ড. রাধেশ্যাম সরকার
২৯ অক্টোবর, ২০২৫, 7:52 PM
অবসরপ্রাপ্ত মানে শুধু চাকরি শেষ নয় বরং জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। জীবনের এক দীর্ঘ যাত্রাপথ পেরিয়ে যখন কেউ অবসরের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ান, তখন তাঁর ভেতরে মিশে থাকে আনন্দ, গর্ব, আবার একরাশ অনিশ্চয়তাও। প্রশ্নটা তখন খুব সহজ অথচ গভীর; যিনি অবসরে গেলেন, তিনি কি সত্যিই অবসরকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারলেন? নাকি চাকরির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে ফেললেন নিজের প্রাণচাঞ্চল্য, আত্মবিশ্বাস, নিজের মূল্যবোধ?
যাঁরা সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘকাল পূর্ণ বেতনে চাকরি করেন, তাঁদের জীবনে একদিন আসে, একটি নির্দিষ্ট বয়সে একটি কাগজ হাতে এসে পৌঁছায়, যেখানে লেখা থাকে: “আপনি এখন অবসরপ্রাপ্ত। ধন্যবাদ আপনার দীর্ঘ সেবার জন্য।” সেই কাগজের সঙ্গে থাকে কিছু আর্থিক সুবিধা, কিছু প্রাপ্য সম্মান, আর এক গভীর শূন্যতার ইঙ্গিত। সেই চিঠি কখনো আনন্দের, কখনো গভীর বিষাদেরও। যিনি সারা জীবন পরিশ্রম, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন, তিনি এই চিঠিকে দেখেন গর্বের চোখে। মনে করেন “আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি, আমার দায়িত্ব শেষ করেছি মর্যাদার সঙ্গে।” তাঁর চোখে অবসর মানে বিশ্রাম, প্রাপ্য সম্মানের স্বীকৃতি। কিন্তু অন্যদিকে কেউ কেউ এই চিঠি হাতে নিয়ে হঠাৎ যেন নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্নে পড়েন। ভাবেন, এতদিন প্রতিদিন সকালে যে অফিসে যাওয়া ছিল জীবনের অংশ, কাল থেকে আর সেখানে তাঁর প্রবেশাধিকার থাকবে না। অফিসের সেই সুসজ্জিত চেম্বার, অফিসের গাড়ি, ড্রাইভার, পিয়ন, সহকর্মীরা সবই তখন অতীতের গল্প। যে চেয়ারে বসে কত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেখানে এখন বসবে অন্য কেউ। এই ভাবনাই যেন বুকের ভেতর অদৃশ্য এক হাহাকার তৈরি করে।
আসলে অবসর মানুষের জীবনের এক অনিবার্য পর্ব, কিন্তু আমাদের সমাজে একে আমরা প্রায়শই শেষের ঘণ্টা হিসেবে দেখি। অথচ এটি হতে পারত এক নতুন সূচনা, নতুন ভাবনার জানালা। যারা অবসরকে আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন না, তারা মনে করেন এটি একপ্রকার ক্ষমতা ও পরিচয় হারানোর বেদনা। কাজ ও দায়িত্বের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক শেষ হওয়ার যন্ত্রণাটা তাঁদের ভেতরে এক শূন্যতার জন্ম দেয়। ফলে তারা নিজের অজান্তেই হয়ে পড়েন খিটখিটে, বিরক্ত, এমনকি মানসিকভাবে বিষণ্ন। পরিবারের সদস্যদের আচরণেও তারা খোঁজেন অবহেলার ছায়া, মনে করেন, “আমাকে আর কেউ আগের মতো সম্মান করে না।” অথচ বাস্তবে, পরিবর্তনটা হয় কেবল পরিস্থিতির, সম্মানের নয়।
অবসরের পর অনেকেই আর্থিক দুশ্চিন্তায় ভোগেন বিশেষ করে যখন পরিবারে আর অন্য উপার্জনশীল সদস্য নেই। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাঁদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। জীবনের হিসাব তখন কেমন যেন বদলে যায়; আয় নয়, ব্যয়ের দিকটিই বড় হয়ে ওঠে। তবে এমনও অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের এ নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তা নেই। সময়মতো বিয়ে করেছেন, সন্তানরা নিজেদের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত, তাই অবসরের পর পাওয়া অর্থটুকু তাঁদের নিজস্ব স্বাধীনতার প্রতীক। কিন্তু তাঁদেরও সমস্যা অন্যত্র কর্মহীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা, এবং আত্মসম্মান হারানোর বেদনা। কারণ, যিনি সারাজীবন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, একদিন কেউ তাঁর পরামর্শ চায় না এই অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য অসহনীয়।
আমার প্রিয় এক শিক্ষকের কথা মনে পড়ে গেলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর পদে থেকে অবসর নিয়েছিলেন তিনি। অবসরের কয়েকদিন পর আমি তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার, রিটায়ার্ড লাইফ কেমন লাগছে? নিশ্চয়ই এখন আরাম পাচ্ছেন?” উনি একটু হেসে, কিছুটা বিরক্ত গলায় বললেন, “না, না, না! একদম না! তুমি বুঝবে না, অফিসের মানুষ, ছাত্র, প্রশ্ন, উত্তর, সিদ্ধান্ত এইসবই ছিল আমার জীবন। এখন মনে হয় চারপাশটা একেবারে নিস্তব্ধ, যেন কেউ আমায় প্রয়োজন মনে করছে না।” তাঁর চোখে আমি যে শূন্যতা দেখেছিলাম, তা ছিল এক নিষ্প্রাণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। ক্ষমতা বা পদ হারানোর নয়, বরং মানুষের দরকার না থাকার বেদনা সেখানে প্রবলতর।
আবার মনে পড়ে আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়কে। সরকারি চাকরি করতেন, সময়নিষ্ঠ ও নিয়মানুবর্তী মানুষ। প্রতিদিন সকালে দু’পিস মাখন দেওয়া টোস্ট আর একটি কলা খেয়ে অফিসে যেতেন। অবসরের পর একদিন তাঁর নাশতা কয়েক মিনিট দেরিতে পরিবেশন করা হয়। তিনি রেগে বললেন, “আমি খাব না। আমার চাকরি নেই বলে দেরিতে খেতে দিচ্ছ?” স্ত্রী বললেন, “অসম্মান কোথায়? আজ একটু দেরি করে উঠেছি, তাই!” কিন্তু তিনি আর খাবার স্পর্শ করলেন না। তাঁর মনে গেঁথে গেছে চাকরি নেই, মানে তার মূল্যও নেই। অথচ তাঁর মূল্য তো চাকরির মধ্যে নয়, তাঁর সত্তার মধ্যেই ছিল। আমি বলব, যে মানুষ চাকরি না থাকার কারণে নিজের মর্যাদা হারানো মনে করেন, তাঁর মানসিক ক্ষত সারানোর কোনো ওষুধ পৃথিবীতে নেই।
তবু অবসর কিন্তু কখনো নেতিবাচক নয়। বরং এটি এক নবজীবনের দ্বার। এক সময় পর্যন্ত আমরা জীবনকে দেখি কর্তব্যের চোখে, দায়িত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা থেকে। অবসরের পর আসে স্বাধীনতার ঋতু, যেখানে আর সময়ের তাড়া নেই, কর্তব্যের ভার নেই। সকালের দৌড়ঝাঁপ, অফিসের ব্যস্ততা, বৈঠকের চাপ সব পেরিয়ে অবসর মানুষকে উপহার দেয় নিজের মতো বাঁচার সুযোগ। বহু বছর ধরে জমে থাকা জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা এবার সমাজের, তরুণদের, কিংবা পরিবারের অনুপ্রেরণা হতে পারে। অবসর মানেই থেমে যাওয়া নয় বরং এটি অন্য এক জীবনধারার দিকে যাত্রা, যেখানে কর্তব্য নয়, ইচ্ছাই হয়ে ওঠে দিকনির্দেশনা।একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষ যদি ভাবতে পারেন, “এবার আমি নিজের জন্য কিছু করব” তাহলেই জীবনের মানচিত্রে নতুন রঙ ফুটে ওঠে। কেউ হয়তো বই লেখেন, কেউ বাগান করেন, কেউ নিঃস্বার্থভাবে পড়ান, কেউ আবার মসজিদ বা মন্দিরে গিয়ে নিজের আত্মাকে শান্ত করেন। জীবন তখন এক নতুন স্বাদ পায়। কারণ, জীবনের প্রতিটি বয়সেরই এক নিজস্ব সৌন্দর্য আছে—যদি আমরা তা দেখতে জানি।
অবসরকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করাই প্রকৃত প্রজ্ঞা। এটি আসলে জীবনের আরেক নাম অন্তর্মুখী শান্তি ও আত্মসম্মানের পুনর্জন্ম। যতদিন কাজ করেছি, ততদিন কর্তব্য ছিল অন্যের প্রতি; এখন কর্তব্য নিজের প্রতি। শরীর, মন, আত্মা সবই বিশ্রামের এবং পুনরুজ্জীবনের দাবি রাখে। তাই অবসর মানে হারানো নয়, বরং পাওয়ারই আরেক নাম। মনে রাখতে হবে, সূর্যই জীবনের প্রতীক। ভোরের সূর্য যেমন উদ্যম ও সম্ভাবনার, দুপুরের সূর্য তেমনি কর্ম ও সাফল্যের, আর গোধূলির সূর্য প্রশান্তি ও উপলব্ধির। জীবনের গোধূলিবেলায় যদি আমরা সেই আলোয় ভেসে যেতে পারি, যদি নিজেকে সাদরে গ্রহণ করতে পারি, তবে হৃদয়ের গভীরে তখনও নীরবে বাজবে, সমুখে শান্তি পারাবার, ভাসাও তরণী হে কর্ণধার।
লেখক: কৃষিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা
ড. রাধেশ্যাম সরকার
২৯ অক্টোবর, ২০২৫, 7:52 PM
অবসরপ্রাপ্ত মানে শুধু চাকরি শেষ নয় বরং জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। জীবনের এক দীর্ঘ যাত্রাপথ পেরিয়ে যখন কেউ অবসরের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ান, তখন তাঁর ভেতরে মিশে থাকে আনন্দ, গর্ব, আবার একরাশ অনিশ্চয়তাও। প্রশ্নটা তখন খুব সহজ অথচ গভীর; যিনি অবসরে গেলেন, তিনি কি সত্যিই অবসরকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারলেন? নাকি চাকরির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে ফেললেন নিজের প্রাণচাঞ্চল্য, আত্মবিশ্বাস, নিজের মূল্যবোধ?
যাঁরা সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘকাল পূর্ণ বেতনে চাকরি করেন, তাঁদের জীবনে একদিন আসে, একটি নির্দিষ্ট বয়সে একটি কাগজ হাতে এসে পৌঁছায়, যেখানে লেখা থাকে: “আপনি এখন অবসরপ্রাপ্ত। ধন্যবাদ আপনার দীর্ঘ সেবার জন্য।” সেই কাগজের সঙ্গে থাকে কিছু আর্থিক সুবিধা, কিছু প্রাপ্য সম্মান, আর এক গভীর শূন্যতার ইঙ্গিত। সেই চিঠি কখনো আনন্দের, কখনো গভীর বিষাদেরও। যিনি সারা জীবন পরিশ্রম, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন, তিনি এই চিঠিকে দেখেন গর্বের চোখে। মনে করেন “আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি, আমার দায়িত্ব শেষ করেছি মর্যাদার সঙ্গে।” তাঁর চোখে অবসর মানে বিশ্রাম, প্রাপ্য সম্মানের স্বীকৃতি। কিন্তু অন্যদিকে কেউ কেউ এই চিঠি হাতে নিয়ে হঠাৎ যেন নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্নে পড়েন। ভাবেন, এতদিন প্রতিদিন সকালে যে অফিসে যাওয়া ছিল জীবনের অংশ, কাল থেকে আর সেখানে তাঁর প্রবেশাধিকার থাকবে না। অফিসের সেই সুসজ্জিত চেম্বার, অফিসের গাড়ি, ড্রাইভার, পিয়ন, সহকর্মীরা সবই তখন অতীতের গল্প। যে চেয়ারে বসে কত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেখানে এখন বসবে অন্য কেউ। এই ভাবনাই যেন বুকের ভেতর অদৃশ্য এক হাহাকার তৈরি করে।
আসলে অবসর মানুষের জীবনের এক অনিবার্য পর্ব, কিন্তু আমাদের সমাজে একে আমরা প্রায়শই শেষের ঘণ্টা হিসেবে দেখি। অথচ এটি হতে পারত এক নতুন সূচনা, নতুন ভাবনার জানালা। যারা অবসরকে আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন না, তারা মনে করেন এটি একপ্রকার ক্ষমতা ও পরিচয় হারানোর বেদনা। কাজ ও দায়িত্বের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক শেষ হওয়ার যন্ত্রণাটা তাঁদের ভেতরে এক শূন্যতার জন্ম দেয়। ফলে তারা নিজের অজান্তেই হয়ে পড়েন খিটখিটে, বিরক্ত, এমনকি মানসিকভাবে বিষণ্ন। পরিবারের সদস্যদের আচরণেও তারা খোঁজেন অবহেলার ছায়া, মনে করেন, “আমাকে আর কেউ আগের মতো সম্মান করে না।” অথচ বাস্তবে, পরিবর্তনটা হয় কেবল পরিস্থিতির, সম্মানের নয়।
অবসরের পর অনেকেই আর্থিক দুশ্চিন্তায় ভোগেন বিশেষ করে যখন পরিবারে আর অন্য উপার্জনশীল সদস্য নেই। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাঁদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। জীবনের হিসাব তখন কেমন যেন বদলে যায়; আয় নয়, ব্যয়ের দিকটিই বড় হয়ে ওঠে। তবে এমনও অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের এ নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তা নেই। সময়মতো বিয়ে করেছেন, সন্তানরা নিজেদের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত, তাই অবসরের পর পাওয়া অর্থটুকু তাঁদের নিজস্ব স্বাধীনতার প্রতীক। কিন্তু তাঁদেরও সমস্যা অন্যত্র কর্মহীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা, এবং আত্মসম্মান হারানোর বেদনা। কারণ, যিনি সারাজীবন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, একদিন কেউ তাঁর পরামর্শ চায় না এই অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য অসহনীয়।
