CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০২ জানুয়ারি, ২০২৬

রাজানীতির মাঠে একা এনসিপি

#
news image

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ছাত্র-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যা চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয়েছিল। সেটি বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। জুলাই বিপ্লবের ইমেজে গড়া এই দলটিকে এখন সব পক্ষই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে দূরে সরিয়ে দিয়েছে বলে রাজনৈতিক মাঠ থেকে তথ্য মিলেছে। এনসিপি’র এই দুর্বলতার পেছনে দলের কতিপয় নেতার অতিরিক্ত অহমিকা, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিতে গা ভাসিয়ে দেওয়া এবং জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির মতো বড় দলগুলোর সঙ্গে কৌশলগত ভুল পদক্ষেপকেই দায়ী করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনসিপি প্রতিষ্ঠার শুরুতে বিএনপি থেকেও শীর্ষ নেতার যোগদানের গুঞ্জন উঠলেও অল্প দিনের মধ্যেই অনেক সদস্য প্রকাশ্যেই দল ছাড়ার ঘোষণা দেন। কতিপয় নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এলেও দলটির পক্ষ থেকে সরাসরি পদক্ষেপ না নেওয়ায় সাংগঠনিকভাবে গুছিয়ে উঠতে পারেনি এনসিপি, যার কারণে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাড়া পড়ছে না। এছাড়া রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে যে, ছাত্র-নেতৃত্বাধীন এই দলটির বর্তমান নেতৃত্বের একটি বড় অংশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র শাখা ছাত্র শিবিরের কর্মী ছিলেন। কারো কারো মতে, জামায়াত এনসিপি’কে নিজেদের একটি সক্রিয় ‘বি টিম’ বা আজ্ঞাবহ দল হিসাবে ব্যবহার করে বিএনপি’কে শায়েস্তা করতে চেয়েছিল। এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা ধীরে ধীরে এনসিপি থেকে সরে যায়।

এদিকে জামায়াত এনসিপি’কে বাগে আনতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের প্রতি সব ধরনের আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তা দেওয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এছাড়া জামায়াত যখন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (চজ) পদ্ধতির নির্বাচনের দাবিতে এনসিপি’কে নিয়ে মাঠে নামতে চেয়েছিল, তখন এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জামায়াতের এই আন্দোলনকে ‘পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতারণা’ বলে অভিহিত করেন। ফলে জামায়াতের সাথে বড় ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জুলাই বিপ্লবে এনসিপি নেতাদের অবদানের জন্য বিএনপি’র হাইকমান্ড তাদের পাশে রাখতে চেয়েছিল। আগামী নির্বাচনে জয়ী করে আনতে আসন ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠকেও এনসিপি’কে কয়েকটি আসন ছেড়ে দেওয়ার আলোচনা হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিএনপি’র প্রতিশ্রুত জাতীয় সরকারেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু এনসিপি’র একটি অংশের নেতারা এসব প্রস্তাবকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে।
জামায়াতের লোভনীয় প্রস্তাবের কারণে তরুণ নেতারা বিভ্রান্ত হয়ে বিএনপি থেকে দূরে সরে যান। যদিও পরে তারা জামায়াতের কূটকৈৗশল ধরতে পেরে দূরত্ব সৃষ্টি করেন, তবে ততক্ষণে বিএনপির কাছ থেকে তারা কার্যকরভাবে সরে গেছে। এনসিপি’র কতিপয় নেতার অহমিকা দলের বেহাল অবস্থার জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। একটি সূত্র জানায়, জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি ও নিশ্চয়তা ছাড়া সনদে সই করবে না এনসিপি’র এমন বাড়াবাড়ি খোদ প্রধান উপদেষ্টাও মেনে নিতে পারেননি।
এছাড়াও, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তির বিশেষ দিনে এনসিপি’র পাঁচ শীর্ষস্থানীয় নেতার হঠাৎ কক্সবাজারে চলে যাওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ মহলকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল।
এই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি তিনটি রাজনৈতিক দলকে নিয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ নামে নতুন জোট ঘোষণা করেছেন। জোট ঘোষণার সময় নাহিদ ইসলাম ইঙ্গিত দেন, ‘আসন ও লোভনীয় অফার’ প্রত্যাখ্যান করে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন এবং একসঙ্গে একই মার্কায় জোটবদ্ধ নির্বাচন করবেন। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, সতের বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের আন্দোলনে সফলতা লাভকারী তরুণদের নিয়ে গড়া এনসিপি সামনের দিনে কতটুকু এগোবে, নাকি অন্য কোনো দলের ভিড়ে মিশে যাবে বা বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়বে তা সময়ই বলে দেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি’র সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো। নতুন গঠিত এই ক্ষুদ্র জোট জাতীয় রাজনীতিতে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর যে তরুণদের নিয়ে দলটি গঠিত হয়েছিল, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত না হলে তাদের মধ্যে বড় ধরনের ভাঙন দেখা যেতে পারে।
রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে তাদের অহমিকা পরিহার করে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর কৌশল অবলম্বন করতে হবে। সব মিলিয়ে, একসময় জুলাই বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত জাতীয় নাগরিক পার্টি এখন রাজনৈতিক ময়দানে নিজেদের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে।

