CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের দ্বন্দ্ব!

#
news image

‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটির ব্যাস বাক্য হলো ‘বিশ্ব বিদ্যার আলয়’। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করতে পারে। ১৯২১ সালে দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের ধারণা আছে। আজকের আলোচনার বিষয় এটি নয়!
দীর্ঘ ১২ বছর প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় সম্পন্ন করে একজন শিক্ষার্থী হাজারো রাত জাগা পরিশ্রম আর প্রবল আকাক্সিক্ষত স্বপ্ন হৃদয়ে ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় পা রাখে, নিজের ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট বিষয়ে পেশাদারি ও সৃজনশীল জ্ঞান দেওয়া। নতুন জ্ঞান উদ্ভাবন ও বিদ্যমান জ্ঞান উন্নত করা এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বৃদ্ধি করা। যেখানে শিক্ষার্থীকে দেশের মেধাবী এবং প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়। তা হলে এত এত পরিশ্রম করে একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় আসার পরে কেন তুচ্ছ সব ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সঙ্গে নানা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এর জন্য মূলত দায়ী কে? আসলেই কী শিক্ষার্থী? স্থানীয় জনগণ? দেশের শিক্ষাব্যবস্থা? দেশের প্রশাসনিক কাঠামো? নাকি আমাদের মানসিকতা?
বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। সাধারণত ক্যাম্পাসগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয় শহর এরিয়ার কিছুটা বাইরে, যেন কোলাহলমুক্ত পরিবেশে শিক্ষা ও গবেষণা পরিচালনা করতে পারে। সেখানে জমির দাম কমসহ বৃহৎ একটি ক্যাম্পাস পাওয়া সহজ হয়। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একটি এলাকায় ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা পরবর্তী সময়ে সে এলাকায় নানা ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। যা সে এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। এ ক্ষেত্রে একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থানীয় জনগণ নানাভাবে উপকৃত হয়- বিশেষত সেখানে সামাজিক সচেতনতা ও শিক্ষার হার বৃদ্ধি পায়। শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্তার ঘটার পাশাপাশি স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা পরোক্ষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিধা পায়। জমির মূল্যবৃদ্ধি ও আর্থিক উন্নতি, সড়ক, বিদ্যুৎ, পানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটে। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য হওয়া, স্থানীয় সংস্কৃতি জাতীয় পরিসরে পরিচিতি পাওয়া, ব্যাংক, হাসপাতাল, বাজারসহ আধুনিক সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। যেমন- মেস, দোকান, টিউশনি ইত্যাদি। স্থানীয় কৃষিপণ্যের বাজার চাহিদা বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যবসা সম্প্রসারণ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটে, নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়। স্থানীয়রা জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষাবিদ, গবেষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। ছোট ব্যবসা, যেমন- দোকান, রেস্টুরেন্ট, হোস্টেল ইত্যাদি গড়ে ওঠে। এককথায় এলাকার সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পরিবর্তন সাধিত হয়। আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখি স্থানীয় জনগণ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বাঁকা চোখে দেখে থাকেন। স্থানীয়দের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের অনেক কারণ যদি খতিয়ে দেখা হয় তা হলে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণ পাওয়া যায়। যেমন- সংঘর্ষগুলোর পেছনে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকে। সামাজিক কারণের ভেতর জড়িত আছে একে অন্যকে অবমূল্যায়ন করা। স্থানীয়রা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আধিপত্যবাদী মনে করেন। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় হোটেল-রেস্তোরাঁ, কাঁচাবাজার ও বিপণিবিতানকে কেন্দ্র করে বেশ বড় একটি অর্থনৈতিক চাকা চলমান থাকে। বিভিন্ন সময়ে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের বিবাদে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। স্থানীয়রা মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মালিক তারা, আর শিক্ষার্থীরা এখানে শরণার্থী। এই যে অবিশ্বাস, ভাড়া, ব্যবসায়িক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব। অনেক ক্ষেত্রে তাদের জমি অধিগ্রহণে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ না পাওয়াসহ নানা কারণে একটি অজানা দূরত্ব থেকে যায়। তাই তাদের প্রচেষ্টা থাকে তাদের হাতে যতটুকু সুযোগ আছে, তার পুরোটা দিয়ে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে রাখতে! যার ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝেও এক ধরনের চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রথম শ্রেণির নাগরিক মনে করে কোনো আইন কেয়ার না করার মানসিকতা তৈরি হয়। কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের স্থানীয় আইন ও সামাজিক নীতির প্রতি অবহেলা ও অমান্য সংঘর্ষ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও প্রকৃত সত্য। ২০১৯ সালে ক্যাম্পাসে প্রথম পদার্পণ করে ক্যাম্পাসের ভেতরেই একটি দোকানে তিন বন্ধু মিলে মজা করে মিষ্টি জর্দা দিয়ে পান খেয়েছিলাম। আমাদের অপরাধ ছিল খাওয়ার আগে এর মূল্য জেনে না নেওয়া! ফলে দেখা যায়, পান খাওয়া শেষে সাধারণ একটি পানের মূল্য ১০১ টাকা করে গুনতে হয়! যা দেশের ঢাকা শহর থেকে সবখানে ৫-১০ টাকা। এটি সাধারণ ছোট্ট একটি উদাহরণ মাত্র! এমনই অগণিত ঘটনার স্বীকার হয় প্রতিটি শিক্ষার্থী! যা তাদের মনে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুপ্ত এক ধরনের চাপা ক্ষোভ পুষে রাখে! ফলে সুযোগ পাওয়া মাত্রই ছোটখাটো যেকোনো সংঘাত বৃহৎ রূপ লাভ করে! যদিও আমরা দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়ের সংঘর্ষের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনা আমরা পর্যালোচনা করে দেখতে পাই গত ৩০-৩১ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী নিরাপত্তাকর্মী বিতর্ক থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষে প্রায় ৬০-৪০০ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আহত হন। এদিকে একই সময়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ৩১ আগস্ট পৌনে ৮টার দিকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, এতে দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ ছাড়াও আমরা বিভিন্ন সময়ে দেশের প্রায় সব প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের সংঘাতের ঘটনা দেখি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) গত ২৯ এপ্রিল ‘রোড দুর্ঘটনাবিরোধী’ আন্দোলনের সময় বাসে হামলা ও উত্ত্যক্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থী আহত। ২০২২ সালে নিউমার্কেট-ঢাকা কলেজ ছাত্রদের সঙ্গে দোকানিদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৩ সালের ১৩ জুন মোবাইল দোকানদারদের হামলায় পাঁচজন জাবি শিক্ষার্থী আহত হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়তে এ বছরের ৩-৪ মার্চ কথাকাটাকাটির জেরে স্থানীয়দের হামলায় কমপক্ষে ৭-৮ জন জবি শিক্ষার্থী আহত ও ৮-৯ আগস্ট সদরঘাটে লঞ্চের স্টাফদের সঙ্গে সংঘর্ষে জবি শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে ৯ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। কুয়েটে ২০২৫ সালে বড় সহিংসতা ঘটে, ছাত্ররাজনীতি বিষয়ক সংঘর্ষে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়দের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। এদিকে ২০২২ সালে গোবিপ্রবিতে শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের হামলা ও ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ২০২২ সালের ২৪ মার্চ রাতে স্থানীয়দের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা থেকে ২০ শিক্ষার্থী আহত হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৩ সালের ১১-১২ মার্চ বাস-বিবাদে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের সংঘর্ষে ২০০-৩০০ জন আহত হয়। এ ছাড়া দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই এসব ঘটনা ঘটছে নিয়মিতভাবে। এ সমস্যা বা সংকট যাই বলি না কেন, এ বিষয়ের সমাধানকল্পে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ সময় স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে না, এমনকি প্রতিটি ঘটনার সময় দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেরিতে হস্তক্ষেপ করে, ফলে সংঘর্ষ বড় আকার নেয়। এতে দূরত্ব বাড়ে! এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় বৈঠক করা। স্থানীয়দের জন্য কমিউনিটি সাপোর্ট ডেস্ক স্থাপন। হোস্টেল বা মেস ভাড়া নির্ধারণে যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়ন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা কর্মশালা। সংঘর্ষ নির্মূলে সালিশি কমিটি গঠন। রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে নিরপেক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের মাঝে সচেতনতা গড়ে তুলতে নানামুখি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল শিক্ষার জায়গা নয়, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের কেন্দ্র। স্থানীয় জনগণ সঠিকভাবে সম্পৃক্ত হলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায়। শিক্ষার্থীরাও স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সমাজ থেকে শেখার সুযোগ পায়, যা তাদের মানবিক ও বাস্তবমুখী করে তোলে। এতে সর্বপ্রথম উভয় পক্ষের নিজ নিজ জায়গা থেকে মানসিক চিন্তা-চেতনার উন্নতিই পারে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে। এই দ্বন্দ্বগুলো আসলে ‘অপব্যবস্থাপনা’র ফল, মৌলিক বৈরিতা নয়। যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণ, নিয়মিত আলোচনার প্ল্যাটফর্ম এবং যৌথ সামাজিক উদ্যোগ নেয়, তা হলে সংঘর্ষ প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। এ ছাড়া শিক্ষার্থী ও স্থানীয় উভয়ের মাঝে প্রয়োজন সৌহার্দপূর্ণ মনোভাবের। তা হলেই কেবল স্থানীয় জনগণের সম্পর্ককে ‘সহযোগিতার মডেল’ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, যেখানে শিক্ষার্থী-শিক্ষক-প্রশাসন-স্থানীয় সবাই যেমন লাভবান হবে, তেমনি সুস্থ, সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথ সুগম হবে। আমরা সেদিনেরই স্বপ্ন দেখি!

আবু তালহা আকাশ

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫,  4:19 PM

news image

‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটির ব্যাস বাক্য হলো ‘বিশ্ব বিদ্যার আলয়’। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করতে পারে। ১৯২১ সালে দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের ধারণা আছে। আজকের আলোচনার বিষয় এটি নয়!
দীর্ঘ ১২ বছর প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় সম্পন্ন করে একজন শিক্ষার্থী হাজারো রাত জাগা পরিশ্রম আর প্রবল আকাক্সিক্ষত স্বপ্ন হৃদয়ে ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় পা রাখে, নিজের ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট বিষয়ে পেশাদারি ও সৃজনশীল জ্ঞান দেওয়া। নতুন জ্ঞান উদ্ভাবন ও বিদ্যমান জ্ঞান উন্নত করা এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বৃদ্ধি করা। যেখানে শিক্ষার্থীকে দেশের মেধাবী এবং প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়। তা হলে এত এত পরিশ্রম করে একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় আসার পরে কেন তুচ্ছ সব ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সঙ্গে নানা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এর জন্য মূলত দায়ী কে? আসলেই কী শিক্ষার্থী? স্থানীয় জনগণ? দেশের শিক্ষাব্যবস্থা? দেশের প্রশাসনিক কাঠামো? নাকি আমাদের মানসিকতা?
বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। সাধারণত ক্যাম্পাসগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয় শহর এরিয়ার কিছুটা বাইরে, যেন কোলাহলমুক্ত পরিবেশে শিক্ষা ও গবেষণা পরিচালনা করতে পারে। সেখানে জমির দাম কমসহ বৃহৎ একটি ক্যাম্পাস পাওয়া সহজ হয়। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একটি এলাকায় ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা পরবর্তী সময়ে সে এলাকায় নানা ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। যা সে এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। এ ক্ষেত্রে একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থানীয় জনগণ নানাভাবে উপকৃত হয়- বিশেষত সেখানে সামাজিক সচেতনতা ও শিক্ষার হার বৃদ্ধি পায়। শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্তার ঘটার পাশাপাশি স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা পরোক্ষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিধা পায়। জমির মূল্যবৃদ্ধি ও আর্থিক উন্নতি, সড়ক, বিদ্যুৎ, পানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটে। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য হওয়া, স্থানীয় সংস্কৃতি জাতীয় পরিসরে পরিচিতি পাওয়া, ব্যাংক, হাসপাতাল, বাজারসহ আধুনিক সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। যেমন- মেস, দোকান, টিউশনি ইত্যাদি। স্থানীয় কৃষিপণ্যের বাজার চাহিদা বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যবসা সম্প্রসারণ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটে, নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়। স্থানীয়রা জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষাবিদ, গবেষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। ছোট ব্যবসা, যেমন- দোকান, রেস্টুরেন্ট, হোস্টেল ইত্যাদি গড়ে ওঠে। এককথায় এলাকার সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পরিবর্তন সাধিত হয়। আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখি স্থানীয় জনগণ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বাঁকা চোখে দেখে থাকেন। স্থানীয়দের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের অনেক কারণ যদি খতিয়ে দেখা হয় তা হলে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণ পাওয়া যায়। যেমন- সংঘর্ষগুলোর পেছনে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকে। সামাজিক কারণের ভেতর জড়িত আছে একে অন্যকে অবমূল্যায়ন করা। স্থানীয়রা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আধিপত্যবাদী মনে করেন। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় হোটেল-রেস্তোরাঁ, কাঁচাবাজার ও বিপণিবিতানকে কেন্দ্র করে বেশ বড় একটি অর্থনৈতিক চাকা চলমান থাকে। বিভিন্ন সময়ে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের বিবাদে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। স্থানীয়রা মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মালিক তারা, আর শিক্ষার্থীরা এখানে শরণার্থী। এই যে অবিশ্বাস, ভাড়া, ব্যবসায়িক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব। অনেক ক্ষেত্রে তাদের জমি অধিগ্রহণে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ না পাওয়াসহ নানা কারণে একটি অজানা দূরত্ব থেকে যায়। তাই তাদের প্রচেষ্টা থাকে তাদের হাতে যতটুকু সুযোগ আছে, তার পুরোটা দিয়ে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে রাখতে! যার ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝেও এক ধরনের চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রথম শ্রেণির নাগরিক মনে করে কোনো আইন কেয়ার না করার মানসিকতা তৈরি হয়। কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের স্থানীয় আইন ও সামাজিক নীতির প্রতি অবহেলা ও অমান্য সংঘর্ষ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও প্রকৃত সত্য। ২০১৯ সালে ক্যাম্পাসে প্রথম পদার্পণ করে ক্যাম্পাসের ভেতরেই একটি দোকানে তিন বন্ধু মিলে মজা করে মিষ্টি জর্দা দিয়ে পান খেয়েছিলাম। আমাদের অপরাধ ছিল খাওয়ার আগে এর মূল্য জেনে না নেওয়া! ফলে দেখা যায়, পান খাওয়া শেষে সাধারণ একটি পানের মূল্য ১০১ টাকা করে গুনতে হয়! যা দেশের ঢাকা শহর থেকে সবখানে ৫-১০ টাকা। এটি সাধারণ ছোট্ট একটি উদাহরণ মাত্র! এমনই অগণিত ঘটনার স্বীকার হয় প্রতিটি শিক্ষার্থী! যা তাদের মনে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুপ্ত এক ধরনের চাপা ক্ষোভ পুষে রাখে! ফলে সুযোগ পাওয়া মাত্রই ছোটখাটো যেকোনো সংঘাত বৃহৎ রূপ লাভ করে! যদিও আমরা দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়ের সংঘর্ষের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনা আমরা পর্যালোচনা করে দেখতে পাই গত ৩০-৩১ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী নিরাপত্তাকর্মী বিতর্ক থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষে প্রায় ৬০-৪০০ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আহত হন। এদিকে একই সময়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ৩১ আগস্ট পৌনে ৮টার দিকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, এতে দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ ছাড়াও আমরা বিভিন্ন সময়ে দেশের প্রায় সব প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের সংঘাতের ঘটনা দেখি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) গত ২৯ এপ্রিল ‘রোড দুর্ঘটনাবিরোধী’ আন্দোলনের সময় বাসে হামলা ও উত্ত্যক্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থী আহত। ২০২২ সালে নিউমার্কেট-ঢাকা কলেজ ছাত্রদের সঙ্গে দোকানিদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৩ সালের ১৩ জুন মোবাইল দোকানদারদের হামলায় পাঁচজন জাবি শিক্ষার্থী আহত হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়তে এ বছরের ৩-৪ মার্চ কথাকাটাকাটির জেরে স্থানীয়দের হামলায় কমপক্ষে ৭-৮ জন জবি শিক্ষার্থী আহত ও ৮-৯ আগস্ট সদরঘাটে লঞ্চের স্টাফদের সঙ্গে সংঘর্ষে জবি শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে ৯ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। কুয়েটে ২০২৫ সালে বড় সহিংসতা ঘটে, ছাত্ররাজনীতি বিষয়ক সংঘর্ষে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়দের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। এদিকে ২০২২ সালে গোবিপ্রবিতে শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের হামলা ও ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ২০২২ সালের ২৪ মার্চ রাতে স্থানীয়দের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা থেকে ২০ শিক্ষার্থী আহত হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৩ সালের ১১-১২ মার্চ বাস-বিবাদে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের সংঘর্ষে ২০০-৩০০ জন আহত হয়। এ ছাড়া দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই এসব ঘটনা ঘটছে নিয়মিতভাবে। এ সমস্যা বা সংকট যাই বলি না কেন, এ বিষয়ের সমাধানকল্পে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ সময় স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে না, এমনকি প্রতিটি ঘটনার সময় দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেরিতে হস্তক্ষেপ করে, ফলে সংঘর্ষ বড় আকার নেয়। এতে দূরত্ব বাড়ে! এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় বৈঠক করা। স্থানীয়দের জন্য কমিউনিটি সাপোর্ট ডেস্ক স্থাপন। হোস্টেল বা মেস ভাড়া নির্ধারণে যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়ন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা কর্মশালা। সংঘর্ষ নির্মূলে সালিশি কমিটি গঠন। রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে নিরপেক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের মাঝে সচেতনতা গড়ে তুলতে নানামুখি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল শিক্ষার জায়গা নয়, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের কেন্দ্র। স্থানীয় জনগণ সঠিকভাবে সম্পৃক্ত হলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায়। শিক্ষার্থীরাও স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সমাজ থেকে শেখার সুযোগ পায়, যা তাদের মানবিক ও বাস্তবমুখী করে তোলে। এতে সর্বপ্রথম উভয় পক্ষের নিজ নিজ জায়গা থেকে মানসিক চিন্তা-চেতনার উন্নতিই পারে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে। এই দ্বন্দ্বগুলো আসলে ‘অপব্যবস্থাপনা’র ফল, মৌলিক বৈরিতা নয়। যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণ, নিয়মিত আলোচনার প্ল্যাটফর্ম এবং যৌথ সামাজিক উদ্যোগ নেয়, তা হলে সংঘর্ষ প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। এ ছাড়া শিক্ষার্থী ও স্থানীয় উভয়ের মাঝে প্রয়োজন সৌহার্দপূর্ণ মনোভাবের। তা হলেই কেবল স্থানীয় জনগণের সম্পর্ককে ‘সহযোগিতার মডেল’ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, যেখানে শিক্ষার্থী-শিক্ষক-প্রশাসন-স্থানীয় সবাই যেমন লাভবান হবে, তেমনি সুস্থ, সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথ সুগম হবে। আমরা সেদিনেরই স্বপ্ন দেখি!