CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬

শিক্ষকরাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রগতির ঝাণ্ডাবাহক

#
news image

শিক্ষাই মানুষের প্রকৃত মুক্তির পথ। সেই শিক্ষার আলোয় যারা আমাদের অন্তরকে প্রজ্বলিত করেন তারাই শিক্ষক। যাদের সান্নিধ্যে থেকে জগৎকে অনুধাবন করার জ্ঞান লাভ করি এই লেখাতে বলব সেই শিক্ষকদের কথা। শিক্ষক হলো শিক্ষার অক্সিজেন আর শিক্ষার্থীরা হলো প্রাণ। প্রাণ বাঁচাতে যেমন অক্সিজেন প্রয়োজন ঠিক তেমনি শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষতায় প্রয়োজন মানবিক, পেশাগতভাবে দক্ষ, সৎ ও একনিষ্ঠ শিক্ষকের। তাই শিক্ষকদের মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুণ্ন রেখে দেশকে শিক্ষিত ও উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মাণে শিক্ষকের গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষকতা হচ্ছে- পৃথিবীর প্রাচীন পেশাগুলোর একটি। শিক্ষকতা একটি মেধাভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পেশা। এটি শতভাগই একটি স্নায়বিক শ্রমের পেশা। 
একজন মানবসন্তানের বর্ণমালার পরিচিতি থেকে জীবনবোধের শিক্ষা সবকিছুই লাভ করে শিক্ষকের মাধ্যমে। শিক্ষকদের দেখানো পথেই উন্নতির আলো দেখেছি আমি নিজেও। তাই আমার শিক্ষকরা শ্রদ্ধার আসনে রয়ে যাবে আজীবন। কর্মব্যস্ত জীবনে যোগাযোগ নিভে গেলেও কৃতজ্ঞতা জেগে আছে তাদের প্রতি। গুরুত্ব বিবেচনায় শিক্ষকের মর্যাদা ও অধিকার বিশ্বব্যাপী সমুন্নত রাখতে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা- ইউনেসকো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর যৌথ উদ্যোগে ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে একটি সনদ প্রণীত ও গৃহীত হয়। প্রণীত সনদ অনুসরণ ও যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে ‘এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংগঠন গঠিত হয়। ১৬৭টি দেশের ২১০টি জাতীয় সংগঠনের প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ শিক্ষক সদস্যের সমন্বয়ে ১৯৯৩ সালে এ সংগঠনটি গঠিত হয়। ওই সংগঠনের চেষ্টায় ১৯৯৪ সালে ইউনেসকোর ২৬তম অধিবেশনে ইউনেসকোর তদানীন্তন মহাপরিচালক ড. ফ্রেডারিক এম মেয়র ৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালনের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। শিক্ষকের মর্যাদা অনুধাবনপূর্বক শিক্ষকের গুরুত্ব ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেতনতা সৃষ্টিতে পরবর্তী সময়ে প্রতি বছরের ৫ অক্টোবর এই দিবসটি বিশ্বব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। 
২০২৫ সালে দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য হলো- ‘শিক্ষকতাকে একটি সহযোগী পেশা হিসেবে পুনর্গঠন’ করা। বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো দেশের শিক্ষাক্রমের সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষকদের পারস্পরিক সহযোগিতা, পেশাগত উন্নয়ন, মানসিক সুস্থতা এবং পাঠদান পদ্ধতির আধুনিকায়নে। বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায়। দুঃখজনক সত্য হলো- এসব প্রতিষ্ঠানের এন্ট্রি লেভেলের শিক্ষকদের ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ের কোনো ব্যবস্থা এখনও রাষ্ট্র করতে পারেনি। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোতে যে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয় সেটাও সবার জন্য সুযোগ হয়ে উঠে না। সুতরাং দেশের ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষকরা যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদানে নিয়োজিত হতে বাধ্য হন। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৫.৮ লাখ শিক্ষক রয়েছেন। 
