CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০২ জানুয়ারি, ২০২৬

শুক্রবারের ভূমিকম্প আমাদের কী শেখাল

#
news image

প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ঝড়, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘটনা মানুষকে অন্তত কিছুটা প্রস্তুতির সময় দেয়, কিন্তু ভূমিকম্প কোন দিন, কোন মুহূর্তে, কোন অঞ্চলে শক্তিশালী কম্পন সৃষ্টি করে পৃথিবীর বুক কাঁপিয়ে দেবে তা পূর্বাভাসের প্রযুক্তি মানুয়ের নাগালের বাইরে। কয়েকটি অ্যাপ ভূমিকম্প শুরু হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সতর্ক সংকেত পাঠাতে পারে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো আসলে পূর্বাভাস নয়; বরং কম্পনের তরঙ্গ শনাক্ত করে মানুষকে মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে জানার সুযোগ দেয়। হঠাৎ কিছু বোঝার আগেই গত শুক্রবার জুম্মার আগে সারা দেশের পরিবেশ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল, মুহূর্তেই কেঁপে উঠেছিল বাংলাদেশ। টিনের ঘর থেকে শুরু করে দালান, অট্টালিকা, রাস্তা, পাড়া-মহল্লা, এমনকি বহু বছরের পুরোনো স্থাপনাগুলো পর্যন্ত কম্পনের তীব্রতায় দুলতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গেই কিছু দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়, রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর মানুষ ভয়ে ছুটে বাইরে এসে দাঁড়ায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী এই ভূমিকম্পে অন্তত সতেরো জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং চার শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। যারা সরাসরি অনুভব করেছেন এই তান্ডব তারা জানিয়েছেন, তাদের মনে হচ্ছিল যেন জীবনের শেষ সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছেন তারা। মাত্র ৫.৭ মাত্রার এই ভূমিকম্প বলেই ক্ষতি কম হয়েছে এমনটি বলা কঠিন; বরং এই ছোট থেকে মাঝারি মাত্রার কম্পনই কোটি মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার তীব্র প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছে।

 

২১ নভেম্বরের এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল নরসিংদী, যা মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস অনুযায়ী মাটি থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপন্ন হয়েছিল। বড় ভূমিকম্পের আগে প্রায়ই ছোট ফোরশক বা পূর্বাভাস কম্পন অনুভূত হয়, যা অপেক্ষাকৃত কম শক্তির হলেও ভবিষ্যতে আসন্ন প্রধান কম্পনের ইঙ্গিত দেয়। প্রধান কম্পনকে মেইনশক বলা হয় এবং এর পরে একই স্থানে পরবর্তী কম্পন বা আফটারশক ঘটে। আফটারশকের মাত্রা এবং সময়কাল মূল কম্পনের আকারের ওপর নির্ভর করে এবং এটি কখনও সপ্তাহব্যাপী এবং কখনও মাসব্যাপী চলতে পারে। গত শুক্রবারে ভূকম্পনটির অনুভূতি রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে নরাসংদী, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, নড়াইল, রংপুর, সাতক্ষীরা, যশোর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, রাজশাহী, সিলেটসহ বহু জেলায়। এমনকি ভারতের কিছু অঞ্চলেও এর প্রভাব অনুভূত হয়েছে, যা এই ভূমিকম্পের বিস্তৃততাকেই নির্দেশ করে। সরকারি সংস্থার হিসাবে মোট ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় আহত হয়েছেন মোট ৪৬১ জন, যার মধ্যে শুধু গাজীপুরেই আহতের সংখ্যা ২৫২ জন একক জেলা হিসেবে যা সর্বোচ্চ। অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ কর্তৃপক্ষ বলেছেন, এই মুহূর্তে হতাহতের পূর্ণ হিসাব এবং ক্ষয়ক্ষতির মোট পরিমান নিরূপণই সরকারের প্রধান কাজ, যদিও ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার বা বড় পরিসরের ডেবরিস ম্যানেজমেন্টের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতার অভাব আছে।

 