আমার প্রিয় এক শিক্ষকের কথা মনে পড়ে গেলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর পদে থেকে অবসর নিয়েছিলেন তিনি। অবসরের কয়েকদিন পর আমি তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার, রিটায়ার্ড লাইফ কেমন লাগছে? নিশ্চয়ই এখন আরাম পাচ্ছেন?” উনি একটু হেসে, কিছুটা বিরক্ত গলায় বললেন, “না, না, না! একদম না! তুমি বুঝবে না, অফিসের মানুষ, ছাত্র, প্রশ্ন, উত্তর, সিদ্ধান্ত এইসবই ছিল আমার জীবন। এখন মনে হয় চারপাশটা একেবারে নিস্তব্ধ, যেন কেউ আমায় প্রয়োজন মনে করছে না।” তাঁর চোখে আমি যে শূন্যতা দেখেছিলাম, তা ছিল এক নিষ্প্রাণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। ক্ষমতা বা পদ হারানোর নয়, বরং মানুষের দরকার না থাকার বেদনা সেখানে প্রবলতর।
আবার মনে পড়ে আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়কে। সরকারি চাকরি করতেন, সময়নিষ্ঠ ও নিয়মানুবর্তী মানুষ। প্রতিদিন সকালে দু’পিস মাখন দেওয়া টোস্ট আর একটি কলা খেয়ে অফিসে যেতেন। অবসরের পর একদিন তাঁর নাশতা কয়েক মিনিট দেরিতে পরিবেশন করা হয়। তিনি রেগে বললেন, “আমি খাব না। আমার চাকরি নেই বলে দেরিতে খেতে দিচ্ছ?” স্ত্রী বললেন, “অসম্মান কোথায়? আজ একটু দেরি করে উঠেছি, তাই!” কিন্তু তিনি আর খাবার স্পর্শ করলেন না। তাঁর মনে গেঁথে গেছে চাকরি নেই, মানে তার মূল্যও নেই। অথচ তাঁর মূল্য তো চাকরির মধ্যে নয়, তাঁর সত্তার মধ্যেই ছিল। আমি বলব, যে মানুষ চাকরি না থাকার কারণে নিজের মর্যাদা হারানো মনে করেন, তাঁর মানসিক ক্ষত সারানোর কোনো ওষুধ পৃথিবীতে নেই।
তবু অবসর কিন্তু কখনো নেতিবাচক নয়। বরং এটি এক নবজীবনের দ্বার। এক সময় পর্যন্ত আমরা জীবনকে দেখি কর্তব্যের চোখে, দায়িত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা থেকে। অবসরের পর আসে স্বাধীনতার ঋতু, যেখানে আর সময়ের তাড়া নেই, কর্তব্যের ভার নেই। সকালের দৌড়ঝাঁপ, অফিসের ব্যস্ততা, বৈঠকের চাপ সব পেরিয়ে অবসর মানুষকে উপহার দেয় নিজের মতো বাঁচার সুযোগ। বহু বছর ধরে জমে থাকা জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা এবার সমাজের, তরুণদের, কিংবা পরিবারের অনুপ্রেরণা হতে পারে। অবসর মানেই থেমে যাওয়া নয় বরং এটি অন্য এক জীবনধারার দিকে যাত্রা, যেখানে কর্তব্য নয়, ইচ্ছাই হয়ে ওঠে দিকনির্দেশনা।একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষ যদি ভাবতে পারেন, “এবার আমি নিজের জন্য কিছু করব” তাহলেই জীবনের মানচিত্রে নতুন রঙ ফুটে ওঠে। কেউ হয়তো বই লেখেন, কেউ বাগান করেন, কেউ নিঃস্বার্থভাবে পড়ান, কেউ আবার মসজিদ বা মন্দিরে গিয়ে নিজের আত্মাকে শান্ত করেন। জীবন তখন এক নতুন স্বাদ পায়। কারণ, জীবনের প্রতিটি বয়সেরই এক নিজস্ব সৌন্দর্য আছে—যদি আমরা তা দেখতে জানি।
অবসরকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করাই প্রকৃত প্রজ্ঞা। এটি আসলে জীবনের আরেক নাম অন্তর্মুখী শান্তি ও আত্মসম্মানের পুনর্জন্ম। যতদিন কাজ করেছি, ততদিন কর্তব্য ছিল অন্যের প্রতি; এখন কর্তব্য নিজের প্রতি। শরীর, মন, আত্মা সবই বিশ্রামের এবং পুনরুজ্জীবনের দাবি রাখে। তাই অবসর মানে হারানো নয়, বরং পাওয়ারই আরেক নাম। মনে রাখতে হবে, সূর্যই জীবনের প্রতীক। ভোরের সূর্য যেমন উদ্যম ও সম্ভাবনার, দুপুরের সূর্য তেমনি কর্ম ও সাফল্যের, আর গোধূলির সূর্য প্রশান্তি ও উপলব্ধির। জীবনের গোধূলিবেলায় যদি আমরা সেই আলোয় ভেসে যেতে পারি, যদি নিজেকে সাদরে গ্রহণ করতে পারি, তবে হৃদয়ের গভীরে তখনও নীরবে বাজবে, সমুখে শান্তি পারাবার, ভাসাও তরণী হে কর্ণধার।
লেখক: কৃষিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা