CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০২ জানুয়ারি, ২০২৬

অবসরের পরও কাজ করতে চান অনেকে: অর্থ না আত্মতৃপ্তি

#
news image

জীবনের দীর্ঘ পথচলায় মানুষ কাজ করে, ঘাম ঝরায়, দায়িত্ব সামলায় এবং এসবই মূলত জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনেই করা হয়। সংসার টিকিয়ে রাখা, সন্তান বড় করে তোলা, সমাজে নিজের অবস্থান গড়ে তোলা এই সব অভিজ্ঞতার কথাও অনেকেই বলেন, তবে শেষ পর্যন্ত এগুলোই কর্মজীবনের সিংহভাগ সময়কে পূর্ণ করে তোলে। তারপর একসময় এসে যায় অবসর, যাকে অনেকে রিটায়ারমেন্ট বলে থাকেন। এটি জীবনের এমন এক নতুন বাঁক, যেখানে সকালবেলার দৌড়ঝাঁপ ধীরে ধীরে থেমে আসে, অফিসের কোলাহল মিলিয়ে যেতে থাকে, মিটিংয়ের তাড়াহুড়োর বদলে চারপাশে নেমে আসে নীরবতা। এই অবসর কারও কাছে পরম বিশ্রামের অনুভূতি হয়ে ওঠে, আবার কারও কাছে ধরা দেয় গভীর নিস্তব্ধতা ও একাকীত্বের সময় হিসেবে।

অবসরের পর কীভাবে কাটবে সময়, এই প্রশ্নের উত্তর সবার কাছে এক নয়। কেউ চান অপূর্ণ শখ পূরণ করতে, কেউবা হারিয়ে যাওয়া অবসরের দিনগুলো খুঁজে ফিরতে। আবার অনেকেই আছেন, যাদের কাছে কাজই জীবনের আনন্দ; তাই অবসরের পরও তারা কোনো না কোনোভাবে কর্মে যুক্ত থাকতে চান। কাজের ভেতরেই তারা খুঁজে পান বেঁচে থাকার অর্থ, জীবনের ছন্দ।

সম্প্রতি মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ বছর বয়সের পরও বহু মানুষ কাজের মধ্যে থাকতে আগ্রহী এবং এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ থেকে ৯৪ বছর বয়সী ৩ হাজার ৪৮৬ জনকে নিয়ে করা এই সমীক্ষায় দেখা যায়, ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ মানুষ কর্মরত, আর ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে কাজ করছেন ১৮ শতাংশ। তাদের মধ্যে কেউ পূর্ণকালীন, কেউ আংশিক সময়ের জন্য, আবার কেউ নিজস্ব ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। গবেষক জেফরি কুলগ্রেন বলেন, “আমরা ধারণা করতাম অবসরের পর মানুষ কাজ থেকে দূরে থাকতে চায়, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই বয়সে যারা শারীরিকভাবে সক্ষম তারা কাজের ভেতর থাকলে মানসিকভাবে আরও বেশি সুখী ও সুস্থ থাকেন।” অর্থাৎ কাজ কেবল অর্থোপার্জনের মাধ্যম নয়, এটি একপ্রকার মানসিক পুনরুজ্জীবন, একধরনের মানসিক থেরাপিও বলা যায়।

অবসরের পর কাজ করতে চাওয়ার পেছনে নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক কারণ একটি বড় বাস্তবতা। অনেকের জন্য পেনশন বা সঞ্চিত অর্থ দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে যথেষ্ট হয় না। চিকিৎসা ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের প্রয়োজন সব মিলিয়ে জীবনের মান বজায় রাখতে অনেক সময় অতিরিক্ত আয়ের প্রয়োজন পড়ে। কেউ কেউ পরিবারে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে চান না এবং নিজের উপার্জনে আত্মমর্যাদা বজায় রাখতেই আবার কাজে ফেরেন। তাই অর্থ এখানে শুধু টাকার বিষয় নয়, এটি আত্মসম্মানেরও প্রতীক। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রবীণদের মধ্যে একধরনের মানসিক প্রশান্তি আনে, যা তাদের জীবনবোধকে জাগিয়ে রাখে।

