CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬

অর্থনীতিতে দ্বৈত-বৈপরীত্য

#
news image

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার সম্মুখীন। একদিকে, ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ১৭ মাস পর দুই অঙ্কে পৌঁছেছে, যা তারল্যের স্বস্তি দিচ্ছে। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে (৬.৩৫ শতাংশ)। এই ভারসাম্যহীনতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মানুষের হাতে থাকা টাকা ব্যাংকে জমা হলেও তা উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে লাগছে না।একই সময়ে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি (৮.৩৬%) এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়া (৮৮% হ্রাস) সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও আর্থিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।১. আমানত বাড়ছে, কেন?বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের আগস্ট মাস শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১০.০২ শতাংশে, যা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির পর প্রথম দুই অঙ্কে পৌঁছাল। এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ:কারণবিশ্লেষণট্রেজারি বিল-বন্ডের আকর্ষণ হ্রাসট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার (যা তিন মাস আগে ১১-১২% ছিল) এখন ৯-১০ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে ব্যক্তি ও করপোরেট বিনিয়োগকারীরা সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে টাকা সরিয়ে ব্যাংক আমানতে রাখছেন।কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপবাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার কিনেছে, যা বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়িয়েছে এবং ব্যাংকগুলোর হাতে বাড়তি তারল্য এসেছে।নগদ অর্থের ব্যাংকে ফেরাব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ ('কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংক') গত এক বছরে প্রায় ৫.৫ শতাংশ কমেছে, অর্থাৎ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে।পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান উভয়েই মনে করেন, ট্রেজারি বন্ডের ফলন কমে যাওয়ায় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকে ফিরে আসায় তারল্য স্বস্তিতে আছে।২. ঋণপ্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন কেন?বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমতে কমতে আগস্টে দাঁড়িয়েছে ৬.৩৫ শতাংশে, যা ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন। এক বছরের ব্যবধানে এই হার প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:উচ্চ সুদহার: বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গড় ঋণ সুদহার এখন ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ, যা নতুন শিল্প বা ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে।রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, "উচ্চ সুদহার ও অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে বাধা তৈরি করছে।"ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ: উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুদবাজারের অস্থিরতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মনেটারি পলিসির কারণে অনেক ব্যাংকই নতুন ঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। ব্যাংক এশিয়ার এমডি সোহেল আর কে হুসেইন জানান, তারা এখন কেবল উৎপাদনমুখী ও রফতানিতে সহায়ক খাতগুলোকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।ফলস্বরূপ, ব্যাংক খাতে গড় আমানত ও ঋণ অনুপাত (এডিআর) ৮৯ শতাংশ থেকে কমে ৮২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, "ব্যাংকে টাকা ঘুমোচ্ছে, কিন্তু বাজারে কাজ করছে না।"৩. সাধারণ মানুষের ওপর চাপআর্থিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে:বাড়ছে মূল্যস্ফীতি: সেপ্টেম্বর মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয়ের বৃদ্ধি চাপ সৃষ্টি করছে।সঞ্চয়পত্র বিক্রি হ্রাস: অর্থনৈতিক মন্দা ও ক্রয়ক্ষমতা কমার কারণে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি চলতি বছরের আগস্টে প্রায় ৮৮ শতাংশ কমে মাত্র ২৮৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর ফলে সরকার ব্যাংক খাতের ঋণের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে এবং অবসরপ্রাপ্তদের আর্থিক নিরাপত্তা কিছুটা ঝুঁকিতে পড়েছে।৪. বিনিয়োগের গতি কমযদিও ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় $১.৮৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ (যার মধ্যে $৬৫ কোটি বিদেশি বিনিয়োগ) জমা পড়েছে, তবুও বাস্তবায়নের গতি ধীর। উদ্যোক্তাদের মতে, ব্যাংক ঋণ পেতে অসুবিধা, ডলারের দামের অনিশ্চয়তা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরবরাহ স্থিতিশীল না হওয়াই এর প্রধান কারণ।তবে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ার প্রবণতা কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি–জুন সময়ে নিট এফডিআই ৬১.৫ শতাংশ বেড়েছে, যার বড় অংশই এসেছে পুনঃবিনিয়োগ হিসেবে।অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে হলে সুদহার স্থিতিশীল করা, বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নীতি সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থের প্রবাহকে উৎপাদনমুখী খাতে জোরদার করতে হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৮ অক্টোবর, ২০২৫,  7:13 PM

