ড.রাধেশ্যাম সরকার
২০ অক্টোবর, ২০২৫, 5:35 PM
প্রবীণজীবন মানেই জীবনের শেষ অধ্যায় নয়; বরং এটি হতে পারে জীবনের আরেকটি ভিন্নতর অধ্যায়, যেখানে অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও স্মৃতির আলোয় মানুষ নতুন অর্থ খুঁজে পান। তবে বাস্তবতার চিত্র প্রায়ই এই রূপকল্পের সঙ্গে মিলে না। প্রবীণ বয়সে জীবন অনেকের কাছে পরিণত হয় এক দীর্ঘ, ধীর, চেপে বসা একাকীত্বের নিঃশ্বাসে, যেখানে দিনের আলো এবং কালের ব্যস্ততা অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকে। এক সময় সকালের আলো যেমন কর্মমুখর জীবন এনে দিত, যার কণ্ঠে বাজত দৃঢ়তার সুর, যার চারপাশে বিরাজ করত আত্মীয়স্বজনের উষ্ণতা সেই মানুষটাই একদিন নিজের ঘরেই যেন অচেনা হয়ে যান। বন্ধুবান্ধব, সন্তান বা আত্মীয়রা যখন ক্রমশ দূরে সরে যায়, তখন চারপাশের চারদেয়াল প্রতিধ্বনিত করে নিঃসঙ্গতার নিঃশব্দ কান্না, যার কোনো শব্দ নেই, কেবল অনুভূতির ভারশূন্যতা। স্মৃতিগুলো আসে, মিশে যায়, কিন্তু বর্তমান যেন এক অবিরাম শূন্য পথ, যেখানে সাহচর্য, স্নেহ এবং আত্মিক সান্ত্বনার অভাব প্রবীণকে ঘিরে ধরে, আর মন কেবল সেই নিঃশব্দে প্রশ্ন তোলে এই জীবন কি সত্যিই শেষ অধ্যায়?
সময়ের স্রোতে জীবনের গতি ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে, যেন উচ্ছল নদী হঠাৎ একদিন প্রবাহ হারিয়ে ফেলে। এমন এক মুহূর্ত আসে, যখন জীবন থমকে দাঁড়ায় নির্জনতার অন্তহীন অরণ্যে। যে স্ত্রী বা স্বামী একসময় ছিল শত স্মৃতির সহযাত্রী, হয়তো আর পাশে নেই; রেখে গেছে শুধু অনুপস্থিতির শূন্যতা। যে সন্তানরা একদিন কচি হাতে ধরে স্কুলের পথ ধরেছিল, আজ তারা ব্যস্ত নিজ নিজ জীবনে, তাদের সান্নিধ্য সীমাবদ্ধ থাকে ফোনের সংক্ষিপ্ত কথায়। ভাইবোনেরা, যাদের সঙ্গে হাসি-কান্নায় ভাগ হয়েছিল শৈশবের রঙিন দিনগুলো, তারাও আটকে গেছে আপন গণ্ডির ব্যস্ততায়। প্রিয় মুখগুলো যেন একে একে ম্লান হয়ে যায় জীবনের ক্যানভাসে, অতীতের উজ্জ্বল রঙ হারিয়ে ফেলে দীপ্তি। যে সংসার একসময় ছিল শব্দমুখর হাসি, তর্ক আর ভালোবাসার উষ্ণতায় পূর্ণ সে সংসারই পরিণত হয় নিঃশব্দতায়, যেখানে চারদেয়াল শুধু সাক্ষী থাকে হারানো দিনের স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। বর্তমান তখন এক অদৃশ্য নিঃসঙ্গতার ভারে ধীরে ধীরে গ্রাসিত হয়। এমন বাস্তবতায় প্রবেশ করে প্রবীণজীবন। যেখানে নেই অফিসের ব্যস্ততা, নেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব, নেই প্রতীক্ষার আনন্দ। থাকে শুধু এক দীর্ঘ নিঃসঙ্গ সন্ধ্যা; যার শেষ নেই, যার আলো নিস্তেজ, যার স্পর্শে কেবল স্মৃতিরা ফিরে আসে, আর ফিরে যায়। তখন মানুষ নিজেকেই প্রশ্ন করে, এই নিঃসঙ্গ জীবনটাই কি শেষ অধ্যায়? নাকি এখনও কিছু বলা বাকি?
বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে পারিবারিক সম্পর্ক ক্রমশ ভেঙে পড়ছে নগরায়ণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের চাপের কারণে প্রবীণদের একাকীত্ব একটি উদ্বেগজনক সামাজিক সমস্যা হয়ে উঠেছে। এক সময় যারা ছিলেন পরিবারের কর্তা বা সহধর্মিণী, বয়সের ভারে, সময়ের ব্যবধানে তাঁরা হয়ে যান পরিত্যক্ত বা অন্তত অবহেলিত। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় পৌনে দুই কোটি। এর মধ্যে অনেকেই একা বাস করছেন। ছেলে-মেয়েরা চাকরি, ব্যবসা বা পড়াশোনার কারণে শহরে বা বিদেশে। মা-বাবার দায়িত্ব ও সঙ্গ দেওয়ার সুযোগ বা ইচ্ছা অনেক ক্ষেত্রে থাকে না। ফলে এই প্রবীণরা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক অবসাদ এবং নির্ভরশীলতার বেদনায় দিন কাটাচ্ছেন।
নিঃসঙ্গতা শুধু মানসিক ব্যাধির জন্ম দেয় না, শারীরিক দিক থেকেও প্রবীণদের দুর্বল করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হৃদরোগ, স্ট্রোক, স্মৃতিভ্রংশ, বিষণ্নতা এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি ৩০%-৪০% পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে। নিঃসঙ্গতা একধরনের ‘মানসিক মৃত্যু’, যা ধীরে ধীরে মানুষকে শেষ করে দেয়। তাহলে এই নির্জনতার প্রতিকার কী? একজন সঙ্গী, একজন এমন মানুষ, যার সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া যায়, যার সান্নিধ্যে বৃদ্ধ বয়সের চাহিদা ও চেতনাকে সম্মান করা যায়। কিন্তু প্রবীণদের পুনর্বিবাহ নিয়ে আমাদের সমাজে এখনও বিদ্যমান একরকম গ্লানি, লজ্জা ও সংকোচ। অনেকেই প্রবীণদের এই আকাঙ্ক্ষাকে উপহাস বা অসম্মানের চোখে দেখেন। যেন প্রবীণ মানেই একটি অনুভূতিহীন, অবৈবাহিক জীবন যাপনকারী ‘মহাজন’।
তবে বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। প্রবীণরাও মানুষ। তাঁদেরও আবেগ আছে, ভালোবাসার প্রয়োজন আছে, সাহচর্যের তীব্র আকাঙ্ক্ষা আছে। একজন সঙ্গী মানে নিরাপত্তা, মানসিক প্রশান্তি, স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা এবং সামাজিক স্বীকৃতি। আমাদের সমাজে প্রবীণদের নিয়ে খোলামেলা আলোচনার অভাব। প্রবীণ মানেই যেন ত্যাগের প্রতিমূর্তি, যিনি শুধু ধর্মকর্মে মন দেবেন, সংসারে নতুন কিছু চাওয়ার অধিকার নেই। অথচ বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসা, যত্ন ও বোঝাপড়ার প্রয়োজন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বয়স যত বাড়ে, মানুষের নির্ভরতার প্রয়োজনও তত বেড়ে যায়। ইসলাম ধর্মে একজন পুরুষ চারজন স্ত্রী রাখতে পারেন, হিন্দু ধর্মেও প্রবীণদের বিবাহে কোনো ধর্মীয় বাধা নেই। বাস্তব উদাহরণও আছে, যেখানে একাকী প্রবীণ পুরুষ-নারী একে অপরের সঙ্গী হয়ে উঠেছেন। কেউ কেউ সাহস করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন, কেউ একত্রে বসবাস করছেন। তারা সমাজের চোখে পাত্তা না দিয়ে নিজেদের মানবিক চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
শহরের ফুটপাতে এক অন্ধ প্রবীণ নারী ও তাকে সহায়তা করা এক প্রবীণ পুরুষের গল্প হৃদয়কে নাড়া দেয়। তারা একে অপরকে দেখাশোনা করেন, চিকিৎসা করান, একসঙ্গে খেয়ে ঘুমান। হয়তো তারা সমাজের চোখে নিঃস্ব, কিন্তু হৃদয়ে ধনবান। এই সম্পর্কের পেছনে আছে আন্তরিকতা, নির্ভরতা, মমতা যা অনেক ধনীর গৃহে নেই। অন্যদিকে, ধানমন্ডি, গুলশান, বারিধারা, উত্তরা এইসব অভিজাত এলাকায় দেখা যায় প্রবীণদের, যারা এক সময় ছিলেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, অধ্যাপক বা শিল্পপতি। এখন তারা একা, সন্তানরা বিদেশে, বাড়িতে শুধু গৃহকর্মী এবং কয়েকটি কুকুর। ধনীরও নিঃসঙ্গতা আছে, তবে তাদের কষ্ট আরও চাপা, নিঃশব্দ বেদনা আরও গভীর। আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত বৈষম্য চোখে পড়ে। যখন একজন পুরুষ স্ত্রীহারা হন, তখন তাঁর সন্তানেরা অনেক সময়ই বাবার পুনর্বিবাহকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়, এমনকি কখনও কখনও তাঁকে নতুন করে সংসার গড়তে উৎসাহিতও করে। যুক্তি থাকে—‘সংসার চালাতে একজন সঙ্গীর প্রয়োজন’। কিন্তু একই পরিস্থিতি যদি একজন নারীর জীবনে ঘটে, অর্থাৎ মা স্বামীহারা হয়ে পড়েন, তখন ছবিটা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। সন্তানরা তখন কোনোমতেই তাঁর পুনর্বিবাহে রাজি হয় না, বরং মায়ের এই স্বাভাবিক মানবিক চাহিদাকে অস্বীকার করে। যেন মায়ের জীবনে নতুন করে ভালোবাসা বা সহচর্য কামনা করা সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ কোনো আকাঙ্ক্ষা। এভাবেই সমাজ পুরুষকে স্বাধীনতা দেয়, কিন্তু নারীর ওপর চাপিয়ে দেয় ত্যাগ আর নিঃসঙ্গতার বোঝা। সমাজের এই বৈষম্য, এই নিষ্ঠুরতা আমাদের যৌক্তিক ও মানবিক বোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমাদের দরকার প্রবীণদের নিয়ে নতুনভাবে ভাবা, তাঁদের জীবনের শেষভাগে আশ্রয়, সাহচর্য এবং সম্মান নিশ্চিত করা। শহরে একাকী প্রবীণদের জন্য নিরাপদ রাতযাপন, চিকিৎসা সহায়তা, সামাজিক স্বীকৃতি ও মানসিক কাউন্সেলিং অত্যন্ত জরুরি।
সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে প্রবীণদের জন্য একটি পরিকল্পিত নীতি গ্রহণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পরিত্যক্ত সরকারি বাড়িতে প্রবীণ নিবাস তৈরি করা, যেখানে প্রবীণরা সম্মানের সঙ্গে বসবাস করতে পারবেন। এই নিবাসে পুনর্বিবাহ বা সহঅবস্থান অনুমোদিত থাকলে প্রবীণদের মানসিক শান্তি ও আনন্দ বাড়বে। কেবল আইন করলেই হবে না; দরকার মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবার, প্রতিবেশী, সমাজ সকলকে প্রবীণদের চাহিদা ও সংকটের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রবীণদের জীবন, বিয়ে এবং নিঃসঙ্গতা নিয়ে প্রতিবেদন, নাটক ও সিনেমা তৈরি করে জনমত গঠন জরুরি।
প্রবীণদের শুধুমাত্র মা-বাবা হিসেবে নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তাঁদের সঙ্গীচাহিদা লজ্জার বিষয় নয়; এটি একটি মৌলিক মানবিক অধিকার। তাঁদের বিয়ে করতে দেওয়া মানে কোনো সামাজিক বিধি ভঙ্গ নয়; বরং তা তাঁদের বাঁচিয়ে রাখার উপায়। জীবনের শেষ অধ্যায় যেন শুধু অপেক্ষায় না কাটে, হোক তা ভালোবাসায় পূর্ণ, সাহচর্যে উজ্জ্বল। প্রবীণদের একাকীত্ব থেকে মুক্তি দিতে হলে আমাদের মনমানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। আজ ভাবতে হবে কারণ আগামীকাল আমরা সবাই হবো সেই প্রবীণ, সেই নিঃসঙ্গ মানুষ, যার প্রয়োজন একটি হাত, একটি কান, একটি হৃদয় যে শুনবে, বোঝাবে এবং পাশে থাকবে।
এই প্রবন্ধের মূল প্রশ্ন “পুনর্বিবাহ কি লজ্জা, না মুক্তি?” এর উত্তর খুঁজে নিতে হবে আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিক বোধের আয়নায়। কারণ প্রবীণ বয়সে সঙ্গীচাহিদা কোনো হাস্যরসের বিষয় নয়, এটি একান্ত মানবিক অধিকার। আমরা যদি সত্যিই নিজেদের মানবিক বলে দাবি করতে চাই, তবে প্রবীণদের নিঃশব্দ আকুতি, তাদের নীরব আর্তনাদে সাড়া দেওয়াই হবে আমাদের প্রথম দায়িত্ব। তবেই তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায় আলোয় পূর্ণ হতে পারে।
লেখক: কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।
ড.রাধেশ্যাম সরকার
২০ অক্টোবর, ২০২৫, 5:35 PM
প্রবীণজীবন মানেই জীবনের শেষ অধ্যায় নয়; বরং এটি হতে পারে জীবনের আরেকটি ভিন্নতর অধ্যায়, যেখানে অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও স্মৃতির আলোয় মানুষ নতুন অর্থ খুঁজে পান। তবে বাস্তবতার চিত্র প্রায়ই এই রূপকল্পের সঙ্গে মিলে না। প্রবীণ বয়সে জীবন অনেকের কাছে পরিণত হয় এক দীর্ঘ, ধীর, চেপে বসা একাকীত্বের নিঃশ্বাসে, যেখানে দিনের আলো এবং কালের ব্যস্ততা অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকে। এক সময় সকালের আলো যেমন কর্মমুখর জীবন এনে দিত, যার কণ্ঠে বাজত দৃঢ়তার সুর, যার চারপাশে বিরাজ করত আত্মীয়স্বজনের উষ্ণতা সেই মানুষটাই একদিন নিজের ঘরেই যেন অচেনা হয়ে যান। বন্ধুবান্ধব, সন্তান বা আত্মীয়রা যখন ক্রমশ দূরে সরে যায়, তখন চারপাশের চারদেয়াল প্রতিধ্বনিত করে নিঃসঙ্গতার নিঃশব্দ কান্না, যার কোনো শব্দ নেই, কেবল অনুভূতির ভারশূন্যতা। স্মৃতিগুলো আসে, মিশে যায়, কিন্তু বর্তমান যেন এক অবিরাম শূন্য পথ, যেখানে সাহচর্য, স্নেহ এবং আত্মিক সান্ত্বনার অভাব প্রবীণকে ঘিরে ধরে, আর মন কেবল সেই নিঃশব্দে প্রশ্ন তোলে এই জীবন কি সত্যিই শেষ অধ্যায়?
সময়ের স্রোতে জীবনের গতি ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে, যেন উচ্ছল নদী হঠাৎ একদিন প্রবাহ হারিয়ে ফেলে। এমন এক মুহূর্ত আসে, যখন জীবন থমকে দাঁড়ায় নির্জনতার অন্তহীন অরণ্যে। যে স্ত্রী বা স্বামী একসময় ছিল শত স্মৃতির সহযাত্রী, হয়তো আর পাশে নেই; রেখে গেছে শুধু অনুপস্থিতির শূন্যতা। যে সন্তানরা একদিন কচি হাতে ধরে স্কুলের পথ ধরেছিল, আজ তারা ব্যস্ত নিজ নিজ জীবনে, তাদের সান্নিধ্য সীমাবদ্ধ থাকে ফোনের সংক্ষিপ্ত কথায়। ভাইবোনেরা, যাদের সঙ্গে হাসি-কান্নায় ভাগ হয়েছিল শৈশবের রঙিন দিনগুলো, তারাও আটকে গেছে আপন গণ্ডির ব্যস্ততায়। প্রিয় মুখগুলো যেন একে একে ম্লান হয়ে যায় জীবনের ক্যানভাসে, অতীতের উজ্জ্বল রঙ হারিয়ে ফেলে দীপ্তি। যে সংসার একসময় ছিল শব্দমুখর হাসি, তর্ক আর ভালোবাসার উষ্ণতায় পূর্ণ সে সংসারই পরিণত হয় নিঃশব্দতায়, যেখানে চারদেয়াল শুধু সাক্ষী থাকে হারানো দিনের স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। বর্তমান তখন এক অদৃশ্য নিঃসঙ্গতার ভারে ধীরে ধীরে গ্রাসিত হয়। এমন বাস্তবতায় প্রবেশ করে প্রবীণজীবন। যেখানে নেই অফিসের ব্যস্ততা, নেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব, নেই প্রতীক্ষার আনন্দ। থাকে শুধু এক দীর্ঘ নিঃসঙ্গ সন্ধ্যা; যার শেষ নেই, যার আলো নিস্তেজ, যার স্পর্শে কেবল স্মৃতিরা ফিরে আসে, আর ফিরে যায়। তখন মানুষ নিজেকেই প্রশ্ন করে, এই নিঃসঙ্গ জীবনটাই কি শেষ অধ্যায়? নাকি এখনও কিছু বলা বাকি?
বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে পারিবারিক সম্পর্ক ক্রমশ ভেঙে পড়ছে নগরায়ণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের চাপের কারণে প্রবীণদের একাকীত্ব একটি উদ্বেগজনক সামাজিক সমস্যা হয়ে উঠেছে। এক সময় যারা ছিলেন পরিবারের কর্তা বা সহধর্মিণী, বয়সের ভারে, সময়ের ব্যবধানে তাঁরা হয়ে যান পরিত্যক্ত বা অন্তত অবহেলিত। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় পৌনে দুই কোটি। এর মধ্যে অনেকেই একা বাস করছেন। ছেলে-মেয়েরা চাকরি, ব্যবসা বা পড়াশোনার কারণে শহরে বা বিদেশে। মা-বাবার দায়িত্ব ও সঙ্গ দেওয়ার সুযোগ বা ইচ্ছা অনেক ক্ষেত্রে থাকে না। ফলে এই প্রবীণরা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক অবসাদ এবং নির্ভরশীলতার বেদনায় দিন কাটাচ্ছেন।
নিঃসঙ্গতা শুধু মানসিক ব্যাধির জন্ম দেয় না, শারীরিক দিক থেকেও প্রবীণদের দুর্বল করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হৃদরোগ, স্ট্রোক, স্মৃতিভ্রংশ, বিষণ্নতা এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি ৩০%-৪০% পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে। নিঃসঙ্গতা একধরনের ‘মানসিক মৃত্যু’, যা ধীরে ধীরে মানুষকে শেষ করে দেয়। তাহলে এই নির্জনতার প্রতিকার কী? একজন সঙ্গী, একজন এমন মানুষ, যার সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া যায়, যার সান্নিধ্যে বৃদ্ধ বয়সের চাহিদা ও চেতনাকে সম্মান করা যায়। কিন্তু প্রবীণদের পুনর্বিবাহ নিয়ে আমাদের সমাজে এখনও বিদ্যমান একরকম গ্লানি, লজ্জা ও সংকোচ। অনেকেই প্রবীণদের এই আকাঙ্ক্ষাকে উপহাস বা অসম্মানের চোখে দেখেন। যেন প্রবীণ মানেই একটি অনুভূতিহীন, অবৈবাহিক জীবন যাপনকারী ‘মহাজন’।
