CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬

জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের হালচাল- অর্জন, সংকট ও আগামীর পথ

#
news image

একদলীয় পরিবারতান্ত্রিক শাসনের বেড়াজাল থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা সেনাকর্মকর্তাদের গোপন সংগঠন সেনা পরিষদ কতৃক ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ঐতিহাসিক আগস্ট বিপ্লব সংগঠিত হয়। পরবর্তীতে ’কু পাল্টা ’কু এর পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে অগণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে এবং তারই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্র পরিচালনা করে জনগণকেই করেছে ‘ক্ষমতার উৎস’ এবং জনগণের কল্যাণের জন্য তিনি গ্রহণ করেছে নানা গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি, যে গুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান দেশের ভাষা, ধর্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও অর্থনীতির সব দিককে একীভূত করে একটি ঐতিহ্যবাহী ও সংহত জাতীয় পরিচিতি হিসেবে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’কে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর মতে, ‘ভাষা যদি একটি ফুল হয়, ধর্ম আরেকটি ফুল, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, মুক্তিযুদ্ধের নানা ফুল নিয়ে যে তোড়া বেঁধেছি- এটিই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। তাঁর এই ধারণা ছিলো সমাজের সব স্তরের মানুষকে একত্র করার শক্তিশালী রসায়ন, যা আজও দেশবাসীকে একসঙ্গে থাকার প্রেরণা জোগায়।

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ছিলো সমানাধিকার ও উন্নয়নের দর্শন। তিনি দেশের মানুষের জন্য একটি আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যতের চিত্র এঁকেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘কোনো দেশের উন্নতি সম্ভব নয় যদি সে অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে। আমাদের দেশের প্রতিটি সেক্টরকে আত্মনির্ভরশীল করতে হবে, তবেই আমরা সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে পারবো।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের একটি বিশেষ অধ্যায় আছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি গঠন করে, তখন থেকেই তিনি নারীর ক্ষমতায়ন এবং তাদের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলো। তিনি বিশ্বাস করতো, “জাতীয় ঐক্য” গড়তে হলে সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে, বিশেষ করে গ্রামীণ নারী সমাজকে।

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান অপরিসীম। তিনি একজন সত্যিকারের বাস্তববাদী রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রনয়ক। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বল্প সময়ের শাসনামলে তার দক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশে সার্বিক অগ্রগতি হয়েছিলো। আধুনিক স্বনির্ভর বাংলাদেশের রূপকার জিয়াউর রহমান তার সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নারী সমাজকে মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন অনুভব করেন।

