CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০২ জানুয়ারি, ২০২৬

সন্তানের অপেক্ষায় বার্ধক্য

#
news image

প্রকৃতি এক অদ্ভুত ভারসাম্যের নাম। সকল প্রাণী সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তাদের দায়িত্ব প্রকৃতির উপর সমর্পণ করে, যেমন-পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ এবং অন্যান্য প্রাণী। শুধু মানুষ সন্তান জন্ম দেওয়ার এবং লালন-পালনের পরে তার জীবনের শেষ অধ্যায়ে সন্তানের সান্নিধ্য ও সেবা যত্নের মধ্যে কাটানোর প্রত্যাশা করে। প্রাণীদের ক্ষেত্রে, সেই নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হলে সন্তান নিজস্ব প্রবৃত্তি এবং প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে। বেঁচে থাকা, খাবার জোগাড় করা এবং বিপদ এড়ানোর কৌশল প্রকৃতিই তাদের শেখায়, এবং এই প্রক্রিয়ায় বাব মায়ের সন্তানের নিকট কোনো কিছু চাওয়া পাওয়ার থাকে না। সেখানে কোনো প্রত্যাশা থাকে না, থাকে না অভিযোগ বা ফিরে তাকানোর নীরব আহ্বান। প্রকৃতির এই সরল ও নির্মোহ নিয়মের বাইরে মানুষ গড়ে তুলেছে ভিন্ন এক সামাজিক কাঠামো। মানুষের ক্ষেত্রে সন্তান জন্ম দেওয়া কেবল একটি জৈবিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে লালন পালন, শিক্ষা, মূল্যবোধ গঠন এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা। এভাবে সন্তান হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ মানবিক বিনিয়োগের কেন্দ্রবিন্দু।  আর সেই বিনিয়োগের শেষ প্রান্তে এসে, জীবনের পরিণত বয়সে, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সন্তানের সান্নিধ্য, যত্ন ও মানসিক আশ্রয়ের প্রত্যাশা করে, যা তার কাছে জীবনের স্বাভাবিক ও ন্যায্য পরিণতি বলেই মনে হয়।  এই প্রত্যাশা পূরণ হলে বার্ধক্য জীবনের এক শান্ত ও স্থির অধ্যায়ে পরিণত হয়। কিন্তু এই প্রত্যাশা যখন বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি খুঁজে পায় না, তখনই মানুষের মনে জন্ম নেয় হতাশা, বিষণ্নতা এবং গভীর এক নিঃসঙ্গতা। এই নিঃসঙ্গতা অনেক সময় উচ্চস্বরে প্রকাশ পায় না, শব্দহীনভাবেই বেড়ে ওঠে।

মানুষের প্রত্যাশার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি মানুষের সামাজিক স্বভাবের গভীরে প্রোথিত। বহু সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানী বারবার উল্লেখ করেছেন যে মানুষ মূলত একটি সামাজিক প্রাণী, যার অস্তিত্ব ও বিকাশ নির্ভর করে পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর। পরিবার মানুষের জীবনের প্রথম সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে নিরাপত্তা, ভালোবাসা এবং নিজের পরিচয় সম্পর্কে বোধ তৈরি হয়। সন্তান জন্মের পর থেকেই বাবা মা ধীরে ধীরে নিজেদের চাহিদাকে গৌণ করে সন্তানের প্রয়োজনকে সর্বাগ্রে স্থান দেন। শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিটি প্রচেষ্টার পেছনে নীরবে কাজ করে একটি গভীর প্রত্যাশা, জীবনের শেষ সময়ে সন্তান পাশে থাকবে এবং মানসিক আশ্রয় দেবে। এই প্রত্যাশা সব সময় সরাসরি উচ্চারিত হয় না, কিন্তু সংস্কৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক রীতিনীতির ভেতর দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে এসেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় সমাজে, যেখানে যৌথ পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, সেখানে বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের সেবা ও সান্নিধ্য পাওয়াকে প্রায় স্বাভাবিক ও নীরব এক সামাজিক চুক্তি হিসেবেই দেখা হতো।

