ইউসুফ আলী বাচ্চু
১৩ আগস্ট, ২০২৫, 6:48 PM
খাট, ইজি চেয়ার, চারকোনা দুটি টেবিল ঘিরে প্লাস্টিকের কিছু চেয়ার ও দেয়ালে সাঁটানো দলীয় ব্যানার নির্বাচন কমিশনের নতুন যাচাইবাছাইয়ে উত্তীর্ণ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরের চিত্রটা এমনই। রাজধানীর বাংলা বাজারে আর এম প্লাজার ১০ তলা ভবনের চিলেকোঠায় এককক্ষের এই দলটিকে বাছাই করা হয়েছে ১৪৩টি দলের আবেদনের মধ্য থেকে।
ঘরোয়া পরিবেশে যেমন রাজনৈতিক দলের অফিস, তেমনই দলের নাম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম’ নামে রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত থাকলেও এই নামের সঙ্গে নেজামে ইসলাম পার্টি নামে যোগ (জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি) করে ফের আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি নামেও একটি দলকে যাচাইবাছাইয়ে পাস মার্ক দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর বাইরে আরও কয়েকটি অংশে বিভক্ত হয়ে দল পরিচালনা করছেন নেজামে ইসলাম পার্টির নেতারা।
ব্রিটিশ ভারতে পাকিস্তান আন্দোলনের সময় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ থেকে নেজামে ইসলাম পার্টির জন্ম দেন তৎকালীন নেতারা। নির্বাচন কমিশনের বাছাইয়ে উত্তীর্ণ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব পরিচয়ে মুফতি মোহাম্মদ কাইয়ূম দাবি করেন, তিনি ১৯৪৫ সালে গঠিত নেজামে ইসলাম পার্টির লিগেসি থেকে এভাবে দল করছেন।
নির্বাচন কমিশনের বাছাইয়ে তার নামই মহাসচিব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে। ঢাকার ডেমরা এলাকার আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেন মুফতি মোহাম্মদ কাইয়ূম।
প্রয়াত মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী দলের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব পদে ছিলেন মুফতি কাইয়ূম। পুরানা পল্টনে এই অংশের কার্যালয়টি বর্তমানে নেজামীর ছেলের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে।
মঙ্গলবার সরেজমিনে বাংলাবাজারের নর্থব্রুক হল রোডের ৫০/৩ নম্বর ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যায় ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়। একটি সরু গলির ভেতরে ১০ তলা একটি ভবন। এই ভবনের নিচ তলায় রয়েছে মোটর পার্টসের দোকান। দোতালায় রয়েছে আরও কিছু দোকান। এরমধ্যে একটি খোলা পাওয়া গেলেও বাকিগুলো বন্ধ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনের চার তলা পর্যন্ত রয়েছে বিভিন্ন মোটর পার্টসের গোডাউন। পাঁচ তলা থেকে ১০ তলা পর্যন্ত আবাসিক বসতি। ১০ তলায় গিয়েও কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় খুঁজে পাওয়া যায়নি প্রথমে। পরে ১০ তলার উপরে ছাদের চিলেকোঠায় দেখা মেলে ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়।
কার্যালয়ের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, দলীয় ব্যানার টানানো। এছাড়া রয়েছে দুটি টেবিল পাশাপাশি রাখা মিটিং টেবিল, ১৫টি চেয়ার, একটি কিং সাইজের খাট, একটি ড্রেসিং টেবিল, একটি সোফা, একটি রকিং চেয়ার এবং ফাইল রাখার একটি স্টিলের শেলফ।
