ইউসুফ আলী বাচ্চু
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, 5:35 PM
ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পরে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এই নির্বাচনের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনেও পরতে পারে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রিহার্সাল মাত্র। এতে কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে বর্তমান সময়ের ক্ষমতায় যাওয়া সব থেকে সম্ভাবনাময় দল বিএনপি। তাদের মুখে হতাশার ছাপ না দেখা গেলেও ভেতরে অস্থিরতা কাজ করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, গত বছর ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশব্যাপি লুটতরাজ, দখলদারির কারনে এই নির্বাচনে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। এমনকি আগামী জাতীয় নির্বাচনে এর ফল ভোগ করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ডাকসুর পর জাকসুতেও ছাত্রদলের ভরাডুবি কেবল দুটি নির্বাচনে হার নয়; এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। ছাত্র রাজনীতিতে ব্যর্থ হলে জাতীয় রাজনীতিতেও বিকল্প শক্তি হিসেবে বিএনপির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই এখনই ছাত্রদলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা ও তরুণদের আস্থা অর্জনে কৌশলগত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পরবে না বলে মনে করেন বিএনপির আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক ব্যরিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক নয়। তবে সামনে আরো কঠিন চ্যালেঞ্জ আছে।
রুমিন ফারহানা বলেন, ডাকসু বা জাকসুর মতো আগামী জাতীয় নির্বাচনেও বিএনপির সামনে কঠিন পরীক্ষা আছে। নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই নিয়ে জটিলতা আছে, বিএনপির মনোনয়নে অনেক মতবিরোধও হতে পারে। তবে জামায়াতে এই সমস্যা নেই। জামায়াতে প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে কোনো দ্বৈরথ হবে না উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘বিএনপি একটি বিশাল রাজনৈতিক দল। সো প্রতিটা আসনে একজন প্রার্থীর সঙ্গে একই ধরনের যোগ্যতা বা একটু কম যোগ্যতা, বাট যোগ্য প্রার্থী আরো পাঁচ-ছয়জন করে আছেন। সো একজনের নাম যদি এখন ঘোষণা করা হয়। আমি জানি না এলাকায় বা আসনে আসনে কিছুটা কোনো দল হতে পারে। এক. যেটা কিন্তু জামায়াতের একটা বিরাট অ্যাডভান্টেজ হলো তারা অনেক সাংগঠনিক। একসময় জামায়াতের আমির বলেছিলেন যে আর্মির সঙ্গে আমাদের কিছু মিল আছে। আমরা অত্যন্ত অর্গানাইজড একটা পার্টি। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল একটা দল। সো জামায়াত যদি বলে যে অমুক আসনে কলাগাছ দাঁড়াবে জামায়াতের কোনো প্রার্থী সে যতই যোগ্য হোক, সে কিন্তু ওই আসনে আর নিজেকে মানে ডিক্লেয়ার করবে না প্রার্থী হিসেবে।’
তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচন ইজ কমপ্লিটলি ডিফারেন্ট ফ্রম ইউনিভার্সিটি হল নির্বাচন। এটা ইউনিভার্সিটি হল নির্বাচন একেবারেই স্টুডেন্ট ওরিয়েন্টেড। অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচন অনেক বেশি বিস্তৃত ৩০০টা আসনে লড়াই হয় যে আগামীতে সরকার কে গঠন করবে। সো সেই জায়গাটাতে যদি আপনি দেখেন, সেখানে আমার মনে হয় না যে ডাকসুতে বা জাহাঙ্গীরনগরে বিএনপি যেই রিলাক্সড মুডে নির্বাচনকে নিয়েছে বা যতটা ঢিলেঢালাভাবে তারা হয়তো প্রস্তুতি নিয়েছে, তারা জাতীয় নির্বাচনে এ রকম থাকবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচন শুধু ক্যাম্পাস রাজনীতির সীমায় আটকে থাকবে না; বরং তা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটারদের মানসিকতা ও রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের ভোট বিএনপির জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধের পাশাপাশি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ছাত্রলীগকেও। এবারের ডাকসু নির্বাচনে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের কোনো প্রার্থী ছিলো না। ছাত্রলীগ বাদে ডাকসু নির্বাচনের মাঠে লড়ছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ, গণঅধিকার পরিষদ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রমৈত্রীসহ বামপন্থী সংগঠনগুলোর সমর্থিত প্যানেল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এ লড়াইয়ের মাঠে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির ঠেকাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সমর্থকরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ডাকসু, জাকসু নির্বাচন কেবল ছাত্র সংসদে ক্ষমতার লড়াই নয়; বরং জাতীয় নির্বাচনের আগে জনমত যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্নিপরীক্ষা।
