ইউসুফ আলী বাচ্চু
২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫, 4:56 PM
একই চেহারায় দুই রুপ ধরা পড়েছে বর্তমান নির্বাহী প্রোকৌশলী মো. রাকিবুল হাসানের। গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের দাবি, রাকিবুল হাসান প্রকৃতপক্ষে ‘দুই পরিচয়ের মানুষ’ দিনে তিনি প্রকৌশলী, আর অফিসের বাইরে তিনি একটি শক্তিশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের হোতা।
জানা গেছে, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-১ এর উপ সচিব তাসমিন ফারহানা স্বাক্ষরিত রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে গত ১৭ নভেম্বর নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান মো. রাকিবুল হাসান। এরপরই তিনি চলে আসেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তা হয়েও গত ১১ বছর ধরে গোপনে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা করা, শত কোটি টাকার অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও প্রকল্প লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এই পদোন্নতির খবর প্রকাশের পরই গণপূর্ত অধিদপ্তরে (পিডব্লিউডি) শুরু হয় তোলপাড়।
অভিযোগকারীদের মতে, রাকিবুল হাসানের নেতৃত্বে দু’জন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং অন্তত এক ডজন নির্বাহী প্রকৌশলীর একটি ‘অন্ধকার সিন্ডিকেট’ সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে গুরুতর রয়েছে। সেগুলো হলো:
ফাইল আটকে জিম্মি: প্রকল্পের কমিশন না দিলে ফাইল আটকে দেওয়া এবং মাপ-জোখে জটিলতা তৈরি করে ঠিকাদারদের জিম্মি করে রাখা।
টেন্ডার ‘বন্দোবস্ত’: রাজনৈতিক নাম ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগ এবং সিন্ডিকেটের নির্দেশে টেন্ডারগুলো ‘বন্দোবস্ত’ করে দেওয়া।
‘নিজেদের ঠিকাদার’ ছাড়া সুযোগ নেই: তেজগাঁও গণপূর্ত উপবিভাগে দায়িত্ব পালনকালে রাকিবুল হাসান কোনো বাইরের ঠিকাদারকে সুযোগ দিতেন না। অভিযোগ: ‘যেখানে তার স্বার্থ, সেখানে তিনিই ঠিকাদার।’
২০ কোটি টাকার ভুয়া ভেরিয়েশন: ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘দেশ উন্নয়ন’-এর বিল ছাড় করতে তিনি ২০ কোটি টাকার ভুয়া ভেরিয়েশন দেখিয়ে ২ কোটি টাকা কমিশন নিয়েছেন।
এছাড়া তেজগাঁও বিসিক ভবনের বেজমেন্টে গুরুতর ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘কুশলী নির্মাতা’-কে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ছাড়পত্র দেন। ভুক্তভোগীরা জানান, রাকিবুলকে ৫শতাংশ কমিশন দিয়ে তারা সম্পূর্ণ বিল তুলেছে।
অভিযোগ রয়েছে, তেজগাঁও শিল্প প্লট ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাকিবুল হাসান অন্তত শত কোটি টাকা লোপাট করেছেন। এই অবৈধ অর্থপ্রবাহের মাধ্যমে তিনি ঢাকা, কুমিল্লা ও গাজীপুরে বিলাসবহুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। যার মধ্যে ঢাকায় মূল্যবান জমি ও ফ্ল্যাট, কুমিল্লা শহরে ১০ কাঠা জমি, এবং গাজীপুরে ৩০ একর জমিতে বিলাসবহুল রিসোর্ট নির্মাণ। গুঞ্জন রয়েছে, তিনি সিঙ্গাপুরে কয়েকশো কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করেছেন।
গণপূর্তের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রাকিবুল এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, এখন ওকে না খুশি করে কোনো প্রকল্পই এগোয় না।’
ঠিকাদারদের মানববন্ধন ও কর্তৃপক্ষের অবস্থান:
গত ১০ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে রাকিবুলের বিরুদ্ধে কাজ করা একাধিক ঠিকাদার মানববন্ধন করে তাকে ‘দস্যু প্রকৌশলী’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং তাকে তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান।
এ বিষয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে বলেন, ‘এ ধরনের অনিয়ম কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।’ তিনি প্রতিবেদককে অফিসে এসে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নিতে বলেন।
এ বিষয় কথা বলার জন্য মো. রাকিবুল হাসানের বক্তব্যের জন্য কল করা হলে প্রথমে তিনি কল কেটে দেন। পারে আবার কল করলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বলেন আমি এখন ব্যস্ত আছি পরে কথা বলবো।
এরপর অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখা যায় তিনি সেদিন অনুপস্থিত।
অপর দিকে পদোন্নতির সঙ্গে সঙ্গেই গণপূর্তের ভেতরে বছরের পর বছর চাপা থাকা এই দুর্নীতি, গোপন ঠিকাদারি এবং অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগগুলো এখন ছাইচাপা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের ভিত ভেঙে একজন রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে সত্যিকারের ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা সম্ভব হবে কি না।
ইউসুফ আলী বাচ্চু
২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫, 4:56 PM
একই চেহারায় দুই রুপ ধরা পড়েছে বর্তমান নির্বাহী প্রোকৌশলী মো. রাকিবুল হাসানের। গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের দাবি, রাকিবুল হাসান প্রকৃতপক্ষে ‘দুই পরিচয়ের মানুষ’ দিনে তিনি প্রকৌশলী, আর অফিসের বাইরে তিনি একটি শক্তিশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের হোতা।
জানা গেছে, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-১ এর উপ সচিব তাসমিন ফারহানা স্বাক্ষরিত রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে গত ১৭ নভেম্বর নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান মো. রাকিবুল হাসান। এরপরই তিনি চলে আসেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তা হয়েও গত ১১ বছর ধরে গোপনে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা করা, শত কোটি টাকার অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও প্রকল্প লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এই পদোন্নতির খবর প্রকাশের পরই গণপূর্ত অধিদপ্তরে (পিডব্লিউডি) শুরু হয় তোলপাড়।
অভিযোগকারীদের মতে, রাকিবুল হাসানের নেতৃত্বে দু’জন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং অন্তত এক ডজন নির্বাহী প্রকৌশলীর একটি ‘অন্ধকার সিন্ডিকেট’ সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে গুরুতর রয়েছে। সেগুলো হলো:
ফাইল আটকে জিম্মি: প্রকল্পের কমিশন না দিলে ফাইল আটকে দেওয়া এবং মাপ-জোখে জটিলতা তৈরি করে ঠিকাদারদের জিম্মি করে রাখা।
টেন্ডার ‘বন্দোবস্ত’: রাজনৈতিক নাম ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগ এবং সিন্ডিকেটের নির্দেশে টেন্ডারগুলো ‘বন্দোবস্ত’ করে দেওয়া।
‘নিজেদের ঠিকাদার’ ছাড়া সুযোগ নেই: তেজগাঁও গণপূর্ত উপবিভাগে দায়িত্ব পালনকালে রাকিবুল হাসান কোনো বাইরের ঠিকাদারকে সুযোগ দিতেন না। অভিযোগ: ‘যেখানে তার স্বার্থ, সেখানে তিনিই ঠিকাদার।’
২০ কোটি টাকার ভুয়া ভেরিয়েশন: ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘দেশ উন্নয়ন’-এর বিল ছাড় করতে তিনি ২০ কোটি টাকার ভুয়া ভেরিয়েশন দেখিয়ে ২ কোটি টাকা কমিশন নিয়েছেন।
এছাড়া তেজগাঁও বিসিক ভবনের বেজমেন্টে গুরুতর ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘কুশলী নির্মাতা’-কে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ছাড়পত্র দেন। ভুক্তভোগীরা জানান, রাকিবুলকে ৫শতাংশ কমিশন দিয়ে তারা সম্পূর্ণ বিল তুলেছে।
অভিযোগ রয়েছে, তেজগাঁও শিল্প প্লট ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাকিবুল হাসান অন্তত শত কোটি টাকা লোপাট করেছেন। এই অবৈধ অর্থপ্রবাহের মাধ্যমে তিনি ঢাকা, কুমিল্লা ও গাজীপুরে বিলাসবহুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। যার মধ্যে ঢাকায় মূল্যবান জমি ও ফ্ল্যাট, কুমিল্লা শহরে ১০ কাঠা জমি, এবং গাজীপুরে ৩০ একর জমিতে বিলাসবহুল রিসোর্ট নির্মাণ। গুঞ্জন রয়েছে, তিনি সিঙ্গাপুরে কয়েকশো কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করেছেন।
গণপূর্তের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রাকিবুল এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, এখন ওকে না খুশি করে কোনো প্রকল্পই এগোয় না।’
ঠিকাদারদের মানববন্ধন ও কর্তৃপক্ষের অবস্থান:
গত ১০ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে রাকিবুলের বিরুদ্ধে কাজ করা একাধিক ঠিকাদার মানববন্ধন করে তাকে ‘দস্যু প্রকৌশলী’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং তাকে তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান।
এ বিষয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে বলেন, ‘এ ধরনের অনিয়ম কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।’ তিনি প্রতিবেদককে অফিসে এসে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নিতে বলেন।
এ বিষয় কথা বলার জন্য মো. রাকিবুল হাসানের বক্তব্যের জন্য কল করা হলে প্রথমে তিনি কল কেটে দেন। পারে আবার কল করলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বলেন আমি এখন ব্যস্ত আছি পরে কথা বলবো।
এরপর অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখা যায় তিনি সেদিন অনুপস্থিত।
অপর দিকে পদোন্নতির সঙ্গে সঙ্গেই গণপূর্তের ভেতরে বছরের পর বছর চাপা থাকা এই দুর্নীতি, গোপন ঠিকাদারি এবং অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগগুলো এখন ছাইচাপা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের ভিত ভেঙে একজন রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে সত্যিকারের ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা সম্ভব হবে কি না।