ইউসুফ আলী বাচ্চু
২১ নভেম্বর, ২০২৫, 4:56 PM
একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে সারাদেশ কেঁপে ওঠার পর প্রাথমিকভাবে নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৭জনে দাঁড়িয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন আরো হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে। ভূমিকম্পের তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে যে, সামনে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই পুরনো বা দুর্বল কাঠামোর ভবনের ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েছিলেন বলে জানা গেছে। সরকার জনগণের প্রতি আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকার এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের নির্দেশাবলী মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
সরকারে পক্ষথেকে ‘ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনও পরিষ্কার নয়। তবে সবাইকে আফটারশক (পরবর্তী কম্পন) সম্পর্কে সতর্ক থাকার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে দ্রুত সরে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।’
গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ৫ দশমিক ৭ এবং উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর মাধবদী।
এদিকে ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার দেওয়া শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন এবং সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে উদ্ধার কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেন।
জনগণ ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধান উপদেষ্টা। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এ তথ্য জানান।
সকালে ভূমিকম্পের পর কসাইটুলির কেপি ঘোষ স্ট্রিটের ২০/সি নম্বরের ভবনের রেলিং ভেঙে নিচে পড়ে। এতে তিন পথচারী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের নাম-পরিচয় জানাতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় ১০ জন পথচারী আহত হয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, ভূমিকম্পের সময় হঠাৎ করে ছয়তলা ভবনের রেলিং ধসে পড়ে তিন পথচারী ঘটনাস্থলে নিহত হন। ভবনটির নিচে একটি গরুর মাংস বিক্রির দোকান ছিল। সেখানে থাকা ক্রেতা ও পথচারীরা আহত হন। ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত হন।
বংশাল থানার পরিদর্শক মোহাম্মদ সোহেল হোসেন বলেন, ভবন ধসের ঘটনা ঘটেনি। তবে ভবনের রেলিং ভেঙে নিচে পড়েছে। ভাঙা বস্তুর আঘাতে ভবনের আঘাতে থাকা তিনজন গুরুতর আহত হন। তাদের উদ্ধার করে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, ঢাকার বংশালের কসাইটুলিতে ভূমিকম্পে পাঁচতলা ভবনের রেলিং ধসে তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের (মিটফোর্ড) ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাফিউল ইসলাম, হাজী আব্দুর রহিম (৪৭) ও মেহরাব হোসেন রিমন (১২)।
নিহত রাফির মা নুসরাতের সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচার চলছে। তিনি জানেন না , তার ছেলে আর কোনোদিন চোখ মেলে পৃথিবীর আলো দেখবে না।
এর আগে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার বলেন, ভবন ধসের খবর পেয়ে সদরঘাট ও সিদ্দিকবাজার ফায়ার স্টেশন থেকে দুটি ইউনিট সেখানে যায়। কিন্তু সেখানে ভবন ধসের ঘটনা ঘটেনি। পলেস্তারার কিছু অংশ ও কিছু ইট খসে পড়েছিল। এতে তিনজন আহত হন। তবে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা পৌঁছানোর আগেই আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যান স্থানীয়রা।
নরসিংদীর পলাশে ভূমিকম্পের সময় মাটির দেয়াল ধসে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ছাদের কার্নিশ ধসে পড়ে তিন জন গুরুতর আহতসহ বিভিন্ন স্থানে ৪০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন পলাশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ভূমিকম্পে দেয়াল ধসে ফাতেমা নামে এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নবজাতকের মা ও এক প্রতিবেশী আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। রূপগঞ্জের ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মোখলেসুর রহমান এ তথ্য জানান।
এছাড়া গাজীপুরের শ্রীপুরে ভূমিকম্পের সময় একটি পোশাক কারখানা থেকে হুড়োহুড়ি করে বের হতে গিয়ে তিন শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। শ্রীপুর পৌরসভার গড়গড়িয়া মাস্টার বাড়ি এলাকায় ডেনিমেক লিমিটেড পোশাক কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। স্বজনরা আহতদের গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা পঙ্গু হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যান।
এদিকে ভূমিকম্পে আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সব হাসপাতালে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। শুক্রবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নেন তিনি।
আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে যে কোন সময়:
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির বলেছেন, ঢাকা এবং এর আশপাশে বিগত কয়েক দশকে সংঘটিত হওয়া ভূমিকম্পের মধ্যে এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সর্বোচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প। এই সময়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ৪ থেকে ৫ মাত্রার সামান্য বেশি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। তবে এগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের বাইরে।
তিনি আরও জানান, ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে একাধিক বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। যা প্রমাণ করে যে, এটি ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। যে কোনো সময় বাংলাদেশে আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে। ঠিক কবে হবে সেটা আমরা বলতে পারি না। শুক্রবার দুপুরে তিনি এসব কথা বলেন।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ হুমায়ুন আখতার বলেন, এর আগে ২০০৩ সালে রাঙ্গামাটিতে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি বরকল ইউনিয়নে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এটিও অনেক শক্তিশালী ছিল। তবে ১৯১৮ সালে দেশের অভ্যন্তরে সর্বোচ্চ ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
তিনি বলেন, আমরা সরকারকে বারবার বলে আসছি ভূমিকম্পে মহড়ার বিকল্প নাই। সরকার ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধারকার্যের জন্য কোটি কোটি টাকার বাজেট রাখে, সেখান থেকে দুর্নীতি করতে পারে। কিন্ত যথাযথ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা: ঢাকাসহ সারাদেশে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এটাকে দেশের ইতিহাসে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প বলে উল্লেখ করেছেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার।
শুক্রবার ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতি জানার জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের দেশ তো ভূমিকম্পপ্রবণ। আজকের ভূমিকম্প এত বড় ঝাঁকুনি ও শক্তিশালী হওয়ার কারণ হলো দেশের পূর্ব প্রান্তটা হচ্ছে বার্মা প্লেট, পশ্চিমটা হচ্ছে ইন্ডিয়ান প্লেট; এই সংযোগস্থলে ভূমিকম্প হয়েছে। এবং এই সংযোগটা এতদিন আটকে ছিল। এখন এই সংযোগটা আজকে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে খুলে গেছে। অর্থাৎ আটকানোটা বা লকটা খুলে গেছে।
তিনি বলেন, এখন সামনে আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে। আজকের এই ভূমিকম্প সেই সতর্কবাণী দিচ্ছে। প্লেট যেটা আটকে ছিল, সেটা আটকানো অবস্থা থেকে খুলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে আরও বড় ভূমিকম্প হবে। যেটা আমরা ২০১৬ সাল থেকে বলে আসছি।
তিনি বলেন, আমরা তখন পূর্বাভাস দিয়েছিলাম ৮ মাত্রাশক্তির ভূমিকম্প এখানে জমা হয়ে আছে। সেই শক্তির সামান্য অংশ আজ বের হলো। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে স্মরণকালের এত বড় ভূমিকম্প হয়নি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির বলেছেন, ঢাকা ও ঢাকার আশপাশে বিগত কয়েক দশকে হওয়া ভূমিকম্পের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ শক্তিশালী ও সর্বোচ্চ মাত্রার। এই সময়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ৪ থেকে ৫ মাত্রার সামান্য বেশি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। তবে এগুলোর উৎপত্তিস্থল দেশের বাইরে।
তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে একাধিক বড় ভূমিকম্প হয়েছে, যা প্রমাণ করে এটি ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। যে কোনো সময় বাংলাদেশে আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে। ঠিক কবে হবে সেটা আমরা বলতে পারি না।
দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসাইন ভূইয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান এমন যে, ভূমিকম্প হওয়া অবশ্যম্ভাবী। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান তিনটি টেকটোনিক প্লেট ইন্ডিয়ান প্লেট, বার্মিজ প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে ভূমিকম্প হওয়ার ঝুঁকি সবসময় বিদ্যমান। বাংলাদেশের ভূগঠন মূলত নরম শিলা দিয়ে তৈরি। তাই নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সি ও উচ্চ অ্যাম্পলিচিউডের ভূমিকম্প হলে ক্ষতি বেশি হয়। ভূমিকম্পের কম্পন মাটির নিজস্ব কম্পাঙ্ক ও ভবনের কম্পাঙ্ক একসাথে মিলে গেলে তা আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, ছোট ছোট ভূমিকম্প প্রতিনিয়ত ঘটছে, যা একেবারেই স্বাভাবিক। পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৫০টি ছোট মাত্রার ভূমিকম্প ঘটে। এক থেকে তিন মাত্রার ভূমিকম্প সাধারণত টের পাওয়া যায় না। কিন্তু চার বা তার ওপরে হলে মানুষ তা অনুভব করতে পারে এবং ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাও তৈরি হয়। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রিখাটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ৫.৭। এটির উৎপত্তিস্থল ঢাকা থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর মাধবদীতে। এটি মাঝারি ধরনের।
মাটির ওপর কম্পনের যে তীব্রতা, এটা স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি। এটির গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার। এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত তিনজন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইউসুফ আলী বাচ্চু