তার শাসনামলেই বাংলাদেশের সংবিধানের ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমঅধিকার ঘোষণা করা হয়েছে। জনজীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমভাবে অংশগ্রহণের কথাও আমাদের সংবিধানে বলা আছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিলো ভিন্ন। স্বাধীনতার পর জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীদের সম্পৃক্ততা উল্লেখ করার মতো ছিলো না।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। কিন্তু সেই নারী সমাজ শিক্ষা-দীক্ষায়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পুরুষদের তুলনায় অনেক পশ্চাতে পড়ে রয়েছে। পূর্বে তাদের চেতনাবোধ জাগিয়ে তোলার জন্য কোনো সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা সরকারের তরফ থেকে গ্রহণ করা হয়নি। ঘর-রান্নার কাজ ছাড়া আর কোনো গঠনমুখী কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ তাদের ছিলো না। এই কথা স্বীকার করতেই হবে যে, যদি কোনো জাতির অর্ধেক অংশ পেছনে পড়ে থাকে, তবে সেই জাতির সর্বাঙ্গীণ উন্নতি আশা করা যায় না’।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রণীত ১৯ দফা কর্মসূচীর ১১ নম্বর দফায় নারীদের যথাযোগ্য মর্যাদা নিশ্চিত করে এবং সমাজে তাদের যোগ্য স্থানে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। নারীর কল্যাণ ও তাদের অবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের অধীনে একটি নারী বিষয়ক দফতর প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরকার ‘মহিলা বিষয়ক’ একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে। নারীরা যাতে যথাযোগ্য মর্যাদা, ধর্মীয়, শাসনতান্ত্রিক ও আইনগত অধিকার এবং আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা গুলো ভোগ করতে পারে, সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে তারা যাতে চাকুরী করতে পারে এবং সর্বোপরি সমাজ ও জাতি গঠনে অবদান রাখতে পারে এ বিষয় গুলো দেখভাল করার লক্ষ্যে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করে এ মন্ত্রণালয়ে একজন নারীকে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী বেগম খালেদা জিয়া মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বর্ধিত করে ‘মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে’ রূপান্তরিত করে। নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ, নারী পাচার রোধ, নারীর নিরাপত্তা এবং সর্বক্ষেত্রে সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হলো মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মূল লক্ষ্য। ১৯৭৮-৮০ সালে জিয়া সরকারের গৃহীত দ্বিবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারী উন্নয়ন বিষয়ক বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। জাতীয় মহিলা সংস্থা ও নারী উন্নয়ন অ্যাকাডেমির তত্ত্বাবধানে নারীদের সেলাই, বুনন, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন এবং মৌচাষ ইত্যাদি নানামুখী প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের কর্ম উপযোগী করে তোলা হয়। বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন নারীদের জন্য বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে নারীদের কল্যাণে আইডিএ ও বিশ্বব্যাংক বেশ কিছু প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে এসেছিলো। শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান নারী শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। শিক্ষিত নারীদের কর্মজীবী নারীতে রূপান্তরিত করার জন্য সরকারী-বেসরকারী খাতে চাকুরীর শূন্য পদে নারীদের জন্য শতকরা ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া’র নেতৃত্বে গঠিত সরকার প্রাথমিক শিক্ষা ও দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত নারীদের লেখা-পড়া অবৈতনিক করে এবং বিশেষ প্রাধিকার প্রদান করা হয়। মাধ্যমিক স্কুলে নারীদের জন্য শতকরা ৫০ ভাগ, সরকারী কলেজের প্রভাষক পদে এক-তৃতীয়াংশ, সরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে টাইপিস্ট ও করণিক পদের শতকরা ৫০ ভাগ, টেলিফোন অপারেটর ও রিসেপশনিস্টের সব পদ এবং থানা পরিবার পরিকল্পনা অফিসারের ২০ শতাংশ পদ নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। মেডিক্যাল কলেজ সমূহের ২০ শতাংশ আসন নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ক্রীড়া অঙ্গনে প্রথম মহিলা ফুটবল প্রতিযোগিতা শুরু করা হয়।

বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীতে আজ যে নারী সদস্যের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায় এর উদ্যোগটি প্রথম নিয়েছিলো শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনিই প্রথম সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা উপেক্ষা করে নারীদের পুলিশ বাহিনী যোগদানের ব্যবস্থা করেছিলো। গ্রামীণ জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শহিদ জিয়া গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী বা ভিডিপি প্রতিষ্ঠা করে। এতেও তিনি নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করেছিলো।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় ৭৬% আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তৈরি পোশাক শিল্পকে রফতানিমুখী শিল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের উদ্ভাবনী চিন্তার ফসল থেকে। এই পোশাক তৈরির খাতে নারী শ্রমিকের অবদানই আজ সবচেয়ে বেশী। এ খাতে কর্মরত প্রায় ৩৫ লাখ শ্রমিকের শতকরা ৯০ ভাগই নারী। নারীদের এ বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি শহিদ জিয়ার দূরদৃষ্টির ফল বলা যেতে পারে।

বাল্যবিয়ে বন্ধ, যৌতুক নিরোধ ও নারী নির্যাতন বন্ধে জিয়াউর রহমান কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এ কাজে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য ও গ্রাম সরকারকে সম্পৃক্ত করা হয়েছিলো। ১৯৮০ সালে জাতীয় সংসদে বিবাহে যৌতুক নিরোধ আইন পাস করা হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের এসব উদ্যোগের ফলে তখন নারীর প্রতি সহিংসতা অনেক কমে গিয়েছিলো। জনসংখ্যা বৃদ্ধি বাংলাদেশের এক নম্বর জাতীয় সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে ১৯৭৬ সালে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে প্রায় ৫৫ হাজার পূর্ণকালীন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলো নারী।