ইউসুফ আলী বাচ্চু

১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫,  4:49 PM

news image

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ছাত্র-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যা চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয়েছিল। সেটি বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। জুলাই বিপ্লবের ইমেজে গড়া এই দলটিকে এখন সব পক্ষই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে দূরে সরিয়ে দিয়েছে বলে রাজনৈতিক মাঠ থেকে তথ্য মিলেছে। এনসিপি’র এই দুর্বলতার পেছনে দলের কতিপয় নেতার অতিরিক্ত অহমিকা, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিতে গা ভাসিয়ে দেওয়া এবং জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির মতো বড় দলগুলোর সঙ্গে কৌশলগত ভুল পদক্ষেপকেই দায়ী করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনসিপি প্রতিষ্ঠার শুরুতে বিএনপি থেকেও শীর্ষ নেতার যোগদানের গুঞ্জন উঠলেও অল্প দিনের মধ্যেই অনেক সদস্য প্রকাশ্যেই দল ছাড়ার ঘোষণা দেন। কতিপয় নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এলেও দলটির পক্ষ থেকে সরাসরি পদক্ষেপ না নেওয়ায় সাংগঠনিকভাবে গুছিয়ে উঠতে পারেনি এনসিপি, যার কারণে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাড়া পড়ছে না। এছাড়া রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে যে, ছাত্র-নেতৃত্বাধীন এই দলটির বর্তমান নেতৃত্বের একটি বড় অংশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র শাখা ছাত্র শিবিরের কর্মী ছিলেন। কারো কারো মতে, জামায়াত এনসিপি’কে নিজেদের একটি সক্রিয় ‘বি টিম’ বা আজ্ঞাবহ দল হিসাবে ব্যবহার করে বিএনপি’কে শায়েস্তা করতে চেয়েছিল। এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা ধীরে ধীরে এনসিপি থেকে সরে যায়।

এদিকে জামায়াত এনসিপি’কে বাগে আনতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের প্রতি সব ধরনের আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তা দেওয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এছাড়া জামায়াত যখন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (চজ) পদ্ধতির নির্বাচনের দাবিতে এনসিপি’কে নিয়ে মাঠে নামতে চেয়েছিল, তখন এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জামায়াতের এই আন্দোলনকে ‘পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতারণা’ বলে অভিহিত করেন। ফলে জামায়াতের সাথে বড় ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জুলাই বিপ্লবে এনসিপি নেতাদের অবদানের জন্য বিএনপি’র হাইকমান্ড তাদের পাশে রাখতে চেয়েছিল। আগামী নির্বাচনে জয়ী করে আনতে আসন ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠকেও এনসিপি’কে কয়েকটি আসন ছেড়ে দেওয়ার আলোচনা হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিএনপি’র প্রতিশ্রুত জাতীয় সরকারেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু এনসিপি’র একটি অংশের নেতারা এসব প্রস্তাবকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে।
জামায়াতের লোভনীয় প্রস্তাবের কারণে তরুণ নেতারা বিভ্রান্ত হয়ে বিএনপি থেকে দূরে সরে যান। যদিও পরে তারা জামায়াতের কূটকৈৗশল ধরতে পেরে দূরত্ব সৃষ্টি করেন, তবে ততক্ষণে বিএনপির কাছ থেকে তারা কার্যকরভাবে সরে গেছে। এনসিপি’র কতিপয় নেতার অহমিকা দলের বেহাল অবস্থার জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। একটি সূত্র জানায়, জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি ও নিশ্চয়তা ছাড়া সনদে সই করবে না এনসিপি’র এমন বাড়াবাড়ি খোদ প্রধান উপদেষ্টাও মেনে নিতে পারেননি।
এছাড়াও, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তির বিশেষ দিনে এনসিপি’র পাঁচ শীর্ষস্থানীয় নেতার হঠাৎ কক্সবাজারে চলে যাওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ মহলকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল।
এই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি তিনটি রাজনৈতিক দলকে নিয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ নামে নতুন জোট ঘোষণা করেছেন। জোট ঘোষণার সময় নাহিদ ইসলাম ইঙ্গিত দেন, ‘আসন ও লোভনীয় অফার’ প্রত্যাখ্যান করে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন এবং একসঙ্গে একই মার্কায় জোটবদ্ধ নির্বাচন করবেন। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, সতের বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের আন্দোলনে সফলতা লাভকারী তরুণদের নিয়ে গড়া এনসিপি সামনের দিনে কতটুকু এগোবে, নাকি অন্য কোনো দলের ভিড়ে মিশে যাবে বা বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়বে তা সময়ই বলে দেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি’র সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো। নতুন গঠিত এই ক্ষুদ্র জোট জাতীয় রাজনীতিতে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর যে তরুণদের নিয়ে দলটি গঠিত হয়েছিল, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত না হলে তাদের মধ্যে বড় ধরনের ভাঙন দেখা যেতে পারে।
রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে তাদের অহমিকা পরিহার করে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর কৌশল অবলম্বন করতে হবে। সব মিলিয়ে, একসময় জুলাই বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত জাতীয় নাগরিক পার্টি এখন রাজনৈতিক ময়দানে নিজেদের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে।