ইউসুফ আলী বাচ্চু
০৩ অক্টোবর, ২০২৫, 7:12 PM
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে এক গভীর সন্দেহের বেড়াজালে জড়িয়ে পড়েছে। একদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চমহল থেকে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হওয়ার ব্যাপারে কঠোর আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার পতনে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোই এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি ছাড়া কোনো নির্বাচন হতে দেবে না বলে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা।
নির্বাচন নিয়ে কঠোরতা ও পাল্টা হুঙ্কার: অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হচ্ছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্থেই অনুষ্ঠিত হবে এবং পৃথিবীর কোনো শক্তি এই নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না। তবে এর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনসহ সাতটি সমমনা দল পিআর পদ্ধতি চালুসহ পাঁচ দফা দাবিতে ফের মাঠে নামছে। তাদের দাবি, নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু করতে হবে। এই দলগুলোর পাল্টা আন্দোলনের ঘোষণা সরকারের উঁচু মহলের আশাবাদের বিপরীতে এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
তারেক রহমানের ‘গুপ্ত স্বৈরাচার’ উদ্বেগ: নির্বাচন অনুষ্ঠানের তোড়জোড় চললেও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, “আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ না হই, আমরা গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ না হই, তাহলে আগামী দিনে গুপ্ত স্বৈরাচারের আবির্ভাব হতে পারে।” যদিও তিনি এই ‘গুপ্ত স্বৈরাচার’ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেননি, তবে তার এই বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং একটি বিশেষ শক্তির উত্থান নিয়ে তার গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।
প্রশাসনে বিএনপি-জামায়াত ভাগ-বাটোয়ারা: মাহফুজ আলমের বিস্ফোরক মন্তব্য
সবচেয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের মন্তব্যে। একটি গোলটেবিল বৈঠকে তিনি দাবি করেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি ও জামায়াতের লোকেরা সরকারকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভাগ করে নিয়েছে।
মাহফুজ আলম বলেন, “বিএনপি-জামায়াতের লোকেরা তালিকা দিয়ে তাদের লোক নিয়োগ দিল। ভিসি নিয়োগ হলো ১০ জন বিএনপির, তিনজন জামায়াতের। ভিসি না পেলে প্রোভিসি দিতে হবে...।”
এই মন্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে:যদি প্রশাসন বিএনপি-জামায়াতের দখলে থাকে, তাহলে তাদের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য আগামী নির্বাচন কি নিরপেক্ষ হবে?
যে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠল, তার অধীনে ড. ইউনূসের দেওয়া ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ’ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব?
মাহফুজ আলম নিজেও তার বর্তমান পদ নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করে বলেছেন, “গত দুই মাস ধরে আমি অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি যে আমি কখন নেমে যাই।”
ড. ইউনূসের কণ্ঠেও ‘আন্তর্জাতিক মহল’ নিয়ে আশঙ্কা: প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তার আশাবাদের পাশাপাশি উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, “কিছু আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।” তিনি অভিযোগ করেন, “বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালা হচ্ছে, যার সুবিধাভোগী রয়েছে দেশের ভেতরে ও বাইরে। তারা সুসংগঠিত এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়।”
ড. ইউনূসের এই মন্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতদিন কেবল প্রতিবেশী দেশের ষড়যন্ত্রের কথা বাতাসে চাউর থাকলেও, তিনি এবার সরাসরি ‘আন্তর্জাতিক মহলকে’ সন্দেহ করছেন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ এখনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার কারণ অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি। ড. ইউনূসের আমলে এমন রিপোর্ট প্রকাশ পাওয়ায় কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
টিভি বন্ধের প্রস্তাব ও সরকারের উদ্বেগ: সর্বশেষ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠকে দুটি অ্যাপ টেলিগ্রাম ও বোটিম বন্ধের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে এই অ্যাপের মাধ্যমেই তার কর্মীরা যোগাযোগ করছে।
কেউ কেউ মনে করছেন, অ্যাপ বন্ধের এই চিন্তা সরকারের অসহায়তা ও আতঙ্কিত অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। দেশে চলমান এই বহুমুখী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট আগামী দিনগুলোতে আরও হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করছে কিনা, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সব মহলে।
ইউসুফ আলী বাচ্চু
০৩ অক্টোবর, ২০২৫, 7:12 PM
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে এক গভীর সন্দেহের বেড়াজালে জড়িয়ে পড়েছে। একদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চমহল থেকে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হওয়ার ব্যাপারে কঠোর আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার পতনে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোই এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি ছাড়া কোনো নির্বাচন হতে দেবে না বলে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা।
নির্বাচন নিয়ে কঠোরতা ও পাল্টা হুঙ্কার: অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হচ্ছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্থেই অনুষ্ঠিত হবে এবং পৃথিবীর কোনো শক্তি এই নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না। তবে এর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনসহ সাতটি সমমনা দল পিআর পদ্ধতি চালুসহ পাঁচ দফা দাবিতে ফের মাঠে নামছে। তাদের দাবি, নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু করতে হবে। এই দলগুলোর পাল্টা আন্দোলনের ঘোষণা সরকারের উঁচু মহলের আশাবাদের বিপরীতে এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
তারেক রহমানের ‘গুপ্ত স্বৈরাচার’ উদ্বেগ: নির্বাচন অনুষ্ঠানের তোড়জোড় চললেও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, “আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ না হই, আমরা গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ না হই, তাহলে আগামী দিনে গুপ্ত স্বৈরাচারের আবির্ভাব হতে পারে।” যদিও তিনি এই ‘গুপ্ত স্বৈরাচার’ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেননি, তবে তার এই বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং একটি বিশেষ শক্তির উত্থান নিয়ে তার গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।
প্রশাসনে বিএনপি-জামায়াত ভাগ-বাটোয়ারা: মাহফুজ আলমের বিস্ফোরক মন্তব্য
সবচেয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের মন্তব্যে। একটি গোলটেবিল বৈঠকে তিনি দাবি করেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি ও জামায়াতের লোকেরা সরকারকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভাগ করে নিয়েছে।
মাহফুজ আলম বলেন, “বিএনপি-জামায়াতের লোকেরা তালিকা দিয়ে তাদের লোক নিয়োগ দিল। ভিসি নিয়োগ হলো ১০ জন বিএনপির, তিনজন জামায়াতের। ভিসি না পেলে প্রোভিসি দিতে হবে...।”
এই মন্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে:যদি প্রশাসন বিএনপি-জামায়াতের দখলে থাকে, তাহলে তাদের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য আগামী নির্বাচন কি নিরপেক্ষ হবে?
যে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠল, তার অধীনে ড. ইউনূসের দেওয়া ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ’ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব?
মাহফুজ আলম নিজেও তার বর্তমান পদ নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করে বলেছেন, “গত দুই মাস ধরে আমি অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি যে আমি কখন নেমে যাই।”
ড. ইউনূসের কণ্ঠেও ‘আন্তর্জাতিক মহল’ নিয়ে আশঙ্কা: প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তার আশাবাদের পাশাপাশি উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, “কিছু আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।” তিনি অভিযোগ করেন, “বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালা হচ্ছে, যার সুবিধাভোগী রয়েছে দেশের ভেতরে ও বাইরে। তারা সুসংগঠিত এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়।”
ড. ইউনূসের এই মন্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতদিন কেবল প্রতিবেশী দেশের ষড়যন্ত্রের কথা বাতাসে চাউর থাকলেও, তিনি এবার সরাসরি ‘আন্তর্জাতিক মহলকে’ সন্দেহ করছেন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ এখনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার কারণ অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি। ড. ইউনূসের আমলে এমন রিপোর্ট প্রকাশ পাওয়ায় কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
টিভি বন্ধের প্রস্তাব ও সরকারের উদ্বেগ: সর্বশেষ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠকে দুটি অ্যাপ টেলিগ্রাম ও বোটিম বন্ধের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে এই অ্যাপের মাধ্যমেই তার কর্মীরা যোগাযোগ করছে।
কেউ কেউ মনে করছেন, অ্যাপ বন্ধের এই চিন্তা সরকারের অসহায়তা ও আতঙ্কিত অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। দেশে চলমান এই বহুমুখী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট আগামী দিনগুলোতে আরও হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করছে কিনা, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সব মহলে।