নারীর ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান তাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে। রাজনীতিতে মহিলারা যাতে অধিকহারে সংস্পৃত হতে পারে, সেজন্য নিজের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিতে সে ব্যবস্থা করেছিলো। ১৯৭৮ সালের ২০শে অক্টোবর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির প্রথম সভার বক্তৃতায় তিনি কেন্দ্র, জেলা এবং আরও নিচের পর্যায়ের কমিটিতে নারী সদস্য অন্তর্ভুক্তির কথা বলেছিলো। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলো- ‘বাংলাদেশের প্রত্যেকটি নারী একদিন না একদিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সদস্য হবে’। শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংস্থায় নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের বিকাশ, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা এবং তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সরকারের যোগাযোগ তৈরির জন্য তিনি গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলো।

১১ সদস্যের গ্রাম সরকারে ২টি সদস্য পদ নারীদের জন্য সংরক্ষিত ছিলো। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ২টি এবং ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনে পাঁচটি সদস্য পদ নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। সংরক্ষিত পদের বাইরেও নারীরা সাধারণ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতো। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদে ১০ বছরের জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষণ করা হয়েছিলো। শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমান দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র ৬ নম্বর সংশোধন আদেশ, ১৯৭৮ দ্বারা ১০ বছরের স্থলে ১৫ বছর এবং নারীদের সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ১৫ থেকে বাড়িয়ে ৩০ জন করে। এর বাইরে সংবিধানের ৬৫(২) অনুযায়ী সাধারণ আসনেও নারীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতো। মন্ত্রী পরিষদেও জিয়া নারী সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করেছিলো। ১৯৭০-৭৫ সালের সরকারে নারী মন্ত্রীর সংখ্যা ছিলো মাত্র ২ জন। ১৯৭৬-৮০ সালে জিয়া সরকারের সময় এ সংখ্যা ৬ জনে উন্নীত হয়।

বেগম খালেদা জিয়া’র নেতৃত্বে গঠিত সরকার মহীয়সী নারীদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে সন্মানিত করার জন্য ১৯৯৫ সালে প্রথম “বেগম রোকেয়া পদক” প্রদান শুরু করে। সংসদে সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৩০ থেকে ৫০-এ উন্নতি করে। তার সময়েই মাতৃ মৃত্যুর হার কমে এসেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে বর্তমানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের এসব অবদানকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায়। প্রবণতা দেখা যায় নারীর ক্ষমতায়ন ও মুক্তির প্রশ্নে খালেদা জিয়ার সরকারের অবদানও। কিন্তু ইতিহাস থেকে কারো অবদান জোর করে মুছে দেওয়া যায় না।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরে বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসে। তিনি শুধু বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীই নন, বরং বিশ্বের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রথম নারী সরকার প্রধানদের একজন হয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ আরও বাড়তে শুরু করে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নারী প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা হয়। সেই সঙ্গে শিক্ষা, ক্ষুদ্র ঋণ, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প—সব জায়গায় নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়। মেয়েদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি চালু হওয়ায় স্কুলে তাদের টিকে থাকার হারও অনেক বেড়ে যায়।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া’র সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার পরে দেখা গেছে, নারী নেত্রীদের সক্রিয়তা আরও বেড়েছে। গণমাধ্যম, টিভির টক শো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সব জায়গায় বিএনপি’র নারী নেত্রীদের সরব উপস্থিতি আছে। অনেক তরুণী পেশাজীবীও বিএনপি’র সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এটি দলের ভাবমূর্তিতে আধুনিকতা এবং তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এতো অর্জনের মাঝেও বড় কিছু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

আজও দেখা যায়, বিএনপি’র নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রটি সেই চিরচেনা কয়েকজন নেত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রায় ২০-২২ জন পরিচিত মুখের বাইরে নতুন কোনো মুখ তেমন ভাবে উঠে আসার সুযোগ পাচ্ছে না। অথচ গত ত্রিশ বছরে যারা মাঠ পর্যায়ে এবং বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে দক্ষ তাদের সমন্বয়ে কমপক্ষে আরও ত্রিশজন নতুন নেত্রী তৈরি করা যেতো।

