CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০২ জানুয়ারি, ২০২৬

স্বাধীনতার পাঁচ দশক: বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অর্জন ও অপূর্ণ স্বপ্নের খতিয়ান

#
news image

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম অর্জন হলো ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে, রক্তস্নাত এক জনযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। আজ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আমাদের ফিরে দেখা প্রয়োজন—যে স্বপ্ন ও চেতনাকে ধারণ করে এ দেশের আপামর জনতা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল, তা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত আর ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা কি তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছে? নাকি উন্নয়নের চাকচিক্যময় পরিসংখ্যানের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মূলমন্ত্র?
আত্মত্যাগের মহাকাব্য ও চেতনার ভিত্তি
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো আলোচনার টেবিলে অর্জিত সমঝোতা নয়; এটি এক ভয়ানক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল। এই সংগ্রামের ভিত্তি ছিল পাকিস্তানের দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটানো। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা এ দেশের মানুষের ওপর যে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল, তা ইতিহাসের পাতায় এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
ইতিহাসের দলিল অনুযায়ী, দীর্ঘ নয় মাসের এই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন ৩০ লক্ষ মানুষ। এই ৩০ লক্ষ সংখ্যাটি কেবল একটি গাণিতিক হিসাব নয়; এটি ৩০ লক্ষ স্বপ্ন, ৩০ লক্ষ পরিবারের হাহাকার এবং একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার চরম মূল্য। একইভাবে, পাকিস্তানি জান্তারা যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনকে। ২ লক্ষ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন, অনেকে অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। এই মা-বোনেদের আত্মত্যাগ আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে মূলত চারটি স্তম্ভকে বোঝানো হয়—জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র (সামাজিক ন্যায়বিচার ও শোষণমুক্তি) এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। এই চারটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই ১৯৭২ সালের সংবিধান রচিত হয়েছিল। চেতনার মূল নির্যাস ছিল এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে থাকবে না কোনো শোষণ, মানুষে মানুষে থাকবে না কোনো ভেদাভেদ, এবং রাষ্ট্র হবে সবার জন্য নিরাপদ ও মানবিক।
অর্থনৈতিক রূপান্তর: ধ্বংসস্তূপ থেকে বিস্ময়
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জনকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ১৯৭১ সালে যে দেশকে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন, সেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে উন্নয়নের এক বিস্ময়। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো নিয়ে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ আজ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দিকে ধাবমান।
কৃষি, তৈরি পোশাক শিল্প এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স—এই তিন চাকার ওপর ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বহুগুণ বেড়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, কমেছে দারিদ্র্যের হার। একসময়ের খাদ্য ঘাটতির দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগাপ্রজেক্টগুলো আমাদের সক্ষমতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও মাতৃমৃত্যু-শিশুমৃত্যু হ্রাসে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
এই দৃশ্যমান উন্নয়ন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি অংশের বাস্তবায়ন—তা হলো অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি কেবল ইট-পাথরের উন্নয়ন আর জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ? উত্তর হলো—না।
গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে জনগণের ভোটাধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে সুরক্ষিত। পাকিস্তানি শাসনামলে আমাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল বলেই আমরা অস্ত্র ধরেছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর আজ প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সেই কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র পেয়েছি?
গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস মসৃণ ছিল না। সামরিক শাসন, ক্যু-পাল্টা ক্যু এবং গণতান্ত্রিক ধাবা, সব মিলিয়ে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে বহুবার। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র আজও মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে আস্থার সংকট বারবার ফিরে এসেছে। একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং কার্যকর সংসদ—যা সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণ—তা পুরোপুরি বিকশিত হতে পারেনি।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল এমন এক সমাজ, যেখানে দ্বিমতকে সম্মান জানানো হবে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরমতসহিষ্ণুতার চরম অভাব লক্ষ্য করা যায়। বিরোধী মত দমন, ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো বিভিন্ন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা সংকুচিত করার অভিযোগ বারবার উঠেছে। যখন একটি স্বাধীন দেশে মানুষ তার মত প্রকাশে ভীতি অনুভব করে, তখন তা ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
বৈষম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার: স্বপ্নের অপমৃত্যু
মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে এবং পরবর্তীতে সংবিধানে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’-এর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে আমরা কী দেখি? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে সত্য, কিন্তু তার সুফল কি সবাই সমানভাবে পাচ্ছে?
গত কয়েক দশকে দেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। সম্পদ গুটিকতক মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ ব্যাংকিং খাত। যখন একজন কৃষক সামান্য ঋণের জন্য জেল খাটেন, আর হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপিরা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, তখন তা মুক্তিযুদ্ধের ‘শোষণমুক্ত সমাজ’-এর ধারণাকে উপহাস করে।
৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছিলেন এমন এক দেশের জন্য যেখানে কোনো লুটেরা শ্রেণি থাকবে না। কিন্তু আজ দুর্নীতির করাল গ্রাস সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে সরকারি সেবা খাত—কোথাও আজ সাধারণ মানুষ হয়রানি ও ঘুষ ছাড়া সেবা পায় না। এই কাঠামোগত দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থকে ম্লান করে দিচ্ছে।
ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালির এক হওয়ার যুদ্ধ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। তাই ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল আমাদের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি। কিন্তু গত ৫৪ বছরে এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর বারবার আঘাত এসেছে।
রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের ব্যবহার এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, তাদের বাড়িঘর ও উপাসনালয় ভাঙচুরের ঘটনা প্রমাণ করে যে, আমরা এখনো পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন করতে পারিনি। একটি সমন্বিত ও সম্প্রদায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে শিক্ষা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে, যার মধ্যে পাঠ্যপুস্তক, ধর্মীয় আলোচনা মঞ্চ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অন্তর্ভুক্ত, এমন কিছু বিষয় বা দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা সামাজিক সম্প্রীতি ও সহনশীলতার মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এর ফলে সমাজের বহুত্ববাদী ও উদারনৈতিক চরিত্র ক্ষুণ্ণ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ মতপ্রকাশ করেছেন।
শিক্ষা ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমে সংলাপ, সহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার আদর্শকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। সকল প্রচেষ্টা করা উচিত যাতে শিক্ষা ও তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিক মূল্যবোধ সংরক্ষিত থাকে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকল স্তরে যৌক্তিক ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা সমাজের সার্বিক উন্নয়নের জন্য জরুরি।
বর্তমান প্রজন্ম ও ইতিহাস বিকৃতি
মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, স্বাধীনতার পর থেকে যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে, তারা নিজেদের মতো করে ইতিহাস রচনা বা ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছে। এতে করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ১৬ই ডিসেম্বর বা ২৬শে মার্চে ফুল দেওয়া আর গান গাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে দেশপ্রেম। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে সততা, নিষ্ঠা এবং দেশের প্রতি মমত্ববোধের বড়ই অভাব। তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ আজ দেশবিমুখ, তারা মেধা ও শ্রম দিয়ে বিদেশের মাটি গড়তে আগ্রহী। মেধা পাচার (ইৎধরহ উৎধরহ) রোধ করতে না পারা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। যে তরুণরা আগামীর বাংলাদেশ গড়বে, তাদের যদি আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত আদর্শ—সততা, সাহস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—শেখাতে না পারি, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ পথ হারাবে।
আমাদের করণীয়: আগামীর পথনকশা
স্বাধীনতার পাঁচ দশকে আমাদের প্রাপ্তি অনেক, কিন্তু অপ্রাপ্তির পাল্লাও কম ভারী নয়। ৩০ লক্ষ শহীদ আর ২ লক্ষ মা-বোনের ঋণ শোধ করতে হলে আমাদের কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে আমাদের এখনই কিছু কঠোর ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে:
১.গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: নির্বাচন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও প্রশ্নমুক্ত করতে হবে। সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে যেখানে সংসদ হবে সকল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ২.দুর্নীতি ও বৈষম্য রোধ: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্নীতিবাজ, তা সে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। সম্পদ পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ধনীদের ওপর কর বাড়িয়ে ও দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী বাড়িয়ে আয় বৈষম্য কমাতে হবে। ৩. মানবিক মর্যাদা ও নারী নিরাপত্তা: ২ লক্ষ মা-বোনের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণ রোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। নারীদের জন্য ঘরে-বাইরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্ব। ৪. মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান: এখনো অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের যথাযথ সম্মান ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। ৫. সুশাসন ও আইনের শাসন: অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে সুশাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। ৬. মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। মেধা পাচার (ইৎধরহ উৎধরহ) রোধে দেশে মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ৭. অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি: বৈষম্য হ্রাসে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিস্তার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (ঝগঊ) উন্নয়ন ঘটাতে হবে। প্রবৃদ্ধির সুফল যেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পর্যন্ত পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ৮. রাজনৈতিক সংস্কার: সংঘাতময় রাজনীতি পরিহার করে আলোচনার ভিত্তিতে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা গণতন্ত্রের স্বার্থেই প্রয়োজন।
উপসংহার
স্বাধীনতার ৫৪ বছর বা সুবর্ণজয়ন্তী কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি মাইলফলক মাত্র। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা এই মাটি আমাদের কাছে পবিত্র আমানত। ২ লক্ষ মা-বোনের দীর্ঘশ্বাস আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা মানে কেবল একটি নতুন পতাকা বা মানচিত্র নয়; স্বাধীনতা মানে মানুষের মুক্তি।
যতদিন এ দেশে একজন মানুষও না খেয়ে থাকবে, ততদিন স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ। যতদিন বিচারহীনতার সংস্কৃতি থাকবে, ততদিন স্বাধীনতা বিপন্ন। যতদিন সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প থাকবে, ততদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের এমন একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে যেখানে দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, যেখানে মানুষে মানুষে বৈষম্য থাকবে না এবং যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে বাস করতে পারবে।
আমাদের পূর্বসূরিরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড দিয়ে গেছেন। সেই ভূখণ্ডকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করাই বর্তমান প্রজন্মের ঐতিহাসিক দায়িত্ব। আবেগের পাশাপাশি বিবেক ও প্রজ্ঞা দিয়ে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করলেই কেবল শহীদের রক্তের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করা সম্ভব হবে।
আসুন, স্বাধীনতার এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা নতুন করে শপথ নিই। সকল বিভেদ ভুলে, দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলি যা হবে প্রকৃত অর্থেই ‘সোনার বাংলা’। যেখানে ধনী-দরিদ্রের আকাশচুম্বী তফাত থাকবে না, যেখানে মত প্রকাশের দায়ে কাউকে নিগৃহীত হতে হবে না, এবং যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার, এটাই হোক ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা।

লেখক, গবেষক, মনবাধিকার কর্মী ও সাবেক প্রভাষক, সিউবি।

 

মোঃ সাকিল তালুকদার 

০১ ডিসেম্বর, ২০২৫,  6:38 PM

news image

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম অর্জন হলো ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে, রক্তস্নাত এক জনযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। আজ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আমাদের ফিরে দেখা প্রয়োজন—যে স্বপ্ন ও চেতনাকে ধারণ করে এ দেশের আপামর জনতা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল, তা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত আর ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা কি তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছে? নাকি উন্নয়নের চাকচিক্যময় পরিসংখ্যানের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মূলমন্ত্র?
আত্মত্যাগের মহাকাব্য ও চেতনার ভিত্তি
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো আলোচনার টেবিলে অর্জিত সমঝোতা নয়; এটি এক ভয়ানক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল। এই সংগ্রামের ভিত্তি ছিল পাকিস্তানের দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটানো। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা এ দেশের মানুষের ওপর যে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল, তা ইতিহাসের পাতায় এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
ইতিহাসের দলিল অনুযায়ী, দীর্ঘ নয় মাসের এই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন ৩০ লক্ষ মানুষ। এই ৩০ লক্ষ সংখ্যাটি কেবল একটি গাণিতিক হিসাব নয়; এটি ৩০ লক্ষ স্বপ্ন, ৩০ লক্ষ পরিবারের হাহাকার এবং একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার চরম মূল্য। একইভাবে, পাকিস্তানি জান্তারা যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনকে। ২ লক্ষ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন, অনেকে অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। এই মা-বোনেদের আত্মত্যাগ আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে মূলত চারটি স্তম্ভকে বোঝানো হয়—জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র (সামাজিক ন্যায়বিচার ও শোষণমুক্তি) এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। এই চারটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই ১৯৭২ সালের সংবিধান রচিত হয়েছিল। চেতনার মূল নির্যাস ছিল এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে থাকবে না কোনো শোষণ, মানুষে মানুষে থাকবে না কোনো ভেদাভেদ, এবং রাষ্ট্র হবে সবার জন্য নিরাপদ ও মানবিক।
অর্থনৈতিক রূপান্তর: ধ্বংসস্তূপ থেকে বিস্ময়
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জনকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ১৯৭১ সালে যে দেশকে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন, সেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে উন্নয়নের এক বিস্ময়। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো নিয়ে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ আজ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দিকে ধাবমান।
কৃষি, তৈরি পোশাক শিল্প এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স—এই তিন চাকার ওপর ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বহুগুণ বেড়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, কমেছে দারিদ্র্যের হার। একসময়ের খাদ্য ঘাটতির দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগাপ্রজেক্টগুলো আমাদের সক্ষমতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও মাতৃমৃত্যু-শিশুমৃত্যু হ্রাসে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
এই দৃশ্যমান উন্নয়ন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি অংশের বাস্তবায়ন—তা হলো অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি কেবল ইট-পাথরের উন্নয়ন আর জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ? উত্তর হলো—না।
গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে জনগণের ভোটাধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে সুরক্ষিত। পাকিস্তানি শাসনামলে আমাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল বলেই আমরা অস্ত্র ধরেছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর আজ প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সেই কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র পেয়েছি?
গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস মসৃণ ছিল না। সামরিক শাসন, ক্যু-পাল্টা ক্যু এবং গণতান্ত্রিক ধাবা, সব মিলিয়ে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে বহুবার। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র আজও মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে আস্থার সংকট বারবার ফিরে এসেছে। একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং কার্যকর সংসদ—যা সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণ—তা পুরোপুরি বিকশিত হতে পারেনি।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল এমন এক সমাজ, যেখানে দ্বিমতকে সম্মান জানানো হবে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরমতসহিষ্ণুতার চরম অভাব লক্ষ্য করা যায়। বিরোধী মত দমন, ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো বিভিন্ন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা সংকুচিত করার অভিযোগ বারবার উঠেছে। যখন একটি স্বাধীন দেশে মানুষ তার মত প্রকাশে ভীতি অনুভব করে, তখন তা ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
বৈষম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার: স্বপ্নের অপমৃত্যু
মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে এবং পরবর্তীতে সংবিধানে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’-এর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে আমরা কী দেখি? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে সত্য, কিন্তু তার সুফল কি সবাই সমানভাবে পাচ্ছে?
গত কয়েক দশকে দেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। সম্পদ গুটিকতক মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ ব্যাংকিং খাত। যখন একজন কৃষক সামান্য ঋণের জন্য জেল খাটেন, আর হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপিরা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, তখন তা মুক্তিযুদ্ধের ‘শোষণমুক্ত সমাজ’-এর ধারণাকে উপহাস করে।
৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছিলেন এমন এক দেশের জন্য যেখানে কোনো লুটেরা শ্রেণি থাকবে না। কিন্তু আজ দুর্নীতির করাল গ্রাস সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে সরকারি সেবা খাত—কোথাও আজ সাধারণ মানুষ হয়রানি ও ঘুষ ছাড়া সেবা পায় না। এই কাঠামোগত দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থকে ম্লান করে দিচ্ছে।
ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালির এক হওয়ার যুদ্ধ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। তাই ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল আমাদের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি। কিন্তু গত ৫৪ বছরে এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর বারবার আঘাত এসেছে।
রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের ব্যবহার এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, তাদের বাড়িঘর ও উপাসনালয় ভাঙচুরের ঘটনা প্রমাণ করে যে, আমরা এখনো পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন করতে পারিনি। একটি সমন্বিত ও সম্প্রদায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে শিক্ষা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে, যার মধ্যে পাঠ্যপুস্তক, ধর্মীয় আলোচনা মঞ্চ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অন্তর্ভুক্ত, এমন কিছু বিষয় বা দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা সামাজিক সম্প্রীতি ও সহনশীলতার মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এর ফলে সমাজের বহুত্ববাদী ও উদারনৈতিক চরিত্র ক্ষুণ্ণ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ মতপ্রকাশ করেছেন।
শিক্ষা ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমে সংলাপ, সহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার আদর্শকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। সকল প্রচেষ্টা করা উচিত যাতে শিক্ষা ও তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিক মূল্যবোধ সংরক্ষিত থাকে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকল স্তরে যৌক্তিক ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা সমাজের সার্বিক উন্নয়নের জন্য জরুরি।
বর্তমান প্রজন্ম ও ইতিহাস বিকৃতি
মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, স্বাধীনতার পর থেকে যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে, তারা নিজেদের মতো করে ইতিহাস রচনা বা ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছে। এতে করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ১৬ই ডিসেম্বর বা ২৬শে মার্চে ফুল দেওয়া আর গান গাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে দেশপ্রেম। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে সততা, নিষ্ঠা এবং দেশের প্রতি মমত্ববোধের বড়ই অভাব। তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ আজ দেশবিমুখ, তারা মেধা ও শ্রম দিয়ে বিদেশের মাটি গড়তে আগ্রহী। মেধা পাচার (ইৎধরহ উৎধরহ) রোধ করতে না পারা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। যে তরুণরা আগামীর বাংলাদেশ গড়বে, তাদের যদি আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত আদর্শ—সততা, সাহস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—শেখাতে না পারি, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ পথ হারাবে।
আমাদের করণীয়: আগামীর পথনকশা
স্বাধীনতার পাঁচ দশকে আমাদের প্রাপ্তি অনেক, কিন্তু অপ্রাপ্তির পাল্লাও কম ভারী নয়। ৩০ লক্ষ শহীদ আর ২ লক্ষ মা-বোনের ঋণ শোধ করতে হলে আমাদের কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে আমাদের এখনই কিছু কঠোর ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে:
১.গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: নির্বাচন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও প্রশ্নমুক্ত করতে হবে। সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে যেখানে সংসদ হবে সকল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ২.দুর্নীতি ও বৈষম্য রোধ: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্নীতিবাজ, তা সে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। সম্পদ পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ধনীদের ওপর কর বাড়িয়ে ও দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী বাড়িয়ে আয় বৈষম্য কমাতে হবে। ৩. মানবিক মর্যাদা ও নারী নিরাপত্তা: ২ লক্ষ মা-বোনের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণ রোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। নারীদের জন্য ঘরে-বাইরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্ব। ৪. মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান: এখনো অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের যথাযথ সম্মান ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। ৫. সুশাসন ও আইনের শাসন: অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে সুশাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। ৬. মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। মেধা পাচার (ইৎধরহ উৎধরহ) রোধে দেশে মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ৭. অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি: বৈষম্য হ্রাসে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিস্তার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (ঝগঊ) উন্নয়ন ঘটাতে হবে। প্রবৃদ্ধির সুফল যেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পর্যন্ত পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ৮. রাজনৈতিক সংস্কার: সংঘাতময় রাজনীতি পরিহার করে আলোচনার ভিত্তিতে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা গণতন্ত্রের স্বার্থেই প্রয়োজন।
উপসংহার
স্বাধীনতার ৫৪ বছর বা সুবর্ণজয়ন্তী কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি মাইলফলক মাত্র। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা এই মাটি আমাদের কাছে পবিত্র আমানত। ২ লক্ষ মা-বোনের দীর্ঘশ্বাস আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা মানে কেবল একটি নতুন পতাকা বা মানচিত্র নয়; স্বাধীনতা মানে মানুষের মুক্তি।
যতদিন এ দেশে একজন মানুষও না খেয়ে থাকবে, ততদিন স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ। যতদিন বিচারহীনতার সংস্কৃতি থাকবে, ততদিন স্বাধীনতা বিপন্ন। যতদিন সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প থাকবে, ততদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের এমন একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে যেখানে দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, যেখানে মানুষে মানুষে বৈষম্য থাকবে না এবং যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে বাস করতে পারবে।
আমাদের পূর্বসূরিরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড দিয়ে গেছেন। সেই ভূখণ্ডকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করাই বর্তমান প্রজন্মের ঐতিহাসিক দায়িত্ব। আবেগের পাশাপাশি বিবেক ও প্রজ্ঞা দিয়ে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করলেই কেবল শহীদের রক্তের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করা সম্ভব হবে।
আসুন, স্বাধীনতার এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা নতুন করে শপথ নিই। সকল বিভেদ ভুলে, দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলি যা হবে প্রকৃত অর্থেই ‘সোনার বাংলা’। যেখানে ধনী-দরিদ্রের আকাশচুম্বী তফাত থাকবে না, যেখানে মত প্রকাশের দায়ে কাউকে নিগৃহীত হতে হবে না, এবং যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার, এটাই হোক ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা।

লেখক, গবেষক, মনবাধিকার কর্মী ও সাবেক প্রভাষক, সিউবি।