CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০২ জানুয়ারি, ২০২৬

 বার্ধক্যের অতিকথন নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ প্রতিধ্বনি

#
news image

কর্মক্ষেত্রের পর্দা যখন ধীরে ধীরে নামতে থাকে, দিনের শেষে থিয়েটারের আলো যেমন নিভে আসে, ঠিক তেমনি যিনি একদিন ছিলেন কর্মচাঞ্চল্যে ভরা, সক্রিয়, প্রভাবশালী এবং নানা মানুষের ভিড়ে ঘেরা, তিনি হঠাৎ উপলব্ধি করেন যে জীবন যেন তাকে এক অচেনা মঞ্চে। সেই মঞ্চ আর তার পরিচিত নয়, নেই করতালি, নেই শ্রোতা, কেবল পুরোনো স্মৃতির ধ্বনি ঘুরে ফিরে আসে, যেন অন্ধকার ঘরে প্রতিধ্বনির মতো বাজে একলা সুর। তখনই মনে জন্ম নেয় এক অদৃশ্য অথচ গভীর অনুভূতি, যার নাম অপ্রয়োজনীয়তা। আর সেই বোধ ধীরে ধীরে রূপ নেয় অতিবাকতার প্রবণতায়, যাকে আজ আমরা বলি বার্ধক্যের অতিকথন। বয়স বাড়লে মানুষের চারপাশের পৃথিবী যেন অচেনা হয়ে যায়। সন্তানরা ব্যস্ত নিজেদের জীবনের তাড়নায়, বন্ধুরা একে একে হারিয়ে যায় কিংবা চলে যায় এমন দূরে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে তার পরিচয়ের আগের উৎসগুলো। যিনি একসময় ছিলেন একজন কর্মকর্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, আমলা বা কর্মী, অবসরের পরে তিনি কেবল “একজন বৃদ্ধ”। তার জীবন আর কাজের পরিচয়ে চেনা যায় না, ধীরে ধীরে তার পরিচয় নির্ধারিত হয় শুধু বয়সের হিসাব দিয়ে। অথচ দীর্ঘ জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি যে অভিজ্ঞতা, পরিশ্রম, সাফল্য ও ব্যর্থতার ভাণ্ডার তৈরি করেছেন, তা তাকে বলে ওঠে “আমি কিছু জানি, আমি কিছু বলতে পারি।” তাই তিনি বলেন। আরও বলেন। যতক্ষণ না আশেপাশের মানুষ শুনে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কিংবা চোখে মুখে অনাগ্রহের ছায়া ফেলে সরে যায় অন্য পথে।

বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্যে এই প্রবণতাটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। সারাজীবন তাঁদের কাজ ছিল কথা বলা, বোঝানো, ভুল ধরিয়ে ঠিক করে দেওয়া। তাঁরা এমন পরিবেশে অভ্যস্ত ছিলেন, যেখানে তাঁদের প্রতিটি কথা গুরুত্ব পেত, শ্রোতারা মনোযোগ দিয়ে শুনত, ভুল হলে বিনয়ের সঙ্গে সংশোধন চাইত। শ্রেণিকক্ষে তাঁদের কথাই ছিল নিয়ম, তাঁদের ব্যাখ্যাই ছিল পথনির্দেশ। কিন্তু অবসরের পর সেই শ্রোতা আর থাকে না, সেই পরিচিত মঞ্চ নীরব হয়ে যায়, আর বহু বছরের সেই ভেতরের বক্তৃতার অভ্যাস থামতে চায় না। তাই তাঁরা বাজারে দাঁড়িয়েই গল্প জুড়ে দেন, রাস্তায় দেখা হলে আলাপ বাড়িয়ে তোলেন, প্রতিবেশীর সন্তানকে পড়াশোনার পরামর্শ দেন, আর পরিবারের তরুণদের শোনান “আমাদের সময়ে” দিয়ে শুরু হওয়া অভিজ্ঞতার দীর্ঘ কাহিনি। তাঁদের বোঝানো কঠিন হয় যে সময় বদলে গেছে, ভাষা বদলেছে, আর নতুন প্রজন্মের মনও আর আগের মতো স্থির ও ধৈর্যশীল নয়। তবুও তাঁরা থামতে পারেন না, কারণ থামা মানে তাঁদের সামনে এসে দাঁড়ায় এক গভীর নীরবতা, যা তাঁদের কাছে প্রায় মৃত্যুভয়ের মতো ভয়ানক লাগে।

বয়স্কদের অতিবাকতার পেছনে কাজ করে এক জৈবিক ও মানসিক পরিবর্তন, যা ধীরে ধীরে কথার স্রোতকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে। গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়লে মস্তিষ্কের সেই সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়, যা অপ্রয়োজনীয় বা পুনরাবৃত্ত কথাগুলোকে থামিয়ে রাখে। ফলে তাঁরা নিজেরাই বুঝতে পারেন না কখন, কতটা বলে ফেলছেন। একই সঙ্গে স্মৃতির পুনরাবৃত্তির প্রবণতা ক্রমে বেড়ে ওঠে। কোনো সুখস্মৃতি, গৌরব বা জীবনের বিশেষ অভিজ্ঞতা এমনভাবে মস্তিষ্কে ছাপ ফেলে যে তা অনিচ্ছাসত্ত্বেও বারবার ফিরে আসে, যেন জীবনের পর্দায় একই দৃশ্য পুনঃপ্রচারিত হচ্ছে। তাই একই গল্প, একই শিক্ষা, একই হাসির কাহিনি পুনরায় উচ্চারিত হয়, যদিও শ্রোতা তা বহুবার শুনেছে। একসময় যে অভিজ্ঞতা ছিল জ্ঞানের গর্ব, তা পরিণত হয় একঘেয়েমির উৎসে। শ্রোতা ক্লান্ত হয়, কিন্তু বক্তা নিজের উচ্ছ্বাসে অচেতন থাকেন। কারণ তাঁর কাছে বলা মানেই বেঁচে থাকা, আর না শোনা মানেই ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া।

সমাজের প্রতিক্রিয়াও এই বার্ধক্যজনিত কথাপ্রবাহের ক্ষেত্রে নীরব পালানোর রূপ নেয়। একসময় প্রবীণদের কথা সমাজ শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করত, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে মনে করা হতো জীবনের পাঠশালা। কিন্তু সময় বদলে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত জগতে তরুণরা এখন মনে করে তারা সব জানে, সব বোঝে, তাই প্রবীণের উপদেশ তাদের কাছে হয়ে দাঁড়ায় অনাহূত বক্তৃতা। কেউ সরাসরি কিছু বলে না, তবু মনে বিরক্তি জমে। অনেকেই দূর থেকে দেখেই অন্য পথে চলে যায়, কেউ বা ফোনে ব্যস্ততার অজুহাত তোলে, যেন কথোপকথনটি শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। বৃদ্ধ ব্যক্তি বোঝেন না কেন মানুষ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে তাঁর কাছ থেকে। তিনি ভাবেন, পৃথিবী অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়েছে, মানুষ হারিয়ে ফেলেছে শ্রদ্ধাবোধ। অথচ বাস্তবে মানুষ পালাচ্ছে শ্রবণ ক্লান্তি থেকে, পালাচ্ছে পুনরাবৃত্ত বাক্যের ভার থেকে। আজকের যুগে এই শ্রবণ ক্লান্তি এক বাস্তব সামাজিক সমস্যা, যার শিকড়ে আছে সময়ের অভাব, মনোযোগের ক্ষয় এবং সম্পর্কের ক্রমশ সংকুচিত পরিসর।

অতিকথনের সঙ্গে আরও কিছু প্রবীণস্বভাব প্রায়শই জড়িয়ে যায়।
প্রথমত, অন্যের ভুল ধরার প্রবণতা। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁদের মনে এই ধারণা জন্ম দেয় যে তাঁরা যা বলেন তাই ঠিক, বাকিরা সংশোধনের প্রয়োজনীয় অবস্থায় আছে। তাই তাঁরা চারপাশের সবাইকে শেখাতে চান, কিভাবে কথা বলতে হয়, কিভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

দ্বিতীয়ত, অতীতমুগ্ধতা। বর্তমানের জটিলতা তাঁদের বোধগম্য হয় না বা তাঁরা তা মানতে চান না। “আমাদের সময়ে মানুষ ছিল ভদ্র, মূল্যবোধ ছিল দৃঢ়” এই বাক্য তাঁদের কাছে সত্যের একমাত্র রূপ হয়ে ওঠে। কিন্তু এই অতীতচর্চাই কখনো কখনো প্রজন্মের ব্যবধানকে গভীর করে তোলে।

তৃতীয়ত, অসহিষ্ণুতা। নতুন প্রজন্মের আচরণ, পোশাক, মতামত তাঁদের কাছে অনভিপ্রেত মনে হয়। তাঁরা তর্কে নামেন, প্রমাণ দিতে চান যে আগেকার পথই ছিল সঠিক। অথচ এই মনোভাব তাঁদের আরও নিঃসঙ্গ করে তোলে।
চতুর্থত, শ্রবণ শক্তির হ্রাসও একটি বড় কারণ। অনেকে কথার মাঝপথে অন্যের বক্তব্য বুঝতে না পেরে নিজের কথাতেই ফিরে যান। ভুল বোঝাবুঝি থেকে জন্ম নেয় আত্মরক্ষার এক জেদ, আর সেই জেদ থেকেই গড়ে ওঠে অবিরাম বাক্যস্রোত।

এই অতিকথনের নির্দিষ্ট ওষুধ নেই, কিন্তু প্রতিকার আছে। প্রবীণদের যদি মনোযোগ দিয়ে কেউ শোনে, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়, তাঁদের জীবনের গল্পের প্রতি আগ্রহ দেখায়, তবে তাঁরা আর কথা দিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা করবেন না। তাঁদের শেখানো দরকার, নীরবতাও এক প্রকার প্রজ্ঞা, শোনা কখনো কখনো বলা থেকেও মূল্যবান।

যদি প্রবীণদের মধ্যে বই পড়া, শিল্পচর্চা, সামাজিক সেবা, ধর্মচিন্তা বা প্রযুক্তি শেখার নতুন আগ্রহ জাগানো যায়, তবে তাঁদের মনের সেই একঘেয়ে কথার প্রবাহ রূপান্তরিত হবে অর্থবহ যোগাযোগে। সমাজের উচিত প্রবীণদের কথাকে শুধুই “বিরক্তিকর” না ভেবে বুঝবার চেষ্টা করা, কারণ প্রতিটি অতিবাক্যই এক নিঃসঙ্গতার আর্তি, যা শ্রোতার অভাবে উচ্চারিত হয়।

কিন্তু সমাজ যদি প্রবীণদের কেবল “অতিরিক্ত কথাবলা মানুষ” হিসেবে দূরে সরিয়ে দেয়, তবে তাঁদের অতিকথন আরও বাড়বে। কারণ একাকিত্বের প্রতিধ্বনি যখন ফেরত আসে না, তখন মানুষ নিজেই নিজের শ্রোতা হয়ে ওঠে। বার্ধক্যের অতিকথন কোনো ব্যক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং এটি মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক গভীর মানসিক প্রয়াস। যখন দেখবেন কেউ আপনাকে দেখে হঠাৎ অন্য পথ বেছে নিচ্ছে, তখন বুঝবেন আপনি কেবল বৃদ্ধ নন, আপনি আক্রান্ত হয়েছেন এক জটিল অথচ নীরব রোগে, যার নাম বার্ধক্যের অতিকথন।
মুখ থেকে ঝরে পড়তে থাকে অসংখ্য বাক্য, উপদেশ, স্মৃতি আর উপমা। আপনি কথা বলে যান অবিরাম, অথচ শ্রোতার চোখে ভেসে ওঠে ক্লান্তির ছাপ। বার্ধক্যের মানে শুধু বলা নয়, শোনাও। শোনুন নিজের মনকে, শোনুন সময়ের পরিবর্তনকে, শোনুন জীবনের নীরব সুরকে। সেই শ্রবণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বার্ধক্যের শান্তি, নীরবতার প্রজ্ঞা, আর জীবনের শেষ প্রান্তে এক গভীর মানবিক আলো।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন। 

ড. রাধেশ্যাম সরকার

১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫,  6:06 PM

news image

কর্মক্ষেত্রের পর্দা যখন ধীরে ধীরে নামতে থাকে, দিনের শেষে থিয়েটারের আলো যেমন নিভে আসে, ঠিক তেমনি যিনি একদিন ছিলেন কর্মচাঞ্চল্যে ভরা, সক্রিয়, প্রভাবশালী এবং নানা মানুষের ভিড়ে ঘেরা, তিনি হঠাৎ উপলব্ধি করেন যে জীবন যেন তাকে এক অচেনা মঞ্চে। সেই মঞ্চ আর তার পরিচিত নয়, নেই করতালি, নেই শ্রোতা, কেবল পুরোনো স্মৃতির ধ্বনি ঘুরে ফিরে আসে, যেন অন্ধকার ঘরে প্রতিধ্বনির মতো বাজে একলা সুর। তখনই মনে জন্ম নেয় এক অদৃশ্য অথচ গভীর অনুভূতি, যার নাম অপ্রয়োজনীয়তা। আর সেই বোধ ধীরে ধীরে রূপ নেয় অতিবাকতার প্রবণতায়, যাকে আজ আমরা বলি বার্ধক্যের অতিকথন। বয়স বাড়লে মানুষের চারপাশের পৃথিবী যেন অচেনা হয়ে যায়। সন্তানরা ব্যস্ত নিজেদের জীবনের তাড়নায়, বন্ধুরা একে একে হারিয়ে যায় কিংবা চলে যায় এমন দূরে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে তার পরিচয়ের আগের উৎসগুলো। যিনি একসময় ছিলেন একজন কর্মকর্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, আমলা বা কর্মী, অবসরের পরে তিনি কেবল “একজন বৃদ্ধ”। তার জীবন আর কাজের পরিচয়ে চেনা যায় না, ধীরে ধীরে তার পরিচয় নির্ধারিত হয় শুধু বয়সের হিসাব দিয়ে। অথচ দীর্ঘ জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি যে অভিজ্ঞতা, পরিশ্রম, সাফল্য ও ব্যর্থতার ভাণ্ডার তৈরি করেছেন, তা তাকে বলে ওঠে “আমি কিছু জানি, আমি কিছু বলতে পারি।” তাই তিনি বলেন। আরও বলেন। যতক্ষণ না আশেপাশের মানুষ শুনে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কিংবা চোখে মুখে অনাগ্রহের ছায়া ফেলে সরে যায় অন্য পথে।

বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্যে এই প্রবণতাটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। সারাজীবন তাঁদের কাজ ছিল কথা বলা, বোঝানো, ভুল ধরিয়ে ঠিক করে দেওয়া। তাঁরা এমন পরিবেশে অভ্যস্ত ছিলেন, যেখানে তাঁদের প্রতিটি কথা গুরুত্ব পেত, শ্রোতারা মনোযোগ দিয়ে শুনত, ভুল হলে বিনয়ের সঙ্গে সংশোধন চাইত। শ্রেণিকক্ষে তাঁদের কথাই ছিল নিয়ম, তাঁদের ব্যাখ্যাই ছিল পথনির্দেশ। কিন্তু অবসরের পর সেই শ্রোতা আর থাকে না, সেই পরিচিত মঞ্চ নীরব হয়ে যায়, আর বহু বছরের সেই ভেতরের বক্তৃতার অভ্যাস থামতে চায় না। তাই তাঁরা বাজারে দাঁড়িয়েই গল্প জুড়ে দেন, রাস্তায় দেখা হলে আলাপ বাড়িয়ে তোলেন, প্রতিবেশীর সন্তানকে পড়াশোনার পরামর্শ দেন, আর পরিবারের তরুণদের শোনান “আমাদের সময়ে” দিয়ে শুরু হওয়া অভিজ্ঞতার দীর্ঘ কাহিনি। তাঁদের বোঝানো কঠিন হয় যে সময় বদলে গেছে, ভাষা বদলেছে, আর নতুন প্রজন্মের মনও আর আগের মতো স্থির ও ধৈর্যশীল নয়। তবুও তাঁরা থামতে পারেন না, কারণ থামা মানে তাঁদের সামনে এসে দাঁড়ায় এক গভীর নীরবতা, যা তাঁদের কাছে প্রায় মৃত্যুভয়ের মতো ভয়ানক লাগে।

বয়স্কদের অতিবাকতার পেছনে কাজ করে এক জৈবিক ও মানসিক পরিবর্তন, যা ধীরে ধীরে কথার স্রোতকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে। গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়লে মস্তিষ্কের সেই সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়, যা অপ্রয়োজনীয় বা পুনরাবৃত্ত কথাগুলোকে থামিয়ে রাখে। ফলে তাঁরা নিজেরাই বুঝতে পারেন না কখন, কতটা বলে ফেলছেন। একই সঙ্গে স্মৃতির পুনরাবৃত্তির প্রবণতা ক্রমে বেড়ে ওঠে। কোনো সুখস্মৃতি, গৌরব বা জীবনের বিশেষ অভিজ্ঞতা এমনভাবে মস্তিষ্কে ছাপ ফেলে যে তা অনিচ্ছাসত্ত্বেও বারবার ফিরে আসে, যেন জীবনের পর্দায় একই দৃশ্য পুনঃপ্রচারিত হচ্ছে। তাই একই গল্প, একই শিক্ষা, একই হাসির কাহিনি পুনরায় উচ্চারিত হয়, যদিও শ্রোতা তা বহুবার শুনেছে। একসময় যে অভিজ্ঞতা ছিল জ্ঞানের গর্ব, তা পরিণত হয় একঘেয়েমির উৎসে। শ্রোতা ক্লান্ত হয়, কিন্তু বক্তা নিজের উচ্ছ্বাসে অচেতন থাকেন। কারণ তাঁর কাছে বলা মানেই বেঁচে থাকা, আর না শোনা মানেই ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া।

সমাজের প্রতিক্রিয়াও এই বার্ধক্যজনিত কথাপ্রবাহের ক্ষেত্রে নীরব পালানোর রূপ নেয়। একসময় প্রবীণদের কথা সমাজ শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করত, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে মনে করা হতো জীবনের পাঠশালা। কিন্তু সময় বদলে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত জগতে তরুণরা এখন মনে করে তারা সব জানে, সব বোঝে, তাই প্রবীণের উপদেশ তাদের কাছে হয়ে দাঁড়ায় অনাহূত বক্তৃতা। কেউ সরাসরি কিছু বলে না, তবু মনে বিরক্তি জমে। অনেকেই দূর থেকে দেখেই অন্য পথে চলে যায়, কেউ বা ফোনে ব্যস্ততার অজুহাত তোলে, যেন কথোপকথনটি শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। বৃদ্ধ ব্যক্তি বোঝেন না কেন মানুষ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে তাঁর কাছ থেকে। তিনি ভাবেন, পৃথিবী অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়েছে, মানুষ হারিয়ে ফেলেছে শ্রদ্ধাবোধ। অথচ বাস্তবে মানুষ পালাচ্ছে শ্রবণ ক্লান্তি থেকে, পালাচ্ছে পুনরাবৃত্ত বাক্যের ভার থেকে। আজকের যুগে এই শ্রবণ ক্লান্তি এক বাস্তব সামাজিক সমস্যা, যার শিকড়ে আছে সময়ের অভাব, মনোযোগের ক্ষয় এবং সম্পর্কের ক্রমশ সংকুচিত পরিসর।

অতিকথনের সঙ্গে আরও কিছু প্রবীণস্বভাব প্রায়শই জড়িয়ে যায়।
প্রথমত, অন্যের ভুল ধরার প্রবণতা। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁদের মনে এই ধারণা জন্ম দেয় যে তাঁরা যা বলেন তাই ঠিক, বাকিরা সংশোধনের প্রয়োজনীয় অবস্থায় আছে। তাই তাঁরা চারপাশের সবাইকে শেখাতে চান, কিভাবে কথা বলতে হয়, কিভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

দ্বিতীয়ত, অতীতমুগ্ধতা। বর্তমানের জটিলতা তাঁদের বোধগম্য হয় না বা তাঁরা তা মানতে চান না। “আমাদের সময়ে মানুষ ছিল ভদ্র, মূল্যবোধ ছিল দৃঢ়” এই বাক্য তাঁদের কাছে সত্যের একমাত্র রূপ হয়ে ওঠে। কিন্তু এই অতীতচর্চাই কখনো কখনো প্রজন্মের ব্যবধানকে গভীর করে তোলে।

তৃতীয়ত, অসহিষ্ণুতা। নতুন প্রজন্মের আচরণ, পোশাক, মতামত তাঁদের কাছে অনভিপ্রেত মনে হয়। তাঁরা তর্কে নামেন, প্রমাণ দিতে চান যে আগেকার পথই ছিল সঠিক। অথচ এই মনোভাব তাঁদের আরও নিঃসঙ্গ করে তোলে।
চতুর্থত, শ্রবণ শক্তির হ্রাসও একটি বড় কারণ। অনেকে কথার মাঝপথে অন্যের বক্তব্য বুঝতে না পেরে নিজের কথাতেই ফিরে যান। ভুল বোঝাবুঝি থেকে জন্ম নেয় আত্মরক্ষার এক জেদ, আর সেই জেদ থেকেই গড়ে ওঠে অবিরাম বাক্যস্রোত।

এই অতিকথনের নির্দিষ্ট ওষুধ নেই, কিন্তু প্রতিকার আছে। প্রবীণদের যদি মনোযোগ দিয়ে কেউ শোনে, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়, তাঁদের জীবনের গল্পের প্রতি আগ্রহ দেখায়, তবে তাঁরা আর কথা দিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা করবেন না। তাঁদের শেখানো দরকার, নীরবতাও এক প্রকার প্রজ্ঞা, শোনা কখনো কখনো বলা থেকেও মূল্যবান।

যদি প্রবীণদের মধ্যে বই পড়া, শিল্পচর্চা, সামাজিক সেবা, ধর্মচিন্তা বা প্রযুক্তি শেখার নতুন আগ্রহ জাগানো যায়, তবে তাঁদের মনের সেই একঘেয়ে কথার প্রবাহ রূপান্তরিত হবে অর্থবহ যোগাযোগে। সমাজের উচিত প্রবীণদের কথাকে শুধুই “বিরক্তিকর” না ভেবে বুঝবার চেষ্টা করা, কারণ প্রতিটি অতিবাক্যই এক নিঃসঙ্গতার আর্তি, যা শ্রোতার অভাবে উচ্চারিত হয়।

কিন্তু সমাজ যদি প্রবীণদের কেবল “অতিরিক্ত কথাবলা মানুষ” হিসেবে দূরে সরিয়ে দেয়, তবে তাঁদের অতিকথন আরও বাড়বে। কারণ একাকিত্বের প্রতিধ্বনি যখন ফেরত আসে না, তখন মানুষ নিজেই নিজের শ্রোতা হয়ে ওঠে। বার্ধক্যের অতিকথন কোনো ব্যক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং এটি মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক গভীর মানসিক প্রয়াস। যখন দেখবেন কেউ আপনাকে দেখে হঠাৎ অন্য পথ বেছে নিচ্ছে, তখন বুঝবেন আপনি কেবল বৃদ্ধ নন, আপনি আক্রান্ত হয়েছেন এক জটিল অথচ নীরব রোগে, যার নাম বার্ধক্যের অতিকথন।
মুখ থেকে ঝরে পড়তে থাকে অসংখ্য বাক্য, উপদেশ, স্মৃতি আর উপমা। আপনি কথা বলে যান অবিরাম, অথচ শ্রোতার চোখে ভেসে ওঠে ক্লান্তির ছাপ। বার্ধক্যের মানে শুধু বলা নয়, শোনাও। শোনুন নিজের মনকে, শোনুন সময়ের পরিবর্তনকে, শোনুন জীবনের নীরব সুরকে। সেই শ্রবণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বার্ধক্যের শান্তি, নীরবতার প্রজ্ঞা, আর জীবনের শেষ প্রান্তে এক গভীর মানবিক আলো।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।