ইউসুফ আলী বাচ্চু
১০ অক্টোবর, ২০২৫, 6:50 PM
গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা ও হয়রানির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব মামলাকে হয়রানিমূলক বলে দাবি করে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার একটি 'পর্যবেক্ষণ কমিটি' গঠন করলেও, কমিটি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর বক্তব্য থেকে এর কার্যকারিতা এবং সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাংবাদিক নিপীড়নের উদ্বেগজনক চিত্র
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়নের ঘটনা বহুগুণ বেড়েছে:
হামলা ও নিপীড়ন: ৯ মাসে ৯০ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন এবং মোট ৩১৫ জন সাংবাদিক হত্যা ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। একজনকে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা।
মামলা: সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ৬৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর ৫২ জন সাংবাদিক মামলার আসামি হয়েছেন।
রাজনৈতিক নিপীড়ন: বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের কর্মীদের হাতে ২১ জন এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মীদের হাতে একজন সাংবাদিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
অন্যান্য সংস্থার তথ্যেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। টিআইবি'র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৪৯৬ জন সাংবাদিক নিপীড়নের শিকার এবং ২৬৬ জন সাংবাদিক বিভিন্ন মামলায় আসামি হয়েছেন। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) জানিয়েছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সহিংসতা সংক্রান্ত মামলায় কমপক্ষে ১৪০ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।
পর্যবেক্ষণ কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
সাংবাদিকদের হয়রানি ঠেকাতে গত বছরের ৭ অক্টোবর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি 'পর্যবেক্ষণ কমিটি' গঠন করা হয়। তবে কমিটির সদস্যরা তাদের কার্যক্রমের ব্যাপ্তি নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন:
পর্যালোচিত মামলার সংখ্যা: কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, বিজ্ঞপ্তি ও চিঠির মাধ্যমে সারা দেশ থেকে ৭২টি হয়রানিমূলক মামলার তথ্য কমিটির কাছে এসেছে।
অধিকাংশই স্থানীয় বিরোধ: তিনি দাবি করেন, এই ৭২টি মামলার মধ্যে প্রায় ৭০ ভাগ মামলাই হয়েছে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও বিরোধের কারণে, যেমন চাঁদাবাজি ও নানা বিরোধের অভিযোগ। তিনি বলেন, যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের ৯০ ভাগই আওয়ামী লীগের কোনো না কোনো পদে রয়েছেন।
কারাগারে থাকা সাংবাদিক: কমিটি মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোর বিষয়ে আইনগত কারণে কিছু করতে পারেনি।
কমিটির কাজ শেষ: মুহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, কমিটি মামলাগুলো পর্যালোচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠিয়েছে যাতে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত কেউ অহেতুক হয়রানির শিকার না হন। তিনি মনে করেন, এর মধ্য দিয়ে তাদের কমিটির কাজ শেষ।
অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের যুগ্ম সচিব কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে যেসব মামলা তাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল, সেগুলোতে প্রায় ৩০০ আসামি ছিল, কিন্তু যেহেতু সাংবাদিকদের বিষয়টি তথ্য মন্ত্রণালয় দেখে, তাই মামলাগুলো আবার তথ্য মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
দুই মন্ত্রণালয়ের এই 'ফুটবল খেলার' মতো অবস্থা সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
উপসংহার: হয়রানি বন্ধে সরকারের সদিচ্ছা কতটা?
সাংবাদিক নিপীড়নের হার যখন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, তখন সরকারের পর্যবেক্ষণ কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা মামলাগুলোকে মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা ব্যক্তিগত বিরোধের ফসল হিসেবে দেখছেন। অথচ মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বারবার পেশাগত দায়িত্ব পালনের জেরে হয়রানির অভিযোগ আনছে।
পর্যবেক্ষণ কমিটির কার্যক্রম সমাপ্তি ঘোষণা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে ফাইল ফেরত পাঠানোর ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হয়রানিমূলক মামলাগুলোর তদন্ত বা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সরকারের সদিচ্ছা বাস্তব কার্যক্রমে কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নিয়ে নতুন করে সংশয় দেখা দিয়েছে।
ইউসুফ আলী বাচ্চু
১০ অক্টোবর, ২০২৫, 6:50 PM
গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা ও হয়রানির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব মামলাকে হয়রানিমূলক বলে দাবি করে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার একটি 'পর্যবেক্ষণ কমিটি' গঠন করলেও, কমিটি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর বক্তব্য থেকে এর কার্যকারিতা এবং সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাংবাদিক নিপীড়নের উদ্বেগজনক চিত্র
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়নের ঘটনা বহুগুণ বেড়েছে:
হামলা ও নিপীড়ন: ৯ মাসে ৯০ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন এবং মোট ৩১৫ জন সাংবাদিক হত্যা ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। একজনকে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা।
মামলা: সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ৬৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর ৫২ জন সাংবাদিক মামলার আসামি হয়েছেন।
রাজনৈতিক নিপীড়ন: বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের কর্মীদের হাতে ২১ জন এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মীদের হাতে একজন সাংবাদিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
অন্যান্য সংস্থার তথ্যেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। টিআইবি'র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৪৯৬ জন সাংবাদিক নিপীড়নের শিকার এবং ২৬৬ জন সাংবাদিক বিভিন্ন মামলায় আসামি হয়েছেন। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) জানিয়েছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সহিংসতা সংক্রান্ত মামলায় কমপক্ষে ১৪০ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।
পর্যবেক্ষণ কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
সাংবাদিকদের হয়রানি ঠেকাতে গত বছরের ৭ অক্টোবর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি 'পর্যবেক্ষণ কমিটি' গঠন করা হয়। তবে কমিটির সদস্যরা তাদের কার্যক্রমের ব্যাপ্তি নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন:
পর্যালোচিত মামলার সংখ্যা: কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, বিজ্ঞপ্তি ও চিঠির মাধ্যমে সারা দেশ থেকে ৭২টি হয়রানিমূলক মামলার তথ্য কমিটির কাছে এসেছে।
অধিকাংশই স্থানীয় বিরোধ: তিনি দাবি করেন, এই ৭২টি মামলার মধ্যে প্রায় ৭০ ভাগ মামলাই হয়েছে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও বিরোধের কারণে, যেমন চাঁদাবাজি ও নানা বিরোধের অভিযোগ। তিনি বলেন, যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের ৯০ ভাগই আওয়ামী লীগের কোনো না কোনো পদে রয়েছেন।
কারাগারে থাকা সাংবাদিক: কমিটি মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোর বিষয়ে আইনগত কারণে কিছু করতে পারেনি।
কমিটির কাজ শেষ: মুহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, কমিটি মামলাগুলো পর্যালোচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠিয়েছে যাতে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত কেউ অহেতুক হয়রানির শিকার না হন। তিনি মনে করেন, এর মধ্য দিয়ে তাদের কমিটির কাজ শেষ।
অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের যুগ্ম সচিব কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে যেসব মামলা তাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল, সেগুলোতে প্রায় ৩০০ আসামি ছিল, কিন্তু যেহেতু সাংবাদিকদের বিষয়টি তথ্য মন্ত্রণালয় দেখে, তাই মামলাগুলো আবার তথ্য মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
দুই মন্ত্রণালয়ের এই 'ফুটবল খেলার' মতো অবস্থা সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
উপসংহার: হয়রানি বন্ধে সরকারের সদিচ্ছা কতটা?
সাংবাদিক নিপীড়নের হার যখন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, তখন সরকারের পর্যবেক্ষণ কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা মামলাগুলোকে মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা ব্যক্তিগত বিরোধের ফসল হিসেবে দেখছেন। অথচ মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বারবার পেশাগত দায়িত্ব পালনের জেরে হয়রানির অভিযোগ আনছে।
পর্যবেক্ষণ কমিটির কার্যক্রম সমাপ্তি ঘোষণা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে ফাইল ফেরত পাঠানোর ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হয়রানিমূলক মামলাগুলোর তদন্ত বা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সরকারের সদিচ্ছা বাস্তব কার্যক্রমে কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নিয়ে নতুন করে সংশয় দেখা দিয়েছে।