নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ অক্টোবর, ২০২৫, 3:42 PM
গত বছরের জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে নিরপরাধ সাধারণ মানুষের হয়রানি এবং মামলা-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন ঢাকা মহানগরীর আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞরা। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এবং চার্জশিট দাখিলে অস্বাভাবিক দেরি হওয়ায় অনেক নিরপরাধ মানুষ গ্রেফতার হয়ে জেল খাটছেন, যা এক ধরনের সাজা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হয়রানির চিত্র: ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিনের ঘটনা
নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানির একটি উদাহরণ হিসেবে ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিনের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
ঘটনা: গত ২৮ নভেম্বর (২০২৪) কবির নামে এক ব্যক্তি হেলাল উদ্দিনের কাছে ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। হেলাল জিডি করলে, কবির উল্টো তাকে যাত্রাবাড়ী থানার একটি জুলাই আন্দোলনের মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে ১৬১ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে আসামি করেন।
পরিণতি: গত ৭ সেপ্টেম্বর (২০২৫) হেলাল উদ্দিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ এবং বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।
আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন মনে করেন, দেরিতে চার্জশিট দাখিলের সুযোগে একটি মহল ‘মামলা-বাণিজ্য’ করছে। ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত শত্রুতার জের ধরে অনেককে জুলাই আন্দোলনের মামলায় ঢালাওভাবে আসামি করা হচ্ছে।
মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ও চার্জশিটের অবস্থা
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর (৫ আগস্ট ২০২৪) প্রথম মামলাটি হয় গত বছরের ১১ আগস্ট।
মোট মামলা: গত ১৪ মাসে রাজধানীর ৫০টি থানায় জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত মোট মামলা হয়েছে ৭২৯টি।
চার্জশিটের অবস্থা: এ পর্যন্ত একটি মামলারও চূড়ান্ত চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়নি। শুধুমাত্র গুলশান থানার একটি মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়া হলেও, রাষ্ট্রপক্ষের নারাজির কারণে আদালত সেটিকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।
চার্জশিট না হওয়ায় নিরপরাধ ব্যক্তিরা মুক্তির সুযোগ পাচ্ছেন না এবং এজাহারভুক্ত ব্যক্তিরা সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন: সমাধান না ফাঁকফোকর?
সাধারণ মানুষের হয়রানি রোধে সরকার গত ৯ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের জন্য পরিপত্র জারি করে।
প্রতিক্রিয়া: এরপর আদালতে ৭২টি মামলার অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় এবং এসব মামলায় ৩৭৩ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি:
পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী মনে করেন, অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন একটি ‘ভালো সিদ্ধান্ত’। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে হয়রানি থেকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অব্যাহতির বিষয়টি নজরদারি করতে পারছেন। তিনি দাবি করেন, তদন্তকাজে কোনও গাফিলতি নেই এবং “যথাযথ ও ভালো কাজে কিছু সময় লাগা স্বাভাবিক।”
আইনজীবীদের শঙ্কা:
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনকে সমাধান হিসেবে দেখছেন না। তার মতে, এই নিয়মের ভেতরে অনেক ফাঁকফোকর আছে এবং এর মাধ্যমে ‘পুলিশের বাণিজ্যের সুযোগ’ তৈরি হয়।
ভোগান্তি বৃদ্ধি: যাদের অব্যাহতি দেওয়া হবে না, তাদের জামিন পাওয়া কঠিন হবে। অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের কারণে চূড়ান্ত চার্জশিট দাখিলে দেরি করার সুযোগ বেড়ে যায়।
অর্থনৈতিক বৈষম্য: “অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন অর্থশালীদের ভোগান্তি থেকে বাঁচালেও সাধারণ মানুষকে আরও বেশি ভোগান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞদের বিকল্প প্রস্তাব
আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম মনে করেন, অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের নিয়ম তৈরি না করে চার্জশিটের জন্য পুলিশকে সময় বেঁধে দেওয়া উচিত ছিল।
সময়সীমা: চার্জশিট দাখিলের জন্য সর্বোচ্চ ১৮০ দিন সময় দেওয়া যেতে পারত।
শাস্তির বিধান: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চার্জশিট দিতে ব্যর্থ হলে তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান থাকা জরুরি ছিল, যেমনটি দীর্ঘদিনের মামলাগুলোতে দেখা যায় না।
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ অক্টোবর, ২০২৫, 3:42 PM
গত বছরের জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে নিরপরাধ সাধারণ মানুষের হয়রানি এবং মামলা-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন ঢাকা মহানগরীর আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞরা। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এবং চার্জশিট দাখিলে অস্বাভাবিক দেরি হওয়ায় অনেক নিরপরাধ মানুষ গ্রেফতার হয়ে জেল খাটছেন, যা এক ধরনের সাজা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হয়রানির চিত্র: ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিনের ঘটনা
নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানির একটি উদাহরণ হিসেবে ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিনের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
ঘটনা: গত ২৮ নভেম্বর (২০২৪) কবির নামে এক ব্যক্তি হেলাল উদ্দিনের কাছে ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। হেলাল জিডি করলে, কবির উল্টো তাকে যাত্রাবাড়ী থানার একটি জুলাই আন্দোলনের মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে ১৬১ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে আসামি করেন।
পরিণতি: গত ৭ সেপ্টেম্বর (২০২৫) হেলাল উদ্দিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ এবং বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।
আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন মনে করেন, দেরিতে চার্জশিট দাখিলের সুযোগে একটি মহল ‘মামলা-বাণিজ্য’ করছে। ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত শত্রুতার জের ধরে অনেককে জুলাই আন্দোলনের মামলায় ঢালাওভাবে আসামি করা হচ্ছে।
মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ও চার্জশিটের অবস্থা
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর (৫ আগস্ট ২০২৪) প্রথম মামলাটি হয় গত বছরের ১১ আগস্ট।
মোট মামলা: গত ১৪ মাসে রাজধানীর ৫০টি থানায় জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত মোট মামলা হয়েছে ৭২৯টি।
চার্জশিটের অবস্থা: এ পর্যন্ত একটি মামলারও চূড়ান্ত চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়নি। শুধুমাত্র গুলশান থানার একটি মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়া হলেও, রাষ্ট্রপক্ষের নারাজির কারণে আদালত সেটিকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।
চার্জশিট না হওয়ায় নিরপরাধ ব্যক্তিরা মুক্তির সুযোগ পাচ্ছেন না এবং এজাহারভুক্ত ব্যক্তিরা সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন: সমাধান না ফাঁকফোকর?
সাধারণ মানুষের হয়রানি রোধে সরকার গত ৯ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের জন্য পরিপত্র জারি করে।
প্রতিক্রিয়া: এরপর আদালতে ৭২টি মামলার অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় এবং এসব মামলায় ৩৭৩ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি:
পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী মনে করেন, অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন একটি ‘ভালো সিদ্ধান্ত’। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে হয়রানি থেকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অব্যাহতির বিষয়টি নজরদারি করতে পারছেন। তিনি দাবি করেন, তদন্তকাজে কোনও গাফিলতি নেই এবং “যথাযথ ও ভালো কাজে কিছু সময় লাগা স্বাভাবিক।”
আইনজীবীদের শঙ্কা:
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনকে সমাধান হিসেবে দেখছেন না। তার মতে, এই নিয়মের ভেতরে অনেক ফাঁকফোকর আছে এবং এর মাধ্যমে ‘পুলিশের বাণিজ্যের সুযোগ’ তৈরি হয়।
ভোগান্তি বৃদ্ধি: যাদের অব্যাহতি দেওয়া হবে না, তাদের জামিন পাওয়া কঠিন হবে। অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের কারণে চূড়ান্ত চার্জশিট দাখিলে দেরি করার সুযোগ বেড়ে যায়।
অর্থনৈতিক বৈষম্য: “অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন অর্থশালীদের ভোগান্তি থেকে বাঁচালেও সাধারণ মানুষকে আরও বেশি ভোগান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞদের বিকল্প প্রস্তাব
আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম মনে করেন, অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের নিয়ম তৈরি না করে চার্জশিটের জন্য পুলিশকে সময় বেঁধে দেওয়া উচিত ছিল।
সময়সীমা: চার্জশিট দাখিলের জন্য সর্বোচ্চ ১৮০ দিন সময় দেওয়া যেতে পারত।
শাস্তির বিধান: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চার্জশিট দিতে ব্যর্থ হলে তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান থাকা জরুরি ছিল, যেমনটি দীর্ঘদিনের মামলাগুলোতে দেখা যায় না।