এসময় কথা হয় বাড়ির একাংশের মালিক ও দলটির সহকারী মহাসচিব রবিউল আলম মজুমদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এটিই ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়। করোনার সময় থেকে (আনুমানিক ২০২০ সাল) এটিই কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আমরা এখানেই দলের মিটিং করি। এটির ভাড়া ৮ হাজার টাকা, ইউটিলিটিসহ ১০ হাজার টাকা পরে যায়।
তিনি জানান, ভবনের চার তলা পর্যন্ত কমার্শিয়াল ভাড়া দেওয়া। তার উপরে থেকে আবাসিক বাসা।
রবিউল আলম বলেন, ‘আমরা এই ভবনের একমাত্র মালিক না, আরও মালিক আছে। আমি দলের সঙ্গে যুক্ত আছি। আমি দলের সহকারী মহাসচিব। আর আমার বাবা দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি। এক সময় বর্তমান ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন এই দলের সহ-সভাপতি ছিলেন।’
এসময় ভবনের নিচের মোটর পার্টসের দোকানিদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এই ভবনে কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় আছে কিনা, জানতে চাইলে দোকানি বলেন, ‘আমার জানামতে এরকম কিছু নাই। আমি দেড় বছর ধরে এই দোকান চালাচ্ছি এরকম কিছু দেখি নাই। তবে মালিকরা মোটর পার্টস সমিতির সঙ্গে যুক্ত আছে, হয়তো রাজনীতি করে।’
গতকাল বুধবার নর্থব্রুক হল রোডে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে নিজের মোটর পার্টসের দোকানে বসে কথা বলেন দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা আব্দুর রশিদ মজুমদার। এসময় তিনি তার দলের আগের সদস্যদের নামের তালিকা দেখান। তালিকায় শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ নেজাম ইসলাম পার্টির’ নাম দেখা যায়। এসময় তার কাছে জানতে চাওয়া হয় এখন দলের নাম পরিবর্তন হয়েছে কিনা। তিনি বলেন, ‘না। দলের নাম জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি। ছোট করে নেজামে ইসলাম পার্টি বলি।’
‘নেজাম ইসলাম পার্টি’ নামে আরেকটা দল আছে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘এটা পোলাপানদের একটা দল। রাস্তা-ঘাটে ঘুরে এরা নাম দিয়ে খুলে ফেলছে। এরা ছোট পোলাপান।’
প্রসঙ্গত, নেজামে ইসলাম পার্টি নামে বেশ কয়েকটি অংশ সক্রিয় রয়েছে। এরমধ্যে একেএম আশরাফুল হকসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি অংশ ইতোমধ্যে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করছে। অন্য একটি অংশ জামায়াতের সঙ্গে যেতে আগ্রহী। আব্দুর রকিবের নামে একটি অংশ রয়েছে।
‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি’র মহাসচিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুমের সঙ্গে কথা হয়। এসময় ইলেকশন কমিশনে ‘জমিয়তে উলামা ইসলাম’ এবং ‘নেজাম ইসলাম পার্টি’ এই দুই দলের নামে আবেদন করছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এটা দুই দল না একদল।’
একদল বলতে মানে জমিয়তে উলামা নাকি নেজাম ইসলাম পার্টি প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘এটার পুরা নামটা এরকমই ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি’। এটা সংক্ষেপে বলে আরকি ‘নেজাম ইসলাম’। এটা পাকিস্তান পিরিয়ড থেকেই সংক্ষেপে ‘নেজাম ইসলাম পার্টি’ বলে।’’
‘জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম’ নামে আলাদা করে একটি দলের নিবন্ধনও আছে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম যেটা আছে, ওনারা তো আছে আগে থেকেই। ওনারা শুধু এতটুকুই ব্যবহার করে। আমাদের নামটা হলো পুরো নাম ‘জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও নেজাম ইসলাম পার্টি’। সংক্ষেপে ‘নেজাম ইসলাম পার্টি’ হিসেবে সবাই চেনে।’
আপনার মনে হয় না যে, দুইটা দল আলাদা হয়ে গেছে এখন দুইটা এক হয়েছে? এর জবাবে তিনি বলেন, ‘অনেকে এটা এরকম মনে করেন। কিন্তু এটা অনেক আগে থেকেই এই নামে চলে আসছে। যেটা নিবন্ধিত আছে ওইটার ধারা আর আমাদের জমিয়তের ধারা ভিন্ন। ওনারা সম্পর্ক রাখেন জমিয়তে ওলামা হিন্দের সঙ্গে। আর আমাদের সম্পর্ক হলো যেটা শুরুতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। যেটা পাকিস্তান গঠনের পক্ষে ছিল সেটার সঙ্গে।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা মুঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এর নেপথ্যে কোনও চক্রান্ত আছে কিনা, তা ভাবা প্রয়োজন। একসময় জমিয়ত ও নেজামে ইসলামের পার্টির নামে জমিয়তের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভবনে (৫১/৫১ পুরানা পল্টন) ব্যানার দেখেছিলাম।’
জমিয়তের নেতারা জানান, ব্রিটিশ ভারতে ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ। ওই সময় দলটি অবিভক্ত ভারতের পক্ষে স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে যায়। ১৯৪৫ সালে পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম। স্বাধীনতা উত্তর পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জমিয়ত, নেজামে ইসলাম পার্টি নামে নিজেদের নির্বাচনি সেল গঠন করে ৩৬টি আসনে জয়লাভ করে।
এই মুহূর্তে আপনার দলের সাবেক কোনও সংসদ সদস্য আছে কিনা, জানতে চাইলে জমিয়ত-নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা কাইয়ূম বলেন, ‘সংসদ সদস্য না, কিন্তু এই (দলের) নামে নির্বাচন করছেন মাওলানা আব্দুল মালেক হালিম। উনি আছেন এখনও হায়াতে (জীবিত) আছেন।’
তিনি বলেন, ‘নিবন্ধনের জন্য তিনটা ক্যাটাগরি ছিল। একটা ক্যাটাগরি হলো যদি এই দলের থেকে এমপি থাকে, আরেকটা ক্যাটাগরি হলো যদি এই দলের রাজনৈতিক অফিস এবং কার্যক্রম ২০টা জেলা ১০০টা উপজেলার মধ্যে থাকে, তাহলে তারা নিবন্ধন পাবে। আর আরেকটা হলো এ দলের নামে যদি কেউ নির্বাচন করে থাকে এবং কাস্টিং ভোটের ৫ শতাংশ পায়, তাইলে তারাও নিবন্ধন পাবে। আমাদের সারা দেশে অফিস নাই। কিন্তু ওই যে আমাদের যে ধারা দিলাম... এমপি হয় নাই, কিন্তু সে ৫ শতাংশ ভোটের বেশি পেয়েছে। ওই ক্রাইটেরিয়াটাতে আমরা দিয়েছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘নতুন দল নিবন্ধনের জন্য মোট ১৪৩টি আবেদন জমা পড়েছিল। পরে ইসির কমিটি থেকে প্রথম ১৪৩টি দলকেই রিভিউ করে আমরা এটা পাঠিয়েছি, তাদের (তথ্যের) ঘাটতি পূরণের জন্য। ঘাটতি পূরণ করার পরে তারা যে পেপার দিয়েছে, সেই অনুযায়ী সোমবার (১২ আগস্ট) ২২টি দলকে আমরা বললাম— হ্যাঁ, তারা পেপারওয়াইজ ঠিক আছে, ডকুমেন্টওয়াইজ ঠিক আছে।’
আখতার আহমেদ আরও বলেন, ‘এখন এখানে দুটি ব্যাপার আছে। একটা হচ্ছে কিছু ডকুমেন্ট, আরেকটা হচ্ছে ফিল্ডের কিছু, যেমন- ১০০টি উপজেলায় ২০০ জন করে ওনাদের দলভুক্ত মানে মানুষ আছে। সেটা তো যাচাই-বাছাই করতে হবে। আমরা এখন ২২টি দলের বিষয়ে যাচাই বাছাই করতে জন্য পাঠাবো।’
