নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ অক্টোবর, ২০২৫, 6:43 PM
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে গত শনিবার (১৮ অক্টোবর) রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুরো ব্যবসায়িক মহল গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছে। আগুনে বিপুল পরিমাণ আমদানি ও রফতানি পণ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল ও ওষুধের উপাদান পুড়ে যাওয়ায় দেশের রফতানি সরবরাহ চেইন (শৃঙ্খল) মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) জানিয়েছে, এই দুর্ঘটনার প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই ক্ষতি এমন এক সময়ে এলো, যখন মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে আরও দুটি বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।
১. ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড: শিল্প খাতের অস্থিরতাবিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের আগুন সাম্প্রতিক ধারাবাহিক বিপর্যয়ের সর্বশেষ সংযোজন। এক সপ্তাহের মধ্যে তিনটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড শিল্প উৎপাদন, রফতানি কার্যক্রম ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে:তারিখস্থানক্ষতির বিবরণ১৪ অক্টোবরমিরপুর, রূপনগর (ঢাকা)প্রিন্টিং ও কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু।১৬ অক্টোবরচট্টগ্রাম ইপিজেডঅ্যাডামস ক্যাপস অ্যান্ড টেক্সটাইলস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ড। প্রাথমিক ক্ষতি ২০-২৫ কোটি টাকা।১৮ অক্টোবরকার্গো ভিলেজ (হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর)বিপুল পরিমাণ আমদানি ও রফতানি পণ্য, কাঁচামাল ধ্বংস। ক্ষতির আশঙ্কা ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি।শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধারাবাহিক দুর্ঘটনা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনাম, ডেলিভারি প্রতিশ্রুতি ও বিনিয়োগ আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।২. কার্গো ভিলেজের ক্ষতি ও প্রভাবকার্গো ভিলেজের আগুনে তৈরি পোশাক, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, টেলিকম ও প্রসাধনী খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।পোশাক খাত: তৈরি পোশাক শিল্পের নমুনা, লেইস, বোতাম, জিপার ও কাঁচামাল পুড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি ও অর্ডার নবায়ন কঠিন হবে। বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বড়দিনের (ক্রিসমাস) মৌসুম সামনে রেখে এক সপ্তাহের বিলম্বও বড় ক্ষতি ডেকে আনবে।
ওষুধ শিল্প: বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বিপিএ) মহাসচিব মো. জাকির হোসেন জানিয়েছেন, শীর্ষ ৩২টি কোম্পানির প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাঁচামাল পুড়ে গেছে, যা তিন থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ওষুধ উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে।ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী: ছোট আমদানিকারকরা, বিশেষ করে যারা শীত মৌসুমের ব্যবসা দিয়ে সারা বছর চলেন, তারা বিমাহীন হওয়ায় দেউলিয়া হওয়ার মুখে।ইএবি সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রশ্ন তুলেছেন, "একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অটো ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম নেই, এটি অকল্পনীয়।" তিনি সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমস ও বিমান বাংলাদেশের জবাবদিহিতা চেয়েছেন এবং নাশকতাসহ সব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি করেছেন।৩. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: মন্দার ইঙ্গিতঅগ্নিকাণ্ডের এই বিপর্যয় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে:ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন: বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমতে কমতে ২০২৫ সালের আগস্টে ৬.৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন।কারণ: অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা এর জন্য উচ্চ সুদহার (১৪-১৫%), রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগে আস্থাহীনতাকে দায়ী করছেন। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, উচ্চ সুদহার নতুন বিনিয়োগে বড় বাধা।আমদানি শুল্কের চাপ: চট্টগ্রাম বন্দরে বাড়তি শুল্ক, মুদ্রাস্ফীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যের ওপর নতুন ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও কঠিন করেছে।৪. সরকারের প্রতি ইএবি-র ৬ দফা আহ্বানক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য ইএবি সরকারের প্রতি ছয় দফা দাবি জানিয়েছে:১. ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের বিমা দাবির দ্রুত নিষ্পত্তি।২. বিমাহীন ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি তহবিল গঠন।৩. কার্গো ভিলেজের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ।৪. ওষুধ শিল্পের জন্য আলাদা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদাম স্থাপন।৫. রাসায়নিক গুদাম নিরাপদ দূরত্বে স্থানান্তর।৬. গুদাম ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর করা।এছাড়াও, ব্যবসায়ীরা সরকার ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের নীতি ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এর মূল কারণ। ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ অক্টোবর, ২০২৫, 6:43 PM
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে গত শনিবার (১৮ অক্টোবর) রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুরো ব্যবসায়িক মহল গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছে। আগুনে বিপুল পরিমাণ আমদানি ও রফতানি পণ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল ও ওষুধের উপাদান পুড়ে যাওয়ায় দেশের রফতানি সরবরাহ চেইন (শৃঙ্খল) মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) জানিয়েছে, এই দুর্ঘটনার প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই ক্ষতি এমন এক সময়ে এলো, যখন মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে আরও দুটি বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।
১. ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড: শিল্প খাতের অস্থিরতাবিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের আগুন সাম্প্রতিক ধারাবাহিক বিপর্যয়ের সর্বশেষ সংযোজন। এক সপ্তাহের মধ্যে তিনটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড শিল্প উৎপাদন, রফতানি কার্যক্রম ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে:তারিখস্থানক্ষতির বিবরণ১৪ অক্টোবরমিরপুর, রূপনগর (ঢাকা)প্রিন্টিং ও কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু।১৬ অক্টোবরচট্টগ্রাম ইপিজেডঅ্যাডামস ক্যাপস অ্যান্ড টেক্সটাইলস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ড। প্রাথমিক ক্ষতি ২০-২৫ কোটি টাকা।১৮ অক্টোবরকার্গো ভিলেজ (হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর)বিপুল পরিমাণ আমদানি ও রফতানি পণ্য, কাঁচামাল ধ্বংস। ক্ষতির আশঙ্কা ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি।শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধারাবাহিক দুর্ঘটনা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনাম, ডেলিভারি প্রতিশ্রুতি ও বিনিয়োগ আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।২. কার্গো ভিলেজের ক্ষতি ও প্রভাবকার্গো ভিলেজের আগুনে তৈরি পোশাক, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, টেলিকম ও প্রসাধনী খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।পোশাক খাত: তৈরি পোশাক শিল্পের নমুনা, লেইস, বোতাম, জিপার ও কাঁচামাল পুড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি ও অর্ডার নবায়ন কঠিন হবে। বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বড়দিনের (ক্রিসমাস) মৌসুম সামনে রেখে এক সপ্তাহের বিলম্বও বড় ক্ষতি ডেকে আনবে।
ওষুধ শিল্প: বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বিপিএ) মহাসচিব মো. জাকির হোসেন জানিয়েছেন, শীর্ষ ৩২টি কোম্পানির প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাঁচামাল পুড়ে গেছে, যা তিন থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ওষুধ উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে।ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী: ছোট আমদানিকারকরা, বিশেষ করে যারা শীত মৌসুমের ব্যবসা দিয়ে সারা বছর চলেন, তারা বিমাহীন হওয়ায় দেউলিয়া হওয়ার মুখে।ইএবি সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রশ্ন তুলেছেন, "একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অটো ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম নেই, এটি অকল্পনীয়।" তিনি সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমস ও বিমান বাংলাদেশের জবাবদিহিতা চেয়েছেন এবং নাশকতাসহ সব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি করেছেন।৩. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: মন্দার ইঙ্গিতঅগ্নিকাণ্ডের এই বিপর্যয় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে:ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন: বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমতে কমতে ২০২৫ সালের আগস্টে ৬.৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন।কারণ: অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা এর জন্য উচ্চ সুদহার (১৪-১৫%), রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগে আস্থাহীনতাকে দায়ী করছেন। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, উচ্চ সুদহার নতুন বিনিয়োগে বড় বাধা।আমদানি শুল্কের চাপ: চট্টগ্রাম বন্দরে বাড়তি শুল্ক, মুদ্রাস্ফীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যের ওপর নতুন ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও কঠিন করেছে।৪. সরকারের প্রতি ইএবি-র ৬ দফা আহ্বানক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য ইএবি সরকারের প্রতি ছয় দফা দাবি জানিয়েছে:১. ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের বিমা দাবির দ্রুত নিষ্পত্তি।২. বিমাহীন ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি তহবিল গঠন।৩. কার্গো ভিলেজের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ।৪. ওষুধ শিল্পের জন্য আলাদা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদাম স্থাপন।৫. রাসায়নিক গুদাম নিরাপদ দূরত্বে স্থানান্তর।৬. গুদাম ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর করা।এছাড়াও, ব্যবসায়ীরা সরকার ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের নীতি ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এর মূল কারণ। ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।