীমান্ত এলাকার অলিগলিসহ আশপাশের এলাকা থেকে ঢাকায় ঢুকে পড়েছে লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা। অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ।
নগরের আতঙ্ক: ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন নগরের এক অন্যরকম আতঙ্কের নাম। নগরীর রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, বাসাবো, বৌদ্ধ মন্দির, মুগদা, সিপাহীবাগ, মানিকনগর, মান্ডা, সায়েদাবাদ, কোনাপাড়া, বসিলাসহ বিভিন্ন এলাকাতেই আগে থেকেই চলত হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। দেশের পট পরিবর্তনের পর পুলিশ নিষ্ক্রিয় হওয়ায় এগুলো ঢাকার ভিআইপি এলাকাতেও প্রবেশ করে। শুধু তাই নয়, বিমানবন্দর সড়ক এমনকি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতেও এগুলো চলতে দেখা যায়। ট্রাফিক পুলিশ সক্রিয় হওয়ার পর ভিআইপি সড়ক ও এলাকাতে এগুলোর চলাচল কমলেও একেবারে বন্ধ হয়নি। মঙ্গলবার দুপুরেও বনানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলতে দেখা গেছে। একই চিত্র ছিল মতিঝিল, গুলিস্তান, আরামবাগ, কাকরাইল, পুরানা পল্টনসহ ব্যস্ততম এলাকাগুলোতেও।
নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করা ও বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি
রাজধানীর নিম্ন এলাকাগুলোয় এই ব্যাটারিচালিত রিকশা নামানোর ব্যাপারে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হয় না। যেমন গুলশান-বনানী কিংবা বারিধারায় চাইলেই এসব গাড়ি হুট করে নামানো যায় না; কিন্তু যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মুগদা, মানিকনগর, মান্ডা কিংবা সিপাহীবাগের মতো এলাকাগুলোতে যে কেউ যখন-তখন নামিয়ে ফেলতে পারে এসব রিকশা। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ এসব এলাকায় আরও যানজট বাড়ছে, বাড়ছে রাস্তায় বিশৃঙ্খলাও। অথচ, নিয়ম রয়েছে রাস্তার হিসাব করে যেকোনো যানবাহন নামানোর বিষয়টি। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা যেন রাস্তায় নামানোই এখন সহজ একটি প্রক্রিয়া।
এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকা, লালবাগ, হাজারীবাগ, আজিমপুরসহ ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর এবং উত্তরাতেও ব্যাপক সংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অবাধে চলাচল করছে।
দুর্ঘটনা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় প্রতিদিন রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের বেপরোয়া চলাচলে প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। কিছু কিছু ঘটনা আলোচনায় আসছে, বাকি অনেক ঘটনা জানতেও পারছে না মানুষ।
জানা গেছে, এসব রিকশা থেকে প্রতি মাসে বড় অঙ্কের চাঁদাবাজি হয়ে থাকে, যা স্থানীয় থানাসহ রাজনৈতিক পরিচয়ধারী নেতা-কর্মীরা ভাগ পেয়ে থাকেন। ঢাকা শহরের মতো দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন রাস্তার ‘গলার কাঁটা’। এলাকার ভেতরের রাস্তায় এসব রিকশা চলাচলের কথা থাকলেও এগুলো সব সময় মহাসড়কে উঠে আসে। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব নিয়ন্ত্রণ করা যায় না রাজনৈতিক কারণেই। কারণ দিনশেষে এ থেকে বড় অঙ্কের চাঁদাবাজি হয়ে থাকে, যার ভাগ রাস্তার পাতি নেতা থেকে শুরু করে প্রশাসন পর্যন্ত পেয়ে থাকে। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চাঁদাবাজি বন্ধ রয়েছে। অনেকের মতে, এগুলো নির্মূল করার এখনই উপযুক্ত সময়।
বিদ্যুৎ খরচ ও পরিবেশগত প্রভাব:
দেশের অনেক সড়কেই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলে থাকে ধীরগতির ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন, মাহিন্দ্রা গাড়িগুলো। অন্যদিকে, দূরপাল্লার পরিবহনগুলো দ্রুত গতির হয়ে থাকে। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনা। সরু রাস্তা ও ধীরগতির অবৈধ যানবাহনের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে দুর্ভোগও।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ট্রাফিক বিভাগের কাছে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও পুরো দেশজুড়েই চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। ধারণা করা হয় এ সংখ্যা ৫০ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকাসহ দেশের জেলা শহরগুলোতে চলাচল করছে। সারা দেশে এই অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও তিন চাকার অটোবাইকের ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। এতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের খরচ হচ্ছে। সাধারণত একটি ইজিবাইক চালানোর জন্য চার থেকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি প্রয়োজন। আর প্রতি সেট ব্যাটারি চার্জের জন্য গড়ে ৯০০ থেকে ১১০০ ওয়াট হিসেবে পাঁচ থেকে ছয় ইউনিট (দিনে বা রাতে কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা) বিদ্যুৎ খরচ হয়। সে হিসেবে এক লাখ ইজিবাইক বা ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জের জন্য জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন অন্তত ১১০ মেগাওয়াট এবং মাসে ৩৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হওয়ার কথা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ গ্যারেজ চুরি করে ও লুকিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এসব ব্যাটারি রিচার্জ করায় সরকার বিদ্যুতের বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও সমাধানের পথ:
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করেন বুয়েটের প্রফেসর ও গণপরিবহণ বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, রেজিস্ট্রেশনবিহীন যেসব গাড়ি যেমন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, নছিমন, করিমন সেগুলোর বিষয়ে করণীয় কী, এগুলো কেউ ভাবছেন বলে মনে হচ্ছে না।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রফেসর হাদিউজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সিঙ্গেল সড়কগুলো যখন সরাসরি মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়া হয় আর আইন করা হয় এসব তিন চাকার যান মহাসড়কে ওঠা নিষেধ, তাহলে বিকল্প রাস্তা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘গত ১৫ বছরে কয়েক লাখ মানুষের কর্মনির্ভর করে এখানে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সব মহাসড়কের দুই পাশে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সার্ভিস রোড চালু করতে হবে। এতে মহাসড়ক একদিকে ঝুঁকিমুক্ত হবে এবং থ্রি-হুইলারসহ অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল বন্ধ হবে। আনফিট যানবাহন সরিয়ে নিতে হবে।
এ বিষয় ডিএমপি থেকে বলা হয় ‘রাজধানীর যত্রতত্র চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। ট্রাফিক পুলিশ নগরীর ১০৯টি পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। কোনো কোনো দিন প্রায় ৩ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
‘শুধু আইন প্রয়োগ করে এ ধরনের রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব নয়। এ জন্য নগরীর সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুতগতির হওয়ায় দুর্ঘটনাও ঘটছে। সাধারণ মানুষ ব্যাটারিচালিত রিকশা ব্যবহার বন্ধ করলে বা কমিয়ে দিলে চালকদের মধ্যে আগ্রহ কমবে। সকলের সহযোগিতা থাকলে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে সফল হবে পুলিশ।