কৃষিবিদ ড. রাধেশ্যাম সরকার
২০ ডিসেম্বর, ২০২৫, 3:36 PM
মোটরসাইকেল আজ আধুনিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহন। বিশেষ করে তরুণদের কাছে এটি শুধু যাতায়াতের উপকরণ নয়, বরং স্বাধীনতা, গতি এবং আত্মবিশ্বাসের এক দৃশ্যমান প্রকাশ। শহরের যানজট পেরিয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধা মোটরসাইকেলকে জনপ্রিয় করেছে। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার আড়ালে এক গভীর সংকটও ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নিয়ন্ত্রণহীন গতি, অসচেতন চালনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ প্রতিদিন অসংখ্য তরুণের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে প্রশ্নটা আর শুধু বাইক চালানো নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়ায়, আমরা আমাদের জীবনকে কতটা মূল্য দিচ্ছি এবং ভবিষ্যৎকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং তা ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশের সঙ্গে মোটরসাইকেল জড়িত। জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ২০২৪ সালে মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৫৭০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৩ হাজার ১৫১ জন। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং এটি সড়কে চলাচলকারী বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তে থাকা ঝুঁকির স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
আগের বছরগুলোর তুলনায় এই প্রবণতা যে ক্রমেই বাড়ছে, তা বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। টাইমস অব বাংলাদেশে প্রকাশিত সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির হারও প্রায় সমানতালে বেড়েছে। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মাত্র পাঁচ বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১১ হাজার ৮৬৪ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ের পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে সমস্যাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিক ও গভীর সংকট।
এ সংকটের তাৎক্ষণিক ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে। সেখানে জানানো হয়, শুধু ২০২৫ সালের মে মাসেই ২৩৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় অন্তত ২৫৬ জন নিহত হয়েছেন, যা ওই এক মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহতের প্রায় ৪২ শতাংশের সমান। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সড়ক মৃত্যুর একটি বড় অংশ দখল করে নিয়েছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল বয়সভিত্তিক বা অঞ্চলভিত্তিক পার্থক্যই তুলে ধরে না, বরং এর ভেতর দিয়ে আরও বড় একটি সামাজিক বাস্তবতা প্রকাশ পায়। দুর্ঘটনায় নিহতদের বড় অংশই ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ, যারা সমাজের সবচেয়ে কর্মক্ষম, সৃজনশীল ও সম্ভাবনাময় জনগোষ্ঠী। তাই এই সংখ্যাগুলো নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার আড়ালে রয়েছে ভেঙে পড়া একটি পরিবার, থেমে যাওয়া একটি স্বপ্নের যাত্রা এবং অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত অসংখ্য মানুষের জীবন। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কেবল একটি সড়ক নিরাপত্তা সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত একটি সামাজিক চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশের নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়, যার মধ্যে প্রায় ২৮ শতাংশই মোটরসাইকেল চালক। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মোটরসাইকেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে এখানেই পার্থক্য গড়ে দেয় সচেতনতা, আইন প্রয়োগ এবং নীতিনির্ধারণ। থাইল্যান্ডে বাধ্যতামূলক হেলমেট আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার প্রায় ২৩ শতাংশ কমেছে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াতেও একই ধরনের উদ্যোগ ইতিবাচক ফল এনেছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে গতি কমানো মানে স্থবিরতা নয়, বরং তা দীর্ঘমেয়াদে জীবনের গতি ও নিরাপত্তা দুটোই বাড়ায়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি কারণ বারবার সামনে আসে। অতিরিক্ত গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য, হেলমেট না পরা বা নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহার, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া চালনা এবং সামাজিক মাধ্যমে স্টান্ট প্রদর্শনের প্রবণতা মিলিয়ে একটি ঝুঁকিপূর্ণ সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। তরুণ বয়সে অনেকের মধ্যেই একটি ভুল আত্মবিশ্বাস কাজ করে যে তার কিছু হবে না। কিন্তু দুর্ঘটনা কখনো বয়স, সাহস বা আত্মবিশ্বাস বিচার করে আসে না। তা আসে হঠাৎ, বিনা সতর্কতায়, আর তখন অনুশোচনার সময় থাকে না। গবেষণায় দেখা গেছে, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৪২ শতাংশ কমে এবং মাথায় গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি কমে প্রায় ৬৯ শতাংশ। তবুও বাস্তবে দেখা যায়, অনেকেই হেলমেটকে কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে বিবেচনা করে। আধা হেলমেট বা ঠিকভাবে বাঁধা না থাকা হেলমেট দুর্ঘটনার সময় কার্যত কোনো সুরক্ষা দিতে পারে না। এখানে সমস্যাটি শুধু আইন প্রয়োগের নয়, বরং মানসিকতারও। জীবনকে যদি আমরা সত্যিই মূল্য দিই, তাহলে নিরাপত্তাকে বোঝা হিসেবে নয়, সম্মানের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
মোটরসাইকেল চালানো মানে কেবল নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া নয়। একটি দ্রুতগতির বাইক রাস্তায় থাকা পথচারী, রিকশাচালক, সাধারণ যাত্রী বা অন্য যানবাহনের আরোহীর জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে। একটি মুহূর্তের বেপরোয়া, অযথা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বহু মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি, অপরিবর্তনীয় আঘাত কিংবা অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ছোট একটি ভুল পলকে একেবারে ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, যা শুধু আহত ব্যক্তির নয়, তার পরিবার এবং আশেপাশের সমাজকেও প্রভাবিত করে। তাই নিরাপদ, সচেতন ও শৃঙ্খলিত চালনা কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বও, যা সমগ্র সড়ক ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং জনসাধারণের জীবন রক্ষা করতে অপরিহার্য।
তবে এই অন্ধকার চিত্রের মধ্যেও আশার আলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রতিদিন অসংখ্য তরুণ নিয়ম মেনে, শৃঙ্খলার সঙ্গে এবং সচেতনভাবে মোটরসাইকেল চালাচ্ছে। তারা বোঝে যে জীবনের সত্যিকারের সাফল্য কয়েক সেকেন্ডের উত্তেজনা, অযথা ঝুঁকি বা তাড়াহুড়োর মধ্যে নয়, বরং ধারাবাহিক পরিশ্রম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, দায়িত্বশীল আচরণ এবং সচেতন মনোভাবের মধ্য দিয়ে আসে। শৃঙ্খলিত রাইডিং আসলে শৃঙ্খলিত জীবনেরই একটি স্বচ্ছ ও স্পষ্ট প্রতিফলন। যে তরুণ ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলে, নিয়মিত সীমিত গতিতে বাইক চালায় এবং সতর্কতার সঙ্গে রাস্তায় চলাচল করে, সে কর্মক্ষেত্রেও নিয়ম ও নীতির প্রতি আনুগত্য শেখে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধৈর্য ধরে এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে সক্ষম হয়। ভবিষ্যতের উদ্যোক্তা, গবেষক, পেশাজীবী বা সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিক হতে চাইলে এই শৃঙ্খলিত অভ্যাসই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় পুঁজি, যা শুধু জীবন নয়, সমগ্র সমাজকে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
জীবনের গতি কখনোই বাইকের স্পিডোমিটারে মাপা যায় না। জীবনের প্রকৃত অগ্রগতি আসে শিক্ষা, দক্ষতা, দায়িত্ববোধ এবং সময়ের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে। মোটরসাইকেল সেই যাত্রার সহায়ক হতে পারে, যদি আমরা তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। ধীরে চালানো মানে পিছিয়ে পড়া নয়, বরং নিরাপদে এবং স্থায়ীভাবে এগিয়ে যাওয়া। জীবন কোনো ছোট দৌড় নয়, এটি একটি দীর্ঘ পথচলা। শুরুতেই বেপরোয়া হলে মাঝপথে থেমে যাওয়ার ঝুঁকিই বেশি থাকে। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে। হেলমেটের মান নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত রাইডিং প্রশিক্ষণ এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও সমানভাবে জরুরি। তবে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, আজ আমি কীভাবে বাইক চালাব এবং কতটা দায়িত্বশীল হব।
তরুণদের উদ্দেশে তাই একটি কথাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জীবন একটাই, কিন্তু সম্ভাবনা অসীম। কয়েক সেকেন্ডের উত্তেজনার জন্য সেই সম্ভাবনাকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রতিদিন বের হওয়ার সময় নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে গন্তব্য শুধু আজ নয়, আগামীকালও আছে। ধীরে চালানো, নিয়ম মানা এবং হেলমেট পরা মানেই নিজের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। কারণ জীবন থাকলেই স্বপ্ন বাঁচে, পরিবার হাসে এবং দেশ এগিয়ে যায়। ধীরগতির পথেই গড়ে ওঠে নিরাপদ ও স্থায়ী ভবিষ্যৎ।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।
কৃষিবিদ ড. রাধেশ্যাম সরকার
২০ ডিসেম্বর, ২০২৫, 3:36 PM
মোটরসাইকেল আজ আধুনিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহন। বিশেষ করে তরুণদের কাছে এটি শুধু যাতায়াতের উপকরণ নয়, বরং স্বাধীনতা, গতি এবং আত্মবিশ্বাসের এক দৃশ্যমান প্রকাশ। শহরের যানজট পেরিয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধা মোটরসাইকেলকে জনপ্রিয় করেছে। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার আড়ালে এক গভীর সংকটও ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নিয়ন্ত্রণহীন গতি, অসচেতন চালনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ প্রতিদিন অসংখ্য তরুণের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে প্রশ্নটা আর শুধু বাইক চালানো নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়ায়, আমরা আমাদের জীবনকে কতটা মূল্য দিচ্ছি এবং ভবিষ্যৎকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং তা ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশের সঙ্গে মোটরসাইকেল জড়িত। জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ২০২৪ সালে মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৫৭০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৩ হাজার ১৫১ জন। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং এটি সড়কে চলাচলকারী বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তে থাকা ঝুঁকির স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
আগের বছরগুলোর তুলনায় এই প্রবণতা যে ক্রমেই বাড়ছে, তা বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। টাইমস অব বাংলাদেশে প্রকাশিত সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির হারও প্রায় সমানতালে বেড়েছে। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মাত্র পাঁচ বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১১ হাজার ৮৬৪ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ের পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে সমস্যাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিক ও গভীর সংকট।
এ সংকটের তাৎক্ষণিক ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে। সেখানে জানানো হয়, শুধু ২০২৫ সালের মে মাসেই ২৩৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় অন্তত ২৫৬ জন নিহত হয়েছেন, যা ওই এক মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহতের প্রায় ৪২ শতাংশের সমান। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সড়ক মৃত্যুর একটি বড় অংশ দখল করে নিয়েছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল বয়সভিত্তিক বা অঞ্চলভিত্তিক পার্থক্যই তুলে ধরে না, বরং এর ভেতর দিয়ে আরও বড় একটি সামাজিক বাস্তবতা প্রকাশ পায়। দুর্ঘটনায় নিহতদের বড় অংশই ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ, যারা সমাজের সবচেয়ে কর্মক্ষম, সৃজনশীল ও সম্ভাবনাময় জনগোষ্ঠী। তাই এই সংখ্যাগুলো নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার আড়ালে রয়েছে ভেঙে পড়া একটি পরিবার, থেমে যাওয়া একটি স্বপ্নের যাত্রা এবং অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত অসংখ্য মানুষের জীবন। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কেবল একটি সড়ক নিরাপত্তা সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত একটি সামাজিক চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশের নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়, যার মধ্যে প্রায় ২৮ শতাংশই মোটরসাইকেল চালক। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মোটরসাইকেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে এখানেই পার্থক্য গড়ে দেয় সচেতনতা, আইন প্রয়োগ এবং নীতিনির্ধারণ। থাইল্যান্ডে বাধ্যতামূলক হেলমেট আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার প্রায় ২৩ শতাংশ কমেছে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াতেও একই ধরনের উদ্যোগ ইতিবাচক ফল এনেছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে গতি কমানো মানে স্থবিরতা নয়, বরং তা দীর্ঘমেয়াদে জীবনের গতি ও নিরাপত্তা দুটোই বাড়ায়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি কারণ বারবার সামনে আসে। অতিরিক্ত গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য, হেলমেট না পরা বা নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহার, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া চালনা এবং সামাজিক মাধ্যমে স্টান্ট প্রদর্শনের প্রবণতা মিলিয়ে একটি ঝুঁকিপূর্ণ সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। তরুণ বয়সে অনেকের মধ্যেই একটি ভুল আত্মবিশ্বাস কাজ করে যে তার কিছু হবে না। কিন্তু দুর্ঘটনা কখনো বয়স, সাহস বা আত্মবিশ্বাস বিচার করে আসে না। তা আসে হঠাৎ, বিনা সতর্কতায়, আর তখন অনুশোচনার সময় থাকে না। গবেষণায় দেখা গেছে, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৪২ শতাংশ কমে এবং মাথায় গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি কমে প্রায় ৬৯ শতাংশ। তবুও বাস্তবে দেখা যায়, অনেকেই হেলমেটকে কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে বিবেচনা করে। আধা হেলমেট বা ঠিকভাবে বাঁধা না থাকা হেলমেট দুর্ঘটনার সময় কার্যত কোনো সুরক্ষা দিতে পারে না। এখানে সমস্যাটি শুধু আইন প্রয়োগের নয়, বরং মানসিকতারও। জীবনকে যদি আমরা সত্যিই মূল্য দিই, তাহলে নিরাপত্তাকে বোঝা হিসেবে নয়, সম্মানের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
মোটরসাইকেল চালানো মানে কেবল নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া নয়। একটি দ্রুতগতির বাইক রাস্তায় থাকা পথচারী, রিকশাচালক, সাধারণ যাত্রী বা অন্য যানবাহনের আরোহীর জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে। একটি মুহূর্তের বেপরোয়া, অযথা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বহু মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি, অপরিবর্তনীয় আঘাত কিংবা অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ছোট একটি ভুল পলকে একেবারে ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, যা শুধু আহত ব্যক্তির নয়, তার পরিবার এবং আশেপাশের সমাজকেও প্রভাবিত করে। তাই নিরাপদ, সচেতন ও শৃঙ্খলিত চালনা কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বও, যা সমগ্র সড়ক ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং জনসাধারণের জীবন রক্ষা করতে অপরিহার্য।
তবে এই অন্ধকার চিত্রের মধ্যেও আশার আলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রতিদিন অসংখ্য তরুণ নিয়ম মেনে, শৃঙ্খলার সঙ্গে এবং সচেতনভাবে মোটরসাইকেল চালাচ্ছে। তারা বোঝে যে জীবনের সত্যিকারের সাফল্য কয়েক সেকেন্ডের উত্তেজনা, অযথা ঝুঁকি বা তাড়াহুড়োর মধ্যে নয়, বরং ধারাবাহিক পরিশ্রম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, দায়িত্বশীল আচরণ এবং সচেতন মনোভাবের মধ্য দিয়ে আসে। শৃঙ্খলিত রাইডিং আসলে শৃঙ্খলিত জীবনেরই একটি স্বচ্ছ ও স্পষ্ট প্রতিফলন। যে তরুণ ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলে, নিয়মিত সীমিত গতিতে বাইক চালায় এবং সতর্কতার সঙ্গে রাস্তায় চলাচল করে, সে কর্মক্ষেত্রেও নিয়ম ও নীতির প্রতি আনুগত্য শেখে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধৈর্য ধরে এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে সক্ষম হয়। ভবিষ্যতের উদ্যোক্তা, গবেষক, পেশাজীবী বা সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিক হতে চাইলে এই শৃঙ্খলিত অভ্যাসই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় পুঁজি, যা শুধু জীবন নয়, সমগ্র সমাজকে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
জীবনের গতি কখনোই বাইকের স্পিডোমিটারে মাপা যায় না। জীবনের প্রকৃত অগ্রগতি আসে শিক্ষা, দক্ষতা, দায়িত্ববোধ এবং সময়ের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে। মোটরসাইকেল সেই যাত্রার সহায়ক হতে পারে, যদি আমরা তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। ধীরে চালানো মানে পিছিয়ে পড়া নয়, বরং নিরাপদে এবং স্থায়ীভাবে এগিয়ে যাওয়া। জীবন কোনো ছোট দৌড় নয়, এটি একটি দীর্ঘ পথচলা। শুরুতেই বেপরোয়া হলে মাঝপথে থেমে যাওয়ার ঝুঁকিই বেশি থাকে। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে। হেলমেটের মান নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত রাইডিং প্রশিক্ষণ এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও সমানভাবে জরুরি। তবে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, আজ আমি কীভাবে বাইক চালাব এবং কতটা দায়িত্বশীল হব।
তরুণদের উদ্দেশে তাই একটি কথাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জীবন একটাই, কিন্তু সম্ভাবনা অসীম। কয়েক সেকেন্ডের উত্তেজনার জন্য সেই সম্ভাবনাকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রতিদিন বের হওয়ার সময় নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে গন্তব্য শুধু আজ নয়, আগামীকালও আছে। ধীরে চালানো, নিয়ম মানা এবং হেলমেট পরা মানেই নিজের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। কারণ জীবন থাকলেই স্বপ্ন বাঁচে, পরিবার হাসে এবং দেশ এগিয়ে যায়। ধীরগতির পথেই গড়ে ওঠে নিরাপদ ও স্থায়ী ভবিষ্যৎ।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।