তবে বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। প্রবীণরাও মানুষ। তাঁদেরও আবেগ আছে, ভালোবাসার প্রয়োজন আছে, সাহচর্যের তীব্র আকাঙ্ক্ষা আছে। একজন সঙ্গী মানে নিরাপত্তা, মানসিক প্রশান্তি, স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা এবং সামাজিক স্বীকৃতি। আমাদের সমাজে প্রবীণদের নিয়ে খোলামেলা আলোচনার অভাব। প্রবীণ মানেই যেন ত্যাগের প্রতিমূর্তি, যিনি শুধু ধর্মকর্মে মন দেবেন, সংসারে নতুন কিছু চাওয়ার অধিকার নেই। অথচ বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসা, যত্ন ও বোঝাপড়ার প্রয়োজন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বয়স যত বাড়ে, মানুষের নির্ভরতার প্রয়োজনও তত বেড়ে যায়। ইসলাম ধর্মে একজন পুরুষ চারজন স্ত্রী রাখতে পারেন, হিন্দু ধর্মেও প্রবীণদের বিবাহে কোনো ধর্মীয় বাধা নেই। বাস্তব উদাহরণও আছে, যেখানে একাকী প্রবীণ পুরুষ-নারী একে অপরের সঙ্গী হয়ে উঠেছেন। কেউ কেউ সাহস করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন, কেউ একত্রে বসবাস করছেন। তারা সমাজের চোখে পাত্তা না দিয়ে নিজেদের মানবিক চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
শহরের ফুটপাতে এক অন্ধ প্রবীণ নারী ও তাকে সহায়তা করা এক প্রবীণ পুরুষের গল্প হৃদয়কে নাড়া দেয়। তারা একে অপরকে দেখাশোনা করেন, চিকিৎসা করান, একসঙ্গে খেয়ে ঘুমান। হয়তো তারা সমাজের চোখে নিঃস্ব, কিন্তু হৃদয়ে ধনবান। এই সম্পর্কের পেছনে আছে আন্তরিকতা, নির্ভরতা, মমতা যা অনেক ধনীর গৃহে নেই। অন্যদিকে, ধানমন্ডি, গুলশান, বারিধারা, উত্তরা এইসব অভিজাত এলাকায় দেখা যায় প্রবীণদের, যারা এক সময় ছিলেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, অধ্যাপক বা শিল্পপতি। এখন তারা একা, সন্তানরা বিদেশে, বাড়িতে শুধু গৃহকর্মী এবং কয়েকটি কুকুর। ধনীরও নিঃসঙ্গতা আছে, তবে তাদের কষ্ট আরও চাপা, নিঃশব্দ বেদনা আরও গভীর। আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত বৈষম্য চোখে পড়ে। যখন একজন পুরুষ স্ত্রীহারা হন, তখন তাঁর সন্তানেরা অনেক সময়ই বাবার পুনর্বিবাহকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়, এমনকি কখনও কখনও তাঁকে নতুন করে সংসার গড়তে উৎসাহিতও করে। যুক্তি থাকে—‘সংসার চালাতে একজন সঙ্গীর প্রয়োজন’। কিন্তু একই পরিস্থিতি যদি একজন নারীর জীবনে ঘটে, অর্থাৎ মা স্বামীহারা হয়ে পড়েন, তখন ছবিটা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। সন্তানরা তখন কোনোমতেই তাঁর পুনর্বিবাহে রাজি হয় না, বরং মায়ের এই স্বাভাবিক মানবিক চাহিদাকে অস্বীকার করে। যেন মায়ের জীবনে নতুন করে ভালোবাসা বা সহচর্য কামনা করা সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ কোনো আকাঙ্ক্ষা। এভাবেই সমাজ পুরুষকে স্বাধীনতা দেয়, কিন্তু নারীর ওপর চাপিয়ে দেয় ত্যাগ আর নিঃসঙ্গতার বোঝা। সমাজের এই বৈষম্য, এই নিষ্ঠুরতা আমাদের যৌক্তিক ও মানবিক বোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমাদের দরকার প্রবীণদের নিয়ে নতুনভাবে ভাবা, তাঁদের জীবনের শেষভাগে আশ্রয়, সাহচর্য এবং সম্মান নিশ্চিত করা। শহরে একাকী প্রবীণদের জন্য নিরাপদ রাতযাপন, চিকিৎসা সহায়তা, সামাজিক স্বীকৃতি ও মানসিক কাউন্সেলিং অত্যন্ত জরুরি।
সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে প্রবীণদের জন্য একটি পরিকল্পিত নীতি গ্রহণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পরিত্যক্ত সরকারি বাড়িতে প্রবীণ নিবাস তৈরি করা, যেখানে প্রবীণরা সম্মানের সঙ্গে বসবাস করতে পারবেন। এই নিবাসে পুনর্বিবাহ বা সহঅবস্থান অনুমোদিত থাকলে প্রবীণদের মানসিক শান্তি ও আনন্দ বাড়বে। কেবল আইন করলেই হবে না; দরকার মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবার, প্রতিবেশী, সমাজ সকলকে প্রবীণদের চাহিদা ও সংকটের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রবীণদের জীবন, বিয়ে এবং নিঃসঙ্গতা নিয়ে প্রতিবেদন, নাটক ও সিনেমা তৈরি করে জনমত গঠন জরুরি।
প্রবীণদের শুধুমাত্র মা-বাবা হিসেবে নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তাঁদের সঙ্গীচাহিদা লজ্জার বিষয় নয়; এটি একটি মৌলিক মানবিক অধিকার। তাঁদের বিয়ে করতে দেওয়া মানে কোনো সামাজিক বিধি ভঙ্গ নয়; বরং তা তাঁদের বাঁচিয়ে রাখার উপায়। জীবনের শেষ অধ্যায় যেন শুধু অপেক্ষায় না কাটে, হোক তা ভালোবাসায় পূর্ণ, সাহচর্যে উজ্জ্বল। প্রবীণদের একাকীত্ব থেকে মুক্তি দিতে হলে আমাদের মনমানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। আজ ভাবতে হবে কারণ আগামীকাল আমরা সবাই হবো সেই প্রবীণ, সেই নিঃসঙ্গ মানুষ, যার প্রয়োজন একটি হাত, একটি কান, একটি হৃদয় যে শুনবে, বোঝাবে এবং পাশে থাকবে।
এই প্রবন্ধের মূল প্রশ্ন “পুনর্বিবাহ কি লজ্জা, না মুক্তি?” এর উত্তর খুঁজে নিতে হবে আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিক বোধের আয়নায়। কারণ প্রবীণ বয়সে সঙ্গীচাহিদা কোনো হাস্যরসের বিষয় নয়, এটি একান্ত মানবিক অধিকার। আমরা যদি সত্যিই নিজেদের মানবিক বলে দাবি করতে চাই, তবে প্রবীণদের নিঃশব্দ আকুতি, তাদের নীরব আর্তনাদে সাড়া দেওয়াই হবে আমাদের প্রথম দায়িত্ব। তবেই তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায় আলোয় পূর্ণ হতে পারে।
লেখক: কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।