ড. রাধেশ্যাম সরকার
৩১ অক্টোবর, ২০২৫, 6:15 PM
বাংলার উৎসবচক্রে শরৎ-হেমন্তের সন্ধিক্ষণে যে পূজা দুর্গাজার ধারাকে নতুন রূপে উজ্জ্বল করে তোলে, তা হলো জগদ্ধাত্রী পূজা। পূজাপর্বের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, বিশ্বাস ও আবেগের বহুমাত্রিক প্রতিধ্বনি। দুর্গাপূজার ধূপের গন্ধ যখন মিলিয়ে যায়, তখনই বাংলার আকাশে নীরবে ভেসে আসে আরেক আরাধনার আলো তা হলো, জগদ্ধাত্রী পূজা। দেবী জগদ্ধাত্রী যেন দুর্গার পরশমুক্ত সত্তা, যিনি ধ্বংসের নয়, ধারনের শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হন। শাস্ত্র মতে, ‘যা জগৎ ধারণ করেন তিনিই জগদ্ধাত্রী’ এই বিশ্বাসেই তাঁর পূজা প্রচলিত। তিনি সাদা বস্ত্রে আবৃত, মুখে শান্তির দীপ্তি, হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুষ ও তীর; আর তাঁর পদতলে অহংকাররূপী হাতি। আর তারঁ বহন সিংহ। এই প্রতীকই বলে মানবের অন্তরের অহংকারই আসল অসুর, আর তাকে দমন করেই মানুষ পেতে পারে মুক্তির আলোক।
জগদ্ধাত্রী পূজার উৎপত্তি নিয়ে বহু কিংবদন্তি প্রচলিত। পুরাণে বলা হয়, দেবতারা এক সময় মহিষাসুর বধের পর অহংকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তাঁরা ভেবেছিলেন, তাঁরাই সর্বশক্তিমান। তখন দেবী দুর্গা তাঁদের শিক্ষা দিতে এক দীপ্ত রূপে প্রকাশিত হন তিনি জগদ্ধাত্রী, যিনি স্মরণ করিয়ে দেন, “অহংকারে নয়, ভক্তিতে নিহিত শক্তি।” এই পৌরাণিক সূত্র থেকেই জগদ্ধাত্রী আরাধনার সূত্রপাত, যা মূলত আত্মসংযম ও নম্রতার প্রতীক। আরেকটি কাহিনি বলে, দেবী জগদ্ধাত্রী বিষ্ণুর শক্তির আধার তিনিই সেই শক্তি, যিনি সৃষ্টিকে স্থিতি ও ভারসাম্যের পথে রাখেন। তাই তাঁকে বলা হয় ‘ধারণ শক্তির দেবী’।
বাংলায় জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন তুলনামূলকভাবে নবীন হলেও তার শিকড় গভীর। ধারণা করা হয়, নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় ১৮শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে দুর্গাপূজার পর ভক্তিমনস্কতার ধারাবাহিকতায় জগদ্ধাত্রী পূজার প্রবর্তন করেন। রাজবাড়ির এই পূজা পরবর্তীকালে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কৃষ্ণনগর, শ্রীরামপুর, চন্দননগর, ও হুগলি অঞ্চলে। বিশেষত চন্দননগরে আজও জগদ্ধাত্রী পূজা আলো, কারুকার্য ও শিল্পকীর্তির জন্য প্রসিদ্ধ। বলা হয়ে থাকে, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র একবার কারাবন্দি অবস্থায় দুর্গাপূজা করতে না পেরে মনোবেদনায় নিমজ্জিত হন। তখন দেবী স্বপ্নে এসে জানান, “আমি জগদ্ধাত্রী রূপে তোমার পূজায় আসবো।” সেই থেকেই শুরু হয় এই পূজার নব অধ্যায়। বাংলাদেশেও জগদ্ধাত্রী পূজা ধীরে ধীরে এক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। দুর্গাপূজার পর যখন প্রকৃতি নিস্তব্ধ, তখন অনেক অঞ্চলেই আবার জেগে ওঠে মন্দির, পাড়া, ও গৃহের মণ্ডপ। খুলনা, যশোর, নারায়ণগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মাদারীপুর, ও রাজশাহী অঞ্চলে পূজাটি আজও উদযাপিত হয় শান্ত অথচ অনুপ্রাণিত পরিবেশে। দেবীর প্রতিমা স্থাপন থেকে শুরু করে সজ্জা, আরতি, ও