ইউসুফ আলী বাচ্চু
০১ আগস্ট, ২০২৫, 6:30 PM
দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে ঘুরেফিরে একটি বিষয় উঠে আসছে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার কবে যাবে। এরই মধ্যে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)’র ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য’এর একটি মন্তব্যে যেন চলমান পরিস্থিতিতে সকলের মনের কথাই উচ্চারণ হল। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের চলে যাওয়ার জন্য এখন চিন্তা করার সময় এসেছে। গত বুধবার এমন মন্তব্য করেন তিনি। ‘অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপকে পরবর্তী সরকার কী পরিমাণ বৈধতা দেবে, তা এখনই চিন্তা করতে হবে। বিশেষ করে যেসব সংস্কার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে পরিপূর্ণ স্বচ্ছতা প্রয়োজন। এখন এক্সিট পলিসি ও অর্জনের স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়ার সময় এসেছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, অপরদিকে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ও সমন্বয়হীনতা সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে দেশ। এই প্রেক্ষাপটেই উঠে আসছে ‘এই সরকারের মেয়াদ কি শেষের দিকে?’ রাজনৈতি বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান ঘটনা অনেক আলোচনা- সমলোচনা রয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাথমিক শাখায় বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয় সম্প্রতি। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় অনেক শিক্ষার্থী হতাহত হন। দুর্ঘটনার পরপরই পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং ক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীরা। তাছাড়া পুরো দেশে-ও এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। এরপরের দিনই রাতে বিএনপি-জামায়াতসহ ৪টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠকে বসেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরই ধারাবাহিকতায় পরেরদিন গত ২৩ জুলাই বুধবার আরও ১৩টি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর যেতে না যেতেই পরাজিত শক্তির (পতিত আওয়ামী লীগ) নানা ষড়যন্ত্রের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।’ এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যকে আরও দৃশ্যমান করা দরকার। উভয় বৈঠকেই চলমান অস্থিরতা কাটিয়ে আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তা ও পরামর্শ চেয়েছেন ড. ইউনূস। এদিকে গত ৯ জুলাই রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর সারাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে- এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ১১ মাস পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কেন অব্যাহত? খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও দলবদ্ধ সহিংসতার (মব সন্ত্রাস) মতো ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলেছে। ফলে সরকারের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্লেষকরাও। এছাড়া খুলনায় যুবদল নেতাকে হত্যার পর তার পায়ের রগ কেটে দেওয়া, চাঁদপুরে মসজিদের ভেতরে ইমামকে চাপাতি দিয়ে কোপানো, মাদারীপুরে মসজিদে আপন দুই ভাইসহ তিনজনকে কুপিয়ে হত্যাসহ নানা ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে দেশে চরম নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে। এই সরকারের আমলেই গত ১১ মাসে ‘মব সন্ত্রাস’ এক সামাজিক ব্যাধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ করছেন বিশ্লেষকরা। অনেক সময় মব হামলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগেই ঘোষণা দিয়ে চালানো হয়েছে, অথচ প্রতিরোধে দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাইস্টোনের ঘটনার পর দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে আর উপায়ান্ত না দেখে প্রধান উদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলার সঙ্গে বৈঠকে বসে। ওই বৈঠকের পর প্রত্যেক দলের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানান দলের নেতারা। ওই সকল বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রায় সবদলই জোর দিয়েছে দ্রুত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে বিএনপিসহ সমমনাদের সবক’টিই জানিয়ে দিয়েছেন সংস্কার ও নির্বাচন ঠিকভাবে হবে কি না, এসব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংশয় রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে এনসিপির প্রতি বিশেষ নজর দিচ্ছে সরকার। ফলে রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ছে। সরকার নিরপেক্ষতা হারালে সঠিক নির্বাচন সম্ভব নয়। আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয় যে, দিন যত যাচ্ছে দেশ অরাজকতার দিকে এগোচ্ছে। কারণ সরকার দুর্বল। অবাধ নির্বাচনের জন্য সরকারকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বারবার সংলাপ করতে হবে। সরকারের নিরপেক্ষতা নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে লন্ডনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক হয়। বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দু-ই প্রধান ব্যক্তির ওয়ান টু ওয়ান বৈঠক। কিন্তু এধরনের বৈঠকের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দেশের বাকি রাজনৈতিক দলকে অপমান করা হয়েছে বলে মনে করা হতে থাকে। আর এবার তা-ই সে অপবাদের হাত থেকে রেহাই পেতে কৌশলে সুসংবাদ জানালেন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত ১৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠকে। এবার আর বড়ো বড়ো দলের নেতাদের সাথে একা বা যৌথ বৈঠকে বলা হয়নি। অপেক্ষাকৃত কমশক্তির দলগুলির কাছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতে ছোট দলগুলি কিছুটা পুলকিত বোধ করেছে সত্য। তাদের সাথে বৈঠকে আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেন বলে প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূস বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির (কাজী জাফরের) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ১৩টি দল এবং একটি জোটের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য দেন তিনি। যমুনার সামনে সংবাদ সম্মেলনে ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়কারী ও জাতীয় পার্টির (কাজী জাফরের) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, “আমি আনন্দের সাথে ঘোষণা করতে চাই- প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্টভাবে বলেছেন, আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে নির্বাচনের একটা সুনির্দিষ্ট সময়সীমা, তারিখ উনি (মুহাম্মদ ইউনূস) ঘোষণা করবেন। ধারণা করা হচ্ছে অগাস্টের শুরুতেই আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হতে পারে। এমনটাই আশা করছেন অনেকে। প্রশ্ন হচ্ছে কিন্তু কেনো? যেখানে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বারবার চলতি বছরের ডিসেম্বরের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা দেওয়ার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছিল, যেখানে প্রধান উপদেষ্টা বারবারই কৌশলী উত্তর দিয়ে পাশ কেটে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সেই তিনি ছোট দলগুলির কাছে জানালেন যে, অল্প কয়েকদিনের মধ্যে নির্বাচনের তারিখ তিনি দিতে যাচ্ছেন? রাজনৈতিক দলগুলোর ধারণা ছিল প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূস আগামী বছর জুনের আগে কোনোভাবেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেনই না। একারণে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ধরে নেয় প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূস তাহলে হয়তবা ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেন। এবং এবিষয়টি হয়তবা জানা যাবে নভেম্বর ডিসেম্বরের আগে। কিন্তু এভাবে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। বাংলাদেশে একটি দ্রুত নির্বাচনের আয়োজনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের চাপ দিন দিন বাড়ছে বলেও অনেকের ধারণা। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি এ্যান জ্যাকবসন। গত সপ্তাহে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর (অব.) সঙ্গে সৌজন্য স্বাক্ষাত করতে আসেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মেগান বোল্ডিন। এসব বৈঠকে দ্রুত নির্বাচনের ব্যাপার আলাপ আলোচনা ছিল। তবে একটি সূত্র জানায় প্রধান উপদেষ্টা বুঝতে পারছেন যে দিন যতোই যাচ্ছে ততই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এর প্রথম কারণ হচ্ছে আমেরিকায় এখন ট্রাম্প প্রশাসন। সহজেই সব কিছু এখন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অনুকূলে যাচ্ছে না। এমনকি দেখা যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা ৩৫ শতাংশ শুল্ক নিয়ে দরকষাকষিতে এখন আর শুকনো কথা চিড়া ভিজছে না। ট্রাম্প কিছুতেই ড. ইউনুসের সম্মানকে প্রাধান্য দিচ্ছে না। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা ৩৫ শতাংশ শুল্ক নিয়ে দরকষাকষির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। আবার দেখা গেছে এতোদিন তারা ভেবেছিল ড. ইউনুসের ব্যক্তিগত কারিসমা দিয়ে ট্রাম্পকে মানিয়ে নিতে পারবেন, তাদেরও মোহ ভঙ্গ হয়েছে। দেখা গেলো বাংলাদেশি পণ্যে বাড়তি শুল্ক কমানোর দর-কষাকষির জন্য লবিস্ট নিয়োগ করার চেষ্টা করছে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এমন তথ্য দিয়ে সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, আমরা লবিস্ট নিয়োগে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন এসব বিষয়গুলির এখন জনসন্মুখে চলে আসছে যে দেশের চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক খাতকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অরাজনৈতিক সরকারের চাদর দিয়ে মোকাবিলা করতে পারবেন না। একারণের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দ্রুত নির্বাচন দিয়ে একটি রাজনৈতিক সরকারের হাতে ক্ষমতা দেওয়াকে অপেক্ষাকৃত বেটার বলে মনে করছেন এবং দ্রুত সড়ে পড়তে চান। বিশ্লেষকদের মতে, যদি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা ঘোষণা করা হয় তাহলে ধরে নিতে হবে একধরনের রাজনৈতিক হিসাব। আর যদি আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয় তাহলে আরেক হিসাবে বাংলাদেশে সামনের দিনগুলি চলবে।