তবে অবসরের পর কাজ করার পেছনে মানসিক প্রেরণা ও আত্মতৃপ্তির আকাঙ্ক্ষা আরও গভীর। কর্মজীবনে মানুষ প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়সূচির মধ্যে থাকে, দায়িত্ব পালন করে এবং সহকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে; এই নিয়মিততা ও সামাজিক যোগাযোগ তার জীবনের অংশ হয়ে যায়। অবসরের পর হঠাৎ সেই কাঠামো হারিয়ে গেলে অনেকের জীবন যেন শূন্য হয়ে পড়ে। একসময় যে ব্যস্ততা বিরক্তিকর মনে হতো, তা হঠাৎ করে কাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজেকে ক্রমে “অপ্রয়োজনীয়” মনে করতে শুরু করে। কাজের মাধ্যমে সে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়, এটিই আত্মতৃপ্তির মূল। সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি মনে হয় আজ করার কিছু নেই, তাহলে মন বিষণ্ন হয়ে যায়। অথচ কোনো ছোট কাজ যেমন শিক্ষাদান, স্বেচ্ছাসেবা, পরামর্শ দেওয়া কিংবা নিজের দক্ষতায় নতুন কিছু তৈরি করা, এই সবই প্রবীণদের জীবনে নতুন উদ্যম এনে দেয়।

অবসরের পর কাজ করার আরও কিছু বাস্তব উপকারও রয়েছে। সক্রিয় থাকার কারণে শরীর ও মস্তিষ্ক সচল থাকে। নিয়মিত যোগাযোগে থাকায় একাকীত্ব কমে যায়, সামাজিক বন্ধন মজবুত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অবসরের পরও সক্রিয় থাকেন, তাদের মধ্যে ডিপ্রেশন, স্মৃতিভ্রংশ ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। এই সক্রিয়তা আসলে বার্ধক্যকে ধীর করে দেয়। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা সপ্তাহে অন্তত তিন দিন কোনো না কোনো সামাজিক বা উৎপাদনমূলক কাজে যুক্ত থাকেন, তাদের আয়ু তুলনামূলকভাবে বেশি হয়, এবং তারা বার্ধক্যে মানসিকভাবে অনেক বেশি প্রফুল্ল থাকেন।

তবে “কাজ” বলতে এখানে শুধুমাত্র অফিস বা ব্যবসার কাজ বোঝানো হচ্ছে না। অনেক সময় মানুষ অবসরপ্রাপ্ত হলেও ছোট ছোট সৃজনশীল কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন, যা তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, বাগান করা বা গাছপালা পালন শুধু সময় কাটানোর একটি মাধ্যম নয়, বরং এটি ধৈর্য, মনোযোগ এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলে। তদ্রূপ, চিত্রাঙ্কন, লেখালেখি বা কোনো সৃজনশীল শিল্পকর্মে যুক্ত থাকা মানুষের মনকে সতেজ রাখে, উদ্যমী করে এবং একরকম মানসিক পুনরুজ্জীবন প্রদান করে। পশুপাখি পালন, পাখি বা বাঘ, হাঁস-মুরগি বা ছোট পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়াও এক ধরনের দায়িত্ববোধ ও আনন্দ দেয়, যা প্রবীণদের জন্য বিশেষভাবে মানসিক তৃপ্তির উৎস হয়ে ওঠে। এছাড়া সমাজসেবামূলক কার্যক্রম যেমন শিক্ষাদান, শিশুদের শিক্ষায় সাহায্য, দরিদ্র বা অসহায়দের সহায়তা, বা স্থানীয় কমিউনিটি কাজে অংশগ্রহণ মানুষের জীবনে অর্থবহতা এবং সামাজিক সংযোগের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। এই ধরনের কর্মকাণ্ডে আর্থিক উপার্জন নাও থাকতে পারে, তবুও এ থেকে আসে গভীর আনন্দ, আত্মতৃপ্তি এবং জীবনের প্রতি এক ধরণের প্রেম ও শ্রদ্ধার অনুভূতি। ফলে, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ এই সব ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে শুধুমাত্র সময় কাটান না, বরং তারা জীবনের নতুন অর্থ, নতুন লক্ষ্য এবং মানসিক উদ্দীপনা লাভ করেন।