প্রসাদ বিতরণ সবকিছুতেই থাকে এক আন্তরিক সরলতা। অনেক সময় স্থানীয় মুসলমান প্রতিবেশীরাও সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। কেউ প্যান্ডেল নির্মাণে সাহায্য করেন, কেউ আলোকসজ্জায় অংশ নেন, কেউ আবার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন। এই দৃশ্যই প্রমাণ করে, ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে জগদ্ধাত্রী পূজা হয়ে উঠেছে সামাজিক সম্প্রীতির এক প্রতীকী উৎসব।
ধর্মীয় দিক থেকে জগদ্ধাত্রী দেবীর আরাধনা এক গভীর তত্ত্ব বহন করে। তিনি দুর্গার পরিণত রূপ, ত্রিগুণময়ী শক্তির তৃতীয় প্রকাশ। শাস্ত্রকারেরা বলেন, “জগদ্ধাত্রী দুর্গার রজোগুণ রূপা।” অর্থাৎ, তিনি স্থিতি ও সংযমের প্রতীক। মানুষ যেমন জীবনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য আত্মসংযম শেখে, তেমনি দেবীও শেখান নিজেকে জয় করাই আসল জয়। তাঁর চার হাতে থাকা অস্ত্র শঙ্খ জ্ঞানের আহ্বান, চক্র কর্মশক্তির প্রতীক, ধনুক ও তীর সংকল্প ও অধ্যবসায়ের ইঙ্গিত। তাঁর বাহন সিংহ, যা সাহসের প্রতীক; আর পদতলে থাকা হাতি অহংকার ও অন্ধকারের রূপক। প্রতিমার এই প্রতিটি উপাদান যেন মানুষের আত্মোন্নয়নের পাঠ।
বাংলার সংস্কৃতিতে জগদ্ধাত্রী পূজা এক নান্দনিক উৎসব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পাড়া-মহল্লার মানুষ একত্র হয়ে পূজার আয়োজন করে; সন্ধ্যায় ঢাকের তালে, ধূপের গন্ধে, আলোয় ভরে ওঠে পরিবেশ। শিশুরা মেতে ওঠে আনন্দে, যুবকেরা ব্যস্ত থাকে স্বেচ্ছাসেবায়, আর প্রবীণরা তন্ময় হয়ে স্মৃতির পথে ফিরে যান। এই মিলনের আবহে জন্ম নেয় সামাজিক বন্ধন ও পারস্পরিক সহমর্মিতা। অনেক স্থানে এই পূজার সঙ্গে যুক্ত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, বা দেবী সম্পর্কিত গান। ফলে এটি হয়ে ওঠে ধর্মীয়তার সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধন। বাংলাদেশের মতো বহু ধর্মের মানুষের দেশে জগদ্ধাত্রী পূজা একতার বার্তা দেয়। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই মন্ত্রে ভর করে পূজার আনন্দ ভাগাভাগি হয়। মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ সকলেই একসাথে অংশ নেন আলো, সৌন্দর্য, ও মানবতার উদযাপনে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে দেখা যায়, পূজার দিনগুলোতে চারপাশের মানুষ একসাথে ভোগ রান্না করেন, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন, আর মণ্ডপে ভক্তিগীত গেয়ে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। এই মিলন শুধু ধর্মীয় নয়, মানবিকতার।
জগদ্ধাত্রী পূজার অন্তর্নিহিত দর্শন মানুষকে শেখায় আত্মপ্রত্যয়ের পাঠ। দেবী যেন মনে করিয়ে দেন, “মানুষ নিজেই নিজের ধারণশক্তি।” জীবনের প্রতিকূলতা, হতাশা, বা সংকটে তিনি আমাদের অন্তরের দৃঢ়তাকে জাগ্রত করেন। তাই জগদ্ধাত্রী পূজা কেবল বাহ্যিক আচার নয়, এটি এক আত্মশুদ্ধির পথ। সমাজে যখন অবিশ্বাস, হিংসা বা বিভাজনের আগুন জ্বলে ওঠে, তখন এই দেবী মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন, আলো জ্বালাতে হলে প্রথমে নিজের অন্তরে অন্ধকার দূর করতে হয়।
বাংলার শিল্প ও সাহিত্যে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রভাবও লক্ষণীয়। চন্দননগরের আলোকসজ্জা যেমন শিল্পের বিস্ময় সৃষ্টি করে, তেমনি কবিদের কলমে দেবী জগদ্ধাত্রী হয়েছেন মাতৃত্ব ও স্নেহের প্রতীক। তিনি যেন সেই মায়ের প্রতিরূপ, যিনি পৃথিবীকে ধারণ করেন নিজের বুকের ওপর, তবু নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় অটল। এই ভালোবাসাই আমাদের শেখায় সহিষ্ণুতা, সহযোগিতা ও মানবতার পাঠ।
আজকের বাংলাদেশে জগদ্ধাত্রী পূজা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি এক সামাজিক চেতনার প্রতীক। উৎসবের দিনগুলোতে মানুষ ভুলে যায় বিভাজন, একে অপরের হাতে তুলে দেয় আলোর প্রদীপ, আর হাসির ভাগ। ধর্মীয় সম্প্রীতির এই চিত্রই বাংলাদেশের আসল সৌন্দর্য। দেবী জগদ্ধাত্রীর আরাধনা তাই শেষ পর্যন্ত এক মানবিক জাগরণের প্রতীক। তিনি শেখান, অহংকার নয়, ভালোবাসাই আসল শক্তি; বিভাজন নয়, সম্প্রীতিই চিরন্তন। যখন আমরা তাঁকে প্রণাম করি, তখন আসলে নিজের মধ্যকার আলোকে জাগিয়ে তুলি, নিজের অহংকারকে দমন করি।
বাংলার আকাশে যখন কার্তিকের শেষ আলো ম্লান হয়ে আসে, তখন মন্দিরের উঠোনে বাজে ঢাকের ছন্দ, ভেসে আসে মন্ত্রধ্বনি “জয় জগদ্ধাত্রী মা।” সেই ধ্বনি যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের প্রকৃত শক্তি ভক্তি, সহিষ্ণুতা ও মানবতায়। এই বার্তাই জগদ্ধাত্রী পূজার চিরন্তন তাৎপর্য।
লেখক: কৃষিবিদ, কলামিষ্ট ও সভাপতি, মহানগর সার্বজনীন পুজা কমিটি, শেরেবাংলা নগর থানা শাখা।
ড. রাধেশ্যাম সরকার
৩১ অক্টোবর, ২০২৫, 6:15 PM
বাংলার উৎসবচক্রে শরৎ-হেমন্তের সন্ধিক্ষণে যে পূজা দুর্গাজার ধারাকে নতুন রূপে উজ্জ্বল করে তোলে, তা হলো জগদ্ধাত্রী পূজা। পূজাপর্বের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, বিশ্বাস ও আবেগের বহুমাত্রিক প্রতিধ্বনি। দুর্গাপূজার ধূপের গন্ধ যখন মিলিয়ে যায়, তখনই বাংলার আকাশে নীরবে ভেসে আসে আরেক আরাধনার আলো তা হলো, জগদ্ধাত্রী পূজা। দেবী জগদ্ধাত্রী যেন দুর্গার পরশমুক্ত সত্তা, যিনি ধ্বংসের নয়, ধারনের শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হন। শাস্ত্র মতে, ‘যা জগৎ ধারণ করেন তিনিই জগদ্ধাত্রী’ এই বিশ্বাসেই তাঁর পূজা প্রচলিত। তিনি সাদা বস্ত্রে আবৃত, মুখে শান্তির দীপ্তি, হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুষ ও তীর; আর তাঁর পদতলে অহংকাররূপী হাতি। আর তারঁ বহন সিংহ। এই প্রতীকই বলে মানবের অন্তরের অহংকারই আসল অসুর, আর তাকে দমন করেই মানুষ পেতে পারে মুক্তির আলোক।
জগদ্ধাত্রী পূজার উৎপত্তি নিয়ে বহু কিংবদন্তি প্রচলিত। পুরাণে বলা হয়, দেবতারা এক সময় মহিষাসুর বধের পর অহংকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তাঁরা ভেবেছিলেন, তাঁরাই সর্বশক্তিমান। তখন দেবী দুর্গা তাঁদের শিক্ষা দিতে এক দীপ্ত রূপে প্রকাশিত হন তিনি জগদ্ধাত্রী, যিনি স্মরণ করিয়ে দেন, “অহংকারে নয়, ভক্তিতে নিহিত শক্তি।” এই পৌরাণিক সূত্র থেকেই জগদ্ধাত্রী আরাধনার সূত্রপাত, যা মূলত আত্মসংযম ও নম্রতার প্রতীক। আরেকটি কাহিনি বলে, দেবী জগদ্ধাত্রী বিষ্ণুর শক্তির আধার তিনিই সেই শক্তি, যিনি সৃষ্টিকে স্থিতি ও ভারসাম্যের পথে রাখেন। তাই তাঁকে বলা হয় ‘ধারণ শক্তির দেবী’।