বড় সমস্যার জায়গা হলো, দলের ভেতর যেসব নারী নেত্রী সারা বছর পরিশ্রম করে দল টিকিয়ে রাখছে, তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। পরিচিত মুখ গুলোই বেশী গুরুত্ব পাচ্ছে, যার কারণে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। এটি বিএনপি’র ভবিষ্যতের জন্যই বড় বিপদ। কারণ, নতুন প্রজন্মের ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে হলে নতুন, উদ্যমী, যোগ্য নারী নেতৃত্বের প্রয়োজন।

অঙ্গ-সংগঠনের ক্ষেত্রেও একই সংকট দেখা যায়। জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী যুবদল, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ইত্যাদির নারী শাখা আলাদা করে গঠন করা উচিৎ। এতে করে নতুন নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। এখনো দেখা যায়, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ১১ বছর ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ। নতুন কমিটি না হওয়ায় অনেক যোগ্য নেত্রী হতাশ হয়ে পড়ছে। সময় মতো কমিটি গঠন করা হলে নেতৃত্বের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি হতো এবং তৃণমূল থেকে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসতো।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাতীয় রাজনীতিতে এবং সংসদে নারীদের ভূমিকা আরও সুদৃঢ় করতে বিএনপিকে আন্তরিক হতে হবে। না হলে দেশের ৫২% নারী ভোটার দিন দিন দল থেকে দূরে সরে যেতে পারে। নারীর অংশগ্রহণ শুধু ‘প্রদর্শনীর জন্য’ হলে, তা রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে পারবে না।

সত্যিকার অর্থে বিএনপি’র জন্য সবচেয়ে জরুরী কাজ হলো, পুরনো ছক ভেঙে নতুন নারীদের সুযোগ দেওয়া। নতুন প্রজন্মের নারী নেত্রীদের সামনে আনা ছাড়া বিএনপি’র রাজনীতিতে কোনো সত্যিকারের পরিবর্তন বা নবজাগরণ সম্ভব নয়।

জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে নারীদের এই দীর্ঘ ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনি বর্তমান সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য নতুন নেতৃত্বের বিকাশ এখন সময়ের দাবী।

লেখক:
সমাজ সেবক ও মানবাধিকার কর্মি,
সাবেক ছাত্রদল নেত্রী ইডেন কলেজ শাখা,
সাবেক সহ মহিলা সম্পাদক জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটি।

মুন্নী চৌধুরী মেধা

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫,  7:20 PM

news image

একদলীয় পরিবারতান্ত্রিক শাসনের বেড়াজাল থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা সেনাকর্মকর্তাদের গোপন সংগঠন সেনা পরিষদ কতৃক ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ঐতিহাসিক আগস্ট বিপ্লব সংগঠিত হয়। পরবর্তীতে ’কু পাল্টা ’কু এর পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে অগণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে এবং তারই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্র পরিচালনা করে জনগণকেই করেছে ‘ক্ষমতার উৎস’ এবং জনগণের কল্যাণের জন্য তিনি গ্রহণ করেছে নানা গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি, যে গুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান দেশের ভাষা, ধর্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও অর্থনীতির সব দিককে একীভূত করে একটি ঐতিহ্যবাহী ও সংহত জাতীয় পরিচিতি হিসেবে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’কে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর মতে, ‘ভাষা যদি একটি ফুল হয়, ধর্ম আরেকটি ফুল, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, মুক্তিযুদ্ধের নানা ফুল নিয়ে যে তোড়া বেঁধেছি- এটিই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। তাঁর এই ধারণা ছিলো সমাজের সব স্তরের মানুষকে একত্র করার শক্তিশালী রসায়ন, যা আজও দেশবাসীকে একসঙ্গে থাকার প্রেরণা জোগায়।

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ছিলো সমানাধিকার ও উন্নয়নের দর্শন। তিনি দেশের মানুষের জন্য একটি আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যতের চিত্র এঁকেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘কোনো দেশের উন্নতি সম্ভব নয় যদি সে অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে। আমাদের দেশের প্রতিটি সেক্টরকে আত্মনির্ভরশীল করতে হবে, তবেই আমরা সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে পারবো।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের একটি বিশেষ অধ্যায় আছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি গঠন করে, তখন থেকেই তিনি নারীর ক্ষমতায়ন এবং তাদের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলো। তিনি বিশ্বাস করতো, “জাতীয় ঐক্য” গড়তে হলে সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে, বিশেষ করে গ্রামীণ নারী সমাজকে।