ইউসুফ আলী বাচ্চু
০১ আগস্ট, ২০২৫, 6:30 PM
দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে ঘুরেফিরে একটি বিষয় উঠে আসছে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার কবে যাবে। এরই মধ্যে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)’র ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য’এর একটি মন্তব্যে যেন চলমান পরিস্থিতিতে সকলের মনের কথাই উচ্চারণ হল। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের চলে যাওয়ার জন্য এখন চিন্তা করার সময় এসেছে। গত বুধবার এমন মন্তব্য করেন তিনি। ‘অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপকে পরবর্তী সরকার কী পরিমাণ বৈধতা দেবে, তা এখনই চিন্তা করতে হবে। বিশেষ করে যেসব সংস্কার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে পরিপূর্ণ স্বচ্ছতা প্রয়োজন। এখন এক্সিট পলিসি ও অর্জনের স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়ার সময় এসেছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, অপরদিকে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ও সমন্বয়হীনতা সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে দেশ। এই প্রেক্ষাপটেই উঠে আসছে ‘এই সরকারের মেয়াদ কি শেষের দিকে?’ রাজনৈতি বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান ঘটনা অনেক আলোচনা- সমলোচনা রয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাথমিক শাখায় বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয় সম্প্রতি। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় অনেক শিক্ষার্থী হতাহত হন। দুর্ঘটনার পরপরই পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং ক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীরা। তাছাড়া পুরো দেশে-ও এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। এরপরের দিনই রাতে বিএনপি-জামায়াতসহ ৪টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠকে বসেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরই ধারাবাহিকতায় পরেরদিন গত ২৩ জুলাই বুধবার আরও ১৩টি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর যেতে না যেতেই পরাজিত শক্তির (পতিত আওয়ামী লীগ) নানা ষড়যন্ত্রের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।’ এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যকে আরও দৃশ্যমান করা দরকার। উভয় বৈঠকেই চলমান অস্থিরতা কাটিয়ে আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তা ও পরামর্শ চেয়েছেন ড. ইউনূস। এদিকে গত ৯ জুলাই রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর সারাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে- এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ১১ মাস পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কেন অব্যাহত? খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও দলবদ্ধ সহিংসতার (মব সন্ত্রাস) মতো ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলেছে। ফলে সরকারের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্লেষকরাও। এছাড়া খুলনায় যুবদল নেতাকে হত্যার পর তার পায়ের রগ কেটে দেওয়া, চাঁদপুরে মসজিদের ভেতরে ইমামকে চাপাতি দিয়ে কোপানো, মাদারীপুরে মসজিদে আপন দুই ভাইসহ তিনজনকে কুপিয়ে হত্যাসহ নানা ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে দেশে চরম নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে। এই সরকারের আমলেই গত ১১ মাসে ‘মব সন্ত্রাস’ এক সামাজিক ব্যাধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ করছেন বিশ্লেষকরা। অনেক সময় মব হামলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগেই ঘোষণা দিয়ে চালানো হয়েছে, অথচ প্রতিরোধে দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাইস্টোনের ঘটনার পর দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে আর উপায়ান্ত না দেখে প্রধান উদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলার সঙ্গে বৈঠকে বসে। ওই বৈঠকের পর প্রত্যেক দলের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানান দলের নেতারা। ওই সকল বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রায় সবদলই জোর দিয়েছে দ্রুত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে বিএনপিসহ সমমনাদের সবক’টিই জানিয়ে দিয়েছেন সংস্কার ও নির্বাচন ঠিকভাবে হবে কি না, এসব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংশয় রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে এনসিপির প্রতি বিশেষ নজর দিচ্ছে সরকার। ফলে রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ছে। সরকার নিরপেক্ষতা হারালে সঠিক নির্বাচন সম্ভব নয়। আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয় যে, দিন যত যাচ্ছে দেশ অরাজকতার দিকে এগোচ্ছে। কারণ সরকার দুর্বল। অবাধ নির্বাচনের জন্য সরকারকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বারবার সংলাপ করতে হবে। সরকারের নিরপেক্ষতা নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে লন্ডনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক হয়। বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দু-ই প্রধান ব্যক্তির ওয়ান টু ওয়ান বৈঠক। কিন্তু এধরনের বৈঠকের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দেশের বাকি রাজনৈতিক দলকে অপমান করা হয়েছে বলে মনে করা হতে থাকে। আর এবার তা-ই সে অপবাদের হাত থেকে রেহাই পেতে কৌশলে সুসংবাদ জানালেন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত ১৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠকে। এবার আর বড়ো বড়ো দলের নেতাদের সাথে একা বা যৌথ বৈঠকে বলা হয়নি। অপেক্ষাকৃত কমশক্তির দলগুলির কাছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতে ছোট দলগুলি কিছুটা পুলকিত বোধ করেছে সত্য। তাদের সাথে বৈঠকে আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেন বলে প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূস বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির (কাজী জাফরের) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ১৩টি দল এবং একটি জোটের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য দেন তিনি। যমুনার সামনে সংবাদ সম্মেলনে ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়কারী ও জাতীয় পার্টির (কাজী জাফরের) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, “আমি আনন্দের সাথে ঘোষণা করতে চাই- প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্টভাবে বলেছেন, আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে নির্বাচনের একটা সুনির্দিষ্ট সময়সীমা, তারিখ উনি (মুহাম্মদ ইউনূস) ঘোষণা করবেন। ধারণা করা হচ্ছে অগাস্টের শুরুতেই আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হতে পারে। এমনটাই আশা করছেন অনেকে। প্রশ্ন হচ্ছে কিন্তু কেনো? যেখানে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বারবার চলতি বছরের ডিসেম্বরের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা দেওয়ার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছিল, যেখানে প্রধান উপদেষ্টা বারবারই কৌশলী উত্তর দিয়ে পাশ কেটে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সেই তিনি ছোট দলগুলির কাছে জানালেন যে, অল্প কয়েকদিনের মধ্যে নির্বাচনের তারিখ তিনি দিতে যাচ্ছেন? রাজনৈতিক দলগুলোর ধারণা ছিল প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূস আগামী বছর জুনের আগে কোনোভাবেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেনই না। একারণে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ধরে নেয় প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূস তাহলে হয়তবা ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেন। এবং এবিষয়টি হয়তবা জানা যাবে নভেম্বর ডিসেম্বরের আগে। কিন্তু এভাবে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। বাংলাদেশে একটি দ্রুত নির্বাচনের আয়োজনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের চাপ দিন দিন বাড়ছে বলেও অনেকের ধারণা। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি এ্যান জ্যাকবসন। গত সপ্তাহে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর (অব.) সঙ্গে সৌজন্য স্বাক্ষাত করতে আসেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মেগান বোল্ডিন। এসব বৈঠকে দ্রুত নির্বাচনের ব্যাপার আলাপ আলোচনা ছিল। তবে একটি সূত্র জানায় প্রধান উপদেষ্টা বুঝতে পারছেন যে দিন যতোই যাচ্ছে ততই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এর প্রথম কারণ হচ্ছে আমেরিকায় এখন ট্রাম্প প্রশাসন। সহজেই সব কিছু এখন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অনুকূলে যাচ্ছে না। এমনকি দেখা যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা ৩৫ শতাংশ শুল্ক নিয়ে দরকষাকষিতে এখন আর শুকনো কথা চিড়া ভিজছে না। ট্রাম্প কিছুতেই ড. ইউনুসের সম্মানকে প্রাধান্য দিচ্ছে না। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা ৩৫ শতাংশ শুল্ক নিয়ে দরকষাকষির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। আবার দেখা গেছে এতোদিন তারা ভেবেছিল ড. ইউনুসের ব্যক্তিগত কারিসমা দিয়ে ট্রাম্পকে মানিয়ে নিতে পারবেন, তাদেরও মোহ ভঙ্গ হয়েছে। দেখা গেলো বাংলাদেশি পণ্যে বাড়তি শুল্ক কমানোর দর-কষাকষির জন্য লবিস্ট নিয়োগ করার চেষ্টা করছে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এমন তথ্য দিয়ে সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, আমরা লবিস্ট নিয়োগে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন এসব বিষয়গুলির এখন জনসন্মুখে চলে আসছে যে দেশের চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক খাতকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অরাজনৈতিক সরকারের চাদর দিয়ে মোকাবিলা করতে পারবেন না। একারণের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দ্রুত নির্বাচন দিয়ে একটি রাজনৈতিক সরকারের হাতে ক্ষমতা দেওয়াকে অপেক্ষাকৃত বেটার বলে মনে করছেন এবং দ্রুত সড়ে পড়তে চান। বিশ্লেষকদের মতে, যদি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা ঘোষণা করা হয় তাহলে ধরে নিতে হবে একধরনের রাজনৈতিক হিসাব। আর যদি আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয় তাহলে আরেক হিসাবে বাংলাদেশে সামনের দিনগুলি চলবে।