সময়ের সঙ্গে বাস্তবতা বদলে গেছে। নগরায়ণ, চাকরি, শিক্ষা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রভাব পরিবার কাঠামোকে পুরোপুরি পরিবর্তন করেছে। একসময়ের পরিচিত যৌথ পরিবার ধীরে ধীরে ভেঙে গিয়ে পরিণত হয়েছে একক পরিবারে। পড়াশোনা কিংবা জীবিকার তাগিদে সন্তানরা গ্রাম ছেড়ে শহরে, আবার শহর ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এই ভৌগোলিক দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে নীরবে বেড়ে উঠছে মানসিক দূরত্বও। গবেষণায় দেখা যায়, আধুনিক সমাজে কর্মজীবী প্রজন্মের ওপর কাজের চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক দায়িত্বের ভার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বহুমাত্রিক চাপের ভেতর অনেক সময় বৃদ্ধ বাবা মায়ের প্রতি যত্ন নেওয়ার প্রবনতা কমে যায় এবং সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণেই বাস্তবসম্মতভাবে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তবু বাস্তবতা যেমনই হোক, প্রত্যাশা অপূর্ণ থেকে গেলে বৃদ্ধ মানুষের মনে ধীরে ধীরে তৈরি হয় গভীর এক শূন্যতা, যা তার জীবনের শেষ প্রান্তকে আরও নিঃসঙ্গ করে তোলে।

বার্ধক্যের এই হতাশা সব সময় দৃশ্যমান হয় না, অনেক ক্ষেত্রে এটি জন্ম নেয় ছোট ছোট অনুভূতির ভেতর দিয়ে। কখনো ফোনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, কখনো দরজার শব্দে অকারণ চমকে ওঠা, আবার উৎসবের দিনে চারপাশের কোলাহলের মাঝেও গভীর নিঃশব্দতা মানুষের মনকে আচ্ছন্ন করে তোলে। সন্তান পাশে না থাকলে অনেক বৃদ্ধ মানুষ ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন এবং মনে মনে ভাবেন, তাহলে এত ত্যাগের মূল্য কোথায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার বৈষম্যজনিত মানসিক চাপ বলা যায়। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা মানসিক বিনিয়োগ যখন প্রত্যাশিত প্রতিদান পায় না, তখন মানুষের আত্মসম্মানবোধে গভীর আঘাত লাগে। অনেক ক্ষেত্রে এই মানসিক চাপ ক্রমে বিষণ্নতার দিকে গড়িয়ে যায়, যা আবার শারীরিক অসুস্থতাকেও ত্বরান্বিত করে এবং বার্ধক্যকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে।

প্রাণী ও মানুষের পার্থক্য আবেগের গভীরতায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রাণীরা সন্তান বড় করে একসময় প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দেয়, কারণ তাদের আবেগের কাঠামো মানুষের মতো জটিল নয়। মানুষের আবেগের ভেতর জমা থাকে স্মৃতি, সেখানে তুলনা তৈরি হয় এবং সেখান থেকেই জন্ম নেয় প্রত্যাশা। মানুষ কেবল বেঁচে থাকার মধ্যেই তৃপ্ত থাকে না, সে তার অস্তিত্বের অর্থ খুঁজে ফেরে। সেই অর্থের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে সন্তান। ফলে সন্তানের দূরত্ব মানুষের কাছে শুধু শারীরিক বিচ্ছেদ হয়ে থাকে না, বরং তা ধীরে ধীরে এক ধরনের অস্তিত্বগত শূন্যতায় রূপ নেয়, যা মানুষের মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করে।