২১ নভেম্বর, ২০২৫, 4:56 PM
একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে সারাদেশ কেঁপে ওঠার পর প্রাথমিকভাবে নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৭জনে দাঁড়িয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন আরো হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে। ভূমিকম্পের তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে যে, সামনে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই পুরনো বা দুর্বল কাঠামোর ভবনের ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েছিলেন বলে জানা গেছে। সরকার জনগণের প্রতি আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকার এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের নির্দেশাবলী মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
সরকারে পক্ষথেকে ‘ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনও পরিষ্কার নয়। তবে সবাইকে আফটারশক (পরবর্তী কম্পন) সম্পর্কে সতর্ক থাকার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে দ্রুত সরে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।’
গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ৫ দশমিক ৭ এবং উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর মাধবদী।
এদিকে ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার দেওয়া শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন এবং সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে উদ্ধার কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেন।
জনগণ ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধান উপদেষ্টা। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এ তথ্য জানান।
সকালে ভূমিকম্পের পর কসাইটুলির কেপি ঘোষ স্ট্রিটের ২০/সি নম্বরের ভবনের রেলিং ভেঙে নিচে পড়ে। এতে তিন পথচারী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের নাম-পরিচয় জানাতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় ১০ জন পথচারী আহত হয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, ভূমিকম্পের সময় হঠাৎ করে ছয়তলা ভবনের রেলিং ধসে পড়ে তিন পথচারী ঘটনাস্থলে নিহত হন। ভবনটির নিচে একটি গরুর মাংস বিক্রির দোকান ছিল। সেখানে থাকা ক্রেতা ও পথচারীরা আহত হন। ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত হন।
বংশাল থানার পরিদর্শক মোহাম্মদ সোহেল হোসেন বলেন, ভবন ধসের ঘটনা ঘটেনি। তবে ভবনের রেলিং ভেঙে নিচে পড়েছে। ভাঙা বস্তুর আঘাতে ভবনের আঘাতে থাকা তিনজন গুরুতর আহত হন। তাদের উদ্ধার করে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, ঢাকার বংশালের কসাইটুলিতে ভূমিকম্পে পাঁচতলা ভবনের রেলিং ধসে তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের (মিটফোর্ড) ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাফিউল ইসলাম, হাজী আব্দুর রহিম (৪৭) ও মেহরাব হোসেন রিমন (১২)।
নিহত রাফির মা নুসরাতের সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচার চলছে। তিনি জানেন না , তার ছেলে আর কোনোদিন চোখ মেলে পৃথিবীর আলো দেখবে না।
এর আগে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার বলেন, ভবন ধসের খবর পেয়ে সদরঘাট ও সিদ্দিকবাজার ফায়ার স্টেশন থেকে দুটি ইউনিট সেখানে যায়। কিন্তু সেখানে ভবন ধসের ঘটনা ঘটেনি। পলেস্তারার কিছু অংশ ও কিছু ইট খসে পড়েছিল। এতে তিনজন আহত হন। তবে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা পৌঁছানোর আগেই আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যান স্থানীয়রা।
নরসিংদীর পলাশে ভূমিকম্পের সময় মাটির দেয়াল ধসে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ছাদের কার্নিশ ধসে পড়ে তিন জন গুরুতর আহতসহ বিভিন্ন স্থানে ৪০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন পলাশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ভূমিকম্পে দেয়াল ধসে ফাতেমা নামে এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নবজাতকের মা ও এক প্রতিবেশী আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। রূপগঞ্জের ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মোখলেসুর রহমান এ তথ্য জানান।
এছাড়া গাজীপুরের শ্রীপুরে ভূমিকম্পের সময় একটি পোশাক কারখানা থেকে হুড়োহুড়ি করে বের হতে গিয়ে তিন শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। শ্রীপুর পৌরসভার গড়গড়িয়া মাস্টার বাড়ি এলাকায় ডেনিমেক লিমিটেড পোশাক কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। স্বজনরা আহতদের গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা পঙ্গু হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যান।
এদিকে ভূমিকম্পে আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সব হাসপাতালে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। শুক্রবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নেন তিনি।
আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে যে কোন সময়:
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির বলেছেন, ঢাকা এবং এর আশপাশে বিগত কয়েক দশকে সংঘটিত হওয়া ভূমিকম্পের মধ্যে এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সর্বোচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প। এই সময়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ৪ থেকে ৫ মাত্রার সামান্য বেশি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। তবে এগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের বাইরে।
তিনি আরও জানান, ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে একাধিক বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। যা প্রমাণ করে যে, এটি ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। যে কোনো সময় বাংলাদেশে আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে। ঠিক কবে হবে সেটা আমরা বলতে পারি না। শুক্রবার দুপুরে তিনি এসব কথা বলেন।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ হুমায়ুন আখতার বলেন, এর আগে ২০০৩ সালে রাঙ্গামাটিতে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি বরকল ইউনিয়নে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এটিও অনেক শক্তিশালী ছিল। তবে ১৯১৮ সালে দেশের অভ্যন্তরে সর্বোচ্চ ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
তিনি বলেন, আমরা সরকারকে বারবার বলে আসছি ভূমিকম্পে মহড়ার বিকল্প নাই। সরকার ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধারকার্যের জন্য কোটি কোটি টাকার বাজেট রাখে, সেখান থেকে দুর্নীতি করতে পারে। কিন্ত যথাযথ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা: ঢাকাসহ সারাদেশে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এটাকে দেশের ইতিহাসে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প বলে উল্লেখ করেছেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার।
শুক্রবার ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতি জানার জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের দেশ তো ভূমিকম্পপ্রবণ। আজকের ভূমিকম্প এত বড় ঝাঁকুনি ও শক্তিশালী হওয়ার কারণ হলো দেশের পূর্ব প্রান্তটা হচ্ছে বার্মা প্লেট, পশ্চিমটা হচ্ছে ইন্ডিয়ান প্লেট; এই সংযোগস্থলে ভূমিকম্প হয়েছে। এবং এই সংযোগটা এতদিন আটকে ছিল। এখন এই সংযোগটা আজকে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে খুলে গেছে। অর্থাৎ আটকানোটা বা লকটা খুলে গেছে।
তিনি বলেন, এখন সামনে আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে। আজকের এই ভূমিকম্প সেই সতর্কবাণী দিচ্ছে। প্লেট যেটা আটকে ছিল, সেটা আটকানো অবস্থা থেকে খুলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে আরও বড় ভূমিকম্প হবে। যেটা আমরা ২০১৬ সাল থেকে বলে আসছি।
তিনি বলেন, আমরা তখন পূর্বাভাস দিয়েছিলাম ৮ মাত্রাশক্তির ভূমিকম্প এখানে জমা হয়ে আছে। সেই শক্তির সামান্য অংশ আজ বের হলো। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে স্মরণকালের এত বড় ভূমিকম্প হয়নি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির বলেছেন, ঢাকা ও ঢাকার আশপাশে বিগত কয়েক দশকে হওয়া ভূমিকম্পের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ শক্তিশালী ও সর্বোচ্চ মাত্রার। এই সময়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ৪ থেকে ৫ মাত্রার সামান্য বেশি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। তবে এগুলোর উৎপত্তিস্থল দেশের বাইরে।
তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে একাধিক বড় ভূমিকম্প হয়েছে, যা প্রমাণ করে এটি ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। যে কোনো সময় বাংলাদেশে আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে। ঠিক কবে হবে সেটা আমরা বলতে পারি না।
দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসাইন ভূইয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান এমন যে, ভূমিকম্প হওয়া অবশ্যম্ভাবী। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান তিনটি টেকটোনিক প্লেট ইন্ডিয়ান প্লেট, বার্মিজ প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে ভূমিকম্প হওয়ার ঝুঁকি সবসময় বিদ্যমান। বাংলাদেশের ভূগঠন মূলত নরম শিলা দিয়ে তৈরি। তাই নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সি ও উচ্চ অ্যাম্পলিচিউডের ভূমিকম্প হলে ক্ষতি বেশি হয়। ভূমিকম্পের কম্পন মাটির নিজস্ব কম্পাঙ্ক ও ভবনের কম্পাঙ্ক একসাথে মিলে গেলে তা আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, ছোট ছোট ভূমিকম্প প্রতিনিয়ত ঘটছে, যা একেবারেই স্বাভাবিক। পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৫০টি ছোট মাত্রার ভূমিকম্প ঘটে। এক থেকে তিন মাত্রার ভূমিকম্প সাধারণত টের পাওয়া যায় না। কিন্তু চার বা তার ওপরে হলে মানুষ তা অনুভব করতে পারে এবং ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাও তৈরি হয়। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রিখাটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ৫.৭। এটির উৎপত্তিস্থল ঢাকা থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর মাধবদীতে। এটি মাঝারি ধরনের।
মাটির ওপর কম্পনের যে তীব্রতা, এটা স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি। এটির গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার। এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত তিনজন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।