CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০২ জানুয়ারি, ২০২৬

অস্থির সমাজে প্রশান্তির সন্ধানে কৃষিকাজ

#
news image

মানুষের মন আজ অস্থির, ক্লান্ত এবং দিশাহারা। চারপাশের সমাজ যেন এক অমান্ত দৌড়ের ভেতর আটকে আছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সামাজিক বিভাজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এক গভীর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই সংঘাত, সহিংসতা, অবিশ্বাস আর হতাশার খবর মানুষের মনে ভার জমিয়ে তোলে। এই অবিরাম উত্তেজনার ভেতর মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের শান্তি হারিয়ে ফেলছে। বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ থাকলেও মন যেন বিশ্রাম নিতে জানে না। এই অস্থির, অমান্ত সমাজে দাঁড়িয়ে মানুষ এখন শান্তি ও স্বস্তির একটি নির্ভরযোগ্য আশ্রয় খুঁজছে।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, এক সময় মানুষের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মাটি, কৃষি এবং প্রকৃতি। জীবন তখন ধীর ছিল, প্রত্যাশা সীমিত হলেও মানুষের মন স্থির ও প্রশান্তিতে ভরা ছিল। প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাই ছিল জীবনের স্বাভাবিক গতি। আজকের ব্যস্ত, উৎকণ্ঠায় ভরা সমাজে দাঁড়িয়ে রামপ্রসাদ সেনের সেই অমর পঙক্তি, “মন রে কৃষিকাজ জান না, এমন মানব-জমিন রলো পতিত, আবাদ করলে ফলতো সোণা” গভীর অর্থ বহন করে। মনে হয়, এটি শুধু কৃষিকাজ না জানার আক্ষেপ নয়, বরং মানুষের নিজের মনকে না চেনার বেদনাও প্রকাশ করে। মাটির সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে মানুষ যেন নিজের ভেতরের ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেছে। কৃষিকাজ এখানে একটি দর্শনের প্রতীক হয়ে ওঠে, যা মানুষকে ধৈর্য, স্থিরতা এবং স্বস্তির পথে ফিরিয়ে আনে।  এভাবে রবীন্দ্রনাথের গান “ফিরে চল, ফিরে চল, ফিরে চল মাটির টানে, যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে” এ লাইনও একই অনুভূতি জাগায়। এই গানটি যেমন মাটির টানে ফিরে যাওয়ার পানে আকৃষ্ট করে, তেমনি মনে করিয়ে দেয় আমাদের অন্তরের গভীর শিকড় ও  প্রকৃতির সান্নিধ্য এবং মাটির প্রতি গভীর টান, যা প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ ফিরে পেলে মানুষের মন শান্তি ও স্থিরতা পায়। এভাবে অসংখ্য কবি-সাধকের কথা মিলিয়ে আমরা বুঝতে পারি যে কৃষিকাজ কেবল জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি মানুষের মনকে প্রশান্তি এবং স্বস্তি প্রদান করে, যা আজকের অস্থির সমাজে অত্যন্ত প্রয়োজন।

রাজনৈতিক অস্থিরতা আধুনিক মানুষের মানসিক নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি নড়বড়ে করে দেয়। ক্ষমতার পালাবদল, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক এবং আদর্শিক সংঘাত সাধারণ মানুষের মনে অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়। রাজনীতি যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন মন ভরে ওঠে হতাশা ও ক্ষোভে। এই অবস্থায় কৃষিকাজ মানুষের জন্য এক নীরব আশ্রয়ের মতো কাজ করে। মাটির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ, বীজ বোনা, গাছের যত্ন নেওয়া এবং প্রকৃতির ছন্দে সময় কাটানো মানুষের মনকে ধীরে ধীরে স্থির করে। কৃষি কোনো বক্তব্য বা স্লোগানের ওপর নির্ভর করে না। এটি প্রকৃতির নিয়মে চলে। এখানে পরিশ্রমের সঙ্গে ফলের একটি সরল সম্পর্ক রয়েছে। এই সরলতা মানুষের মনে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রায়ই হারিয়ে যায়।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক শান্তির সবচেয়ে বড় শত্রু। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় মানুষের মনকে সর্বক্ষণ অস্থির করে রাখে। শহুরে জীবনে মানুষ প্রায়ই ভবিষ্যতের চিন্তায় বর্তমানকে হারিয়ে ফেলে। আগামী মাস, আগামী বছর কিংবা আগামী পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে ভাবতেই জীবনের আজকের মুহূর্তটি ফসকে যায়। কৃষিকাজ মানুষকে ভিন্ন এক শিক্ষা দেয়। এটি মানুষকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে শেখায়। আজ জমি প্রস্তুত করতে হবে, আজ গাছের যত্ন নিতে হবে, আজ বীজ বুনতে হবে। এই আজকে মনোযোগ দেওয়া মানেই মানসিক স্থিরতার পথে এগোনো। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝেও কৃষি মানুষকে শেখায় কীভাবে বর্তমানকে ধারণ করে শান্ত থাকা যায়।