news image

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার সম্মুখীন। একদিকে, ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ১৭ মাস পর দুই অঙ্কে পৌঁছেছে, যা তারল্যের স্বস্তি দিচ্ছে। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে (৬.৩৫ শতাংশ)। এই ভারসাম্যহীনতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মানুষের হাতে থাকা টাকা ব্যাংকে জমা হলেও তা উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে লাগছে না।একই সময়ে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি (৮.৩৬%) এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়া (৮৮% হ্রাস) সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও আর্থিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।১. আমানত বাড়ছে, কেন?বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের আগস্ট মাস শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১০.০২ শতাংশে, যা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির পর প্রথম দুই অঙ্কে পৌঁছাল। এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ:কারণবিশ্লেষণট্রেজারি বিল-বন্ডের আকর্ষণ হ্রাসট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার (যা তিন মাস আগে ১১-১২% ছিল) এখন ৯-১০ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে ব্যক্তি ও করপোরেট বিনিয়োগকারীরা সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে টাকা সরিয়ে ব্যাংক আমানতে রাখছেন।কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপবাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার কিনেছে, যা বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়িয়েছে এবং ব্যাংকগুলোর হাতে বাড়তি তারল্য এসেছে।নগদ অর্থের ব্যাংকে ফেরাব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ ('কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংক') গত এক বছরে প্রায় ৫.৫ শতাংশ কমেছে, অর্থাৎ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে।পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান উভয়েই মনে করেন, ট্রেজারি বন্ডের ফলন কমে যাওয়ায় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকে ফিরে আসায় তারল্য স্বস্তিতে আছে।২. ঋণপ্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন কেন?বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমতে কমতে আগস্টে দাঁড়িয়েছে ৬.৩৫ শতাংশে, যা ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন। এক বছরের ব্যবধানে এই হার প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:উচ্চ সুদহার: বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গড় ঋণ সুদহার এখন ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ, যা নতুন শিল্প বা ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে।রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, "উচ্চ সুদহার ও অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে বাধা তৈরি করছে।"ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ: উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুদবাজারের অস্থিরতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মনেটারি পলিসির কারণে অনেক ব্যাংকই নতুন ঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। ব্যাংক এশিয়ার এমডি সোহেল আর কে হুসেইন জানান, তারা এখন কেবল উৎপাদনমুখী ও রফতানিতে সহায়ক খাতগুলোকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।ফলস্বরূপ, ব্যাংক খাতে গড় আমানত ও ঋণ অনুপাত (এডিআর) ৮৯ শতাংশ থেকে কমে ৮২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, "ব্যাংকে টাকা ঘুমোচ্ছে, কিন্তু বাজারে কাজ করছে না।"৩. সাধারণ মানুষের ওপর চাপআর্থিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে:বাড়ছে মূল্যস্ফীতি: সেপ্টেম্বর মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয়ের বৃদ্ধি চাপ সৃষ্টি করছে।সঞ্চয়পত্র বিক্রি হ্রাস: অর্থনৈতিক মন্দা ও ক্রয়ক্ষমতা কমার কারণে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি চলতি বছরের আগস্টে প্রায় ৮৮ শতাংশ কমে মাত্র ২৮৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর ফলে সরকার ব্যাংক খাতের ঋণের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে এবং অবসরপ্রাপ্তদের আর্থিক নিরাপত্তা কিছুটা ঝুঁকিতে পড়েছে।৪. বিনিয়োগের গতি কমযদিও ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় $১.৮৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ (যার মধ্যে $৬৫ কোটি বিদেশি বিনিয়োগ) জমা পড়েছে, তবুও বাস্তবায়নের গতি ধীর। উদ্যোক্তাদের মতে, ব্যাংক ঋণ পেতে অসুবিধা, ডলারের দামের অনিশ্চয়তা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরবরাহ স্থিতিশীল না হওয়াই এর প্রধান কারণ।তবে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ার প্রবণতা কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি–জুন সময়ে নিট এফডিআই ৬১.৫ শতাংশ বেড়েছে, যার বড় অংশই এসেছে পুনঃবিনিয়োগ হিসেবে।অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে হলে সুদহার স্থিতিশীল করা, বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নীতি সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থের প্রবাহকে উৎপাদনমুখী খাতে জোরদার করতে হবে।