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান অপরিসীম। তিনি একজন সত্যিকারের বাস্তববাদী রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রনয়ক। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বল্প সময়ের শাসনামলে তার দক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশে সার্বিক অগ্রগতি হয়েছিলো। আধুনিক স্বনির্ভর বাংলাদেশের রূপকার জিয়াউর রহমান তার সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নারী সমাজকে মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন অনুভব করেন।

তার শাসনামলেই বাংলাদেশের সংবিধানের ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমঅধিকার ঘোষণা করা হয়েছে। জনজীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমভাবে অংশগ্রহণের কথাও আমাদের সংবিধানে বলা আছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিলো ভিন্ন। স্বাধীনতার পর জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীদের সম্পৃক্ততা উল্লেখ করার মতো ছিলো না।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। কিন্তু সেই নারী সমাজ শিক্ষা-দীক্ষায়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পুরুষদের তুলনায় অনেক পশ্চাতে পড়ে রয়েছে। পূর্বে তাদের চেতনাবোধ জাগিয়ে তোলার জন্য কোনো সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা সরকারের তরফ থেকে গ্রহণ করা হয়নি। ঘর-রান্নার কাজ ছাড়া আর কোনো গঠনমুখী কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ তাদের ছিলো না। এই কথা স্বীকার করতেই হবে যে, যদি কোনো জাতির অর্ধেক অংশ পেছনে পড়ে থাকে, তবে সেই জাতির সর্বাঙ্গীণ উন্নতি আশা করা যায় না’।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রণীত ১৯ দফা কর্মসূচীর ১১ নম্বর দফায় নারীদের যথাযোগ্য মর্যাদা নিশ্চিত করে এবং সমাজে তাদের যোগ্য স্থানে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। নারীর কল্যাণ ও তাদের অবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের অধীনে একটি নারী বিষয়ক দফতর প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরকার ‘মহিলা বিষয়ক’ একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে। নারীরা যাতে যথাযোগ্য মর্যাদা, ধর্মীয়, শাসনতান্ত্রিক ও আইনগত অধিকার এবং আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা গুলো ভোগ করতে পারে, সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে তারা যাতে চাকুরী করতে পারে এবং সর্বোপরি সমাজ ও জাতি গঠনে অবদান রাখতে পারে এ বিষয় গুলো দেখভাল করার লক্ষ্যে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করে এ মন্ত্রণালয়ে একজন নারীকে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী বেগম খালেদা জিয়া মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বর্ধিত করে ‘মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে’ রূপান্তরিত করে। নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ, নারী পাচার রোধ, নারীর নিরাপত্তা এবং সর্বক্ষেত্রে সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হলো মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মূল লক্ষ্য। ১৯৭৮-৮০ সালে জিয়া সরকারের গৃহীত দ্বিবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারী উন্নয়ন বিষয়ক বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। জাতীয় মহিলা সংস্থা ও নারী উন্নয়ন অ্যাকাডেমির তত্ত্বাবধানে নারীদের সেলাই, বুনন, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন এবং মৌচাষ ইত্যাদি নানামুখী প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের কর্ম উপযোগী করে তোলা হয়। বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন নারীদের জন্য বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে নারীদের কল্যাণে আইডিএ ও বিশ্বব্যাংক বেশ কিছু প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে এসেছিলো। শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান নারী শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। শিক্ষিত নারীদের কর্মজীবী নারীতে রূপান্তরিত করার জন্য সরকারী-বেসরকারী খাতে চাকুরীর শূন্য পদে নারীদের জন্য শতকরা ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া’র নেতৃত্বে গঠিত সরকার প্রাথমিক শিক্ষা ও দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত নারীদের লেখা-পড়া অবৈতনিক করে এবং বিশেষ প্রাধিকার প্রদান করা হয়। মাধ্যমিক স্কুলে নারীদের জন্য শতকরা ৫০ ভাগ, সরকারী কলেজের প্রভাষক পদে এক-তৃতীয়াংশ, সরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে টাইপিস্ট ও করণিক পদের শতকরা ৫০ ভাগ, টেলিফোন অপারেটর ও রিসেপশনিস্টের সব পদ এবং থানা পরিবার পরিকল্পনা অফিসারের ২০ শতাংশ পদ নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। মেডিক্যাল কলেজ সমূহের ২০ শতাংশ আসন নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ক্রীড়া অঙ্গনে প্রথম মহিলা ফুটবল প্রতিযোগিতা শুরু করা হয়।

বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীতে আজ যে নারী সদস্যের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায় এর উদ্যোগটি প্রথম নিয়েছিলো শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনিই প্রথম সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা উপেক্ষা করে নারীদের পুলিশ বাহিনী যোগদানের ব্যবস্থা করেছিলো। গ্রামীণ জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শহিদ জিয়া গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী বা ভিডিপি প্রতিষ্ঠা করে। এতেও তিনি নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করেছিলো।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় ৭৬% আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তৈরি পোশাক শিল্পকে রফতানিমুখী শিল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের উদ্ভাবনী চিন্তার ফসল থেকে। এই পোশাক তৈরির খাতে নারী শ্রমিকের অবদানই আজ সবচেয়ে বেশী। এ খাতে কর্মরত প্রায় ৩৫ লাখ শ্রমিকের শতকরা ৯০ ভাগই নারী। নারীদের এ বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি শহিদ জিয়ার দূরদৃষ্টির ফল বলা যেতে পারে।

বাল্যবিয়ে বন্ধ, যৌতুক নিরোধ ও নারী নির্যাতন বন্ধে জিয়াউর রহমান কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এ কাজে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য ও গ্রাম সরকারকে সম্পৃক্ত করা হয়েছিলো। ১৯৮০ সালে জাতীয় সংসদে বিবাহে যৌতুক নিরোধ আইন পাস করা হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের এসব উদ্যোগের ফলে তখন নারীর প্রতি সহিংসতা অনেক কমে গিয়েছিলো। জনসংখ্যা বৃদ্ধি বাংলাদেশের এক নম্বর জাতীয় সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে ১৯৭৬ সালে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে প্রায় ৫৫ হাজার পূর্ণকালীন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলো নারী।

নারীর ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান তাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে। রাজনীতিতে মহিলারা যাতে অধিকহারে সংস্পৃত হতে পারে, সেজন্য নিজের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিতে সে ব্যবস্থা করেছিলো। ১৯৭৮ সালের ২০শে অক্টোবর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির প্রথম সভার বক্তৃতায় তিনি কেন্দ্র, জেলা এবং আরও নিচের পর্যায়ের কমিটিতে নারী সদস্য অন্তর্ভুক্তির কথা বলেছিলো। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলো- ‘বাংলাদেশের প্রত্যেকটি নারী একদিন না একদিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সদস্য হবে’। শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংস্থায় নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের বিকাশ, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা এবং তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সরকারের যোগাযোগ তৈরির জন্য তিনি গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলো।

১১ সদস্যের গ্রাম সরকারে ২টি সদস্য পদ নারীদের জন্য সংরক্ষিত ছিলো। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ২টি এবং ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনে পাঁচটি সদস্য পদ নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। সংরক্ষিত পদের বাইরেও নারীরা সাধারণ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতো। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদে ১০ বছরের জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষণ করা হয়েছিলো। শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমান দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র ৬ নম্বর সংশোধন আদেশ, ১৯৭৮ দ্বারা ১০ বছরের স্থলে ১৫ বছর এবং নারীদের সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ১৫ থেকে বাড়িয়ে ৩০ জন করে। এর বাইরে সংবিধানের ৬৫(২) অনুযায়ী সাধারণ আসনেও নারীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতো। মন্ত্রী পরিষদেও জিয়া নারী সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করেছিলো। ১৯৭০-৭৫ সালের সরকারে নারী মন্ত্রীর সংখ্যা ছিলো মাত্র ২ জন। ১৯৭৬-৮০ সালে জিয়া সরকারের সময় এ সংখ্যা ৬ জনে উন্নীত হয়।

বেগম খালেদা জিয়া’র নেতৃত্বে গঠিত সরকার মহীয়সী নারীদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে সন্মানিত করার জন্য ১৯৯৫ সালে প্রথম “বেগম রোকেয়া পদক” প্রদান শুরু করে। সংসদে সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৩০ থেকে ৫০-এ উন্নতি করে। তার সময়েই মাতৃ মৃত্যুর হার কমে এসেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে বর্তমানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের এসব অবদানকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায়। প্রবণতা দেখা যায় নারীর ক্ষমতায়ন ও মুক্তির প্রশ্নে খালেদা জিয়ার সরকারের অবদানও। কিন্তু ইতিহাস থেকে কারো অবদান জোর করে মুছে দেওয়া যায় না।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরে বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসে। তিনি শুধু বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীই নন, বরং বিশ্বের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রথম নারী সরকার প্রধানদের একজন হয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ আরও বাড়তে শুরু করে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নারী প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা হয়। সেই সঙ্গে শিক্ষা, ক্ষুদ্র ঋণ, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প—সব জায়গায় নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়। মেয়েদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি চালু হওয়ায় স্কুলে তাদের টিকে থাকার হারও অনেক বেড়ে যায়।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া’র সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার পরে দেখা গেছে, নারী নেত্রীদের সক্রিয়তা আরও বেড়েছে। গণমাধ্যম, টিভির টক শো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সব জায়গায় বিএনপি’র নারী নেত্রীদের সরব উপস্থিতি আছে। অনেক তরুণী পেশাজীবীও বিএনপি’র সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এটি দলের ভাবমূর্তিতে আধুনিকতা এবং তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এতো অর্জনের মাঝেও বড় কিছু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

আজও দেখা যায়, বিএনপি’র নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রটি সেই চিরচেনা কয়েকজন নেত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রায় ২০-২২ জন পরিচিত মুখের বাইরে নতুন কোনো মুখ তেমন ভাবে উঠে আসার সুযোগ পাচ্ছে না। অথচ গত ত্রিশ বছরে যারা মাঠ পর্যায়ে এবং বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে দক্ষ তাদের সমন্বয়ে কমপক্ষে আরও ত্রিশজন নতুন নেত্রী তৈরি করা যেতো।

বড় সমস্যার জায়গা হলো, দলের ভেতর যেসব নারী নেত্রী সারা বছর পরিশ্রম করে দল টিকিয়ে রাখছে, তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। পরিচিত মুখ গুলোই বেশী গুরুত্ব পাচ্ছে, যার কারণে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। এটি বিএনপি’র ভবিষ্যতের জন্যই বড় বিপদ। কারণ, নতুন প্রজন্মের ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে হলে নতুন, উদ্যমী, যোগ্য নারী নেতৃত্বের প্রয়োজন।

অঙ্গ-সংগঠনের ক্ষেত্রেও একই সংকট দেখা যায়। জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী যুবদল, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ইত্যাদির নারী শাখা আলাদা করে গঠন করা উচিৎ। এতে করে নতুন নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। এখনো দেখা যায়, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ১১ বছর ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ। নতুন কমিটি না হওয়ায় অনেক যোগ্য নেত্রী হতাশ হয়ে পড়ছে। সময় মতো কমিটি গঠন করা হলে নেতৃত্বের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি হতো এবং তৃণমূল থেকে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসতো।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাতীয় রাজনীতিতে এবং সংসদে নারীদের ভূমিকা আরও সুদৃঢ় করতে বিএনপিকে আন্তরিক হতে হবে। না হলে দেশের ৫২% নারী ভোটার দিন দিন দল থেকে দূরে সরে যেতে পারে। নারীর অংশগ্রহণ শুধু ‘প্রদর্শনীর জন্য’ হলে, তা রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে পারবে না।

সত্যিকার অর্থে বিএনপি’র জন্য সবচেয়ে জরুরী কাজ হলো, পুরনো ছক ভেঙে নতুন নারীদের সুযোগ দেওয়া। নতুন প্রজন্মের নারী নেত্রীদের সামনে আনা ছাড়া বিএনপি’র রাজনীতিতে কোনো সত্যিকারের পরিবর্তন বা নবজাগরণ সম্ভব নয়।

জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে নারীদের এই দীর্ঘ ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনি বর্তমান সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য নতুন নেতৃত্বের বিকাশ এখন সময়ের দাবী।

লেখক:
সমাজ সেবক ও মানবাধিকার কর্মি,
সাবেক ছাত্রদল নেত্রী ইডেন কলেজ শাখা,
সাবেক সহ মহিলা সম্পাদক জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটি।