CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে তরুণদের জাগরণ

#
news image

আধুনিক বিশ্বে শক্তির সংজ্ঞা বদলেছে। রাষ্ট্রশক্তি এখন আর শুধু সেনাবাহিনী বা পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, কৌশলগত করিডোর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপ্রবাহই একটি দেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নির্ধারণ করে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রে অবস্থিত বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে এক নতুন কৌশলগত শক্তি। একসময় যাকে অবহেলিত মনে করা হতো, সেই বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক আগ্রহের কেন্দ্রে চলে এসেছে। স্বার্থপরতা ও গোষ্ঠীপ্রিয়তার চেয়ে দেশপ্রেমকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। না-হলে ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার শক্তি পেয়েছিল কোথা থেকে! ভাষা আন্দোলনের গৌরবগাঁথা রচনা করার সাহস এসেছিল কীভাবে! আর মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজয় ছিনিয়ে আনার উদ্দীপনাই বা পেয়েছিলেন কেমন করে! এতসব ঐতিহ্যের শক্তি স্বাধীন বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে পারতো অন্য এক উচ্চতায়। কিন্তু উলটে গেল সব হিসাবনিকাশ। যেখানে টগবগে ঘোড়ার শক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে কোনো এক অশুভ শক্তি বাংলাদেশের পায়ে যেন ভূতের পা লাগিয়ে দিল। মালোয়েশিয়া যা পেরেছে তার চেয়ে অনেক বেশি পারার কথা ছিল বাংলাদেশের। সাড়ে সাত কোটি জনসম্পদ নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সে সম্পদ বেড়ে এখন সতেরো কোটি পেরিয়ে গেছে। কিছুদিন আগেও খুব কষ্টের সঙ্গে ভাবতে হতো কী হতে পারতো এদেশ আর কী হচ্ছে এখন চারপাশে! বিভিন্ন সরকারের আমলে যদিও অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে বাংলাদেশ। কিন্তু চলমান রাজনৈতিক-সংকট আমাদের আতঙ্কমুক্ত করতে পারছে না। আমাদের দেশের রাজনীতি যেভাবে ক্রমে দেশপ্রেম নির্বাসন দিয়ে গোষ্ঠীপ্রেমকে সামনে নিয়ে আসছে তাতে অগ্রগতির কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো সুকঠিন। দেখে মনে হয়, দেশের উজ্জ্বল ঐতিহ্য ও ইতিহাস পাঠবিমুখ আমাদের রাজনীতির মানুষেরা। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণরা আন্দোলনে নামছে; যাদের বলা হচ্ছে ‘জেন-জি’।আমরা দেখেছি কীভাবে তাদের আন্দোলনের মুখে নেপালের প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্টসহ মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন। এখনও কোথাও কোথাও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের গণঅভ্যুত্থান শুধু নেপালে নয়; এর আগে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশেও ঘটেছে। বস্তুত দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালে কিছু দিক সহজেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন শাসকগোষ্ঠী ও জনসাধারণের বৈষম্য। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলো এসব ব্যাপারে মোটেও মনোযোগ দেয়নি। গণঅভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকতে পারে; কিন্তু অভিন্ন অনেক বিষয়  এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তরুণদের মধ্য থেকে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের প্রথম আওয়াজটা উঠে আসছে। বিক্ষোভকারী জনগোষ্ঠীর বড় অংশ তরুণ। তারা প্রবীণদের তুলনায় বেশি প্রতিবাদী। কারণ, তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। দুনিয়ার যে কোনো সাম্প্রতিক উদ্ভাবন বা ঘটনা তারা নিমেষেই হাতে পাচ্ছে। তারা অনেক বেশি সচেতন, আকাঙ্ক্ষী এবং নিজেদের অধিকার নিয়েও অনেক বেশি সোচ্চার। এটি এ প্রজন্মের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য। বিশেষত সামাজিক মাধ্যমগুলোর সহায়তায় তারা খুব দ্রুত যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে, যেটি অতীতে এত জোরালোভাবে ছিল না। অল্প সময়ে বিক্ষোভ ও আন্দোলন চাঙ্গা করতে সামাজিক মাধ্যমগুলোর বেশ ভূমিকা রয়েছে। অতীতে আমরা দেখেছি, এ ধরনের আন্দোলন-বিক্ষোভ সংগঠিত করত রাজনৈতিক দলগুলো, যা এখন তরুণরা করছে। আরও লক্ষণীয়, তারা এখন আন্দোলন চালিয়ে যেতে রাজনৈতিক দলগুলোর গণ্ডিতে আটকে থাকছে না। অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনেও বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের প্রতীবাদী ও আন্দোলনমুখর হয়ে ওঠার নেপথ্যে আরেকটি প্রধান কারণ হলো রাজনৈতিক অর্থনীতি। গত ৩০-৪০ বছর ধরে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বহাল, তা একদিকে আমাদের মোটা দাগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেমন দিচ্ছে তেমনি প্রকট বৈষম্যও বাড়িয়েছে। কর্মহীন যুবকের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা আমরা বলছি, তা তরুণদের জন্য সামান্যই কল্যাণ বয়ে এনেছে। মনে রাখা জরুরি, কর্মহীনতার কারণেই ২০২২ সালে আমরা শ্রীলঙ্কায় তরুণদের বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামোবিরোধী হয়ে উঠতে দেখি। বাংলাদেশেও গত বছর জুলাই আন্দোলন শুরু হয়েছিল কর্মসংস্থানের বৈষম্য দূর তথা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। পরে সেটা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে। নেপালেও তরুণরা রাজপথে প্রথম নেমেছে। এখন তরুণদের আন্দোলন আগের মতো কেবল দাবি-দাওয়া পূরণ হলেই থেমে থাকছে না। বরং সরকার পতন পর্যন্ত ঠেকছে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে একই চিত্র দেখা গেল। কর্মসংস্থান ও তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণরা মাঠে নামলেও একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিও সামনে আনছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অন্যান্য অনাচার ও অব্যবস্থাপনা তারা আর মেনে নিতে চাইছে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের কথা যদি বলি, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা ধারণা করেছিলাম, এখানে নতুন গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি হবে; দুর্নীতিমুক্ত সরকারি ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে; তরুণ প্রজন্ম কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। কিন্তু আমরা দেখেছি তার উল্টো চিত্র। 
নব্বই-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন সবকটি রাজনৈতিক দলই কমবেশি একই পথে হেঁটেছে। দুর্নীতি হয়েছে, রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা বেড়েছে এবং তরুণরা উপেক্ষিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশে নয়; নেপালেও একই চিত্র দেখেছি। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলো বিভাজন ও বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বহাল রেখে রাষ্ট্র চালাতে চেয়েছে-সেটা নেপালি কংগ্রেস হোক কিংবা অন্য কোনো দল। নেপালের আন্দোলন শুধু কেপি শর্মা অলি কিংবা তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না; বরং তা ছিল পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে দেখা গেছে গণঅভ্যুত্থানের সময় ও পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় স্থাপনাগুলো বিশেষত আইনসভা, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির বাসভবন, সচিবালয় প্রভৃতিতে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনেক স্মারক বিনষ্ট করা হচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় সেটা শুরু হয়েছিল; বাংলাদেশে এর মাত্রা আরও বেড়েছে এবং নেপালে দৃশ্যত চরমে পৌঁছেছে। এটা নিঃসন্দেহে নেতিবাচক দিক। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ও স্মারক সম্পর্কে সচেতনতা না থাকলে যে কোনো দেশ বা জাতি শিকড়হীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন হবে-শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা নেপালের তরুণরা এ ধারণায় আস্থা রাখতে পারছে না। তারা নিজে এগিয়ে গিয়ে দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে। সেটা যেমন বাংলাদেশে, তেমনি নেপালেও ঘটছে। নেপালে ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমার ধারণা, আগামী সরকারের প্রধান এজেন্ডা হবে দুর্নীতিহীন ও বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা পাল্টাতে তরুণরা কতখানি পারবে, সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, তরুণ প্রজন্ম এখন দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইচ্ছুক। আপাতদৃষ্টিতে এটা দুর্নীতিমুক্ত হবে, বৈষম্যহীন হবে এবং তরুণদের প্রত্যাশার দিকে গুরুত্ব দেবে। এগুলো তাদের আকাক্সক্ষার কথা বলছি, তবে কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, সেটা এখনই বলা মুশকিল। কারণ, আন্দোলন এক জিনিস, আর নীতিমালার মধ্য দিয়ে সরকার চালানো অন্য বিষয়। একটা ব্যবস্থা থেকে আরেকটা ব্যবস্থায় উত্তরণ এতটা সহজ নয়। এ জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। নেপালেও সেটি তরুণদের মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশেও আমরা সেটি মোকাবিলা করছি। কিন্তু সত্য কথা হলো, তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবে, বর্তমান বাস্তবতায় সেটাই জানান দিচ্ছে। এভাবে নষ্ট রাজনীতির ঘুণপোকা সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই ঝাঝরা করে দিচ্ছে। হতাশা বাড়াচ্ছে মানুষের মধ্যে। তারপরেও আশাবাদী মানুষ ইতিহাসের অমোঘ নিয়মের সূত্রে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খোঁজে। তবে ভরসা এই যে, প্রয়োজনীয় সময়ে ইতিহাস ঠিকই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করবে। জয় হবে মুক্তচিন্তার মানুষের এবং দেশপ্রেমিক নতুন প্রজন্মের। আজ যারা রাজনীতির স্বার্থচর্চা করতে গিয়ে জাতিকে চরম অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন হয় তারা আত্মচৈতন্যে ফিরে এসে মানবিক হবেন এবং দেশপ্রেমের টান অনুভব করবেন বুকের ভেতরে, দলের চেয়ে সত্যিই দেশকে বড় ভাববেন অথবা দেশপ্রেমিক মানুষের ইচ্ছেশক্তির জোয়ারে দিশেহারা হয়ে পায়ের নিচের মাটি হারাবেন। প্রত্যাশা করি রাজনীতির মাঠে সকল পক্ষের যত আস্ফালনই থাকুক, শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করার উপায় দেখাবেন না। শুধু সম্পদ থাকা যথেষ্ট নয়; পরিকল্পনা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে তা বাস্তবে রূপান্তর করতে হবে। তবেই রেয়ার আর্থ, ইউরেনিয়াম বা বঙ্গোপসাগরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ হতে পারে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। সঠিক নেতৃত্ব ও সহনশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় নবোদিত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট।

রায়হান আহমেদ তপাদার

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫,  5:57 PM

news image

আধুনিক বিশ্বে শক্তির সংজ্ঞা বদলেছে। রাষ্ট্রশক্তি এখন আর শুধু সেনাবাহিনী বা পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, কৌশলগত করিডোর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপ্রবাহই একটি দেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নির্ধারণ করে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রে অবস্থিত বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে এক নতুন কৌশলগত শক্তি। একসময় যাকে অবহেলিত মনে করা হতো, সেই বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক আগ্রহের কেন্দ্রে চলে এসেছে। স্বার্থপরতা ও গোষ্ঠীপ্রিয়তার চেয়ে দেশপ্রেমকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। না-হলে ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার শক্তি পেয়েছিল কোথা থেকে! ভাষা আন্দোলনের গৌরবগাঁথা রচনা করার সাহস এসেছিল কীভাবে! আর মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজয় ছিনিয়ে আনার উদ্দীপনাই বা পেয়েছিলেন কেমন করে! এতসব ঐতিহ্যের শক্তি স্বাধীন বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে পারতো অন্য এক উচ্চতায়। কিন্তু উলটে গেল সব হিসাবনিকাশ। যেখানে টগবগে ঘোড়ার শক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে কোনো এক অশুভ শক্তি বাংলাদেশের পায়ে যেন ভূতের পা লাগিয়ে দিল। মালোয়েশিয়া যা পেরেছে তার চেয়ে অনেক বেশি পারার কথা ছিল বাংলাদেশের। সাড়ে সাত কোটি জনসম্পদ নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সে সম্পদ বেড়ে এখন সতেরো কোটি পেরিয়ে গেছে। কিছুদিন আগেও খুব কষ্টের সঙ্গে ভাবতে হতো কী হতে পারতো এদেশ আর কী হচ্ছে এখন চারপাশে! বিভিন্ন সরকারের আমলে যদিও অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে বাংলাদেশ। কিন্তু চলমান রাজনৈতিক-সংকট আমাদের আতঙ্কমুক্ত করতে পারছে না। আমাদের দেশের রাজনীতি যেভাবে ক্রমে দেশপ্রেম নির্বাসন দিয়ে গোষ্ঠীপ্রেমকে সামনে নিয়ে আসছে তাতে অগ্রগতির কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো সুকঠিন। দেখে মনে হয়, দেশের উজ্জ্বল ঐতিহ্য ও ইতিহাস পাঠবিমুখ আমাদের রাজনীতির মানুষেরা। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণরা আন্দোলনে নামছে; যাদের বলা হচ্ছে ‘জেন-জি’।আমরা দেখেছি কীভাবে তাদের আন্দোলনের মুখে নেপালের প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্টসহ মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন। এখনও কোথাও কোথাও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের গণঅভ্যুত্থান শুধু নেপালে নয়; এর আগে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশেও ঘটেছে। বস্তুত দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালে কিছু দিক সহজেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন শাসকগোষ্ঠী ও জনসাধারণের বৈষম্য। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলো এসব ব্যাপারে মোটেও মনোযোগ দেয়নি। গণঅভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকতে পারে; কিন্তু অভিন্ন অনেক বিষয়  এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তরুণদের মধ্য থেকে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের প্রথম আওয়াজটা উঠে আসছে। বিক্ষোভকারী জনগোষ্ঠীর বড় অংশ তরুণ। তারা প্রবীণদের তুলনায় বেশি প্রতিবাদী। কারণ, তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। দুনিয়ার যে কোনো সাম্প্রতিক উদ্ভাবন বা ঘটনা তারা নিমেষেই হাতে পাচ্ছে। তারা অনেক বেশি সচেতন, আকাঙ্ক্ষী এবং নিজেদের অধিকার নিয়েও অনেক বেশি সোচ্চার। এটি এ প্রজন্মের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য। বিশেষত সামাজিক মাধ্যমগুলোর সহায়তায় তারা খুব দ্রুত যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে, যেটি অতীতে এত জোরালোভাবে ছিল না। অল্প সময়ে বিক্ষোভ ও আন্দোলন চাঙ্গা করতে সামাজিক মাধ্যমগুলোর বেশ ভূমিকা রয়েছে। অতীতে আমরা দেখেছি, এ ধরনের আন্দোলন-বিক্ষোভ সংগঠিত করত রাজনৈতিক দলগুলো, যা এখন তরুণরা করছে। আরও লক্ষণীয়, তারা এখন আন্দোলন চালিয়ে যেতে রাজনৈতিক দলগুলোর গণ্ডিতে আটকে থাকছে না। অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনেও বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের প্রতীবাদী ও আন্দোলনমুখর হয়ে ওঠার নেপথ্যে আরেকটি প্রধান কারণ হলো রাজনৈতিক অর্থনীতি। গত ৩০-৪০ বছর ধরে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বহাল, তা একদিকে আমাদের মোটা দাগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেমন দিচ্ছে তেমনি প্রকট বৈষম্যও বাড়িয়েছে। কর্মহীন যুবকের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা আমরা বলছি, তা তরুণদের জন্য সামান্যই কল্যাণ বয়ে এনেছে। মনে রাখা জরুরি, কর্মহীনতার কারণেই ২০২২ সালে আমরা শ্রীলঙ্কায় তরুণদের বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামোবিরোধী হয়ে উঠতে দেখি। বাংলাদেশেও গত বছর জুলাই আন্দোলন শুরু হয়েছিল কর্মসংস্থানের বৈষম্য দূর তথা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। পরে সেটা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে। নেপালেও তরুণরা রাজপথে প্রথম নেমেছে। এখন তরুণদের আন্দোলন আগের মতো কেবল দাবি-দাওয়া পূরণ হলেই থেমে থাকছে না। বরং সরকার পতন পর্যন্ত ঠেকছে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে একই চিত্র দেখা গেল। কর্মসংস্থান ও তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণরা মাঠে নামলেও একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিও সামনে আনছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অন্যান্য অনাচার ও অব্যবস্থাপনা তারা আর মেনে নিতে চাইছে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের কথা যদি বলি, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা ধারণা করেছিলাম, এখানে নতুন গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি হবে; দুর্নীতিমুক্ত সরকারি ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে; তরুণ প্রজন্ম কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। কিন্তু আমরা দেখেছি তার উল্টো চিত্র। 
নব্বই-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন সবকটি রাজনৈতিক দলই কমবেশি একই পথে হেঁটেছে। দুর্নীতি হয়েছে, রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা বেড়েছে এবং তরুণরা উপেক্ষিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশে নয়; নেপালেও একই চিত্র দেখেছি। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলো বিভাজন ও বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বহাল রেখে রাষ্ট্র চালাতে চেয়েছে-সেটা নেপালি কংগ্রেস হোক কিংবা অন্য কোনো দল। নেপালের আন্দোলন শুধু কেপি শর্মা অলি কিংবা তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না; বরং তা ছিল পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে দেখা গেছে গণঅভ্যুত্থানের সময় ও পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় স্থাপনাগুলো বিশেষত আইনসভা, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির বাসভবন, সচিবালয় প্রভৃতিতে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনেক স্মারক বিনষ্ট করা হচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় সেটা শুরু হয়েছিল; বাংলাদেশে এর মাত্রা আরও বেড়েছে এবং নেপালে দৃশ্যত চরমে পৌঁছেছে। এটা নিঃসন্দেহে নেতিবাচক দিক। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ও স্মারক সম্পর্কে সচেতনতা না থাকলে যে কোনো দেশ বা জাতি শিকড়হীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন হবে-শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা নেপালের তরুণরা এ ধারণায় আস্থা রাখতে পারছে না। তারা নিজে এগিয়ে গিয়ে দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে। সেটা যেমন বাংলাদেশে, তেমনি নেপালেও ঘটছে। নেপালে ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমার ধারণা, আগামী সরকারের প্রধান এজেন্ডা হবে দুর্নীতিহীন ও বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা পাল্টাতে তরুণরা কতখানি পারবে, সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, তরুণ প্রজন্ম এখন দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইচ্ছুক। আপাতদৃষ্টিতে এটা দুর্নীতিমুক্ত হবে, বৈষম্যহীন হবে এবং তরুণদের প্রত্যাশার দিকে গুরুত্ব দেবে। এগুলো তাদের আকাক্সক্ষার কথা বলছি, তবে কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, সেটা এখনই বলা মুশকিল। কারণ, আন্দোলন এক জিনিস, আর নীতিমালার মধ্য দিয়ে সরকার চালানো অন্য বিষয়। একটা ব্যবস্থা থেকে আরেকটা ব্যবস্থায় উত্তরণ এতটা সহজ নয়। এ জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। নেপালেও সেটি তরুণদের মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশেও আমরা সেটি মোকাবিলা করছি। কিন্তু সত্য কথা হলো, তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবে, বর্তমান বাস্তবতায় সেটাই জানান দিচ্ছে। এভাবে নষ্ট রাজনীতির ঘুণপোকা সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই ঝাঝরা করে দিচ্ছে। হতাশা বাড়াচ্ছে মানুষের মধ্যে। তারপরেও আশাবাদী মানুষ ইতিহাসের অমোঘ নিয়মের সূত্রে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খোঁজে। তবে ভরসা এই যে, প্রয়োজনীয় সময়ে ইতিহাস ঠিকই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করবে। জয় হবে মুক্তচিন্তার মানুষের এবং দেশপ্রেমিক নতুন প্রজন্মের। আজ যারা রাজনীতির স্বার্থচর্চা করতে গিয়ে জাতিকে চরম অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন হয় তারা আত্মচৈতন্যে ফিরে এসে মানবিক হবেন এবং দেশপ্রেমের টান অনুভব করবেন বুকের ভেতরে, দলের চেয়ে সত্যিই দেশকে বড় ভাববেন অথবা দেশপ্রেমিক মানুষের ইচ্ছেশক্তির জোয়ারে দিশেহারা হয়ে পায়ের নিচের মাটি হারাবেন। প্রত্যাশা করি রাজনীতির মাঠে সকল পক্ষের যত আস্ফালনই থাকুক, শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করার উপায় দেখাবেন না। শুধু সম্পদ থাকা যথেষ্ট নয়; পরিকল্পনা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে তা বাস্তবে রূপান্তর করতে হবে। তবেই রেয়ার আর্থ, ইউরেনিয়াম বা বঙ্গোপসাগরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ হতে পারে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। সঠিক নেতৃত্ব ও সহনশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় নবোদিত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট।