ড. রাধেশ্যাম সরকার
১৬ অক্টোবর, ২০২৫, 5:06 PM
বাংলাদেশ প্রকৃতির এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। নদী, খাল, বিল, হাওর-বাঁওড়ের বুকে লুকিয়ে আছে অনন্য সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের রূপকথা। সেই রূপকথার উজ্জ্বল নিদর্শন বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার সাতলার বিল। দশ হাজারের একরের বেশী বিস্তৃত এই জলাভূমি শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্যপট নয়, বরং বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য, গ্রামীণ অর্থনীতি ও পর্যটনের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। লাখো লাল শাপলার সমারোহ ভোরের আলোয় প্রকৃতিকে রঙিন জলরঙের ছবিতে রূপান্তরিত করে। এই শাপলা যেমন স্থানীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, তেমনি পর্যটনের নতুন সম্ভাবনাও উন্মোচন করে। বরিশাল সদর থেকে প্রায় ৪৬ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নে এই শাপলারাজ্যের অবস্থান। গ্রামের নামেই বিলে নাম “সাতলা বিল”। তবে শাপলার অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে আজ এটি সবার কাছে পরিচিত “শাপলার বিল” নামে। এই বিলে প্রতি বর্ষা-শরৎ মৌসুমে দিগন্তজোড়া লাল, নীল ও সাদা শাপলায় রঙিন চিত্রকর্মে রূপ নেয়। সন্ধ্যা নদীর প্লাবন ভূমিটি জুলাই মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত শাপলায় ভরে ওঠে, আর এই শাপলারাজ্যের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো।
শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল, স্বাধীনতার প্রতীক এবং একটি ভাসমান জলজ উদ্ভিদ। বাংলায় শাপলা, ইংরেজিতে Water Lily এবং বৈজ্ঞানিক নাম Nymphaea nouchali (কিছু ক্ষেত্রে Nymphaea stellata নামও ব্যবহৃত হয়)। এটি Nymphaeaceae পরিবারভুক্ত ও Nymphaeales বর্গের অন্তর্গত। শাপলা মূলত শান্ত পানির বিল, হাওর, খাল ও নদীতে জন্মায়। এর শ্বাসমূল কাদায় প্রোথিত থাকে, যেখান থেকে নতুন কাণ্ড ও পাতা গজায়। পাতাগুলো বড়, গোলাকার ও ছাতার মতো পানির ওপরে ভেসে থাকে, ব্যাস ১৫ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার। শাপলার ফুল এককভাবে পানির ওপরে ফোটে, ব্যাস ৫ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার, রঙ লাল, সাদা বা বেগুনি। প্রতিটি ফুলে ১০–২০টি পাপড়ি ও কেন্দ্রে অসংখ্য হলুদ পুংকেশর থাকে। সকালে ফুল মেলে ধরে, দুপুরের পর ধীরে বন্ধ হয়। ফল মাংসল ও গোলাকার, যা পানির নিচে তৈরি হয় এবং পাকলে ভেঙে বীজ পানিতে ছড়ায়। ডিম্বাকার বীজ ভেসে দূরে গিয়ে সহজেই বিস্তার ঘটায়। শাপলার বিস্তার বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিসরে, বিশেষত এশিয়া, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে।
বাংলাদেশের প্রায় সব জেলার জলাভূমিতেই শাপলার বিস্তার দেখা যায়। বিশেষত গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, বরিশাল, মাদারীপুর, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার অসংখ্য বিল ও হাওরে শাপলার আধিক্য লক্ষণীয়। এর মধ্যে টাঙ্গাইলের চাম্পাটিয়া বিল, নেত্রকোনার চন্দ্রনাথপুর বিল, কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওর, সুনামগঞ্জের টেকেরঘাট বিল এবং গোপালগঞ্জের হরিদাসপুর বিল শাপলার সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের জরিপ অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৭৫ হাজার হেক্টর জলাভূমিতে শাপলা জন্মে, যার বার্ষিক বাজারমূল্য আনুমানিক ৭০–৮০ কোটি টাকা। খাদ্য হিসেবে শাপলার ডাঁটা, পাতা ও বীজ দেশজুড়ে জনপ্রিয়; গ্রামীণ বাজারে দৈনিক গড়ে ৩০০–৪০০ টন শাপলা বিক্রি হয়, যা সরাসরি ৫০ হাজারেরও বেশি পরিবারকে মৌসুমি কর্মসংস্থান দেয়। একই সঙ্গে শাপলাভিত্তিক পর্যটন শিল্পও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে; বরিশালের সাতলা, নেত্রকোনার গুমাই বিল ও টাঙ্গাইলের চাম্পাটিয়া বিলে প্রতি মৌসুমে প্রায় পাঁচ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন, যেখান থেকে স্থানীয়রা আয় করেন প্রায় ২৫–৩০ কোটি টাকা। শাপলাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, যেমন নৌকা ভাড়া, ফুল বিক্রি, স্থানীয় খাবার সরবরাহ, ফটোশুট ও হস্তশিল্প উৎপাদন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিলে পর্যটন অবকাঠামো ও সংরক্ষণ উদ্যোগ বাড়ানো গেলে বছরে ১০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হতে পারে। তাই শাপলা শুধু একটি ফুল নয়, বরং এটি গ্রামীণ জীবিকা, সংস্কৃতি ও পর্যটনের মিলিত প্রতীক—যা বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে নীরব ভূমিকা রাখছে।
শাপলা শুধু জাতীয় ফুল নয়, বরং বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতির প্রতীক। সাতলার বিলে লাল শাপলার বিস্তার প্রকৃতিকে রক্তিম চাদরে মুড়ে দেয়। ভোরের কুয়াশা কাটলে হাজারো শাপলা একসঙ্গে পাপড়ি মেলে ধরে, সবুজ পাতার ভেতর থেকে লাজুক অথচ গর্বিত রূপে উঁকি দেয়। বর্ষা ও শরৎকাল শাপলার সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠ ঋতু; সকাল ছয়টা থেকে দশটা পর্যন্ত এর পূর্ণ বিকাশ ঘটে। দুপুরের পর পাপড়ি বন্ধ হতে শুরু করে। তাই ভোরের সময়ই দর্শনের সেরা মুহূর্ত। বাংলা সাহিত্য, কবিতা ও লোকগানে শাপলা প্রেম, পবিত্রতা ও লাজুকতার প্রতীক হিসেবে চিরস্থায়ী, আর সাতলার বিল যেন তারই জীবন্ত রূপকথা।
সাতলার বিল শুধু নান্দনিক সৌন্দর্য নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতিরও নির্ভরযোগ্য ভরসা। এ সময়টায় কৃষিকাজ না থাকায় কৃষিজীবী পরিবারগুলোর কাছে শাপলা যেন আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয়। বিলের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এখানকার অসংখ্য পরিবার শাপলানির্ভর কর্মযজ্ঞ করে জীবিকা নির্বাহ করে। কেউ শাপলা তুলে, কেউ মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে, আবার কেউ নৌকায় পর্যটক ভ্রমণে সহযোগিতা করে। ফলে বছরের এই মৌসুমে সাতলার জনপদজুড়ে নেমে আসে এক উৎসবমুখর আবহ।
ভোর থেকে শুরু হয় পারিবারিক কর্মব্যস্ততা। কেউ বৈঠা চালিয়ে বিল থেকে শাপলা তোলে, কেউ নৌকায় বসে আঁটি বাঁধে, আবার কেউ সকালের বাজারে নিয়ে যায় বিক্রির জন্য। স্থানীয় বাজারে প্রতিটি শাপলার আঁটি বিক্রি হয় ৮ থেকে ১০ টাকায়। কৃষক পরিবারের জন্য শাপলা মৌসুমি আয়ের বড় ভরসা। প্রতিটি নৌকা দিনে গড়ে ১০০–১৫০ কেজি সংগ্রহ করে, যা প্রতিকেজি ২০–৩০ টাকা দরে বিক্রি হলে পরিবারপ্রতি দৈনিক আয় দাঁড়ায় ৩০০০–৪০০০ টাকা। নারীর অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য অনেক নারী ঘরে বসে ডাঁটা পরিষ্কার করে বাজারে পাঠান। এতে তারা আর্থিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং আত্মনির্ভরতা অর্জন করেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জল্লা ইউনিয়নের হারতা, বাগদা, কারফা, সাতলা, পশ্চিম কালবিলাসসহ ৭–৮টি গ্রামের অসংখ্য পরিবারের জীবিকা চলে শাপলা সংগ্রহ ও বিক্রির মাধ্যমে। এ অঞ্চলে বড়-ছোট প্রায় ২০টি বিল রয়েছে। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস এই বিল পানিতে ভরা থাকে। ডিসেম্বরের শুরুতে যখন পানি কমে যায়, তখন শাপলা শুকিয়ে যায় এবং কৃষকরা একই জমিতে ধান চাষ করেন। ফলে সাতলার বিল একদিকে ধান উৎপাদনের ক্ষেত্র, অন্যদিকে শাপলার স্বর্গরাজ্য। শাপলার বীজ মাটির সঙ্গে মিশে থেকে যায়, আর বর্ষার পানিতে আবার সজীব হয়ে ওঠে। পানি জমলে মাছ চাষ হয়, আর শীতকালে কৃষিজীবীরা দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। এভাবেই সারা বছর সাতলা বিলের ওপর নির্ভরশীল থাকেন স্থানীয় মানুষ।
গত এক দশকে সাতলার বিল দ্রুত পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখানে তোলা ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় পরিচিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোরের আলোয় বিস্তীর্ণ লাল শাপলার সমাহারকে অনেকে “বাংলাদেশের লাল শাপলার সমুদ্র” বলে আখ্যায়িত করেন। নৌভ্রমণের অভিজ্ঞতা এখানে অন্যতম আকর্ষণ। ছোট নৌকা ভাড়া করে পর্যটকরা শাপলায় ঘেরা জলে ভেসে বেড়ান, প্রকৃতির বুকে স্বপ্নময় অনুভূতি উপভোগ করেন। ফটোগ্রাফি ও মিডিয়ার প্রভাবও পর্যটনের চালিকাশক্তি। শাপলার বিলে ফটোশুট, ভ্রমণচিত্র বা ভিডিওগ্রাফি এখন বিশেষ আকর্ষণ। শুধু শাপলাই নয়, শীতকালে বিল ভরে ওঠে অসংখ্য পরিযায়ী পাখিতে, যা প্রকৃতিপ্রেমী ও পাখিপ্রেমীদের জন্য বাড়তি আনন্দের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক পর্যটক বিলে আসেন, বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার এ সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। স্থানীয় তরুণ-যুবকরা পর্যটকদের গাইডিং, নৌকা ভাড়া, খাবার পরিবেশনসহ নানা সেবায় যুক্ত হয়ে মৌসুমি আয় করছেন।
তবে এখানে ভ্রমণকারীদের জন্য বড় সীমাবদ্ধতা হলো, বিলে কিংবা আশপাশে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। দর্শনার্থীরা সাধারণত শুকনো খাবার সঙ্গে নিয়ে আসেন বা স্থানীয় বাড়িতে রান্নার ব্যবস্থা করে নেন। আশেপাশে কোনো হোটেল, রেস্টুরেন্ট কিংবা পাবলিক টয়লেট না থাকায় অনেকেই সমস্যায় পড়েন। স্থানীয় প্রশাসন ইতিমধ্যেই সৌন্দর্য সংরক্ষণ ও প্রাথমিক অবকাঠামো উন্নয়নে পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে আরও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
শাপলার বিল পর্যটনশিল্পের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র। পর্যটনের বিকাশ ঘটলে স্থানীয় কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলবে যেমন নৌকা চালনা, গাইডিং, খাবার বিক্রি থেকে বিশ্রামাগার তৈরির মতো নানা খাতে মানুষ যুক্ত হতে পারবে। পরিকল্পিতভাবে সাতলার বিলকে ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে এটি আন্তর্জাতিক মানচিত্রে বাংলাদেশের পর্যটনের পরিচিতি বাড়াতে সক্ষম হবে। পর্যটক সংখ্যা বাড়লে হোটেল-রেস্টুরেন্ট, পরিবহন ও হস্তশিল্প ব্যবসায়ীদের আয়ও বাড়বে, যা পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে। পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি, লোকগান ও খাদ্যসংস্কৃতির প্রচারও বৃদ্ধি পাবে।