কৃষিকাজ কেবল পেশা নয়, এটি এক ধরনের মানসিক সাধনা। বীজ বোনার সময় কেউ জানে না ফলন কেমন হবে। তবু কৃষক আশাবাদী থাকে এবং নিয়মিত পরিচর্যা চালিয়ে যায়। এই অপেক্ষা এবং ধৈর্য মানুষের মনের জন্য এক অনন্য প্রশিক্ষণ। আধুনিক সমাজ মানুষকে দ্রুত ফল পাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত করে তুলেছে। ফল না পেলে হতাশা, রাগ এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট দেখা দেয়। কৃষি এই তাড়াহুড়োর সংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে ধীরে চলার শিক্ষা দেয়। এই ধীরতাই মানসিক প্রশান্তির মূল চাবিকাঠি। লালন ফকির মানুষের অন্তর্জগতের দিকে তাকাতে শেখান। তাঁর কথায় পাওয়া যায় আত্মপরিচয়ের গভীর আহ্বান। মানুষ ভেতরের মানুষকে না চিনে বাইরের দুনিয়ায় শান্তি খোঁজে। কৃষিকাজ মানুষকে সেই ভেতরের মানুষটির দিকে ফিরিয়ে নেয়।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গভীর এবং চিরন্তন। বৈজ্ঞানিক গবেষণাও দেখিয়েছে যে প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকা মানুষের মানসিক চাপ কমায়, মনোযোগ বাড়ায় এবং বিষণ্নতার ঝুঁকি হ্রাস করে। সবুজ গাছ, খোলা আকাশ এবং মাটির গন্ধ মানুষের মনে স্বস্তির বার্তা পাঠায়। শহরের কংক্রিট, শব্দ ও ভিড়ের মধ্যে এই শান্তি সহজে পাওয়া যায় না। কৃষিকাজ মানুষকে আবার সেই প্রাকৃতিক ছন্দে ফিরিয়ে আনে, যেখানে মন নিজেই নিজেকে সামলে নিতে শেখে। রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে দেখেছেন মানুষের মুক্তির পথ হিসেবে। তাঁর লেখায় বারবার ফিরে আসে এই সত্য যে প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ হারালে মানুষ নিজের সত্তাকেই হারায়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক চাপ মানুষকে একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেয়। সবাই যখন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। কৃষিভিত্তিক জীবনে এই চিত্র ভিন্ন। মাঠে একসঙ্গে কাজ করা, ফসল নিয়ে আলোচনা করা কিংবা বিপদের সময় একে অপরের পাশে দাঁড়ানো মানুষের মধ্যে গভীর সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলে। এই বন্ধন মানসিক শক্তির বড় উৎস। একা না থাকার অনুভূতি মানুষের চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