সন্তানের যেমন নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকাও এখানে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক বাস্তবতায় হয়তো সব সন্তান শারীরিকভাবে বাবা মায়ের পাশে থাকা সম্ভব করে তুলতে পারে না, কিন্তু মানসিক সংযোগ বজায় রাখা, নিয়মিত যোগাযোগ করা এবং সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে অনেক বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। একই সঙ্গে সমাজকে বিকল্প ব্যবস্থার কথাও গভীরভাবে ভাবতে হবে। প্রবীণবান্ধব সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলা, মানসিক সহায়তার সুযোগ বৃদ্ধি করা, কমিউনিটি সেন্টার গড়ে তোলা এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার পরিসর তৈরি করা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রবীণকে কোনো বোঝা হিসেবে দেখার পরিবর্তে অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার এক মূল্যবান ভাণ্ডার হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা জরুরি।

প্রকৃতি আমাদের জন্ম দেয়, সমাজ আমাদের মানুষ করে আর পরিবার আমাদের জীবনের মানে নির্মাণ করে দেয়। কিন্তু এই তিনের মাঝখানে মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে প্রত্যাশা বুকে ধারণ করে বেঁচে থাকে। সন্তান জন্ম দিয়ে মানুষ কেবল একটি নতুন জীবনের সূচনা করে না, সে নিজের শেষ সময়ের জন্যও নীরবে এক স্বপ্ন বুনে রাখে। সেই স্বপ্ন যখন বাস্তবতার আঘাতে ভেঙে যায়, তখন যে হতাশার জন্ম হয়, তা কোনো সংখ্যা বা পরিসংখ্যানের কাঠামোয় সম্পূর্ণভাবে ধরা যায় না। তাই প্রশ্নটি কেবল সন্তানের কর্তব্য বা প্রবীণের দাবির সীমায় আবদ্ধ নয়, বরং এটি আমাদের সামষ্টিক মানবিকতার এক গভীর পরীক্ষা। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে বার্ধক্য মানেই নিঃসঙ্গতা নয়, বরং সম্মান, সংযোগ ও সহমর্মিতায় ভরা জীবনের আরেকটি অর্থবহ অধ্যায় হয়ে উঠবে। এই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে, প্রকৃতির নিয়মের বাইরে এসে আমরা মানুষ হিসেবে কতটা মানবিক হতে পেরেছি।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন। 

ড.রাধেশ্যাম সাকার

২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫,  5:09 PM

news image

প্রকৃতি এক অদ্ভুত ভারসাম্যের নাম। সকল প্রাণী সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তাদের দায়িত্ব প্রকৃতির উপর সমর্পণ করে, যেমন-পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ এবং অন্যান্য প্রাণী। শুধু মানুষ সন্তান জন্ম দেওয়ার এবং লালন-পালনের পরে তার জীবনের শেষ অধ্যায়ে সন্তানের সান্নিধ্য ও সেবা যত্নের মধ্যে কাটানোর প্রত্যাশা করে। প্রাণীদের ক্ষেত্রে, সেই নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হলে সন্তান নিজস্ব প্রবৃত্তি এবং প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে। বেঁচে থাকা, খাবার জোগাড় করা এবং বিপদ এড়ানোর কৌশল প্রকৃতিই তাদের শেখায়, এবং এই প্রক্রিয়ায় বাব মায়ের সন্তানের নিকট কোনো কিছু চাওয়া পাওয়ার থাকে না। সেখানে কোনো প্রত্যাশা থাকে না, থাকে না অভিযোগ বা ফিরে তাকানোর নীরব আহ্বান। প্রকৃতির এই সরল ও নির্মোহ নিয়মের বাইরে মানুষ গড়ে তুলেছে ভিন্ন এক সামাজিক কাঠামো। মানুষের ক্ষেত্রে সন্তান জন্ম দেওয়া কেবল একটি জৈবিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে লালন পালন, শিক্ষা, মূল্যবোধ গঠন এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা। এভাবে সন্তান হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ মানবিক বিনিয়োগের কেন্দ্রবিন্দু।  আর সেই বিনিয়োগের শেষ প্রান্তে এসে, জীবনের পরিণত বয়সে, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সন্তানের সান্নিধ্য, যত্ন ও মানসিক আশ্রয়ের প্রত্যাশা করে, যা তার কাছে জীবনের স্বাভাবিক ও ন্যায্য পরিণতি বলেই মনে হয়।  এই প্রত্যাশা পূরণ হলে বার্ধক্য জীবনের এক শান্ত ও স্থির অধ্যায়ে পরিণত হয়। কিন্তু এই প্রত্যাশা যখন বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি খুঁজে পায় না, তখনই মানুষের মনে জন্ম নেয় হতাশা, বিষণ্নতা এবং গভীর এক নিঃসঙ্গতা। এই নিঃসঙ্গতা অনেক সময় উচ্চস্বরে প্রকাশ পায় না, শব্দহীনভাবেই বেড়ে ওঠে।

মানুষের প্রত্যাশার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি মানুষের সামাজিক স্বভাবের গভীরে প্রোথিত। বহু সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানী বারবার উল্লেখ করেছেন যে মানুষ মূলত একটি সামাজিক প্রাণী, যার অস্তিত্ব ও বিকাশ নির্ভর করে পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর। পরিবার মানুষের জীবনের প্রথম সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে নিরাপত্তা, ভালোবাসা এবং নিজের পরিচয় সম্পর্কে বোধ তৈরি হয়। সন্তান জন্মের পর থেকেই বাবা মা ধীরে ধীরে নিজেদের চাহিদাকে গৌণ করে সন্তানের প্রয়োজনকে সর্বাগ্রে স্থান দেন। শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিটি প্রচেষ্টার পেছনে নীরবে কাজ করে একটি গভীর প্রত্যাশা, জীবনের শেষ সময়ে সন্তান পাশে থাকবে এবং মানসিক আশ্রয় দেবে। এই প্রত্যাশা সব সময় সরাসরি উচ্চারিত হয় না, কিন্তু সংস্কৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক রীতিনীতির ভেতর দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে এসেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় সমাজে, যেখানে যৌথ পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, সেখানে বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের সেবা ও সান্নিধ্য পাওয়াকে প্রায় স্বাভাবিক ও নীরব এক সামাজিক চুক্তি হিসেবেই দেখা হতো।

সময়ের সঙ্গে বাস্তবতা বদলে গেছে। নগরায়ণ, চাকরি, শিক্ষা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রভাব পরিবার কাঠামোকে পুরোপুরি পরিবর্তন করেছে। একসময়ের পরিচিত যৌথ পরিবার ধীরে ধীরে ভেঙে গিয়ে পরিণত হয়েছে একক পরিবারে। পড়াশোনা কিংবা জীবিকার তাগিদে সন্তানরা গ্রাম ছেড়ে শহরে, আবার শহর ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এই ভৌগোলিক দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে নীরবে বেড়ে উঠছে মানসিক দূরত্বও। গবেষণায় দেখা যায়, আধুনিক সমাজে কর্মজীবী প্রজন্মের ওপর কাজের চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক দায়িত্বের ভার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বহুমাত্রিক চাপের ভেতর অনেক সময় বৃদ্ধ বাবা মায়ের প্রতি যত্ন নেওয়ার প্রবনতা কমে যায় এবং সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণেই বাস্তবসম্মতভাবে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তবু বাস্তবতা যেমনই হোক, প্রত্যাশা অপূর্ণ থেকে গেলে বৃদ্ধ মানুষের মনে ধীরে ধীরে তৈরি হয় গভীর এক শূন্যতা, যা তার জীবনের শেষ প্রান্তকে আরও নিঃসঙ্গ করে তোলে।

বার্ধক্যের এই হতাশা সব সময় দৃশ্যমান হয় না, অনেক ক্ষেত্রে এটি জন্ম নেয় ছোট ছোট অনুভূতির ভেতর দিয়ে। কখনো ফোনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, কখনো দরজার শব্দে অকারণ চমকে ওঠা, আবার উৎসবের দিনে চারপাশের কোলাহলের মাঝেও গভীর নিঃশব্দতা মানুষের মনকে আচ্ছন্ন করে তোলে। সন্তান পাশে না থাকলে অনেক বৃদ্ধ মানুষ ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন এবং মনে মনে ভাবেন, তাহলে এত ত্যাগের মূল্য কোথায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার বৈষম্যজনিত মানসিক চাপ বলা যায়। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা মানসিক বিনিয়োগ যখন প্রত্যাশিত প্রতিদান পায় না, তখন মানুষের আত্মসম্মানবোধে গভীর আঘাত লাগে। অনেক ক্ষেত্রে এই মানসিক চাপ ক্রমে বিষণ্নতার দিকে গড়িয়ে যায়, যা আবার শারীরিক অসুস্থতাকেও ত্বরান্বিত করে এবং বার্ধক্যকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে।

প্রাণী ও মানুষের পার্থক্য আবেগের গভীরতায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রাণীরা সন্তান বড় করে একসময় প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দেয়, কারণ তাদের আবেগের কাঠামো মানুষের মতো জটিল নয়। মানুষের আবেগের ভেতর জমা থাকে স্মৃতি, সেখানে তুলনা তৈরি হয় এবং সেখান থেকেই জন্ম নেয় প্রত্যাশা। মানুষ কেবল বেঁচে থাকার মধ্যেই তৃপ্ত থাকে না, সে তার অস্তিত্বের অর্থ খুঁজে ফেরে। সেই অর্থের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে সন্তান। ফলে সন্তানের দূরত্ব মানুষের কাছে শুধু শারীরিক বিচ্ছেদ হয়ে থাকে না, বরং তা ধীরে ধীরে এক ধরনের অস্তিত্বগত শূন্যতায় রূপ নেয়, যা মানুষের মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করে।

সন্তানের যেমন নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকাও এখানে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক বাস্তবতায় হয়তো সব সন্তান শারীরিকভাবে বাবা মায়ের পাশে থাকা সম্ভব করে তুলতে পারে না, কিন্তু মানসিক সংযোগ বজায় রাখা, নিয়মিত যোগাযোগ করা এবং সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে অনেক বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। একই সঙ্গে সমাজকে বিকল্প ব্যবস্থার কথাও গভীরভাবে ভাবতে হবে। প্রবীণবান্ধব সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলা, মানসিক সহায়তার সুযোগ বৃদ্ধি করা, কমিউনিটি সেন্টার গড়ে তোলা এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার পরিসর তৈরি করা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রবীণকে কোনো বোঝা হিসেবে দেখার পরিবর্তে অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার এক মূল্যবান ভাণ্ডার হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা জরুরি।

প্রকৃতি আমাদের জন্ম দেয়, সমাজ আমাদের মানুষ করে আর পরিবার আমাদের জীবনের মানে নির্মাণ করে দেয়। কিন্তু এই তিনের মাঝখানে মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে প্রত্যাশা বুকে ধারণ করে বেঁচে থাকে। সন্তান জন্ম দিয়ে মানুষ কেবল একটি নতুন জীবনের সূচনা করে না, সে নিজের শেষ সময়ের জন্যও নীরবে এক স্বপ্ন বুনে রাখে। সেই স্বপ্ন যখন বাস্তবতার আঘাতে ভেঙে যায়, তখন যে হতাশার জন্ম হয়, তা কোনো সংখ্যা বা পরিসংখ্যানের কাঠামোয় সম্পূর্ণভাবে ধরা যায় না। তাই প্রশ্নটি কেবল সন্তানের কর্তব্য বা প্রবীণের দাবির সীমায় আবদ্ধ নয়, বরং এটি আমাদের সামষ্টিক মানবিকতার এক গভীর পরীক্ষা। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে বার্ধক্য মানেই নিঃসঙ্গতা নয়, বরং সম্মান, সংযোগ ও সহমর্মিতায় ভরা জীবনের আরেকটি অর্থবহ অধ্যায় হয়ে উঠবে। এই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে, প্রকৃতির নিয়মের বাইরে এসে আমরা মানুষ হিসেবে কতটা মানবিক হতে পেরেছি।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।