বাংলাদেশেও এই প্রবণতা এখন ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত অনেক মানুষ আজ নানা উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছেন, কেউ ছোট স্কুল চালাচ্ছেন, কেউ অনলাইনে শিক্ষাদান করছেন, কেউ কৃষি বা হস্তশিল্পে হাত দিচ্ছেন, আবার কেউ সমাজসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করছেন। কেউ পেনশনভিত্তিক জীবন ছেড়ে নিজেদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলছেন প্রশিক্ষণকেন্দ্র, পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান বা লেখালেখির জগৎ। তাদের অনেকে বলেন, “অবসরের পর সময়টা কাজে না লাগালে দিনগুলো খুব দীর্ঘ মনে হয়।” অর্থাৎ কাজ এখানে জীবনের ছন্দ ফিরিয়ে আনে এবং দিনগুলোকে অর্থপূর্ণ করে তোলে।

তবে চ্যালেঞ্জও আছে। বয়সজনিত সীমাবদ্ধতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি বা সুযোগের অভাব অনেক প্রবীণকে কর্মজগৎ থেকে দূরে রাখে। পাশাপাশি সমাজেও অনেক সময় বয়সকে দক্ষতার সীমা হিসেবে দেখা হয়। অথচ তাদের অভিজ্ঞতা, ধৈর্য, নেতৃত্ব ও বিশ্লেষণী দক্ষতা তরুণ প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ। তাই রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অবসরপ্রাপ্তদের জন্য পরামর্শক বা প্রশিক্ষক হিসেবে কাজের সুযোগ তৈরি করে, তবে তারা আবারও সমাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘সিনিয়র পার্টটাইম প্রোগ্রাম’ চালু আছে, যেখানে প্রবীণরা বয়স ও দক্ষতা অনুযায়ী কাজ করেন এবং সমাজে অবদান রাখেন। বাংলাদেশেও এই ধরনের উদ্যোগ নিলে তা প্রবীণদের আত্মসম্মান ও অর্থনৈতিক স্থিতি উভয়ই রক্ষা করবে।

অবসর আসলে জীবনের শেষ নয়, এটি এক রূপান্তরের মুহূর্ত, যেখানে মানুষ দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলেও জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে না। কাজের ভেতর থেকে যে আত্মতৃপ্তি আসে তা অনেক সময় টাকার চেয়েও মূল্যবান। অর্থের প্রয়োজন জীবন টিকিয়ে রাখে, কিন্তু আত্মতৃপ্তি জীবনকে অর্থবহ করে তোলে। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, অবসরের পরও কাজ করতে চাওয়ার ইচ্ছে কেবল আর্থিক চাহিদা নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। কাজের ভেতরেই সে খুঁজে পায় নিজের পরিচয় এবং নিজের প্রয়োজনীয়তা। যখন কেউ কাজের মাধ্যমে অনুভব করে, “আমি এখনো সমাজের অংশ, আমি এখনো দিতে পারি,” তখন সেই অনুভূতিই হয় তার জীবনের প্রকৃত আনন্দ।

তাই বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ বা মনোবিজ্ঞানী সবাই এখন একমত হচ্ছেন যে অবসরের পরও সক্রিয় থাকা মানে বয়সের ভারকে অতিক্রম করা। কাজ হোক ছোট বা বড়, তা মানুষকে দেয় লক্ষ্য, আত্মবিশ্বাস এবং বেঁচে থাকার কারণ। অর্থ হয়তো জীবনের প্রয়োজন, কিন্তু আত্মতৃপ্তিই জীবনকে প্রকৃত অর্থ দেয় এবং মানুষের আসল প্রেরণা হয়ে ওঠে, যা তাকে নতুন সকাল দেখার এবং নতুনভাবে বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, গবেষক  ও  প্রাবন্ধিক  

ড. রাধেশ্যাম সরকার

১১ ডিসেম্বর, ২০২৫,  2:55 PM

news image

জীবনের দীর্ঘ পথচলায় মানুষ কাজ করে, ঘাম ঝরায়, দায়িত্ব সামলায় এবং এসবই মূলত জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনেই করা হয়। সংসার টিকিয়ে রাখা, সন্তান বড় করে তোলা, সমাজে নিজের অবস্থান গড়ে তোলা এই সব অভিজ্ঞতার কথাও অনেকেই বলেন, তবে শেষ পর্যন্ত এগুলোই কর্মজীবনের সিংহভাগ সময়কে পূর্ণ করে তোলে। তারপর একসময় এসে যায় অবসর, যাকে অনেকে রিটায়ারমেন্ট বলে থাকেন। এটি জীবনের এমন এক নতুন বাঁক, যেখানে সকালবেলার দৌড়ঝাঁপ ধীরে ধীরে থেমে আসে, অফিসের কোলাহল মিলিয়ে যেতে থাকে, মিটিংয়ের তাড়াহুড়োর বদলে চারপাশে নেমে আসে নীরবতা। এই অবসর কারও কাছে পরম বিশ্রামের অনুভূতি হয়ে ওঠে, আবার কারও কাছে ধরা দেয় গভীর নিস্তব্ধতা ও একাকীত্বের সময় হিসেবে।

অবসরের পর কীভাবে কাটবে সময়, এই প্রশ্নের উত্তর সবার কাছে এক নয়। কেউ চান অপূর্ণ শখ পূরণ করতে, কেউবা হারিয়ে যাওয়া অবসরের দিনগুলো খুঁজে ফিরতে। আবার অনেকেই আছেন, যাদের কাছে কাজই জীবনের আনন্দ; তাই অবসরের পরও তারা কোনো না কোনোভাবে কর্মে যুক্ত থাকতে চান। কাজের ভেতরেই তারা খুঁজে পান বেঁচে থাকার অর্থ, জীবনের ছন্দ।

সম্প্রতি মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ বছর বয়সের পরও বহু মানুষ কাজের মধ্যে থাকতে আগ্রহী এবং এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ থেকে ৯৪ বছর বয়সী ৩ হাজার ৪৮৬ জনকে নিয়ে করা এই সমীক্ষায় দেখা যায়, ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ মানুষ কর্মরত, আর ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে কাজ করছেন ১৮ শতাংশ। তাদের মধ্যে কেউ পূর্ণকালীন, কেউ আংশিক সময়ের জন্য, আবার কেউ নিজস্ব ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। গবেষক জেফরি কুলগ্রেন বলেন, “আমরা ধারণা করতাম অবসরের পর মানুষ কাজ থেকে দূরে থাকতে চায়, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই বয়সে যারা শারীরিকভাবে সক্ষম তারা কাজের ভেতর থাকলে মানসিকভাবে আরও বেশি সুখী ও সুস্থ থাকেন।” অর্থাৎ কাজ কেবল অর্থোপার্জনের মাধ্যম নয়, এটি একপ্রকার মানসিক পুনরুজ্জীবন, একধরনের মানসিক থেরাপিও বলা যায়।

অবসরের পর কাজ করতে চাওয়ার পেছনে নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক কারণ একটি বড় বাস্তবতা। অনেকের জন্য পেনশন বা সঞ্চিত অর্থ দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে যথেষ্ট হয় না। চিকিৎসা ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের প্রয়োজন সব মিলিয়ে জীবনের মান বজায় রাখতে অনেক সময় অতিরিক্ত আয়ের প্রয়োজন পড়ে। কেউ কেউ পরিবারে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে চান না এবং নিজের উপার্জনে আত্মমর্যাদা বজায় রাখতেই আবার কাজে ফেরেন। তাই অর্থ এখানে শুধু টাকার বিষয় নয়, এটি আত্মসম্মানেরও প্রতীক। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রবীণদের মধ্যে একধরনের মানসিক প্রশান্তি আনে, যা তাদের জীবনবোধকে জাগিয়ে রাখে।

তবে অবসরের পর কাজ করার পেছনে মানসিক প্রেরণা ও আত্মতৃপ্তির আকাঙ্ক্ষা আরও গভীর। কর্মজীবনে মানুষ প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়সূচির মধ্যে থাকে, দায়িত্ব পালন করে এবং সহকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে; এই নিয়মিততা ও সামাজিক যোগাযোগ তার জীবনের অংশ হয়ে যায়। অবসরের পর হঠাৎ সেই কাঠামো হারিয়ে গেলে অনেকের জীবন যেন শূন্য হয়ে পড়ে। একসময় যে ব্যস্ততা বিরক্তিকর মনে হতো, তা হঠাৎ করে কাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজেকে ক্রমে “অপ্রয়োজনীয়” মনে করতে শুরু করে। কাজের মাধ্যমে সে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়, এটিই আত্মতৃপ্তির মূল। সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি মনে হয় আজ করার কিছু নেই, তাহলে মন বিষণ্ন হয়ে যায়। অথচ কোনো ছোট কাজ যেমন শিক্ষাদান, স্বেচ্ছাসেবা, পরামর্শ দেওয়া কিংবা নিজের দক্ষতায় নতুন কিছু তৈরি করা, এই সবই প্রবীণদের জীবনে নতুন উদ্যম এনে দেয়।

অবসরের পর কাজ করার আরও কিছু বাস্তব উপকারও রয়েছে। সক্রিয় থাকার কারণে শরীর ও মস্তিষ্ক সচল থাকে। নিয়মিত যোগাযোগে থাকায় একাকীত্ব কমে যায়, সামাজিক বন্ধন মজবুত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অবসরের পরও সক্রিয় থাকেন, তাদের মধ্যে ডিপ্রেশন, স্মৃতিভ্রংশ ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। এই সক্রিয়তা আসলে বার্ধক্যকে ধীর করে দেয়। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা সপ্তাহে অন্তত তিন দিন কোনো না কোনো সামাজিক বা উৎপাদনমূলক কাজে যুক্ত থাকেন, তাদের আয়ু তুলনামূলকভাবে বেশি হয়, এবং তারা বার্ধক্যে মানসিকভাবে অনেক বেশি প্রফুল্ল থাকেন।

তবে “কাজ” বলতে এখানে শুধুমাত্র অফিস বা ব্যবসার কাজ বোঝানো হচ্ছে না। অনেক সময় মানুষ অবসরপ্রাপ্ত হলেও ছোট ছোট সৃজনশীল কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন, যা তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, বাগান করা বা গাছপালা পালন শুধু সময় কাটানোর একটি মাধ্যম নয়, বরং এটি ধৈর্য, মনোযোগ এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলে। তদ্রূপ, চিত্রাঙ্কন, লেখালেখি বা কোনো সৃজনশীল শিল্পকর্মে যুক্ত থাকা মানুষের মনকে সতেজ রাখে, উদ্যমী করে এবং একরকম মানসিক পুনরুজ্জীবন প্রদান করে। পশুপাখি পালন, পাখি বা বাঘ, হাঁস-মুরগি বা ছোট পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়াও এক ধরনের দায়িত্ববোধ ও আনন্দ দেয়, যা প্রবীণদের জন্য বিশেষভাবে মানসিক তৃপ্তির উৎস হয়ে ওঠে। এছাড়া সমাজসেবামূলক কার্যক্রম যেমন শিক্ষাদান, শিশুদের শিক্ষায় সাহায্য, দরিদ্র বা অসহায়দের সহায়তা, বা স্থানীয় কমিউনিটি কাজে অংশগ্রহণ মানুষের জীবনে অর্থবহতা এবং সামাজিক সংযোগের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। এই ধরনের কর্মকাণ্ডে আর্থিক উপার্জন নাও থাকতে পারে, তবুও এ থেকে আসে গভীর আনন্দ, আত্মতৃপ্তি এবং জীবনের প্রতি এক ধরণের প্রেম ও শ্রদ্ধার অনুভূতি। ফলে, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ এই সব ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে শুধুমাত্র সময় কাটান না, বরং তারা জীবনের নতুন অর্থ, নতুন লক্ষ্য এবং মানসিক উদ্দীপনা লাভ করেন।

বাংলাদেশেও এই প্রবণতা এখন ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত অনেক মানুষ আজ নানা উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছেন, কেউ ছোট স্কুল চালাচ্ছেন, কেউ অনলাইনে শিক্ষাদান করছেন, কেউ কৃষি বা হস্তশিল্পে হাত দিচ্ছেন, আবার কেউ সমাজসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করছেন। কেউ পেনশনভিত্তিক জীবন ছেড়ে নিজেদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলছেন প্রশিক্ষণকেন্দ্র, পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান বা লেখালেখির জগৎ। তাদের অনেকে বলেন, “অবসরের পর সময়টা কাজে না লাগালে দিনগুলো খুব দীর্ঘ মনে হয়।” অর্থাৎ কাজ এখানে জীবনের ছন্দ ফিরিয়ে আনে এবং দিনগুলোকে অর্থপূর্ণ করে তোলে।

তবে চ্যালেঞ্জও আছে। বয়সজনিত সীমাবদ্ধতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি বা সুযোগের অভাব অনেক প্রবীণকে কর্মজগৎ থেকে দূরে রাখে। পাশাপাশি সমাজেও অনেক সময় বয়সকে দক্ষতার সীমা হিসেবে দেখা হয়। অথচ তাদের অভিজ্ঞতা, ধৈর্য, নেতৃত্ব ও বিশ্লেষণী দক্ষতা তরুণ প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ। তাই রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অবসরপ্রাপ্তদের জন্য পরামর্শক বা প্রশিক্ষক হিসেবে কাজের সুযোগ তৈরি করে, তবে তারা আবারও সমাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘সিনিয়র পার্টটাইম প্রোগ্রাম’ চালু আছে, যেখানে প্রবীণরা বয়স ও দক্ষতা অনুযায়ী কাজ করেন এবং সমাজে অবদান রাখেন। বাংলাদেশেও এই ধরনের উদ্যোগ নিলে তা প্রবীণদের আত্মসম্মান ও অর্থনৈতিক স্থিতি উভয়ই রক্ষা করবে।

অবসর আসলে জীবনের শেষ নয়, এটি এক রূপান্তরের মুহূর্ত, যেখানে মানুষ দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলেও জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে না। কাজের ভেতর থেকে যে আত্মতৃপ্তি আসে তা অনেক সময় টাকার চেয়েও মূল্যবান। অর্থের প্রয়োজন জীবন টিকিয়ে রাখে, কিন্তু আত্মতৃপ্তি জীবনকে অর্থবহ করে তোলে। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, অবসরের পরও কাজ করতে চাওয়ার ইচ্ছে কেবল আর্থিক চাহিদা নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। কাজের ভেতরেই সে খুঁজে পায় নিজের পরিচয় এবং নিজের প্রয়োজনীয়তা। যখন কেউ কাজের মাধ্যমে অনুভব করে, “আমি এখনো সমাজের অংশ, আমি এখনো দিতে পারি,” তখন সেই অনুভূতিই হয় তার জীবনের প্রকৃত আনন্দ।

তাই বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ বা মনোবিজ্ঞানী সবাই এখন একমত হচ্ছেন যে অবসরের পরও সক্রিয় থাকা মানে বয়সের ভারকে অতিক্রম করা। কাজ হোক ছোট বা বড়, তা মানুষকে দেয় লক্ষ্য, আত্মবিশ্বাস এবং বেঁচে থাকার কারণ। অর্থ হয়তো জীবনের প্রয়োজন, কিন্তু আত্মতৃপ্তিই জীবনকে প্রকৃত অর্থ দেয় এবং মানুষের আসল প্রেরণা হয়ে ওঠে, যা তাকে নতুন সকাল দেখার এবং নতুনভাবে বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, গবেষক  ও  প্রাবন্ধিক