কৃষিকাজ মানুষের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করে। নিজের হাতে উৎপাদিত খাদ্য মানুষকে ভোক্তা থেকে স্রষ্টার জায়গায় দাঁড় করায়। বাজারনির্ভর জীবনে মানুষ প্রায় সবকিছুর জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভরশীলতা মানসিকভাবে দুর্বল করে। কৃষি মানুষকে শেখায় যে সে নিজেও কিছু সৃষ্টি করতে পারে। এই সৃষ্টির আনন্দ মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা এবং উদ্দেশ্যহীনতা বাড়ছে। কৃষি তাদের শেখাতে পারে ব্যর্থতা মেনে নেওয়া এবং নতুন করে শুরু করার সাহস।

শহরে কৃষিকাজের পূর্ণ রূপ ফিরিয়ে আনা কঠিন হলেও তার দর্শন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ছাদবাগান, আঙিনার গাছ বা কমিউনিটি গার্ডেন মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক পুনর্গড়ে তোলে। একটি গাছের যত্ন নেওয়া মানুষকে দায়িত্বশীল করে এবং মনকে ইতিবাচক কাজে ব্যস্ত রাখে। একটি নতুন পাতা গজানোর দৃশ্য মানুষের মনে আশার আলো জ্বালায়।

কৃষি জীবনের প্রতীক। এখানে সাফল্য আছে, ব্যর্থতা আছে এবং আবার শুরু করার সুযোগও আছে। ফসল নষ্ট হলেও পরের মৌসুমে নতুন বীজ বোনা যায়। এই বিশ্বাস মানুষের মনকে দৃঢ় করে। রাষ্ট্র বা অর্থনীতি মানুষকে হতাশ করলেও কৃষি মনে করিয়ে দেয় জীবনের প্রবাহ থেমে থাকে না। সবশেষে বলা যায়, অস্থির ও অমান্ত সমাজে শান্তি ও স্বস্তিতে থাকার জন্য কৃষিকাজে মনোনিবেশ করলে প্রশান্তি ও স্বাস্থ্যপূর্ণ জীবনযাপন সম্ভব। মাটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানুষ শুধু জীবিকার পথই খুঁজে পায় না, নিজের ভেতরের স্থিরতাকেও আবিষ্কার করে। মাটির কাছে ফিরে মানুষ আসলে নিজের কাছেই ফিরে আসে। এই ফিরে আসাই আজকের অস্থির সময়ে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন। 

ড. রাধেশ্যাম সরকার

২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫,  3:44 PM

news image

মানুষের মন আজ অস্থির, ক্লান্ত এবং দিশাহারা। চারপাশের সমাজ যেন এক অমান্ত দৌড়ের ভেতর আটকে আছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সামাজিক বিভাজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এক গভীর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই সংঘাত, সহিংসতা, অবিশ্বাস আর হতাশার খবর মানুষের মনে ভার জমিয়ে তোলে। এই অবিরাম উত্তেজনার ভেতর মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের শান্তি হারিয়ে ফেলছে। বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ থাকলেও মন যেন বিশ্রাম নিতে জানে না। এই অস্থির, অমান্ত সমাজে দাঁড়িয়ে মানুষ এখন শান্তি ও স্বস্তির একটি নির্ভরযোগ্য আশ্রয় খুঁজছে।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, এক সময় মানুষের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মাটি, কৃষি এবং প্রকৃতি। জীবন তখন ধীর ছিল, প্রত্যাশা সীমিত হলেও মানুষের মন স্থির ও প্রশান্তিতে ভরা ছিল। প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাই ছিল জীবনের স্বাভাবিক গতি। আজকের ব্যস্ত, উৎকণ্ঠায় ভরা সমাজে দাঁড়িয়ে রামপ্রসাদ সেনের সেই অমর পঙক্তি, “মন রে কৃষিকাজ জান না, এমন মানব-জমিন রলো পতিত, আবাদ করলে ফলতো সোণা” গভীর অর্থ বহন করে। মনে হয়, এটি শুধু কৃষিকাজ না জানার আক্ষেপ নয়, বরং মানুষের নিজের মনকে না চেনার বেদনাও প্রকাশ করে। মাটির সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে মানুষ যেন নিজের ভেতরের ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেছে। কৃষিকাজ এখানে একটি দর্শনের প্রতীক হয়ে ওঠে, যা মানুষকে ধৈর্য, স্থিরতা এবং স্বস্তির পথে ফিরিয়ে আনে।  এভাবে রবীন্দ্রনাথের গান “ফিরে চল, ফিরে চল, ফিরে চল মাটির টানে, যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে” এ লাইনও একই অনুভূতি জাগায়। এই গানটি যেমন মাটির টানে ফিরে যাওয়ার পানে আকৃষ্ট করে, তেমনি মনে করিয়ে দেয় আমাদের অন্তরের গভীর শিকড় ও  প্রকৃতির সান্নিধ্য এবং মাটির প্রতি গভীর টান, যা প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ ফিরে পেলে মানুষের মন শান্তি ও স্থিরতা পায়। এভাবে অসংখ্য কবি-সাধকের কথা মিলিয়ে আমরা বুঝতে পারি যে কৃষিকাজ কেবল জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি মানুষের মনকে প্রশান্তি এবং স্বস্তি প্রদান করে, যা আজকের অস্থির সমাজে অত্যন্ত প্রয়োজন।

রাজনৈতিক অস্থিরতা আধুনিক মানুষের মানসিক নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি নড়বড়ে করে দেয়। ক্ষমতার পালাবদল, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক এবং আদর্শিক সংঘাত সাধারণ মানুষের মনে অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়। রাজনীতি যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন মন ভরে ওঠে হতাশা ও ক্ষোভে। এই অবস্থায় কৃষিকাজ মানুষের জন্য এক নীরব আশ্রয়ের মতো কাজ করে। মাটির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ, বীজ বোনা, গাছের যত্ন নেওয়া এবং প্রকৃতির ছন্দে সময় কাটানো মানুষের মনকে ধীরে ধীরে স্থির করে। কৃষি কোনো বক্তব্য বা স্লোগানের ওপর নির্ভর করে না। এটি প্রকৃতির নিয়মে চলে। এখানে পরিশ্রমের সঙ্গে ফলের একটি সরল সম্পর্ক রয়েছে। এই সরলতা মানুষের মনে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রায়ই হারিয়ে যায়।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক শান্তির সবচেয়ে বড় শত্রু। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় মানুষের মনকে সর্বক্ষণ অস্থির করে রাখে। শহুরে জীবনে মানুষ প্রায়ই ভবিষ্যতের চিন্তায় বর্তমানকে হারিয়ে ফেলে। আগামী মাস, আগামী বছর কিংবা আগামী পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে ভাবতেই জীবনের আজকের মুহূর্তটি ফসকে যায়। কৃষিকাজ মানুষকে ভিন্ন এক শিক্ষা দেয়। এটি মানুষকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে শেখায়। আজ জমি প্রস্তুত করতে হবে, আজ গাছের যত্ন নিতে হবে, আজ বীজ বুনতে হবে। এই আজকে মনোযোগ দেওয়া মানেই মানসিক স্থিরতার পথে এগোনো। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝেও কৃষি মানুষকে শেখায় কীভাবে বর্তমানকে ধারণ করে শান্ত থাকা যায়।

কৃষিকাজ কেবল পেশা নয়, এটি এক ধরনের মানসিক সাধনা। বীজ বোনার সময় কেউ জানে না ফলন কেমন হবে। তবু কৃষক আশাবাদী থাকে এবং নিয়মিত পরিচর্যা চালিয়ে যায়। এই অপেক্ষা এবং ধৈর্য মানুষের মনের জন্য এক অনন্য প্রশিক্ষণ। আধুনিক সমাজ মানুষকে দ্রুত ফল পাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত করে তুলেছে। ফল না পেলে হতাশা, রাগ এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট দেখা দেয়। কৃষি এই তাড়াহুড়োর সংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে ধীরে চলার শিক্ষা দেয়। এই ধীরতাই মানসিক প্রশান্তির মূল চাবিকাঠি। লালন ফকির মানুষের অন্তর্জগতের দিকে তাকাতে শেখান। তাঁর কথায় পাওয়া যায় আত্মপরিচয়ের গভীর আহ্বান। মানুষ ভেতরের মানুষকে না চিনে বাইরের দুনিয়ায় শান্তি খোঁজে। কৃষিকাজ মানুষকে সেই ভেতরের মানুষটির দিকে ফিরিয়ে নেয়।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গভীর এবং চিরন্তন। বৈজ্ঞানিক গবেষণাও দেখিয়েছে যে প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকা মানুষের মানসিক চাপ কমায়, মনোযোগ বাড়ায় এবং বিষণ্নতার ঝুঁকি হ্রাস করে। সবুজ গাছ, খোলা আকাশ এবং মাটির গন্ধ মানুষের মনে স্বস্তির বার্তা পাঠায়। শহরের কংক্রিট, শব্দ ও ভিড়ের মধ্যে এই শান্তি সহজে পাওয়া যায় না। কৃষিকাজ মানুষকে আবার সেই প্রাকৃতিক ছন্দে ফিরিয়ে আনে, যেখানে মন নিজেই নিজেকে সামলে নিতে শেখে। রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে দেখেছেন মানুষের মুক্তির পথ হিসেবে। তাঁর লেখায় বারবার ফিরে আসে এই সত্য যে প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ হারালে মানুষ নিজের সত্তাকেই হারায়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক চাপ মানুষকে একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেয়। সবাই যখন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। কৃষিভিত্তিক জীবনে এই চিত্র ভিন্ন। মাঠে একসঙ্গে কাজ করা, ফসল নিয়ে আলোচনা করা কিংবা বিপদের সময় একে অপরের পাশে দাঁড়ানো মানুষের মধ্যে গভীর সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলে। এই বন্ধন মানসিক শক্তির বড় উৎস। একা না থাকার অনুভূতি মানুষের চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

কৃষিকাজ মানুষের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করে। নিজের হাতে উৎপাদিত খাদ্য মানুষকে ভোক্তা থেকে স্রষ্টার জায়গায় দাঁড় করায়। বাজারনির্ভর জীবনে মানুষ প্রায় সবকিছুর জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভরশীলতা মানসিকভাবে দুর্বল করে। কৃষি মানুষকে শেখায় যে সে নিজেও কিছু সৃষ্টি করতে পারে। এই সৃষ্টির আনন্দ মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা এবং উদ্দেশ্যহীনতা বাড়ছে। কৃষি তাদের শেখাতে পারে ব্যর্থতা মেনে নেওয়া এবং নতুন করে শুরু করার সাহস।

শহরে কৃষিকাজের পূর্ণ রূপ ফিরিয়ে আনা কঠিন হলেও তার দর্শন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ছাদবাগান, আঙিনার গাছ বা কমিউনিটি গার্ডেন মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক পুনর্গড়ে তোলে। একটি গাছের যত্ন নেওয়া মানুষকে দায়িত্বশীল করে এবং মনকে ইতিবাচক কাজে ব্যস্ত রাখে। একটি নতুন পাতা গজানোর দৃশ্য মানুষের মনে আশার আলো জ্বালায়।

কৃষি জীবনের প্রতীক। এখানে সাফল্য আছে, ব্যর্থতা আছে এবং আবার শুরু করার সুযোগও আছে। ফসল নষ্ট হলেও পরের মৌসুমে নতুন বীজ বোনা যায়। এই বিশ্বাস মানুষের মনকে দৃঢ় করে। রাষ্ট্র বা অর্থনীতি মানুষকে হতাশ করলেও কৃষি মনে করিয়ে দেয় জীবনের প্রবাহ থেমে থাকে না। সবশেষে বলা যায়, অস্থির ও অমান্ত সমাজে শান্তি ও স্বস্তিতে থাকার জন্য কৃষিকাজে মনোনিবেশ করলে প্রশান্তি ও স্বাস্থ্যপূর্ণ জীবনযাপন সম্ভব। মাটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানুষ শুধু জীবিকার পথই খুঁজে পায় না, নিজের ভেতরের স্থিরতাকেও আবিষ্কার করে। মাটির কাছে ফিরে মানুষ আসলে নিজের কাছেই ফিরে আসে। এই ফিরে আসাই আজকের অস্থির সময়ে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।