আর দল বাড়বে কিনা জানতে চাইলে ইসির এই সিনিয়র সচিব বলেন, ‘প্রাথমিক বিবেচনায় নাই। যদি হতো তাহলে ওটা ২২ টির জায়গায় ২৩টি বলতেন, কিংবা ২২ এর জায়গায় ১৮ বলতেন। ১৮ বা ২৩ বলেননি। অতএব, কমিটির বিবেচনায় এটি ২২ই থাকবে। আর ২২ বাদে যেগুলো আছে সেগুলো নেই।’
যদি কোনও দলের আপত্তি থাকে, সেক্ষেত্রে নিষ্পত্তি কীভাবে হবে জানতে চাইলে আখতার আহমেদ বলেন, ‘বাকিরা কেন হননি, আমরা সে ব্যাপারে তাদেরকে লিখিতভাবে জানাবো। যার যেটা যেখানে ঘাটতি আছে, আমরা সেটা লিখিতভাবে তাদেরকে জানাবো। এরজন্য একটু সময় দিতে হবে। আর জানিয়ে দেওয়ার পরে ইট ইজ দেয়ার ফ্রিডম। এখন ওনারা কী করবেন, সেটা ওনারা বলতে পারবেন, আমি বলতে পারবো না।’
সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র ও একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতা জানান, নিবন্ধন নিয়ে বেশ কয়েকটি আপত্তি ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা দলগুলোকে বাদ রেখে প্রশ্নবিদ্ধ ব্যানারভিত্তিক দলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রাথমিক বিবেচিত ২২টি দলের মধ্যে এনসিপি, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি, জনতার অধিকার দলসহ কয়েকটি দলের কার্যালয়, দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম থাকলেও অনেক সংগঠনের তা নেই। তবে নির্বাচন কমিশনের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, আপত্তি আসলে তা বিবেচনা করে ব্যবস্থা নিতে বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার আন্তরিক।
ইউসুফ আলী বাচ্চু
১৩ আগস্ট, ২০২৫, 6:48 PM
খাট, ইজি চেয়ার, চারকোনা দুটি টেবিল ঘিরে প্লাস্টিকের কিছু চেয়ার ও দেয়ালে সাঁটানো দলীয় ব্যানার নির্বাচন কমিশনের নতুন যাচাইবাছাইয়ে উত্তীর্ণ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরের চিত্রটা এমনই। রাজধানীর বাংলা বাজারে আর এম প্লাজার ১০ তলা ভবনের চিলেকোঠায় এককক্ষের এই দলটিকে বাছাই করা হয়েছে ১৪৩টি দলের আবেদনের মধ্য থেকে।
ঘরোয়া পরিবেশে যেমন রাজনৈতিক দলের অফিস, তেমনই দলের নাম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম’ নামে রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত থাকলেও এই নামের সঙ্গে নেজামে ইসলাম পার্টি নামে যোগ (জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি) করে ফের আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি নামেও একটি দলকে যাচাইবাছাইয়ে পাস মার্ক দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর বাইরে আরও কয়েকটি অংশে বিভক্ত হয়ে দল পরিচালনা করছেন নেজামে ইসলাম পার্টির নেতারা।
ব্রিটিশ ভারতে পাকিস্তান আন্দোলনের সময় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ থেকে নেজামে ইসলাম পার্টির জন্ম দেন তৎকালীন নেতারা। নির্বাচন কমিশনের বাছাইয়ে উত্তীর্ণ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব পরিচয়ে মুফতি মোহাম্মদ কাইয়ূম দাবি করেন, তিনি ১৯৪৫ সালে গঠিত নেজামে ইসলাম পার্টির লিগেসি থেকে এভাবে দল করছেন।
নির্বাচন কমিশনের বাছাইয়ে তার নামই মহাসচিব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে। ঢাকার ডেমরা এলাকার আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেন মুফতি মোহাম্মদ কাইয়ূম।
প্রয়াত মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী দলের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব পদে ছিলেন মুফতি কাইয়ূম। পুরানা পল্টনে এই অংশের কার্যালয়টি বর্তমানে নেজামীর ছেলের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে।
মঙ্গলবার সরেজমিনে বাংলাবাজারের নর্থব্রুক হল রোডের ৫০/৩ নম্বর ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যায় ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়। একটি সরু গলির ভেতরে ১০ তলা একটি ভবন। এই ভবনের নিচ তলায় রয়েছে মোটর পার্টসের দোকান। দোতালায় রয়েছে আরও কিছু দোকান। এরমধ্যে একটি খোলা পাওয়া গেলেও বাকিগুলো বন্ধ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনের চার তলা পর্যন্ত রয়েছে বিভিন্ন মোটর পার্টসের গোডাউন। পাঁচ তলা থেকে ১০ তলা পর্যন্ত আবাসিক বসতি। ১০ তলায় গিয়েও কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় খুঁজে পাওয়া যায়নি প্রথমে। পরে ১০ তলার উপরে ছাদের চিলেকোঠায় দেখা মেলে ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়।
কার্যালয়ের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, দলীয় ব্যানার টানানো। এছাড়া রয়েছে দুটি টেবিল পাশাপাশি রাখা মিটিং টেবিল, ১৫টি চেয়ার, একটি কিং সাইজের খাট, একটি ড্রেসিং টেবিল, একটি সোফা, একটি রকিং চেয়ার এবং ফাইল রাখার একটি স্টিলের শেলফ।
এসময় কথা হয় বাড়ির একাংশের মালিক ও দলটির সহকারী মহাসচিব রবিউল আলম মজুমদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এটিই ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়। করোনার সময় থেকে (আনুমানিক ২০২০ সাল) এটিই কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আমরা এখানেই দলের মিটিং করি। এটির ভাড়া ৮ হাজার টাকা, ইউটিলিটিসহ ১০ হাজার টাকা পরে যায়।
তিনি জানান, ভবনের চার তলা পর্যন্ত কমার্শিয়াল ভাড়া দেওয়া। তার উপরে থেকে আবাসিক বাসা।
রবিউল আলম বলেন, ‘আমরা এই ভবনের একমাত্র মালিক না, আরও মালিক আছে। আমি দলের সঙ্গে যুক্ত আছি। আমি দলের সহকারী মহাসচিব। আর আমার বাবা দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি। এক সময় বর্তমান ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন এই দলের সহ-সভাপতি ছিলেন।’
এসময় ভবনের নিচের মোটর পার্টসের দোকানিদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এই ভবনে কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় আছে কিনা, জানতে চাইলে দোকানি বলেন, ‘আমার জানামতে এরকম কিছু নাই। আমি দেড় বছর ধরে এই দোকান চালাচ্ছি এরকম কিছু দেখি নাই। তবে মালিকরা মোটর পার্টস সমিতির সঙ্গে যুক্ত আছে, হয়তো রাজনীতি করে।’
গতকাল বুধবার নর্থব্রুক হল রোডে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে নিজের মোটর পার্টসের দোকানে বসে কথা বলেন দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা আব্দুর রশিদ মজুমদার। এসময় তিনি তার দলের আগের সদস্যদের নামের তালিকা দেখান। তালিকায় শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ নেজাম ইসলাম পার্টির’ নাম দেখা যায়। এসময় তার কাছে জানতে চাওয়া হয় এখন দলের নাম পরিবর্তন হয়েছে কিনা। তিনি বলেন, ‘না। দলের নাম জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি। ছোট করে নেজামে ইসলাম পার্টি বলি।’
‘নেজাম ইসলাম পার্টি’ নামে আরেকটা দল আছে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘এটা পোলাপানদের একটা দল। রাস্তা-ঘাটে ঘুরে এরা নাম দিয়ে খুলে ফেলছে। এরা ছোট পোলাপান।’
প্রসঙ্গত, নেজামে ইসলাম পার্টি নামে বেশ কয়েকটি অংশ সক্রিয় রয়েছে। এরমধ্যে একেএম আশরাফুল হকসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি অংশ ইতোমধ্যে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করছে। অন্য একটি অংশ জামায়াতের সঙ্গে যেতে আগ্রহী। আব্দুর রকিবের নামে একটি অংশ রয়েছে।
‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি’র মহাসচিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুমের সঙ্গে কথা হয়। এসময় ইলেকশন কমিশনে ‘জমিয়তে উলামা ইসলাম’ এবং ‘নেজাম ইসলাম পার্টি’ এই দুই দলের নামে আবেদন করছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এটা দুই দল না একদল।’
একদল বলতে মানে জমিয়তে উলামা নাকি নেজাম ইসলাম পার্টি প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘এটার পুরা নামটা এরকমই ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি’। এটা সংক্ষেপে বলে আরকি ‘নেজাম ইসলাম’। এটা পাকিস্তান পিরিয়ড থেকেই সংক্ষেপে ‘নেজাম ইসলাম পার্টি’ বলে।’’
‘জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম’ নামে আলাদা করে একটি দলের নিবন্ধনও আছে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম যেটা আছে, ওনারা তো আছে আগে থেকেই। ওনারা শুধু এতটুকুই ব্যবহার করে। আমাদের নামটা হলো পুরো নাম ‘জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও নেজাম ইসলাম পার্টি’। সংক্ষেপে ‘নেজাম ইসলাম পার্টি’ হিসেবে সবাই চেনে।’
আপনার মনে হয় না যে, দুইটা দল আলাদা হয়ে গেছে এখন দুইটা এক হয়েছে? এর জবাবে তিনি বলেন, ‘অনেকে এটা এরকম মনে করেন। কিন্তু এটা অনেক আগে থেকেই এই নামে চলে আসছে। যেটা নিবন্ধিত আছে ওইটার ধারা আর আমাদের জমিয়তের ধারা ভিন্ন। ওনারা সম্পর্ক রাখেন জমিয়তে ওলামা হিন্দের সঙ্গে। আর আমাদের সম্পর্ক হলো যেটা শুরুতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। যেটা পাকিস্তান গঠনের পক্ষে ছিল সেটার সঙ্গে।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা মুঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এর নেপথ্যে কোনও চক্রান্ত আছে কিনা, তা ভাবা প্রয়োজন। একসময় জমিয়ত ও নেজামে ইসলামের পার্টির নামে জমিয়তের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভবনে (৫১/৫১ পুরানা পল্টন) ব্যানার দেখেছিলাম।’
জমিয়তের নেতারা জানান, ব্রিটিশ ভারতে ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ। ওই সময় দলটি অবিভক্ত ভারতের পক্ষে স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে যায়। ১৯৪৫ সালে পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম। স্বাধীনতা উত্তর পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জমিয়ত, নেজামে ইসলাম পার্টি নামে নিজেদের নির্বাচনি সেল গঠন করে ৩৬টি আসনে জয়লাভ করে।
এই মুহূর্তে আপনার দলের সাবেক কোনও সংসদ সদস্য আছে কিনা, জানতে চাইলে জমিয়ত-নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা কাইয়ূম বলেন, ‘সংসদ সদস্য না, কিন্তু এই (দলের) নামে নির্বাচন করছেন মাওলানা আব্দুল মালেক হালিম। উনি আছেন এখনও হায়াতে (জীবিত) আছেন।’
তিনি বলেন, ‘নিবন্ধনের জন্য তিনটা ক্যাটাগরি ছিল। একটা ক্যাটাগরি হলো যদি এই দলের থেকে এমপি থাকে, আরেকটা ক্যাটাগরি হলো যদি এই দলের রাজনৈতিক অফিস এবং কার্যক্রম ২০টা জেলা ১০০টা উপজেলার মধ্যে থাকে, তাহলে তারা নিবন্ধন পাবে। আর আরেকটা হলো এ দলের নামে যদি কেউ নির্বাচন করে থাকে এবং কাস্টিং ভোটের ৫ শতাংশ পায়, তাইলে তারাও নিবন্ধন পাবে। আমাদের সারা দেশে অফিস নাই। কিন্তু ওই যে আমাদের যে ধারা দিলাম... এমপি হয় নাই, কিন্তু সে ৫ শতাংশ ভোটের বেশি পেয়েছে। ওই ক্রাইটেরিয়াটাতে আমরা দিয়েছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘নতুন দল নিবন্ধনের জন্য মোট ১৪৩টি আবেদন জমা পড়েছিল। পরে ইসির কমিটি থেকে প্রথম ১৪৩টি দলকেই রিভিউ করে আমরা এটা পাঠিয়েছি, তাদের (তথ্যের) ঘাটতি পূরণের জন্য। ঘাটতি পূরণ করার পরে তারা যে পেপার দিয়েছে, সেই অনুযায়ী সোমবার (১২ আগস্ট) ২২টি দলকে আমরা বললাম— হ্যাঁ, তারা পেপারওয়াইজ ঠিক আছে, ডকুমেন্টওয়াইজ ঠিক আছে।’
আখতার আহমেদ আরও বলেন, ‘এখন এখানে দুটি ব্যাপার আছে। একটা হচ্ছে কিছু ডকুমেন্ট, আরেকটা হচ্ছে ফিল্ডের কিছু, যেমন- ১০০টি উপজেলায় ২০০ জন করে ওনাদের দলভুক্ত মানে মানুষ আছে। সেটা তো যাচাই-বাছাই করতে হবে। আমরা এখন ২২টি দলের বিষয়ে যাচাই বাছাই করতে জন্য পাঠাবো।’
আর দল বাড়বে কিনা জানতে চাইলে ইসির এই সিনিয়র সচিব বলেন, ‘প্রাথমিক বিবেচনায় নাই। যদি হতো তাহলে ওটা ২২ টির জায়গায় ২৩টি বলতেন, কিংবা ২২ এর জায়গায় ১৮ বলতেন। ১৮ বা ২৩ বলেননি। অতএব, কমিটির বিবেচনায় এটি ২২ই থাকবে। আর ২২ বাদে যেগুলো আছে সেগুলো নেই।’
যদি কোনও দলের আপত্তি থাকে, সেক্ষেত্রে নিষ্পত্তি কীভাবে হবে জানতে চাইলে আখতার আহমেদ বলেন, ‘বাকিরা কেন হননি, আমরা সে ব্যাপারে তাদেরকে লিখিতভাবে জানাবো। যার যেটা যেখানে ঘাটতি আছে, আমরা সেটা লিখিতভাবে তাদেরকে জানাবো। এরজন্য একটু সময় দিতে হবে। আর জানিয়ে দেওয়ার পরে ইট ইজ দেয়ার ফ্রিডম। এখন ওনারা কী করবেন, সেটা ওনারা বলতে পারবেন, আমি বলতে পারবো না।’
সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র ও একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতা জানান, নিবন্ধন নিয়ে বেশ কয়েকটি আপত্তি ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা দলগুলোকে বাদ রেখে প্রশ্নবিদ্ধ ব্যানারভিত্তিক দলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রাথমিক বিবেচিত ২২টি দলের মধ্যে এনসিপি, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি, জনতার অধিকার দলসহ কয়েকটি দলের কার্যালয়, দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম থাকলেও অনেক সংগঠনের তা নেই। তবে নির্বাচন কমিশনের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, আপত্তি আসলে তা বিবেচনা করে ব্যবস্থা নিতে বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার আন্তরিক।