বাংলায় জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন তুলনামূলকভাবে নবীন হলেও তার শিকড় গভীর। ধারণা করা হয়, নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় ১৮শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে দুর্গাপূজার পর ভক্তিমনস্কতার ধারাবাহিকতায় জগদ্ধাত্রী পূজার প্রবর্তন করেন। রাজবাড়ির এই পূজা পরবর্তীকালে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কৃষ্ণনগর, শ্রীরামপুর, চন্দননগর, ও হুগলি অঞ্চলে। বিশেষত চন্দননগরে আজও জগদ্ধাত্রী পূজা আলো, কারুকার্য ও শিল্পকীর্তির জন্য প্রসিদ্ধ। বলা হয়ে থাকে, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র একবার কারাবন্দি অবস্থায় দুর্গাপূজা করতে না পেরে মনোবেদনায় নিমজ্জিত হন। তখন দেবী স্বপ্নে এসে জানান, “আমি জগদ্ধাত্রী রূপে তোমার পূজায় আসবো।” সেই থেকেই শুরু হয় এই পূজার নব অধ্যায়। বাংলাদেশেও জগদ্ধাত্রী পূজা ধীরে ধীরে এক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। দুর্গাপূজার পর যখন প্রকৃতি নিস্তব্ধ, তখন অনেক অঞ্চলেই আবার জেগে ওঠে মন্দির, পাড়া, ও গৃহের মণ্ডপ। খুলনা, যশোর, নারায়ণগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মাদারীপুর, ও রাজশাহী অঞ্চলে পূজাটি আজও উদযাপিত হয় শান্ত অথচ অনুপ্রাণিত পরিবেশে। দেবীর প্রতিমা স্থাপন থেকে শুরু করে সজ্জা, আরতি, ও প্রসাদ বিতরণ সবকিছুতেই থাকে এক আন্তরিক সরলতা। অনেক সময় স্থানীয় মুসলমান প্রতিবেশীরাও সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। কেউ প্যান্ডেল নির্মাণে সাহায্য করেন, কেউ আলোকসজ্জায় অংশ নেন, কেউ আবার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন। এই দৃশ্যই প্রমাণ করে, ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে জগদ্ধাত্রী পূজা হয়ে উঠেছে সামাজিক সম্প্রীতির এক প্রতীকী উৎসব।
ধর্মীয় দিক থেকে জগদ্ধাত্রী দেবীর আরাধনা এক গভীর তত্ত্ব বহন করে। তিনি দুর্গার পরিণত রূপ, ত্রিগুণময়ী শক্তির তৃতীয় প্রকাশ। শাস্ত্রকারেরা বলেন, “জগদ্ধাত্রী দুর্গার রজোগুণ রূপা।” অর্থাৎ, তিনি স্থিতি ও সংযমের প্রতীক। মানুষ যেমন জীবনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য আত্মসংযম শেখে, তেমনি দেবীও শেখান নিজেকে জয় করাই আসল জয়। তাঁর চার হাতে থাকা অস্ত্র শঙ্খ জ্ঞানের আহ্বান, চক্র কর্মশক্তির প্রতীক, ধনুক ও তীর সংকল্প ও অধ্যবসায়ের ইঙ্গিত। তাঁর বাহন সিংহ, যা সাহসের প্রতীক; আর পদতলে থাকা হাতি অহংকার ও অন্ধকারের রূপক। প্রতিমার এই প্রতিটি উপাদান যেন মানুষের আত্মোন্নয়নের পাঠ।
বাংলার সংস্কৃতিতে জগদ্ধাত্রী পূজা এক নান্দনিক উৎসব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পাড়া-মহল্লার মানুষ একত্র হয়ে পূজার আয়োজন করে; সন্ধ্যায় ঢাকের তালে, ধূপের গন্ধে, আলোয় ভরে ওঠে পরিবেশ। শিশুরা মেতে ওঠে আনন্দে, যুবকেরা ব্যস্ত থাকে স্বেচ্ছাসেবায়, আর প্রবীণরা তন্ময় হয়ে স্মৃতির পথে ফিরে যান। এই মিলনের আবহে জন্ম নেয় সামাজিক বন্ধন ও পারস্পরিক সহমর্মিতা। অনেক স্থানে এই পূজার সঙ্গে যুক্ত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, বা দেবী সম্পর্কিত গান। ফলে এটি হয়ে ওঠে ধর্মীয়তার সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধন। বাংলাদেশের মতো বহু ধর্মের মানুষের দেশে জগদ্ধাত্রী পূজা একতার বার্তা দেয়। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই মন্ত্রে ভর করে পূজার আনন্দ ভাগাভাগি হয়। মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ সকলেই একসাথে অংশ নেন আলো, সৌন্দর্য, ও মানবতার উদযাপনে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে দেখা যায়, পূজার দিনগুলোতে চারপাশের মানুষ একসাথে ভোগ রান্না করেন, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন, আর মণ্ডপে ভক্তিগীত গেয়ে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। এই মিলন শুধু ধর্মীয় নয়, মানবিকতার।
জগদ্ধাত্রী পূজার অন্তর্নিহিত দর্শন মানুষকে শেখায় আত্মপ্রত্যয়ের পাঠ। দেবী যেন মনে করিয়ে দেন, “মানুষ নিজেই নিজের ধারণশক্তি।” জীবনের প্রতিকূলতা, হতাশা, বা সংকটে তিনি আমাদের অন্তরের দৃঢ়তাকে জাগ্রত করেন। তাই জগদ্ধাত্রী পূজা কেবল বাহ্যিক আচার নয়, এটি এক আত্মশুদ্ধির পথ। সমাজে যখন অবিশ্বাস, হিংসা বা বিভাজনের আগুন জ্বলে ওঠে, তখন এই দেবী মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন, আলো জ্বালাতে হলে প্রথমে নিজের অন্তরে অন্ধকার দূর করতে হয়।
বাংলার শিল্প ও সাহিত্যে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রভাবও লক্ষণীয়। চন্দননগরের আলোকসজ্জা যেমন শিল্পের বিস্ময় সৃষ্টি করে, তেমনি কবিদের কলমে দেবী জগদ্ধাত্রী হয়েছেন মাতৃত্ব ও স্নেহের প্রতীক। তিনি যেন সেই মায়ের প্রতিরূপ, যিনি পৃথিবীকে ধারণ করেন নিজের বুকের ওপর, তবু নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় অটল। এই ভালোবাসাই আমাদের শেখায় সহিষ্ণুতা, সহযোগিতা ও মানবতার পাঠ।
আজকের বাংলাদেশে জগদ্ধাত্রী পূজা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি এক সামাজিক চেতনার প্রতীক। উৎসবের দিনগুলোতে মানুষ ভুলে যায় বিভাজন, একে অপরের হাতে তুলে দেয় আলোর প্রদীপ, আর হাসির ভাগ। ধর্মীয় সম্প্রীতির এই চিত্রই বাংলাদেশের আসল সৌন্দর্য। দেবী জগদ্ধাত্রীর আরাধনা তাই শেষ পর্যন্ত এক মানবিক জাগরণের প্রতীক। তিনি শেখান, অহংকার নয়, ভালোবাসাই আসল শক্তি; বিভাজন নয়, সম্প্রীতিই চিরন্তন। যখন আমরা তাঁকে প্রণাম করি, তখন আসলে নিজের মধ্যকার আলোকে জাগিয়ে তুলি, নিজের অহংকারকে দমন করি।
বাংলার আকাশে যখন কার্তিকের শেষ আলো ম্লান হয়ে আসে, তখন মন্দিরের উঠোনে বাজে ঢাকের ছন্দ, ভেসে আসে মন্ত্রধ্বনি “জয় জগদ্ধাত্রী মা।” সেই ধ্বনি যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের প্রকৃত শক্তি ভক্তি, সহিষ্ণুতা ও মানবতায়। এই বার্তাই জগদ্ধাত্রী পূজার চিরন্তন তাৎপর্য।
লেখক: কৃষিবিদ, কলামিষ্ট ও সভাপতি, মহানগর সার্বজনীন পুজা কমিটি, শেরেবাংলা নগর থানা শাখা।