ভবন ও স্থাপনাগুলোর দেয়ালে যে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের অবকাঠামোর ভঙ্গুরতা খুব স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলছে, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকা অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে পড়ে। কারণ এসব অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ স্তরে রয়েছে কয়েকটি সক্রিয় ফাটল, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। তাত্ত্বিকভাবে এই শক্তি কখনো না কখনো ভূমিকম্প হিসেবে বের হবেই। এটাই পৃথিবীর স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যা হলো, আমাদের নগর পরিকল্পনা ও গঠন এবং ভবন-ব্যবস্থায় ভূমিকম্প প্রতিরোধী নীতিমালা যথাযথভাবে মানা হয়নি। ঢাকার মতো অতিঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে বহু ভবন বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি হয়েছে, বেশিরভাগ পুরনো ও অপরিকল্পিত বহুতল ভবন এমন দুর্বল যে মাঝারি কম্পনেই বড় ক্ষতি হতে পারে।

 

বিশ্বব্যাপী ভূমিকম্পের বার্ষিক সংখ্যা লাখের ঘরে, যার বেশিরভাগই অনুভূত হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১৩৮টি ভূমিকম্প পৃথিবীতে ঘটে, জাপানসহ অনেক দেশে হালকা ভূকম্পন প্রতিদিনই অনুভূত হয়। ভূমিকম্প সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থেকে এক-দুই মিনিট স্থায়ী হয়, তবে খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো ভূমিকম্প আট থেকে দশ মিনিট স্থায়ী হয়েছে। মাঝারি বা তীব্র ভূমিকম্পই মূলত বড় ক্ষতি ঘটায়, ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ধসে পড়ে, মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। ইতিহাস এর অনেক উদাহরন আছে, ১৭৬২ সালের গ্রেট আরাকান ভূমিকম্প (৮.৫ মাত্রা), ১৮৯৭ সালের আসাম ভূমিকম্প (৮.৭ মাত্রা), ১৯১৮ সালের বালিসিরা, ১৯৩০ সালের ধুবড়ি ভূমিকম্পের মতো ঘটনাগুলো পূর্ব ভারত-বাংলাদেশ উপত্যকার ভূকম্পন-ইতিহাসকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে। বিশ শতকের মাঝামাঝি মিয়ানমারেও শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটেছে, যা ঢাকাসহ গোটা অঞ্চলের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

 

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সূত্রে জানা যায়, শুক্রবারের ভূমিকম্প কোনো বিস্ময় নয়। বরং এটি একটি সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্পের ‘ফোরশক’ অর্থাৎ বড় ভূমিকম্পের আগে যে ছোট ছোট কম্পন দেখা দেয়। তারা সরাসরি বলেছেন, মাত্রা যদি ৬-এর কাছাকাছি চলে যায়, তাহলে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ঘটতে পারে। মিয়ানমারের ২৮ মার্চের ভূমিকম্প ছিল ৭.৭ মাত্রার, যার উৎপত্তিস্থল ছিল মান্দালয় থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে এবং মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে। এরপর ৬.৮ মাত্রার পরাঘাতসহ আরও কয়েকটি কম্পন হয়েছিল। এই ভূমিকম্পে দেশটির বহু স্থাপনা, রাস্তা, উপাসনালয়, ঘরবাড়ি, সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়। অনেক মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। ভূবিজ্ঞানীরা জানান, ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষে যে বিশাল শক্তি সঞ্চিত হয়েছিল, সেটিই এমন বিপুল মাত্রার কম্পনে রূপ নিয়েছিল।

 

পৃথিবীর ইতিহাস আরো বলছে, ১৯৭৬ সালের চীনের তাংশান ভূমিকম্পে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল; ২০০৪ সালের সুমাত্রা ভূমিকম্প ও সুনামিতে দক্ষিণ এশিয়ার ১৪টি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল; ২০১০ সালের হাইতির ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কয়েক লক্ষ মানুষ মারা যায় এবং লক্ষাধিক স্থাপনা ধ্বংস হয়। এমন অসংখ্য উদাহরণ মানবসভ্যতাকে শিখিয়েছে যে, ভূমিকম্প রোধ করা যায় না, তবে প্রস্তুতি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা ক্ষতি কমাতে পারে।

 

বাংলাদেশের বর্তমান নগরায়ণ সেই প্রস্তুতির ঘাটতিকে স্পষ্ট করে। সরু গলি, অপর্যাপ্ত উদ্ধারকর্মী, গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের জটিলতা, রাসায়নিক গুদামের ঝুঁকি, বিল্ডিং কোড উপেক্ষা করে নির্মাণ এসব মিলিয়ে বড় ভূমিকম্প হলে  ঢাকার মতো শহরগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি ভয়ংকর মাত্রায় পৌঁছাতে পারে। আরও বড় সমস্যা হলো, শহরের বহু শিল্প ও গার্মেন্টস ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা এখনো পরীক্ষা করা হয়নি। এই ভবনগুলোতে প্রতিদিন লক্ষাধিক শ্রমিকের উপস্থিতি থাকায় এ ধরনের ভবনের ঝুঁকি জাতীয় নিরাপত্তার পর্যায়ে চলে যায়।

 

বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল, এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তাই এখনই শহরের পুরনো ভবনগুলো চিহ্নিত করে স্ট্রাকচারাল অডিট করা, প্রয়োজন হলে রেট্রোফিটিং বা পুনর্নির্মাণ করা জরুরি। এটাও জরুরি যে ভবিষ্যতের সব ভবন নির্মাণে ভূকম্পন-সহনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করতে হবে। উদ্ধারসক্ষমতা বাড়াতে হবে, আগুন লাগা বা গ্যাসলাইন বিস্ফোরণের মতো দ্বিতীয় বিপর্যয় ঠেকাতে সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। স্কুল-কলেজে নিয়মিত মহড়া চালু করতে হবে। নগরীর জটিলতা কমিয়ে উন্মুক্ত জায়গা, প্রশস্ত রাস্তা, জরুরি সেবা কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে।

 

শুক্রবারের ভূমিকম্প আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে সামনে থাকা ভবিষ্যৎ কতটা অনিশ্চিত হতে পারে। মাত্র ৫.৭ মাত্রার একটি কম্পন সারা দেশকে কাঁপিয়ে দিয়ে হঠাৎই বুঝিয়ে দিল ভয় কাকে বলে? অনেকেই বলছিলেন, এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল মৃত্যু যেন খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। যে হবু ডাক্তার ছেলেটি মায়ের সঙ্গে বাজারে গিয়েছিল শুক্রবারের রান্নার জন্য মাংস কিনতে, সেই ছেলেটির আর ঘরে ফেরা হয়নি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছে। এমন ঘটনা মনকে ভারী করে তোলে। এই ভূমিকম্প আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে এত ছোট মাত্রার কম্পনেও মানুষ মারা যেতে পারে, শত শত মানুষ আহত হয়, বহু ভবনে ফাটল দেখা দেয়। এটি শুধু দুর্ভাগ্য নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল অবকাঠামোর ফলাফল। পৃথিবীর অনেক দেশ নিয়মিত ভূমিকম্প সহ্য করেও নিরাপদ থাকে, কারণ তারা প্রস্তুত থাকে, নিয়ম মেনে নির্মাণ করে, প্রশিক্ষণ দেয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করে।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর রচনায় বলেছিলেন, “সম্ভবপরের জন্যে প্রস্তুত থাকাই সভ্যতা।” কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি সেই সভ্যতার ধারায় সত্যিই হাঁটতে পেরেছি। বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি বহু বছর ধরে পরিচিত এবং সতর্ক করার মতো একটি বাস্তবতা। তাই বাংলাদেশও পারবে, যদি এখনই গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি বাড়ানো শুরু করা হয়। শহরগুলোকে নিরাপদ করতে, ভবনগুলোকে শক্তিশালী করতে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এবং উদ্ধার সক্ষমতা উন্নত করতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। না হলে বড় মাত্রার ভূমিকম্প এলে ক্ষতির পরিমাণ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটি আমরা কেউই কল্পনা করতে চাই না।

লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক  ও কলামিষ্ট

ড.রাধেশ্যাম সরকার

২৩ নভেম্বর, ২০২৫,  4:48 PM

news image

প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ঝড়, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘটনা মানুষকে অন্তত কিছুটা প্রস্তুতির সময় দেয়, কিন্তু ভূমিকম্প কোন দিন, কোন মুহূর্তে, কোন অঞ্চলে শক্তিশালী কম্পন সৃষ্টি করে পৃথিবীর বুক কাঁপিয়ে দেবে তা পূর্বাভাসের প্রযুক্তি মানুয়ের নাগালের বাইরে। কয়েকটি অ্যাপ ভূমিকম্প শুরু হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সতর্ক সংকেত পাঠাতে পারে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো আসলে পূর্বাভাস নয়; বরং কম্পনের তরঙ্গ শনাক্ত করে মানুষকে মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে জানার সুযোগ দেয়। হঠাৎ কিছু বোঝার আগেই গত শুক্রবার জুম্মার আগে সারা দেশের পরিবেশ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল, মুহূর্তেই কেঁপে উঠেছিল বাংলাদেশ। টিনের ঘর থেকে শুরু করে দালান, অট্টালিকা, রাস্তা, পাড়া-মহল্লা, এমনকি বহু বছরের পুরোনো স্থাপনাগুলো পর্যন্ত কম্পনের তীব্রতায় দুলতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গেই কিছু দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়, রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর মানুষ ভয়ে ছুটে বাইরে এসে দাঁড়ায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী এই ভূমিকম্পে অন্তত সতেরো জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং চার শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। যারা সরাসরি অনুভব করেছেন এই তান্ডব তারা জানিয়েছেন, তাদের মনে হচ্ছিল যেন জীবনের শেষ সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছেন তারা। মাত্র ৫.৭ মাত্রার এই ভূমিকম্প বলেই ক্ষতি কম হয়েছে এমনটি বলা কঠিন; বরং এই ছোট থেকে মাঝারি মাত্রার কম্পনই কোটি মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার তীব্র প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছে।

 

২১ নভেম্বরের এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল নরসিংদী, যা মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস অনুযায়ী মাটি থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপন্ন হয়েছিল। বড় ভূমিকম্পের আগে প্রায়ই ছোট ফোরশক বা পূর্বাভাস কম্পন অনুভূত হয়, যা অপেক্ষাকৃত কম শক্তির হলেও ভবিষ্যতে আসন্ন প্রধান কম্পনের ইঙ্গিত দেয়। প্রধান কম্পনকে মেইনশক বলা হয় এবং এর পরে একই স্থানে পরবর্তী কম্পন বা আফটারশক ঘটে। আফটারশকের মাত্রা এবং সময়কাল মূল কম্পনের আকারের ওপর নির্ভর করে এবং এটি কখনও সপ্তাহব্যাপী এবং কখনও মাসব্যাপী চলতে পারে। গত শুক্রবারে ভূকম্পনটির অনুভূতি রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে নরাসংদী, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, নড়াইল, রংপুর, সাতক্ষীরা, যশোর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, রাজশাহী, সিলেটসহ বহু জেলায়। এমনকি ভারতের কিছু অঞ্চলেও এর প্রভাব অনুভূত হয়েছে, যা এই ভূমিকম্পের বিস্তৃততাকেই নির্দেশ করে। সরকারি সংস্থার হিসাবে মোট ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় আহত হয়েছেন মোট ৪৬১ জন, যার মধ্যে শুধু গাজীপুরেই আহতের সংখ্যা ২৫২ জন একক জেলা হিসেবে যা সর্বোচ্চ। অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ কর্তৃপক্ষ বলেছেন, এই মুহূর্তে হতাহতের পূর্ণ হিসাব এবং ক্ষয়ক্ষতির মোট পরিমান নিরূপণই সরকারের প্রধান কাজ, যদিও ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার বা বড় পরিসরের ডেবরিস ম্যানেজমেন্টের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতার অভাব আছে।

 

ভবন ও স্থাপনাগুলোর দেয়ালে যে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের অবকাঠামোর ভঙ্গুরতা খুব স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলছে, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকা অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে পড়ে। কারণ এসব অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ স্তরে রয়েছে কয়েকটি সক্রিয় ফাটল, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। তাত্ত্বিকভাবে এই শক্তি কখনো না কখনো ভূমিকম্প হিসেবে বের হবেই। এটাই পৃথিবীর স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যা হলো, আমাদের নগর পরিকল্পনা ও গঠন এবং ভবন-ব্যবস্থায় ভূমিকম্প প্রতিরোধী নীতিমালা যথাযথভাবে মানা হয়নি। ঢাকার মতো অতিঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে বহু ভবন বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি হয়েছে, বেশিরভাগ পুরনো ও অপরিকল্পিত বহুতল ভবন এমন দুর্বল যে মাঝারি কম্পনেই বড় ক্ষতি হতে পারে।

 

বিশ্বব্যাপী ভূমিকম্পের বার্ষিক সংখ্যা লাখের ঘরে, যার বেশিরভাগই অনুভূত হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১৩৮টি ভূমিকম্প পৃথিবীতে ঘটে, জাপানসহ অনেক দেশে হালকা ভূকম্পন প্রতিদিনই অনুভূত হয়। ভূমিকম্প সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থেকে এক-দুই মিনিট স্থায়ী হয়, তবে খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো ভূমিকম্প আট থেকে দশ মিনিট স্থায়ী হয়েছে। মাঝারি বা তীব্র ভূমিকম্পই মূলত বড় ক্ষতি ঘটায়, ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ধসে পড়ে, মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। ইতিহাস এর অনেক উদাহরন আছে, ১৭৬২ সালের গ্রেট আরাকান ভূমিকম্প (৮.৫ মাত্রা), ১৮৯৭ সালের আসাম ভূমিকম্প (৮.৭ মাত্রা), ১৯১৮ সালের বালিসিরা, ১৯৩০ সালের ধুবড়ি ভূমিকম্পের মতো ঘটনাগুলো পূর্ব ভারত-বাংলাদেশ উপত্যকার ভূকম্পন-ইতিহাসকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে। বিশ শতকের মাঝামাঝি মিয়ানমারেও শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটেছে, যা ঢাকাসহ গোটা অঞ্চলের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

 

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সূত্রে জানা যায়, শুক্রবারের ভূমিকম্প কোনো বিস্ময় নয়। বরং এটি একটি সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্পের ‘ফোরশক’ অর্থাৎ বড় ভূমিকম্পের আগে যে ছোট ছোট কম্পন দেখা দেয়। তারা সরাসরি বলেছেন, মাত্রা যদি ৬-এর কাছাকাছি চলে যায়, তাহলে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ঘটতে পারে। মিয়ানমারের ২৮ মার্চের ভূমিকম্প ছিল ৭.৭ মাত্রার, যার উৎপত্তিস্থল ছিল মান্দালয় থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে এবং মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে। এরপর ৬.৮ মাত্রার পরাঘাতসহ আরও কয়েকটি কম্পন হয়েছিল। এই ভূমিকম্পে দেশটির বহু স্থাপনা, রাস্তা, উপাসনালয়, ঘরবাড়ি, সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়। অনেক মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। ভূবিজ্ঞানীরা জানান, ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষে যে বিশাল শক্তি সঞ্চিত হয়েছিল, সেটিই এমন বিপুল মাত্রার কম্পনে রূপ নিয়েছিল।

 

পৃথিবীর ইতিহাস আরো বলছে, ১৯৭৬ সালের চীনের তাংশান ভূমিকম্পে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল; ২০০৪ সালের সুমাত্রা ভূমিকম্প ও সুনামিতে দক্ষিণ এশিয়ার ১৪টি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল; ২০১০ সালের হাইতির ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কয়েক লক্ষ মানুষ মারা যায় এবং লক্ষাধিক স্থাপনা ধ্বংস হয়। এমন অসংখ্য উদাহরণ মানবসভ্যতাকে শিখিয়েছে যে, ভূমিকম্প রোধ করা যায় না, তবে প্রস্তুতি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা ক্ষতি কমাতে পারে।

 

বাংলাদেশের বর্তমান নগরায়ণ সেই প্রস্তুতির ঘাটতিকে স্পষ্ট করে। সরু গলি, অপর্যাপ্ত উদ্ধারকর্মী, গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের জটিলতা, রাসায়নিক গুদামের ঝুঁকি, বিল্ডিং কোড উপেক্ষা করে নির্মাণ এসব মিলিয়ে বড় ভূমিকম্প হলে  ঢাকার মতো শহরগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি ভয়ংকর মাত্রায় পৌঁছাতে পারে। আরও বড় সমস্যা হলো, শহরের বহু শিল্প ও গার্মেন্টস ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা এখনো পরীক্ষা করা হয়নি। এই ভবনগুলোতে প্রতিদিন লক্ষাধিক শ্রমিকের উপস্থিতি থাকায় এ ধরনের ভবনের ঝুঁকি জাতীয় নিরাপত্তার পর্যায়ে চলে যায়।

 

বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল, এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তাই এখনই শহরের পুরনো ভবনগুলো চিহ্নিত করে স্ট্রাকচারাল অডিট করা, প্রয়োজন হলে রেট্রোফিটিং বা পুনর্নির্মাণ করা জরুরি। এটাও জরুরি যে ভবিষ্যতের সব ভবন নির্মাণে ভূকম্পন-সহনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করতে হবে। উদ্ধারসক্ষমতা বাড়াতে হবে, আগুন লাগা বা গ্যাসলাইন বিস্ফোরণের মতো দ্বিতীয় বিপর্যয় ঠেকাতে সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। স্কুল-কলেজে নিয়মিত মহড়া চালু করতে হবে। নগরীর জটিলতা কমিয়ে উন্মুক্ত জায়গা, প্রশস্ত রাস্তা, জরুরি সেবা কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে।

 

শুক্রবারের ভূমিকম্প আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে সামনে থাকা ভবিষ্যৎ কতটা অনিশ্চিত হতে পারে। মাত্র ৫.৭ মাত্রার একটি কম্পন সারা দেশকে কাঁপিয়ে দিয়ে হঠাৎই বুঝিয়ে দিল ভয় কাকে বলে? অনেকেই বলছিলেন, এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল মৃত্যু যেন খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। যে হবু ডাক্তার ছেলেটি মায়ের সঙ্গে বাজারে গিয়েছিল শুক্রবারের রান্নার জন্য মাংস কিনতে, সেই ছেলেটির আর ঘরে ফেরা হয়নি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছে। এমন ঘটনা মনকে ভারী করে তোলে। এই ভূমিকম্প আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে এত ছোট মাত্রার কম্পনেও মানুষ মারা যেতে পারে, শত শত মানুষ আহত হয়, বহু ভবনে ফাটল দেখা দেয়। এটি শুধু দুর্ভাগ্য নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল অবকাঠামোর ফলাফল। পৃথিবীর অনেক দেশ নিয়মিত ভূমিকম্প সহ্য করেও নিরাপদ থাকে, কারণ তারা প্রস্তুত থাকে, নিয়ম মেনে নির্মাণ করে, প্রশিক্ষণ দেয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করে।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর রচনায় বলেছিলেন, “সম্ভবপরের জন্যে প্রস্তুত থাকাই সভ্যতা।” কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি সেই সভ্যতার ধারায় সত্যিই হাঁটতে পেরেছি। বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি বহু বছর ধরে পরিচিত এবং সতর্ক করার মতো একটি বাস্তবতা। তাই বাংলাদেশও পারবে, যদি এখনই গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি বাড়ানো শুরু করা হয়। শহরগুলোকে নিরাপদ করতে, ভবনগুলোকে শক্তিশালী করতে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এবং উদ্ধার সক্ষমতা উন্নত করতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। না হলে বড় মাত্রার ভূমিকম্প এলে ক্ষতির পরিমাণ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটি আমরা কেউই কল্পনা করতে চাই না।

লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক  ও কলামিষ্ট