শাপলার বিল জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল, যেখানে মাছ, ব্যাঙ, শামুক, জলজ কীটপতঙ্গ ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পর্যটকদের অসচেতন আচরণে বিলে প্লাস্টিক ও আবর্জনা জমছে, অতিরিক্ত শাপলা আহরণ প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে, কৃষিজমির কীটনাশক পানিতে মিশে ফুল ও প্রাণীর ক্ষতি করছে। বৈঠা ও লগির আঘাতে শাপলার কাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির স্তর ওঠানামা করে শাপলার বৃদ্ধি হুমকির মুখে পড়ছে।
শাপলার বিলকে ঘিরে অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি। পর্যটকদের জন্য আচরণবিধি তৈরি, সীমিত নৌভ্রমণ নিশ্চিত করা ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো অত্যন্ত জরুরি। শাপলার বিলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সংরক্ষণ প্রকল্প হাতে নেওয়া দরকার। উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা গেলে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি সম্পদ সংরক্ষণেও উৎসাহী হবেন।
উজিরপুরের সাতলার বিলের শাপলা শুধু প্রকৃতির বিস্ময় নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি, পর্যটনের সম্ভাবনার কেন্দ্র এবং জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। ভোরবেলার শাপলার সমারোহ যেমন হৃদয় জুড়ে শান্তি আনে, তেমনি কৃষক-শ্রমিকের জীবনে আয় ও আশার আলো জ্বালায়। সঠিক পরিকল্পনা, সচেতনতা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এই বিল জাতীয় সম্পদে রূপ নিতে পারে এবং বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায় যোগ করতে সক্ষম হবে। লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।
ড. রাধেশ্যাম সরকার
১৬ অক্টোবর, ২০২৫, 5:06 PM
বাংলাদেশ প্রকৃতির এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। নদী, খাল, বিল, হাওর-বাঁওড়ের বুকে লুকিয়ে আছে অনন্য সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের রূপকথা। সেই রূপকথার উজ্জ্বল নিদর্শন বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার সাতলার বিল। দশ হাজারের একরের বেশী বিস্তৃত এই জলাভূমি শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্যপট নয়, বরং বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য, গ্রামীণ অর্থনীতি ও পর্যটনের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। লাখো লাল শাপলার সমারোহ ভোরের আলোয় প্রকৃতিকে রঙিন জলরঙের ছবিতে রূপান্তরিত করে। এই শাপলা যেমন স্থানীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, তেমনি পর্যটনের নতুন সম্ভাবনাও উন্মোচন করে। বরিশাল সদর থেকে প্রায় ৪৬ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নে এই শাপলারাজ্যের অবস্থান। গ্রামের নামেই বিলে নাম “সাতলা বিল”। তবে শাপলার অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে আজ এটি সবার কাছে পরিচিত “শাপলার বিল” নামে। এই বিলে প্রতি বর্ষা-শরৎ মৌসুমে দিগন্তজোড়া লাল, নীল ও সাদা শাপলায় রঙিন চিত্রকর্মে রূপ নেয়। সন্ধ্যা নদীর প্লাবন ভূমিটি জুলাই মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত শাপলায় ভরে ওঠে, আর এই শাপলারাজ্যের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো।
শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল, স্বাধীনতার প্রতীক এবং একটি ভাসমান জলজ উদ্ভিদ। বাংলায় শাপলা, ইংরেজিতে Water Lily এবং বৈজ্ঞানিক নাম Nymphaea nouchali (কিছু ক্ষেত্রে Nymphaea stellata নামও ব্যবহৃত হয়)। এটি Nymphaeaceae পরিবারভুক্ত ও Nymphaeales বর্গের অন্তর্গত। শাপলা মূলত শান্ত পানির বিল, হাওর, খাল ও নদীতে জন্মায়। এর শ্বাসমূল কাদায় প্রোথিত থাকে, যেখান থেকে নতুন কাণ্ড ও পাতা গজায়। পাতাগুলো বড়, গোলাকার ও ছাতার মতো পানির ওপরে ভেসে থাকে, ব্যাস ১৫ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার। শাপলার ফুল এককভাবে পানির ওপরে ফোটে, ব্যাস ৫ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার, রঙ লাল, সাদা বা বেগুনি। প্রতিটি ফুলে ১০–২০টি পাপড়ি ও কেন্দ্রে অসংখ্য হলুদ পুংকেশর থাকে। সকালে ফুল মেলে ধরে, দুপুরের পর ধীরে বন্ধ হয়। ফল মাংসল ও গোলাকার, যা পানির নিচে তৈরি হয় এবং পাকলে ভেঙে বীজ পানিতে ছড়ায়। ডিম্বাকার বীজ ভেসে দূরে গিয়ে সহজেই বিস্তার ঘটায়। শাপলার বিস্তার বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিসরে, বিশেষত এশিয়া, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে।
বাংলাদেশের প্রায় সব জেলার জলাভূমিতেই শাপলার বিস্তার দেখা যায়। বিশেষত গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, বরিশাল, মাদারীপুর, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার অসংখ্য বিল ও হাওরে শাপলার আধিক্য লক্ষণীয়। এর মধ্যে টাঙ্গাইলের চাম্পাটিয়া বিল, নেত্রকোনার চন্দ্রনাথপুর বিল, কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওর, সুনামগঞ্জের টেকেরঘাট বিল এবং গোপালগঞ্জের হরিদাসপুর বিল শাপলার সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের জরিপ অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৭৫ হাজার হেক্টর জলাভূমিতে শাপলা জন্মে, যার বার্ষিক বাজারমূল্য আনুমানিক ৭০–৮০ কোটি টাকা। খাদ্য হিসেবে শাপলার ডাঁটা, পাতা ও বীজ দেশজুড়ে জনপ্রিয়; গ্রামীণ বাজারে দৈনিক গড়ে ৩০০–৪০০ টন শাপলা বিক্রি হয়, যা সরাসরি ৫০ হাজারেরও বেশি পরিবারকে মৌসুমি কর্মসংস্থান দেয়। একই সঙ্গে শাপলাভিত্তিক পর্যটন শিল্পও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে; বরিশালের সাতলা, নেত্রকোনার গুমাই বিল ও টাঙ্গাইলের চাম্পাটিয়া বিলে প্রতি মৌসুমে প্রায় পাঁচ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন, যেখান থেকে স্থানীয়রা আয় করেন প্রায় ২৫–৩০ কোটি টাকা। শাপলাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, যেমন নৌকা ভাড়া, ফুল বিক্রি, স্থানীয় খাবার সরবরাহ, ফটোশুট ও হস্তশিল্প উৎপাদন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিলে পর্যটন অবকাঠামো ও সংরক্ষণ উদ্যোগ বাড়ানো গেলে বছরে ১০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হতে পারে। তাই শাপলা শুধু একটি ফুল নয়, বরং এটি গ্রামীণ জীবিকা, সংস্কৃতি ও পর্যটনের মিলিত প্রতীক—যা বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে নীরব ভূমিকা রাখছে।
শাপলা শুধু জাতীয় ফুল নয়, বরং বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতির প্রতীক। সাতলার বিলে লাল শাপলার বিস্তার প্রকৃতিকে রক্তিম চাদরে মুড়ে দেয়। ভোরের কুয়াশা কাটলে হাজারো শাপলা একসঙ্গে পাপড়ি মেলে ধরে, সবুজ পাতার ভেতর থেকে লাজুক অথচ গর্বিত রূপে উঁকি দেয়। বর্ষা ও শরৎকাল শাপলার সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠ ঋতু; সকাল ছয়টা থেকে দশটা পর্যন্ত এর পূর্ণ বিকাশ ঘটে। দুপুরের পর পাপড়ি বন্ধ হতে শুরু করে। তাই ভোরের সময়ই দর্শনের সেরা মুহূর্ত। বাংলা সাহিত্য, কবিতা ও লোকগানে শাপলা প্রেম, পবিত্রতা ও লাজুকতার প্রতীক হিসেবে চিরস্থায়ী, আর সাতলার বিল যেন তারই জীবন্ত রূপকথা।
সাতলার বিল শুধু নান্দনিক সৌন্দর্য নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতিরও নির্ভরযোগ্য ভরসা। এ সময়টায় কৃষিকাজ না থাকায় কৃষিজীবী পরিবারগুলোর কাছে শাপলা যেন আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয়। বিলের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এখানকার অসংখ্য পরিবার শাপলানির্ভর কর্মযজ্ঞ করে জীবিকা নির্বাহ করে। কেউ শাপলা তুলে, কেউ মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে, আবার কেউ নৌকায় পর্যটক ভ্রমণে সহযোগিতা করে। ফলে বছরের এই মৌসুমে সাতলার জনপদজুড়ে নেমে আসে এক উৎসবমুখর আবহ।
ভোর থেকে শুরু হয় পারিবারিক কর্মব্যস্ততা। কেউ বৈঠা চালিয়ে বিল থেকে শাপলা তোলে, কেউ নৌকায় বসে আঁটি বাঁধে, আবার কেউ সকালের বাজারে নিয়ে যায় বিক্রির জন্য। স্থানীয় বাজারে প্রতিটি শাপলার আঁটি বিক্রি হয় ৮ থেকে ১০ টাকায়। কৃষক পরিবারের জন্য শাপলা মৌসুমি আয়ের বড় ভরসা। প্রতিটি নৌকা দিনে গড়ে ১০০–১৫০ কেজি সংগ্রহ করে, যা প্রতিকেজি ২০–৩০ টাকা দরে বিক্রি হলে পরিবারপ্রতি দৈনিক আয় দাঁড়ায় ৩০০০–৪০০০ টাকা। নারীর অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য অনেক নারী ঘরে বসে ডাঁটা পরিষ্কার করে বাজারে পাঠান। এতে তারা আর্থিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং আত্মনির্ভরতা অর্জন করেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জল্লা ইউনিয়নের হারতা, বাগদা, কারফা, সাতলা, পশ্চিম কালবিলাসসহ ৭–৮টি গ্রামের অসংখ্য পরিবারের জীবিকা চলে শাপলা সংগ্রহ ও বিক্রির মাধ্যমে। এ অঞ্চলে বড়-ছোট প্রায় ২০টি বিল রয়েছে। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস এই বিল পানিতে ভরা থাকে। ডিসেম্বরের শুরুতে যখন পানি কমে যায়, তখন শাপলা শুকিয়ে যায় এবং কৃষকরা একই জমিতে ধান চাষ করেন। ফলে সাতলার বিল একদিকে ধান উৎপাদনের ক্ষেত্র, অন্যদিকে শাপলার স্বর্গরাজ্য। শাপলার বীজ মাটির সঙ্গে মিশে থেকে যায়, আর বর্ষার পানিতে আবার সজীব হয়ে ওঠে। পানি জমলে মাছ চাষ হয়, আর শীতকালে কৃষিজীবীরা দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। এভাবেই সারা বছর সাতলা বিলের ওপর নির্ভরশীল থাকেন স্থানীয় মানুষ।
গত এক দশকে সাতলার বিল দ্রুত পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখানে তোলা ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় পরিচিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোরের আলোয় বিস্তীর্ণ লাল শাপলার সমাহারকে অনেকে “বাংলাদেশের লাল শাপলার সমুদ্র” বলে আখ্যায়িত করেন। নৌভ্রমণের অভিজ্ঞতা এখানে অন্যতম আকর্ষণ। ছোট নৌকা ভাড়া করে পর্যটকরা শাপলায় ঘেরা জলে ভেসে বেড়ান, প্রকৃতির বুকে স্বপ্নময় অনুভূতি উপভোগ করেন। ফটোগ্রাফি ও মিডিয়ার প্রভাবও পর্যটনের চালিকাশক্তি। শাপলার বিলে ফটোশুট, ভ্রমণচিত্র বা ভিডিওগ্রাফি এখন বিশেষ আকর্ষণ। শুধু শাপলাই নয়, শীতকালে বিল ভরে ওঠে অসংখ্য পরিযায়ী পাখিতে, যা প্রকৃতিপ্রেমী ও পাখিপ্রেমীদের জন্য বাড়তি আনন্দের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক পর্যটক বিলে আসেন, বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার এ সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। স্থানীয় তরুণ-যুবকরা পর্যটকদের গাইডিং, নৌকা ভাড়া, খাবার পরিবেশনসহ নানা সেবায় যুক্ত হয়ে মৌসুমি আয় করছেন।
তবে এখানে ভ্রমণকারীদের জন্য বড় সীমাবদ্ধতা হলো, বিলে কিংবা আশপাশে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। দর্শনার্থীরা সাধারণত শুকনো খাবার সঙ্গে নিয়ে আসেন বা স্থানীয় বাড়িতে রান্নার ব্যবস্থা করে নেন। আশেপাশে কোনো হোটেল, রেস্টুরেন্ট কিংবা পাবলিক টয়লেট না থাকায় অনেকেই সমস্যায় পড়েন। স্থানীয় প্রশাসন ইতিমধ্যেই সৌন্দর্য সংরক্ষণ ও প্রাথমিক অবকাঠামো উন্নয়নে পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে আরও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
শাপলার বিল পর্যটনশিল্পের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র। পর্যটনের বিকাশ ঘটলে স্থানীয় কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলবে যেমন নৌকা চালনা, গাইডিং, খাবার বিক্রি থেকে বিশ্রামাগার তৈরির মতো নানা খাতে মানুষ যুক্ত হতে পারবে। পরিকল্পিতভাবে সাতলার বিলকে ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে এটি আন্তর্জাতিক মানচিত্রে বাংলাদেশের পর্যটনের পরিচিতি বাড়াতে সক্ষম হবে। পর্যটক সংখ্যা বাড়লে হোটেল-রেস্টুরেন্ট, পরিবহন ও হস্তশিল্প ব্যবসায়ীদের আয়ও বাড়বে, যা পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে। পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি, লোকগান ও খাদ্যসংস্কৃতির প্রচারও বৃদ্ধি পাবে।
শাপলার বিল জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল, যেখানে মাছ, ব্যাঙ, শামুক, জলজ কীটপতঙ্গ ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পর্যটকদের অসচেতন আচরণে বিলে প্লাস্টিক ও আবর্জনা জমছে, অতিরিক্ত শাপলা আহরণ প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে, কৃষিজমির কীটনাশক পানিতে মিশে ফুল ও প্রাণীর ক্ষতি করছে। বৈঠা ও লগির আঘাতে শাপলার কাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির স্তর ওঠানামা করে শাপলার বৃদ্ধি হুমকির মুখে পড়ছে।
শাপলার বিলকে ঘিরে অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি। পর্যটকদের জন্য আচরণবিধি তৈরি, সীমিত নৌভ্রমণ নিশ্চিত করা ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো অত্যন্ত জরুরি। শাপলার বিলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সংরক্ষণ প্রকল্প হাতে নেওয়া দরকার। উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা গেলে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি সম্পদ সংরক্ষণেও উৎসাহী হবেন।
উজিরপুরের সাতলার বিলের শাপলা শুধু প্রকৃতির বিস্ময় নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি, পর্যটনের সম্ভাবনার কেন্দ্র এবং জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। ভোরবেলার শাপলার সমারোহ যেমন হৃদয় জুড়ে শান্তি আনে, তেমনি কৃষক-শ্রমিকের জীবনে আয় ও আশার আলো জ্বালায়। সঠিক পরিকল্পনা, সচেতনতা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এই বিল জাতীয় সম্পদে রূপ নিতে পারে এবং বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায় যোগ করতে সক্ষম হবে। লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।