যথাযথ প্রশিক্ষণ নিয়ে এই শিক্ষকরা পাঠদানে নিয়োজিত হতে পারলে পেশাগত দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়বে, যা সরাসরি শিক্ষণ শিখন প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসটি প্রথমবারের মতো প্যারিসে ইউনেসকোর সদর দফতরে অনুষ্ঠিত না হয়ে ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় আফ্রিকান ইউনিয়নের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত হবে। যা প্যান-আফ্রিকান কনফারেন্স অন টিচার এডুকেশনের অংশ। এই স্থান নির্বাচনটি আফ্রিকার মহাদেশীয় শিক্ষা কৌশল এবং আফ্রিকান এডুকেশনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা শিক্ষাকে টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি নতুন বৈশ্বিক এবং মহাদেশীয় প্রতিশ্রুতিকে তুলে ধরবে। এখানে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল অনুষ্ঠানেও ‘বিচ্ছিন্নতা থেকে সম্মিলিত শক্তিতে : সহযোগিতার দৃষ্টিতে শিক্ষকতা পেশার পুনর্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা হবে। এই বৈশ্বিক আলোচনা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
একজন শিক্ষার্থীর জীবনে শিক্ষকের প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ শিক্ষকই পারেন তার ছাত্রকে নিশ্চিতরূপে আদর্শগতভাবে রূপান্তর করতে। একজন যথার্থ শিক্ষকই পারেন তার ছাত্রের মধ্যে যথাযথ মনন, বুদ্ধি চিন্তাকে বাস্তবরূপে প্রতিফলিত করতে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে চলমান নৈরাজ্য, ভয়াবহ রক্তক্ষয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিঘ্ন হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ। রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর ক্ষমতা প্রদর্শনের তাণ্ডবলীলা কলুষিত করছে পঠন-পাঠনের সুস্থ পরিবেশ। ‘ছাত্রনং অধ্যয়নং তপঃ’এই প্রবাদটি যেন অতীত। সাম্প্রতিক সময়ে মবের সংস্কৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সৃষ্টি করেছে নিরাপত্তাহীনতার নতুন পরিবেশ। সমাজের প্রতি একজন শিক্ষকের কিছু কাজ ও দায়বদ্ধতা আছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষক শুধু সফল নয়, একজন ভালো মানুষ হতে শেখান। 
কিন্তু সেই শিক্ষক সমাজই জীবনভর এই সমাজ তথা রাষ্ট্রের দ্বারা অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত ও অবহেলিত। তা সত্ত্বেও নীতি-নৈতিকতার দায়বোধ থেকে এই বৈষম্য ও অবহেলাকে শিক্ষক সমাজ প্রকৃতি প্রসূত ঔদার্য থেকে মেনে নিয়েছে। একজন শিক্ষকের বিত্তহীন অনাড়ম্বর সরল জীবন হয়তো সমাজকে মুগ্ধ করে। কিন্তু যখন সেই শিক্ষক সমাজের অন্যসব পেশাজীবীদের সঙ্গে একই বাজারে বিকিকিনি করতে যায়। তখন কিন্তু শিক্ষকের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠে। কারণ পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তির অর্থনৈতিক মর্যাদার সঙ্গে সামাজিক মর্যাদা জড়িত। 
ফলে ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থা ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। শিক্ষক হওয়ার সুবাধে এই অভিজ্ঞতা আমার প্রকট। আমার একজন সহকারী অধ্যাপক সহকর্মী যিনি ঠাট্টার সুরে বলেন, প্রতি মাসের শুরুতে বুঝতে পারেন তিনি একজন এমপিওভুক্ত মাস্টার। ঘাড়ের ওপর অসংখ্য কর্তাবাবু, কিন্তু মাসের বেতনের যে তথৈবচ অবস্থা তাতে করে নীতিনৈতিকতা বজায় রেখে এ সমাজে জীবনযাপন করা অনেক কঠিন। কোনো পেশাজীবী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মর্যাদা নির্ণীত হয় এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক মানদণ্ডের ওপর। শিক্ষকদের চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো দুটি মৌলিক চাহিদার প্রদেয় ভাতা যথাক্রমে মাত্র ৫০০ টাকা ও ১০০০ টাকা, যা শুধু বিস্ময়করই নয়, লজ্জাকরও বটে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও আমাদের দেশে শিক্ষকদের অর্থনৈতিক মর্যাদা তো নেই-ই, সামাজিক মর্যাদাও নেই। 
