সুমন মোস্তফা
৩০ জুন, ২০২৫, 3:45 PM
বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতি বেশ আলোচিত। এতে দলগুলো তাদের মোট ভোটের অনুপাতে আসন পায়, যা ভোটের সঠিক প্রতিফলন নিশ্চিত করে।
পিআর পদ্ধতি কী?
পিআর-এ ভোটগ্রহণ হয় দলভিত্তিক। পুরো দেশ একক ভোট এলাকা হিসেবে গণ্য হয়, ফলে ছোট দল ও সংখ্যালঘুদেরও প্রতিনিধিত্ব মেলে।
পিআর পদ্ধতির সুবিধাসমূহ
সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়: ছোট দলগুলোও পার্লামেন্টে জায়গা পেতে পারে, যার ফলে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বাড়ে।
ভোটের সঠিক প্রতিফলন ঘটে: কোনো ভোট ‘অপ্রয়োজনীয়’ হয় না। যার ফলে ভোটারদের মতামত সংসদে প্রতিফলিত হয়।
সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের প্রতিনিধিত্ব বাড়ে: এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুরা তাদের কণ্ঠস্বর সংসদে তুলে ধরতে পারেন।
রাজনৈতিক আপস ও সংলাপ উৎসাহিত হয়: যেহেতু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কঠিন, তাই দলগুলোর মধ্যে জোট গঠন ও সমঝোতার প্রবণতা বাড়ে। রাজনৈতিক মেরুকরণ কমে আসে।
পিআর পদ্ধতির চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি
সরকার গঠনে জটিলতা: অনেক সময় কোনো দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারে না। জোট গঠন কঠিন হয়ে পড়ে।
নীতিনির্ধারণে ধীরগতি: একাধিক দল মিলে সরকার চালালে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা: জোট ভেঙে গেলে বারবার নির্বাচন দিতে হয়। এতে স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন হয়।
স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হয়: নির্দিষ্ট এলাকার জনগণের সমস্যা সরাসরি সংসদে না পৌঁছাতে পারে।
বিশ্বের যেসব স্থানে পিআর পদ্ধতি চালু আছে?
ইউরোপ: নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, বেলজিয়াম, জার্মানি (আংশিক)
এশিয়া: ইসরায়েল, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল
আফ্রিকা: দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া
লাতিন আমেরিকা: ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা
উত্তর আমেরিকা: আংশিকভাবে কানাডা
পিআর পদ্ধতিতে ইসরায়েল
ইসরায়েল একটি ক্লাসিক উদাহরণ, যেখানে পুরো দেশই একক ভোট এলাকা। যে দল মাত্র ৩.২৫% ভোট পায়, তারাও আসন পায়। এতে ছোট দলগুলো সবসময় সংসদে প্রবেশ করে। কিন্তু এ পদ্ধতির ফলে দেখা দেয় কিছু সমস্যাও—
দুর্বল জোট সরকার: একক দল কখনোই সরকার গঠন করতে পারে না। প্রায়ই জোট ভেঙে যায়, ফলে ঘনঘন নির্বাচন হয়। (২০১৯-২০২২ সালে ৫ বার নির্বাচন!)
ছোট দলের অস্বাভাবিক প্রভাব: ছোট দলগুলো ‘কিং-মেকার’ হয়ে উঠে, বড় দলগুলোকে জিম্মি করে তাদের দাবি আদায় করে নেয়।
নীতিগত স্থবিরতা: নানা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বড় সংস্কার নিতে দেরি হয় বা সম্ভব হয় না।
ধর্মীয় চাপ: ধর্মীয় ছোট দলগুলো আধুনিকতা ও নারী অধিকারের বিরোধিতা করে সরকারে চাপ তৈরি করে।
জনগণের আস্থা হ্রাস: ঘনঘন জোট পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জনগণের মধ্যে আস্থা কমে।
আমাদের জন্য কতটা উপযোগী?
বাংলাদেশে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ও আস্থার সংকট রয়েছে। অনেক দল ভোটে অংশ নেয় না, কেউ কেউ অংশ নিলেও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এমতাবস্থায় পিআর পদ্ধতি কিছু সমাধান দিতে পারে যেমন: অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা, সংখ্যালঘু ও ছোট দলের কণ্ঠস্বর শোনা, রাজনৈতিক মেরুকরণ কিছুটা কমানো।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো একক আধিপত্য ও ব্যক্তি-নির্ভরতায় গড়ে উঠেছে। পিআর পদ্ধতি চালুর আগে প্রয়োজন- রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতা, জোট গঠনের বাস্তব প্রস্তুতি, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা।
পিআর পদ্ধতি নিঃসন্দেহে একটি অংশগ্রহণমূলক ও ন্যায্য নির্বাচন পদ্ধতি। তবে এটি কোনো যাদুর কাঠি নয়। সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সাংবিধানিক সংস্কার ও জনসচেতনতা। বা
দেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে আংশিকভাবে পিআর পদ্ধতির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হতে পারে, যাতে করে ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই ও ন্যায্য নির্বাচনী কাঠামো গড়ে তোলা যায়।
সুমন মোস্তফা
৩০ জুন, ২০২৫, 3:45 PM
বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতি বেশ আলোচিত। এতে দলগুলো তাদের মোট ভোটের অনুপাতে আসন পায়, যা ভোটের সঠিক প্রতিফলন নিশ্চিত করে।
পিআর পদ্ধতি কী?
পিআর-এ ভোটগ্রহণ হয় দলভিত্তিক। পুরো দেশ একক ভোট এলাকা হিসেবে গণ্য হয়, ফলে ছোট দল ও সংখ্যালঘুদেরও প্রতিনিধিত্ব মেলে।
পিআর পদ্ধতির সুবিধাসমূহ
সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়: ছোট দলগুলোও পার্লামেন্টে জায়গা পেতে পারে, যার ফলে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বাড়ে।
ভোটের সঠিক প্রতিফলন ঘটে: কোনো ভোট ‘অপ্রয়োজনীয়’ হয় না। যার ফলে ভোটারদের মতামত সংসদে প্রতিফলিত হয়।
সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের প্রতিনিধিত্ব বাড়ে: এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুরা তাদের কণ্ঠস্বর সংসদে তুলে ধরতে পারেন।
রাজনৈতিক আপস ও সংলাপ উৎসাহিত হয়: যেহেতু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কঠিন, তাই দলগুলোর মধ্যে জোট গঠন ও সমঝোতার প্রবণতা বাড়ে। রাজনৈতিক মেরুকরণ কমে আসে।
পিআর পদ্ধতির চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি
সরকার গঠনে জটিলতা: অনেক সময় কোনো দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারে না। জোট গঠন কঠিন হয়ে পড়ে।
নীতিনির্ধারণে ধীরগতি: একাধিক দল মিলে সরকার চালালে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা: জোট ভেঙে গেলে বারবার নির্বাচন দিতে হয়। এতে স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন হয়।
স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হয়: নির্দিষ্ট এলাকার জনগণের সমস্যা সরাসরি সংসদে না পৌঁছাতে পারে।
বিশ্বের যেসব স্থানে পিআর পদ্ধতি চালু আছে?
ইউরোপ: নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, বেলজিয়াম, জার্মানি (আংশিক)
এশিয়া: ইসরায়েল, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল
আফ্রিকা: দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া
লাতিন আমেরিকা: ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা
উত্তর আমেরিকা: আংশিকভাবে কানাডা
পিআর পদ্ধতিতে ইসরায়েল
ইসরায়েল একটি ক্লাসিক উদাহরণ, যেখানে পুরো দেশই একক ভোট এলাকা। যে দল মাত্র ৩.২৫% ভোট পায়, তারাও আসন পায়। এতে ছোট দলগুলো সবসময় সংসদে প্রবেশ করে। কিন্তু এ পদ্ধতির ফলে দেখা দেয় কিছু সমস্যাও—
দুর্বল জোট সরকার: একক দল কখনোই সরকার গঠন করতে পারে না। প্রায়ই জোট ভেঙে যায়, ফলে ঘনঘন নির্বাচন হয়। (২০১৯-২০২২ সালে ৫ বার নির্বাচন!)
ছোট দলের অস্বাভাবিক প্রভাব: ছোট দলগুলো ‘কিং-মেকার’ হয়ে উঠে, বড় দলগুলোকে জিম্মি করে তাদের দাবি আদায় করে নেয়।
নীতিগত স্থবিরতা: নানা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বড় সংস্কার নিতে দেরি হয় বা সম্ভব হয় না।
ধর্মীয় চাপ: ধর্মীয় ছোট দলগুলো আধুনিকতা ও নারী অধিকারের বিরোধিতা করে সরকারে চাপ তৈরি করে।
জনগণের আস্থা হ্রাস: ঘনঘন জোট পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জনগণের মধ্যে আস্থা কমে।
আমাদের জন্য কতটা উপযোগী?
বাংলাদেশে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ও আস্থার সংকট রয়েছে। অনেক দল ভোটে অংশ নেয় না, কেউ কেউ অংশ নিলেও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এমতাবস্থায় পিআর পদ্ধতি কিছু সমাধান দিতে পারে যেমন: অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা, সংখ্যালঘু ও ছোট দলের কণ্ঠস্বর শোনা, রাজনৈতিক মেরুকরণ কিছুটা কমানো।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো একক আধিপত্য ও ব্যক্তি-নির্ভরতায় গড়ে উঠেছে। পিআর পদ্ধতি চালুর আগে প্রয়োজন- রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতা, জোট গঠনের বাস্তব প্রস্তুতি, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা।
পিআর পদ্ধতি নিঃসন্দেহে একটি অংশগ্রহণমূলক ও ন্যায্য নির্বাচন পদ্ধতি। তবে এটি কোনো যাদুর কাঠি নয়। সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সাংবিধানিক সংস্কার ও জনসচেতনতা। বা
দেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে আংশিকভাবে পিআর পদ্ধতির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হতে পারে, যাতে করে ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই ও ন্যায্য নির্বাচনী কাঠামো গড়ে তোলা যায়।