ইউসুফ আলী বাচ্চু
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, 3:50 PM
মুখে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হলেও, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনও সীমিত। দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নারীর হাতে থাকলেও, সাংবিধানিক ও সাংগঠনিক পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। সম্প্রতি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতেও এই চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রাজনীতির উচ্চ স্তরে নারী নেতৃত্ব, কিন্তু কেন পিছিয়ে?
১৯৮০-এর দশক থেকে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বে নারী ছিলেন এবং এখনও আছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং খালেদা জিয়া ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপার্সন হন। তাঁরা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের শাসন ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা পালন করেছেন। তবে রাজনৈতিক দলের ভেতরের কাঠামোতে নারীর অবস্থান এখনও দুর্বল। ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা থাকলেও, কোনো দলই তা অর্জন করতে পারেনি। তাই, নতুন করে ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য পূরণের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ছাত্র রাজনীতিতে নারীর হতাশাজনক উপস্থিতি: জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতিতেও মেধাবী তরুণীদের অংশগ্রহণ কমে আসছে, যার প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে পড়ছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাকসু) -এর ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল খুবই হতাশাজনক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: সর্বশেষ ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে মোট ৪৭১ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৩৮ জন ছিলেন নারী, যা মোট প্রার্থীর মাত্র ৮.০৬ শতাংশ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাকসু): দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সংসদের ২৫৮ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৩০ জন, অর্থাৎ ১১.৬৩শতাংশ। ৬টি ছাত্রী হলের অন্তত ৩৭টি পদে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছেন এবং ৪টি হলে কোনো প্রার্থীই পাওয়া যায়নি।
নারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তারা সাইবার বুলিং ও সামাজিক হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। প্রাক্তন সমন্বয়ক ফৌজিয়া নওরীন এবং অহনা মৃত্তিকা অভিযোগ করেছেন যে আন্দোলনের পর সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ায় তারা নির্বাচনে অংশ নেননি।
নারীরা কেন রাজনীতিতে আসতে চায় না?
মেধাবী তরুণীরা কেন রাজনীতিতে আসছে না, বা এলেও কেন টিকে থাকতে পারছে না? এ বিষয়ে বিভিন্ন জনের মতামত থেকে কিছু কারণ উঠে এসেছে:
নিরাপত্তাহীনতা: সামাজিক, ধর্মীয়, ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই। রাস্তায়, ক্যাম্পাসে এবং অনলাইনে তারা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
সামাজিক সীমাবদ্ধতা: পুরুষতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতিকে এখনও পুরুষদের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। পরিবার এবং সমাজের কাছ থেকে নারীরা পর্যাপ্ত সমর্থন পান না।
সাইবার বুলিং: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেনামি আইডি থেকে হয়রানি এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ একটি বড় সমস্যা, যা নারীদের নিরুৎসাহিত করছে।
আর্থিক ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা: প্রচারণার জন্য অর্থ ও টিম গঠনে নারীদের প্রায়শই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
ব্যতিক্রম: গণ বিশ্ববিদ্যালয়
তবে এই হতাশাজনক চিত্রের মাঝে ব্যতিক্রমী উদাহরণ সৃষ্টি করেছে গণ বিশ্ববিদ্যালয় (গকসু) নির্বাচন। দীর্ঘ সাত বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে একঝাঁক তরুণী প্রার্থী নারী প্রতিনিধিত্বের নতুন বার্তা দিয়েছেন। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রার্থী হয়েছেন আফসানা মিমি, যিনি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য কাজ করতে চান। তিনি বলেন, “আমি নারী হয়েও শুধু মেয়েদের প্রতিনিধি নই, বরং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার সমস্যার কথা শুনতে চাই।”
ঐতিহাসিকভাবেও গকসুতে নারী নেতৃত্ব উজ্জ্বল। ২০১৩ সালের প্রথম সংসদ থেকেই সেখানে নারী নেতৃত্ব দৃশ্যমান। এবারের নির্বাচনেও সম্পাদকীয় পদ থেকে শুরু করে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে একাধিক তরুণী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।
সার্বিকভাবে, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য শুধু স্লোগান নয়, বরং নিরাপদ পরিবেশ, সামাজিক সমর্থন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরকার কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইউসুফ আলী বাচ্চু
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, 3:50 PM
মুখে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হলেও, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনও সীমিত। দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নারীর হাতে থাকলেও, সাংবিধানিক ও সাংগঠনিক পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। সম্প্রতি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতেও এই চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রাজনীতির উচ্চ স্তরে নারী নেতৃত্ব, কিন্তু কেন পিছিয়ে?
১৯৮০-এর দশক থেকে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বে নারী ছিলেন এবং এখনও আছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং খালেদা জিয়া ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপার্সন হন। তাঁরা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের শাসন ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা পালন করেছেন। তবে রাজনৈতিক দলের ভেতরের কাঠামোতে নারীর অবস্থান এখনও দুর্বল। ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা থাকলেও, কোনো দলই তা অর্জন করতে পারেনি। তাই, নতুন করে ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য পূরণের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ছাত্র রাজনীতিতে নারীর হতাশাজনক উপস্থিতি: জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতিতেও মেধাবী তরুণীদের অংশগ্রহণ কমে আসছে, যার প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে পড়ছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাকসু) -এর ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল খুবই হতাশাজনক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: সর্বশেষ ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে মোট ৪৭১ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৩৮ জন ছিলেন নারী, যা মোট প্রার্থীর মাত্র ৮.০৬ শতাংশ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাকসু): দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সংসদের ২৫৮ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৩০ জন, অর্থাৎ ১১.৬৩শতাংশ। ৬টি ছাত্রী হলের অন্তত ৩৭টি পদে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছেন এবং ৪টি হলে কোনো প্রার্থীই পাওয়া যায়নি।
নারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তারা সাইবার বুলিং ও সামাজিক হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। প্রাক্তন সমন্বয়ক ফৌজিয়া নওরীন এবং অহনা মৃত্তিকা অভিযোগ করেছেন যে আন্দোলনের পর সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ায় তারা নির্বাচনে অংশ নেননি।
নারীরা কেন রাজনীতিতে আসতে চায় না?
মেধাবী তরুণীরা কেন রাজনীতিতে আসছে না, বা এলেও কেন টিকে থাকতে পারছে না? এ বিষয়ে বিভিন্ন জনের মতামত থেকে কিছু কারণ উঠে এসেছে:
নিরাপত্তাহীনতা: সামাজিক, ধর্মীয়, ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই। রাস্তায়, ক্যাম্পাসে এবং অনলাইনে তারা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
সামাজিক সীমাবদ্ধতা: পুরুষতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতিকে এখনও পুরুষদের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। পরিবার এবং সমাজের কাছ থেকে নারীরা পর্যাপ্ত সমর্থন পান না।
সাইবার বুলিং: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেনামি আইডি থেকে হয়রানি এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ একটি বড় সমস্যা, যা নারীদের নিরুৎসাহিত করছে।
আর্থিক ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা: প্রচারণার জন্য অর্থ ও টিম গঠনে নারীদের প্রায়শই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
ব্যতিক্রম: গণ বিশ্ববিদ্যালয়
তবে এই হতাশাজনক চিত্রের মাঝে ব্যতিক্রমী উদাহরণ সৃষ্টি করেছে গণ বিশ্ববিদ্যালয় (গকসু) নির্বাচন। দীর্ঘ সাত বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে একঝাঁক তরুণী প্রার্থী নারী প্রতিনিধিত্বের নতুন বার্তা দিয়েছেন। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রার্থী হয়েছেন আফসানা মিমি, যিনি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য কাজ করতে চান। তিনি বলেন, “আমি নারী হয়েও শুধু মেয়েদের প্রতিনিধি নই, বরং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার সমস্যার কথা শুনতে চাই।”
ঐতিহাসিকভাবেও গকসুতে নারী নেতৃত্ব উজ্জ্বল। ২০১৩ সালের প্রথম সংসদ থেকেই সেখানে নারী নেতৃত্ব দৃশ্যমান। এবারের নির্বাচনেও সম্পাদকীয় পদ থেকে শুরু করে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে একাধিক তরুণী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।
সার্বিকভাবে, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য শুধু স্লোগান নয়, বরং নিরাপদ পরিবেশ, সামাজিক সমর্থন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরকার কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।