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ১৮৯টি সদস্য দেশের মধ্যে অর্থনীতির সক্ষমতার তুলনায় শিক্ষা খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেয় যে ১০টি দেশ, বাংলাদেশ তার একটি। দক্ষিণ এশিয়ায় জিডিপির বিপরীতে শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে ভুটান। দেশটিতে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ মোট জিডিপির ৮ দশমিক ১ শতাংশ। ভারত ও মালদ্বীপে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। আমাদের দেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশেরও কম। শিক্ষা খাতের বিভিন্ন দায় মিটিয়ে উল্লেখিত বরাদ্দের কতটুকুইবা শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় হয় তা অবস্থাদৃষ্টে সহজেই অনুমেয়। এত বঞ্চনা পরেও আবার ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দেয় রাজনৈতিক নোংরা হস্তক্ষেপ।
সময়ের পরিক্রমায় যখন রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হয় তখন একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী স্বার্থান্বেষী মহল দ্বারা দেশব্যাপী নজিরবিহীন হেনস্থার শিকার হতে হয় শিক্ষকদের। আমাদের কর্তাব্যক্তিরা রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক সমাজকে কী পরিমাণ লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত করতে চায় তার একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হলো- এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পেনশনের টাকা তছরুপ করা। বাংলাদেশে আর কোনো পেশাজীবীকে এভাবে নিজের বেতনের টাকা রাষ্ট্রকে দিয়ে যথাসময়ে প্রাপ্তিতে ভুগতে হয় বলে মনে হয় না। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য জমানো ৬ হাজার কোটি টাকা যে ব্যাংকে রাখা হয়েছিল, সেটি দেউলিয়া হওয়ায় শিক্ষকদের সঞ্চয়ের কোনো টাকা এখন আর নেই। কিন্তু এই টাকা সেই ব্যাংকে জমা রাখার সিদ্ধান্ত পুরোটাই অযৌক্তিক ও লুটপাট করার ঘটনাটি পরিকল্পিত। শিক্ষক সমাজকে ভুখা রেখে সমৃদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। যতদিন পর্যন্ত শিক্ষকদের অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে না ততদিন পর্যন্ত মানসম্মত সুশিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। শিক্ষকতা একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। 
স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫৪ বছরে কত সরকার এলো আর গেল, কিন্তু শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে আকর্ষণীয় করার জন্য কেউই আন্তরিকতা দেখায়নি। উপরন্তু অনেক মন্ত্রী ও কর্তাব্যক্তিই শিক্ষকদের নিয়ে নানা সময়ে নানাবিধ অপ্রীতিকর মন্তব্য করেছেন। এ কারণে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় না। যে শিক্ষকের পুরো কর্মজীবনটাই রাষ্ট্রের একটি সম্পদ, সেই সম্পদকে কাজে লাগাতে না পারলে এর ব্যর্থতার দায়ভার রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।
শিক্ষক দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক গুণী শিক্ষক সম্মাননা প্রদান করা হয়। আশা করি সম্মাননা প্রদানের পাশাপাশি দেশের সব শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কমিশন গঠনপূর্বক উপযুক্ত সম্মানীর ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি হয়ে গেছে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে একটাই প্রত্যাশা- সমৃদ্ধ হোক আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থা। সুনিশ্চিত হোক আমাদের আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যৎ।

মো. তাহমিদ রহমান

০৫ অক্টোবর, ২০২৫,  6:26 PM

news image

শিক্ষাই মানুষের প্রকৃত মুক্তির পথ। সেই শিক্ষার আলোয় যারা আমাদের অন্তরকে প্রজ্বলিত করেন তারাই শিক্ষক। যাদের সান্নিধ্যে থেকে জগৎকে অনুধাবন করার জ্ঞান লাভ করি এই লেখাতে বলব সেই শিক্ষকদের কথা। শিক্ষক হলো শিক্ষার অক্সিজেন আর শিক্ষার্থীরা হলো প্রাণ। প্রাণ বাঁচাতে যেমন অক্সিজেন প্রয়োজন ঠিক তেমনি শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষতায় প্রয়োজন মানবিক, পেশাগতভাবে দক্ষ, সৎ ও একনিষ্ঠ শিক্ষকের। তাই শিক্ষকদের মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুণ্ন রেখে দেশকে শিক্ষিত ও উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মাণে শিক্ষকের গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষকতা হচ্ছে- পৃথিবীর প্রাচীন পেশাগুলোর একটি। শিক্ষকতা একটি মেধাভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পেশা। এটি শতভাগই একটি স্নায়বিক শ্রমের পেশা। 
একজন মানবসন্তানের বর্ণমালার পরিচিতি থেকে জীবনবোধের শিক্ষা সবকিছুই লাভ করে শিক্ষকের মাধ্যমে। শিক্ষকদের দেখানো পথেই উন্নতির আলো দেখেছি আমি নিজেও। তাই আমার শিক্ষকরা শ্রদ্ধার আসনে রয়ে যাবে আজীবন। কর্মব্যস্ত জীবনে যোগাযোগ নিভে গেলেও কৃতজ্ঞতা জেগে আছে তাদের প্রতি। গুরুত্ব বিবেচনায় শিক্ষকের মর্যাদা ও অধিকার বিশ্বব্যাপী সমুন্নত রাখতে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা- ইউনেসকো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর যৌথ উদ্যোগে ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে একটি সনদ প্রণীত ও গৃহীত হয়। প্রণীত সনদ অনুসরণ ও যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে ‘এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংগঠন গঠিত হয়। ১৬৭টি দেশের ২১০টি জাতীয় সংগঠনের প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ শিক্ষক সদস্যের সমন্বয়ে ১৯৯৩ সালে এ সংগঠনটি গঠিত হয়। ওই সংগঠনের চেষ্টায় ১৯৯৪ সালে ইউনেসকোর ২৬তম অধিবেশনে ইউনেসকোর তদানীন্তন মহাপরিচালক ড. ফ্রেডারিক এম মেয়র ৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালনের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। শিক্ষকের মর্যাদা অনুধাবনপূর্বক শিক্ষকের গুরুত্ব ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেতনতা সৃষ্টিতে পরবর্তী সময়ে প্রতি বছরের ৫ অক্টোবর এই দিবসটি বিশ্বব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। 
২০২৫ সালে দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য হলো- ‘শিক্ষকতাকে একটি সহযোগী পেশা হিসেবে পুনর্গঠন’ করা। বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো দেশের শিক্ষাক্রমের সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষকদের পারস্পরিক সহযোগিতা, পেশাগত উন্নয়ন, মানসিক সুস্থতা এবং পাঠদান পদ্ধতির আধুনিকায়নে। বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায়। দুঃখজনক সত্য হলো- এসব প্রতিষ্ঠানের এন্ট্রি লেভেলের শিক্ষকদের ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ের কোনো ব্যবস্থা এখনও রাষ্ট্র করতে পারেনি। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোতে যে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয় সেটাও সবার জন্য সুযোগ হয়ে উঠে না। সুতরাং দেশের ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষকরা যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদানে নিয়োজিত হতে বাধ্য হন। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৫.৮ লাখ শিক্ষক রয়েছেন। 
যথাযথ প্রশিক্ষণ নিয়ে এই শিক্ষকরা পাঠদানে নিয়োজিত হতে পারলে পেশাগত দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়বে, যা সরাসরি শিক্ষণ শিখন প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসটি প্রথমবারের মতো প্যারিসে ইউনেসকোর সদর দফতরে অনুষ্ঠিত না হয়ে ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় আফ্রিকান ইউনিয়নের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত হবে। যা প্যান-আফ্রিকান কনফারেন্স অন টিচার এডুকেশনের অংশ। এই স্থান নির্বাচনটি আফ্রিকার মহাদেশীয় শিক্ষা কৌশল এবং আফ্রিকান এডুকেশনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা শিক্ষাকে টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি নতুন বৈশ্বিক এবং মহাদেশীয় প্রতিশ্রুতিকে তুলে ধরবে। এখানে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল অনুষ্ঠানেও ‘বিচ্ছিন্নতা থেকে সম্মিলিত শক্তিতে : সহযোগিতার দৃষ্টিতে শিক্ষকতা পেশার পুনর্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা হবে। এই বৈশ্বিক আলোচনা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
একজন শিক্ষার্থীর জীবনে শিক্ষকের প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ শিক্ষকই পারেন তার ছাত্রকে নিশ্চিতরূপে আদর্শগতভাবে রূপান্তর করতে। একজন যথার্থ শিক্ষকই পারেন তার ছাত্রের মধ্যে যথাযথ মনন, বুদ্ধি চিন্তাকে বাস্তবরূপে প্রতিফলিত করতে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে চলমান নৈরাজ্য, ভয়াবহ রক্তক্ষয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিঘ্ন হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ। রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর ক্ষমতা প্রদর্শনের তাণ্ডবলীলা কলুষিত করছে পঠন-পাঠনের সুস্থ পরিবেশ। ‘ছাত্রনং অধ্যয়নং তপঃ’এই প্রবাদটি যেন অতীত। সাম্প্রতিক সময়ে মবের সংস্কৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সৃষ্টি করেছে নিরাপত্তাহীনতার নতুন পরিবেশ। সমাজের প্রতি একজন শিক্ষকের কিছু কাজ ও দায়বদ্ধতা আছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষক শুধু সফল নয়, একজন ভালো মানুষ হতে শেখান। 
কিন্তু সেই শিক্ষক সমাজই জীবনভর এই সমাজ তথা রাষ্ট্রের দ্বারা অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত ও অবহেলিত। তা সত্ত্বেও নীতি-নৈতিকতার দায়বোধ থেকে এই বৈষম্য ও অবহেলাকে শিক্ষক সমাজ প্রকৃতি প্রসূত ঔদার্য থেকে মেনে নিয়েছে। একজন শিক্ষকের বিত্তহীন অনাড়ম্বর সরল জীবন হয়তো সমাজকে মুগ্ধ করে। কিন্তু যখন সেই শিক্ষক সমাজের অন্যসব পেশাজীবীদের সঙ্গে একই বাজারে বিকিকিনি করতে যায়। তখন কিন্তু শিক্ষকের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠে। কারণ পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তির অর্থনৈতিক মর্যাদার সঙ্গে সামাজিক মর্যাদা জড়িত। 
ফলে ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থা ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। শিক্ষক হওয়ার সুবাধে এই অভিজ্ঞতা আমার প্রকট। আমার একজন সহকারী অধ্যাপক সহকর্মী যিনি ঠাট্টার সুরে বলেন, প্রতি মাসের শুরুতে বুঝতে পারেন তিনি একজন এমপিওভুক্ত মাস্টার। ঘাড়ের ওপর অসংখ্য কর্তাবাবু, কিন্তু মাসের বেতনের যে তথৈবচ অবস্থা তাতে করে নীতিনৈতিকতা বজায় রেখে এ সমাজে জীবনযাপন করা অনেক কঠিন। কোনো পেশাজীবী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মর্যাদা নির্ণীত হয় এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক মানদণ্ডের ওপর। শিক্ষকদের চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো দুটি মৌলিক চাহিদার প্রদেয় ভাতা যথাক্রমে মাত্র ৫০০ টাকা ও ১০০০ টাকা, যা শুধু বিস্ময়করই নয়, লজ্জাকরও বটে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও আমাদের দেশে শিক্ষকদের অর্থনৈতিক মর্যাদা তো নেই-ই, সামাজিক মর্যাদাও নেই। 
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ১৮৯টি সদস্য দেশের মধ্যে অর্থনীতির সক্ষমতার তুলনায় শিক্ষা খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেয় যে ১০টি দেশ, বাংলাদেশ তার একটি। দক্ষিণ এশিয়ায় জিডিপির বিপরীতে শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে ভুটান। দেশটিতে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ মোট জিডিপির ৮ দশমিক ১ শতাংশ। ভারত ও মালদ্বীপে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। আমাদের দেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশেরও কম। শিক্ষা খাতের বিভিন্ন দায় মিটিয়ে উল্লেখিত বরাদ্দের কতটুকুইবা শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় হয় তা অবস্থাদৃষ্টে সহজেই অনুমেয়। এত বঞ্চনা পরেও আবার ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দেয় রাজনৈতিক নোংরা হস্তক্ষেপ।
সময়ের পরিক্রমায় যখন রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হয় তখন একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী স্বার্থান্বেষী মহল দ্বারা দেশব্যাপী নজিরবিহীন হেনস্থার শিকার হতে হয় শিক্ষকদের। আমাদের কর্তাব্যক্তিরা রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক সমাজকে কী পরিমাণ লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত করতে চায় তার একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হলো- এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পেনশনের টাকা তছরুপ করা। বাংলাদেশে আর কোনো পেশাজীবীকে এভাবে নিজের বেতনের টাকা রাষ্ট্রকে দিয়ে যথাসময়ে প্রাপ্তিতে ভুগতে হয় বলে মনে হয় না। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য জমানো ৬ হাজার কোটি টাকা যে ব্যাংকে রাখা হয়েছিল, সেটি দেউলিয়া হওয়ায় শিক্ষকদের সঞ্চয়ের কোনো টাকা এখন আর নেই। কিন্তু এই টাকা সেই ব্যাংকে জমা রাখার সিদ্ধান্ত পুরোটাই অযৌক্তিক ও লুটপাট করার ঘটনাটি পরিকল্পিত। শিক্ষক সমাজকে ভুখা রেখে সমৃদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। যতদিন পর্যন্ত শিক্ষকদের অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে না ততদিন পর্যন্ত মানসম্মত সুশিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। শিক্ষকতা একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। 
স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫৪ বছরে কত সরকার এলো আর গেল, কিন্তু শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে আকর্ষণীয় করার জন্য কেউই আন্তরিকতা দেখায়নি। উপরন্তু অনেক মন্ত্রী ও কর্তাব্যক্তিই শিক্ষকদের নিয়ে নানা সময়ে নানাবিধ অপ্রীতিকর মন্তব্য করেছেন। এ কারণে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় না। যে শিক্ষকের পুরো কর্মজীবনটাই রাষ্ট্রের একটি সম্পদ, সেই সম্পদকে কাজে লাগাতে না পারলে এর ব্যর্থতার দায়ভার রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।
শিক্ষক দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক গুণী শিক্ষক সম্মাননা প্রদান করা হয়। আশা করি সম্মাননা প্রদানের পাশাপাশি দেশের সব শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কমিশন গঠনপূর্বক উপযুক্ত সম্মানীর ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি হয়ে গেছে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে একটাই প্রত্যাশা- সমৃদ্ধ হোক আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থা। সুনিশ্চিত হোক আমাদের আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যৎ।