এদিকে ছাত্রশিবির ডাকসুতে জয়লাবের পরে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বেড়েছে। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য ও মনোবল বেড়েছে। একই সঙ্গে আগামী সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ভোটে এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলম বলেন, ডাকসু নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনে একটি ভালো প্রভাব রাখবে, তবে সেটি কত বড়, তা বলা যাচ্ছে না। এটিকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ বলা হয়। তবে এটি একমাত্র ডিসাইসিভ ফ্যাক্টর হবে না।
তিনি বলেন, নির্বাচন কেন্দ্রিক একধরনের নেগোসিয়েশন, দেন-দরবার, জোট-ঐক্যজোট হয়। ফলে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের কেউ জিতলে তারা বিভিন্ন আলোচনায় বাড়তি সুবিধা পাবে।
ছাত্রশিবিরের অবস্থান তুলে ধরে অধ্যাপক খোরশেদ বলেন, ছাত্রশিবির জিতলে জামায়াতে ইসলামী সমাজে একটি ন্যায্যতা পাবে, মধ্যবিত্ত সমাজ তাদের চায় বা আর অপছন্দ করছে না।
তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান মনে করছেন, ছাত্রদের এই নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতে কোনো প্রভাব রাখবে না।
তিনি বলেন, এটি শিক্ষার্থীদের নির্বাচন। এখানে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা হবে। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন, কিন্তু তার অর্থ এই নয়, জাতীয় পর্যায়ে ভোটাররা প্রভাবিত হবে।
অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, এখানে যেসব শিক্ষার্থীরা এসেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, তাদের বাবা-মা এবং আত্মীয়-স্বজনের এই নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ আছে। ফলে তাদের একটা আগ্রহ আছে জানার। কিন্তু এটি জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে না। জাতীয় নির্বাচনের সাথে এখানকার নির্বাচনের দাবি-দাওয়া ও স্বার্থের কোনো মিল নেই।
এদিকে ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল ঘোষণা নিয়ে সংগঠন ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের পরামর্শ গ্রহণ করা হয়নি। বিএনপির সম্পাদকমণ্ডলীর একজন নেতা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের একজন উপদেষ্টা এবং সংগঠনের বর্তমান সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে প্যানেল করা হয়। যার ফলে, ছাত্রদলের অনেক প্রার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে অপরিচিত ছিলেন। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ছাত্রদলের অনুপস্থিতির কারণে ব্যাপকহারে নতুন কর্মীও তৈরি করা যায়নি। যার কারণে নেতৃত্বও সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রদলের প্যানেলের নির্বাচনী প্রচারণা ছিল অনিয়ন্ত্রিত ও দুর্বল। তাদের সামাজিক মাধ্যমের প্রচার-প্রচারণাও তেমন আকর্ষণীয় ছিল না। প্যানেল ঘোষণার পর ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান প্রচারণায় কিছুটা এগোলেও ভোটের জন্য তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রদলের প্রার্থীদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই কাল হয়েছে। এ ছাড়া ডাকসু নির্বাচন ঘিরে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণায় চালানো হয়েছে। ছাত্রদল জিতলে ছাত্রলীগের মতো গেস্টরুম ও গণরুম সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনবে— এমন প্রচারণাও চালানো হয়। ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলকে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ দেখিয়ে প্রচারণা চালানো হলেও ছাত্রদলের তরফ থেকে এর উপযুক্ত জবাব আসেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রদল এখনো পুরোনো ধারার রাজনীতিতে আটকে আছে। ৫ আগস্টের পর ছাত্রদল সাধারণ ছাত্রদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সেইভাবে মাঠে নামতে পারেনি। তারা বরং দলীয় কর্মসূচি নিয়ে বেশি ব্যস্ত সময় পার করেছে। এ ছাড়া আগস্ট পরবর্তী সময়ে সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি, দখল ও মারামারি ঘটনার প্রভাবও ডাকসু নির্বাচনে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নির্বাচনগুলো শুধু শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চার জায়গা নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বেরও পরীক্ষাগার। ডাকসু ও জাকসুর মতো নির্বাচনে ধারাবাহিক ব্যর্থতা বিএনপির ছাত্র রাজনীতিতে সংকটকে স্পষ্ট করে তুলছে। এতে বিএনপির আগামী প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিএনপির জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে পারে। ছাত্র রাজনীতির মাঠ থেকে ছাত্রদলের দুর্বলতা জাতীয় নির্বাচনের মাঠেও প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে।
ইউসুফ আলী বাচ্চু
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, 5:35 PM
ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পরে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এই নির্বাচনের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনেও পরতে পারে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রিহার্সাল মাত্র। এতে কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে বর্তমান সময়ের ক্ষমতায় যাওয়া সব থেকে সম্ভাবনাময় দল বিএনপি। তাদের মুখে হতাশার ছাপ না দেখা গেলেও ভেতরে অস্থিরতা কাজ করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, গত বছর ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশব্যাপি লুটতরাজ, দখলদারির কারনে এই নির্বাচনে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। এমনকি আগামী জাতীয় নির্বাচনে এর ফল ভোগ করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ডাকসুর পর জাকসুতেও ছাত্রদলের ভরাডুবি কেবল দুটি নির্বাচনে হার নয়; এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। ছাত্র রাজনীতিতে ব্যর্থ হলে জাতীয় রাজনীতিতেও বিকল্প শক্তি হিসেবে বিএনপির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই এখনই ছাত্রদলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা ও তরুণদের আস্থা অর্জনে কৌশলগত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পরবে না বলে মনে করেন বিএনপির আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক ব্যরিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক নয়। তবে সামনে আরো কঠিন চ্যালেঞ্জ আছে।
রুমিন ফারহানা বলেন, ডাকসু বা জাকসুর মতো আগামী জাতীয় নির্বাচনেও বিএনপির সামনে কঠিন পরীক্ষা আছে। নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই নিয়ে জটিলতা আছে, বিএনপির মনোনয়নে অনেক মতবিরোধও হতে পারে। তবে জামায়াতে এই সমস্যা নেই। জামায়াতে প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে কোনো দ্বৈরথ হবে না উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘বিএনপি একটি বিশাল রাজনৈতিক দল। সো প্রতিটা আসনে একজন প্রার্থীর সঙ্গে একই ধরনের যোগ্যতা বা একটু কম যোগ্যতা, বাট যোগ্য প্রার্থী আরো পাঁচ-ছয়জন করে আছেন। সো একজনের নাম যদি এখন ঘোষণা করা হয়। আমি জানি না এলাকায় বা আসনে আসনে কিছুটা কোনো দল হতে পারে। এক. যেটা কিন্তু জামায়াতের একটা বিরাট অ্যাডভান্টেজ হলো তারা অনেক সাংগঠনিক। একসময় জামায়াতের আমির বলেছিলেন যে আর্মির সঙ্গে আমাদের কিছু মিল আছে। আমরা অত্যন্ত অর্গানাইজড একটা পার্টি। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল একটা দল। সো জামায়াত যদি বলে যে অমুক আসনে কলাগাছ দাঁড়াবে জামায়াতের কোনো প্রার্থী সে যতই যোগ্য হোক, সে কিন্তু ওই আসনে আর নিজেকে মানে ডিক্লেয়ার করবে না প্রার্থী হিসেবে।’
তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচন ইজ কমপ্লিটলি ডিফারেন্ট ফ্রম ইউনিভার্সিটি হল নির্বাচন। এটা ইউনিভার্সিটি হল নির্বাচন একেবারেই স্টুডেন্ট ওরিয়েন্টেড। অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচন অনেক বেশি বিস্তৃত ৩০০টা আসনে লড়াই হয় যে আগামীতে সরকার কে গঠন করবে। সো সেই জায়গাটাতে যদি আপনি দেখেন, সেখানে আমার মনে হয় না যে ডাকসুতে বা জাহাঙ্গীরনগরে বিএনপি যেই রিলাক্সড মুডে নির্বাচনকে নিয়েছে বা যতটা ঢিলেঢালাভাবে তারা হয়তো প্রস্তুতি নিয়েছে, তারা জাতীয় নির্বাচনে এ রকম থাকবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচন শুধু ক্যাম্পাস রাজনীতির সীমায় আটকে থাকবে না; বরং তা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটারদের মানসিকতা ও রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের ভোট বিএনপির জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধের পাশাপাশি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ছাত্রলীগকেও। এবারের ডাকসু নির্বাচনে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের কোনো প্রার্থী ছিলো না। ছাত্রলীগ বাদে ডাকসু নির্বাচনের মাঠে লড়ছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ, গণঅধিকার পরিষদ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রমৈত্রীসহ বামপন্থী সংগঠনগুলোর সমর্থিত প্যানেল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এ লড়াইয়ের মাঠে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির ঠেকাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সমর্থকরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ডাকসু, জাকসু নির্বাচন কেবল ছাত্র সংসদে ক্ষমতার লড়াই নয়; বরং জাতীয় নির্বাচনের আগে জনমত যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্নিপরীক্ষা।
এদিকে ছাত্রশিবির ডাকসুতে জয়লাবের পরে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বেড়েছে। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য ও মনোবল বেড়েছে। একই সঙ্গে আগামী সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ভোটে এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলম বলেন, ডাকসু নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনে একটি ভালো প্রভাব রাখবে, তবে সেটি কত বড়, তা বলা যাচ্ছে না। এটিকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ বলা হয়। তবে এটি একমাত্র ডিসাইসিভ ফ্যাক্টর হবে না।
তিনি বলেন, নির্বাচন কেন্দ্রিক একধরনের নেগোসিয়েশন, দেন-দরবার, জোট-ঐক্যজোট হয়। ফলে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের কেউ জিতলে তারা বিভিন্ন আলোচনায় বাড়তি সুবিধা পাবে।
ছাত্রশিবিরের অবস্থান তুলে ধরে অধ্যাপক খোরশেদ বলেন, ছাত্রশিবির জিতলে জামায়াতে ইসলামী সমাজে একটি ন্যায্যতা পাবে, মধ্যবিত্ত সমাজ তাদের চায় বা আর অপছন্দ করছে না।
তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান মনে করছেন, ছাত্রদের এই নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতে কোনো প্রভাব রাখবে না।
তিনি বলেন, এটি শিক্ষার্থীদের নির্বাচন। এখানে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা হবে। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন, কিন্তু তার অর্থ এই নয়, জাতীয় পর্যায়ে ভোটাররা প্রভাবিত হবে।
অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, এখানে যেসব শিক্ষার্থীরা এসেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, তাদের বাবা-মা এবং আত্মীয়-স্বজনের এই নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ আছে। ফলে তাদের একটা আগ্রহ আছে জানার। কিন্তু এটি জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে না। জাতীয় নির্বাচনের সাথে এখানকার নির্বাচনের দাবি-দাওয়া ও স্বার্থের কোনো মিল নেই।
এদিকে ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল ঘোষণা নিয়ে সংগঠন ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের পরামর্শ গ্রহণ করা হয়নি। বিএনপির সম্পাদকমণ্ডলীর একজন নেতা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের একজন উপদেষ্টা এবং সংগঠনের বর্তমান সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে প্যানেল করা হয়। যার ফলে, ছাত্রদলের অনেক প্রার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে অপরিচিত ছিলেন। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ছাত্রদলের অনুপস্থিতির কারণে ব্যাপকহারে নতুন কর্মীও তৈরি করা যায়নি। যার কারণে নেতৃত্বও সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রদলের প্যানেলের নির্বাচনী প্রচারণা ছিল অনিয়ন্ত্রিত ও দুর্বল। তাদের সামাজিক মাধ্যমের প্রচার-প্রচারণাও তেমন আকর্ষণীয় ছিল না। প্যানেল ঘোষণার পর ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান প্রচারণায় কিছুটা এগোলেও ভোটের জন্য তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রদলের প্রার্থীদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই কাল হয়েছে। এ ছাড়া ডাকসু নির্বাচন ঘিরে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণায় চালানো হয়েছে। ছাত্রদল জিতলে ছাত্রলীগের মতো গেস্টরুম ও গণরুম সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনবে— এমন প্রচারণাও চালানো হয়। ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলকে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ দেখিয়ে প্রচারণা চালানো হলেও ছাত্রদলের তরফ থেকে এর উপযুক্ত জবাব আসেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রদল এখনো পুরোনো ধারার রাজনীতিতে আটকে আছে। ৫ আগস্টের পর ছাত্রদল সাধারণ ছাত্রদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সেইভাবে মাঠে নামতে পারেনি। তারা বরং দলীয় কর্মসূচি নিয়ে বেশি ব্যস্ত সময় পার করেছে। এ ছাড়া আগস্ট পরবর্তী সময়ে সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি, দখল ও মারামারি ঘটনার প্রভাবও ডাকসু নির্বাচনে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নির্বাচনগুলো শুধু শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চার জায়গা নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বেরও পরীক্ষাগার। ডাকসু ও জাকসুর মতো নির্বাচনে ধারাবাহিক ব্যর্থতা বিএনপির ছাত্র রাজনীতিতে সংকটকে স্পষ্ট করে তুলছে। এতে বিএনপির আগামী প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিএনপির জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে পারে। ছাত্র রাজনীতির মাঠ থেকে ছাত্রদলের দুর্বলতা জাতীয় নির্বাচনের মাঠেও প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে।