CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬

স্মার্ট কৃষির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ

#
news image

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে কৃষি শুধু একটি পেশা নয়, বরং এক জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির প্রতিফলন। প্রাচীনকাল থেকে এ দেশের মানুষের খাদ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক কাঠামো কৃষিকেন্দ্রিক ছিল। এখনো দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান সরাসরি কৃষিনির্ভর, এবং মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ১১.৫০% (BBS, ২০২১-২২) কৃষি খাত থেকে আসে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, কৃষি জমি কমে যাওয়া এবং কৃষি উৎপাদনের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া চাহিদা এসব সংকট কৃষিকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বাংলাদেশের কৃষিকে টিকিয়ে রাখা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ‘স্মার্ট কৃষি’ হয়ে উঠেছে সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
 
স্মার্ট কৃষি বলতে বোঝানো হয় এমন একটি কৃষি ব্যবস্থা, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় কৃষি কাজ পরিচালিত হয়। এখানে ব্যবহৃত হয় ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর, বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স, অটোমেশন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল অ্যাপ্লিকেশন। এর মাধ্যমে কৃষকরা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কোন সময়ে বীজ বপন করা শ্রেয়, কতটুকু সার প্রয়োগ করা দরকার, মাটির আর্দ্রতা কেমন আছে, কিংবা কোন কীটনাশক কখন প্রয়োগ করা উচিত। ফলস্বরূপ উৎপাদনশীলতা বাড়ে, খরচ কমে, পরিবেশ-বান্ধব কৃষি নিশ্চিত হয় এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায়। প্রযুক্তি এখানে কৃষকের সহায়ক শক্তি হয়ে ওঠে, যা তাকে শুধু পরিশ্রমী নয়, বরং বুদ্ধিদীপ্ত কৃষক হিসেবে গড়ে তোলে।
 
বাংলাদেশে স্মার্ট কৃষির যাত্রা যদিও ধীরগতিতে শুরু হয়েছে, তবে তা এখন দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে চলেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘ডিজিটাল কৃষি’ কার্যক্রমে ইতোমধ্যেই চালু হয়েছে কৃষক কল সেন্টার (১৬১২৩), যেখানে কৃষকরা বিনামূল্যে ফোন করে প্রয়োজনীয় কৃষি পরামর্শ নিতে পারছেন। শুধু তাই নয়, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তারা ফসলের রোগ শনাক্তকরণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজারদরের হালনাগাদ তথ্য এবং কৃষি প্রশিক্ষণ সম্পর্কিত উপদেশ পাচ্ছেন। “Krishoker Janala”, “iFarmer” এবং “Digital Krishok” এর মতো অ্যাপগুলো গ্রামীণ কৃষকদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে, যা প্রযুক্তির প্রতি কৃষকদের আস্থার ইঙ্গিত বহন করে।
 
২০২৪ সালে কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে অন্তত ৪০টি জেলায় স্মার্ট কৃষি সম্পর্কিত প্রকল্প চালু হয়েছে। এর মধ্যে ২০টির বেশি জেলায় ‘ড্রিপ ইরিগেশন’, ‘স্মার্ট গ্রিনহাউজ’ এবং ‘অটোমেটেড চাষাবাদ’ প্রক্রিয়া পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বরিশাল ও যশোর অঞ্চলের কিছু কৃষক ইতিমধ্যে IoT-ভিত্তিক মাটির আর্দ্রতা সেন্সর ব্যবহার করে পানির ব্যবহার প্রায় ৩০% পর্যন্ত কমাতে সক্ষম হয়েছেন, যা পানি সংকট মোকাবিলায় একটি ইতিবাচক উদাহরণ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি উন্নয়ন হলো ড্রোন প্রযুক্তির প্রয়োগ। ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ড্রোনের মাধ্যমে কীটনাশক ছিটানো এবং ক্ষেত পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু করেছে। এতে সময় ও শ্রমের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে, পাশাপাশি জমির স্বাস্থ্যও ভালো থাকছে। ড্রোন প্রযুক্তি শুধু কাজের গতি বাড়াচ্ছে না, বরং জমি ব্যবস্থাপনায় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সহায়তা করছে। একইসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ শনাক্তকরণ মডেল তৈরি করছে স্থানীয় স্টার্টআপগুলো। উদাহরণস্বরূপ, “Agroshift” এবং “iPage” প্রতিষ্ঠানগুলো রিমোট সেন্সিং, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ ও AI অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কৃষকদের জমি ও ফসল সংক্রান্ত মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করছে।
 
বাংলাদেশের স্মার্ট কৃষির ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সংযোজন হলো এগ্রি-স্টার্টআপ সংস্কৃতি। গত পাঁচ বছরে দেশে ৫০টির বেশি কৃষি প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপ গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে iFarmer, Agrohoop, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে “Khamar-e” এবং কৃষি-ফিনটেক সেবায় “Sathi” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব স্টার্টআপ কৃষক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলছে। উদাহরণস্বরূপ, iFarmer ২০২৪ সালে প্রায় ২০ হাজার কৃষকের কাছে ৭৫ কোটি টাকার কৃষি সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে, যার ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪২%। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের কৃষিকে শুধু আধুনিক করছে না, বরং তরুণ উদ্যোক্তাদের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করছে।
 
বিদেশি সাহায্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। FAO, USAID এবং World Bank স্মার্ট কৃষির উন্নয়নে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করছে। “Climate-Smart Agriculture” প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকায় ফসলের ধরন পরিবর্তন, মাটির মান পর্যবেক্ষণ এবং কৃষকদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকে টেকসই পথে এগিয়ে নেবে।
 
তবে স্মার্ট কৃষির পথে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দেশের অধিকাংশ কৃষক এখনও প্রযুক্তি ব্যবহারে অপরিচিত বা অনভিজ্ঞ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (২০২৩) তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ কৃষকদের মধ্যে মাত্র ৩০% স্মার্টফোন ব্যবহার করেন এবং মাত্র ২২% ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন। এই তথ্য স্পষ্ট করে দেয় যে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থায় এখনো অধিকাংশ কৃষক অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি। আরও উদ্বেগজনক হলো শিক্ষার সীমাবদ্ধতা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কৃষকের প্রায় ৪৮% প্রাথমিক স্তর পেরোননি বা প্রাথমিকের নিচে শিক্ষিত। প্রায় ৩৩% কৃষক কেবল প্রাথমিক পাস এবং মাত্র ১৫% কৃষক উচ্চমাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন। অর্থাৎ প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার করতে সক্ষম এমন কৃষকের সংখ্যা এখনো খুবই সীমিত। এর পাশাপাশি রয়েছে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা। অধিকাংশ অ্যাপ বা প্রযুক্তির ইন্টারফেস ইংরেজি বা মাননসই বাংলায় না থাকায় সাধারণ কৃষকের কাছে এগুলো ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার উন্নত যন্ত্রপাতির উচ্চমূল্য এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ সুবিধার অভাবও স্মার্ট কৃষিকে সাধারণ কৃষকের নাগালের বাইরে রাখছে। অনেক প্রবীণ কৃষক প্রথাগত কৃষিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং প্রযুক্তির প্রতি আস্থা রাখতে দ্বিধাগ্রস্ত হন। তবে আশার কথা, দেশের কৃষিশ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১৮-৩৫ বছর বয়সী তরুণ কৃষকের হার প্রায় ২৭% (BIDS, ২০২৪)। এরা তুলনামূলকভাবে প্রযুক্তির প্রতি বেশি আগ্রহী এবং শেখার মানসিকতা রাখে। যদি এই তরুণ কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়া যায়, তবে স্মার্ট কৃষির বিস্তারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
 
স্মার্ট কৃষির বিস্তারে ইন্টারনেট সংযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহও একটি বড় সীমাবদ্ধতা। অনেক অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ কিংবা উচ্চগতির ইন্টারনেট না থাকায় IoT ভিত্তিক প্রযুক্তি বা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কৃষকদের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারকে সহজ করা, স্থানীয় ভাষাভিত্তিক অ্যাপ তৈরি এবং নিরবচ্ছিন্ন অবকাঠামো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগকে আরও সমন্বিত হতে হবে। যেমন কৃষি যন্ত্রপাতির উপর ভর্তুকি প্রদান, স্টার্টআপদের জন্য সহজ ঋণপ্রাপ্তি, নিয়মিত প্রযুক্তি প্রদর্শনী ও কৃষি মেলা আয়োজন, ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, এবং কৃষি প্রযুক্তির গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এগুলো কেবল কৃষকদের প্রযুক্তিতে আগ্রহী করে তুলবে না, বরং কৃষিকে আরও গতিশীল ও টেকসই করে তুলবে।
 
সবশেষে বলা যায়, স্মার্ট কৃষির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট উজ্জ্বল। যদি আমরা প্রযুক্তির ব্যবহার সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে পারি, তবে খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং টেকসই কৃষি একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব হবে। আধুনিক প্রযুক্তি এবং মানুষের প্রজ্ঞার সমন্বয়ে তৈরি হবে এমন এক কৃষি ব্যবস্থা, যা কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও খাদ্য চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে। অতএব, স্মার্ট কৃষি এখন আর ভবিষ্যতের কল্পনা নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে শক্তিশালী করতে চাই আরও উদ্ভাবন, আরও অন্তর্ভুক্তি এবং কৃষক-কেন্দ্রিক নীতিমালা। বাংলাদেশের কৃষক যদি প্রযুক্তির সাহচর্যে নিজের দক্ষতাকে পুনর্গঠন করতে পারেন, তবে ‘স্মার্ট কৃষির পথে বাংলাদেশ’ শুধু একটি প্রবন্ধের শিরোনাম নয়, বরং সময়ের দাবি ও নতুন দিগন্তের প্রতীক হয়ে উঠবে। প্রযুক্তি ও প্রজ্ঞার সম্মিলনে আমাদের কৃষি হবে আরও টেকসই, আরও মানবিক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা ও চেয়াম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।

ড.রাধেশ্যাম সরকার

২০ আগস্ট, ২০২৫,  2:42 PM

news image

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে কৃষি শুধু একটি পেশা নয়, বরং এক জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির প্রতিফলন। প্রাচীনকাল থেকে এ দেশের মানুষের খাদ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক কাঠামো কৃষিকেন্দ্রিক ছিল। এখনো দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান সরাসরি কৃষিনির্ভর, এবং মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ১১.৫০% (BBS, ২০২১-২২) কৃষি খাত থেকে আসে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, কৃষি জমি কমে যাওয়া এবং কৃষি উৎপাদনের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া চাহিদা এসব সংকট কৃষিকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বাংলাদেশের কৃষিকে টিকিয়ে রাখা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ‘স্মার্ট কৃষি’ হয়ে উঠেছে সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
 
স্মার্ট কৃষি বলতে বোঝানো হয় এমন একটি কৃষি ব্যবস্থা, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় কৃষি কাজ পরিচালিত হয়। এখানে ব্যবহৃত হয় ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর, বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স, অটোমেশন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল অ্যাপ্লিকেশন। এর মাধ্যমে কৃষকরা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কোন সময়ে বীজ বপন করা শ্রেয়, কতটুকু সার প্রয়োগ করা দরকার, মাটির আর্দ্রতা কেমন আছে, কিংবা কোন কীটনাশক কখন প্রয়োগ করা উচিত। ফলস্বরূপ উৎপাদনশীলতা বাড়ে, খরচ কমে, পরিবেশ-বান্ধব কৃষি নিশ্চিত হয় এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায়। প্রযুক্তি এখানে কৃষকের সহায়ক শক্তি হয়ে ওঠে, যা তাকে শুধু পরিশ্রমী নয়, বরং বুদ্ধিদীপ্ত কৃষক হিসেবে গড়ে তোলে।
 
বাংলাদেশে স্মার্ট কৃষির যাত্রা যদিও ধীরগতিতে শুরু হয়েছে, তবে তা এখন দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে চলেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘ডিজিটাল কৃষি’ কার্যক্রমে ইতোমধ্যেই চালু হয়েছে কৃষক কল সেন্টার (১৬১২৩), যেখানে কৃষকরা বিনামূল্যে ফোন করে প্রয়োজনীয় কৃষি পরামর্শ নিতে পারছেন। শুধু তাই নয়, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তারা ফসলের রোগ শনাক্তকরণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজারদরের হালনাগাদ তথ্য এবং কৃষি প্রশিক্ষণ সম্পর্কিত উপদেশ পাচ্ছেন। “Krishoker Janala”, “iFarmer” এবং “Digital Krishok” এর মতো অ্যাপগুলো গ্রামীণ কৃষকদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে, যা প্রযুক্তির প্রতি কৃষকদের আস্থার ইঙ্গিত বহন করে।
 
২০২৪ সালে কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে অন্তত ৪০টি জেলায় স্মার্ট কৃষি সম্পর্কিত প্রকল্প চালু হয়েছে। এর মধ্যে ২০টির বেশি জেলায় ‘ড্রিপ ইরিগেশন’, ‘স্মার্ট গ্রিনহাউজ’ এবং ‘অটোমেটেড চাষাবাদ’ প্রক্রিয়া পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বরিশাল ও যশোর অঞ্চলের কিছু কৃষক ইতিমধ্যে IoT-ভিত্তিক মাটির আর্দ্রতা সেন্সর ব্যবহার করে পানির ব্যবহার প্রায় ৩০% পর্যন্ত কমাতে সক্ষম হয়েছেন, যা পানি সংকট মোকাবিলায় একটি ইতিবাচক উদাহরণ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি উন্নয়ন হলো ড্রোন প্রযুক্তির প্রয়োগ। ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ড্রোনের মাধ্যমে কীটনাশক ছিটানো এবং ক্ষেত পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু করেছে। এতে সময় ও শ্রমের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে, পাশাপাশি জমির স্বাস্থ্যও ভালো থাকছে। ড্রোন প্রযুক্তি শুধু কাজের গতি বাড়াচ্ছে না, বরং জমি ব্যবস্থাপনায় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সহায়তা করছে। একইসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ শনাক্তকরণ মডেল তৈরি করছে স্থানীয় স্টার্টআপগুলো। উদাহরণস্বরূপ, “Agroshift” এবং “iPage” প্রতিষ্ঠানগুলো রিমোট সেন্সিং, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ ও AI অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কৃষকদের জমি ও ফসল সংক্রান্ত মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করছে।
 
বাংলাদেশের স্মার্ট কৃষির ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সংযোজন হলো এগ্রি-স্টার্টআপ সংস্কৃতি। গত পাঁচ বছরে দেশে ৫০টির বেশি কৃষি প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপ গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে iFarmer, Agrohoop, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে “Khamar-e” এবং কৃষি-ফিনটেক সেবায় “Sathi” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব স্টার্টআপ কৃষক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলছে। উদাহরণস্বরূপ, iFarmer ২০২৪ সালে প্রায় ২০ হাজার কৃষকের কাছে ৭৫ কোটি টাকার কৃষি সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে, যার ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪২%। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের কৃষিকে শুধু আধুনিক করছে না, বরং তরুণ উদ্যোক্তাদের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করছে।
 
বিদেশি সাহায্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। FAO, USAID এবং World Bank স্মার্ট কৃষির উন্নয়নে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করছে। “Climate-Smart Agriculture” প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকায় ফসলের ধরন পরিবর্তন, মাটির মান পর্যবেক্ষণ এবং কৃষকদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকে টেকসই পথে এগিয়ে নেবে।
 
তবে স্মার্ট কৃষির পথে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দেশের অধিকাংশ কৃষক এখনও প্রযুক্তি ব্যবহারে অপরিচিত বা অনভিজ্ঞ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (২০২৩) তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ কৃষকদের মধ্যে মাত্র ৩০% স্মার্টফোন ব্যবহার করেন এবং মাত্র ২২% ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন। এই তথ্য স্পষ্ট করে দেয় যে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থায় এখনো অধিকাংশ কৃষক অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি। আরও উদ্বেগজনক হলো শিক্ষার সীমাবদ্ধতা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কৃষকের প্রায় ৪৮% প্রাথমিক স্তর পেরোননি বা প্রাথমিকের নিচে শিক্ষিত। প্রায় ৩৩% কৃষক কেবল প্রাথমিক পাস এবং মাত্র ১৫% কৃষক উচ্চমাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন। অর্থাৎ প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার করতে সক্ষম এমন কৃষকের সংখ্যা এখনো খুবই সীমিত। এর পাশাপাশি রয়েছে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা। অধিকাংশ অ্যাপ বা প্রযুক্তির ইন্টারফেস ইংরেজি বা মাননসই বাংলায় না থাকায় সাধারণ কৃষকের কাছে এগুলো ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার উন্নত যন্ত্রপাতির উচ্চমূল্য এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ সুবিধার অভাবও স্মার্ট কৃষিকে সাধারণ কৃষকের নাগালের বাইরে রাখছে। অনেক প্রবীণ কৃষক প্রথাগত কৃষিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং প্রযুক্তির প্রতি আস্থা রাখতে দ্বিধাগ্রস্ত হন। তবে আশার কথা, দেশের কৃষিশ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১৮-৩৫ বছর বয়সী তরুণ কৃষকের হার প্রায় ২৭% (BIDS, ২০২৪)। এরা তুলনামূলকভাবে প্রযুক্তির প্রতি বেশি আগ্রহী এবং শেখার মানসিকতা রাখে। যদি এই তরুণ কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়া যায়, তবে স্মার্ট কৃষির বিস্তারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
 
স্মার্ট কৃষির বিস্তারে ইন্টারনেট সংযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহও একটি বড় সীমাবদ্ধতা। অনেক অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ কিংবা উচ্চগতির ইন্টারনেট না থাকায় IoT ভিত্তিক প্রযুক্তি বা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কৃষকদের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারকে সহজ করা, স্থানীয় ভাষাভিত্তিক অ্যাপ তৈরি এবং নিরবচ্ছিন্ন অবকাঠামো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগকে আরও সমন্বিত হতে হবে। যেমন কৃষি যন্ত্রপাতির উপর ভর্তুকি প্রদান, স্টার্টআপদের জন্য সহজ ঋণপ্রাপ্তি, নিয়মিত প্রযুক্তি প্রদর্শনী ও কৃষি মেলা আয়োজন, ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, এবং কৃষি প্রযুক্তির গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এগুলো কেবল কৃষকদের প্রযুক্তিতে আগ্রহী করে তুলবে না, বরং কৃষিকে আরও গতিশীল ও টেকসই করে তুলবে।
 
সবশেষে বলা যায়, স্মার্ট কৃষির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট উজ্জ্বল। যদি আমরা প্রযুক্তির ব্যবহার সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে পারি, তবে খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং টেকসই কৃষি একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব হবে। আধুনিক প্রযুক্তি এবং মানুষের প্রজ্ঞার সমন্বয়ে তৈরি হবে এমন এক কৃষি ব্যবস্থা, যা কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও খাদ্য চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে। অতএব, স্মার্ট কৃষি এখন আর ভবিষ্যতের কল্পনা নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে শক্তিশালী করতে চাই আরও উদ্ভাবন, আরও অন্তর্ভুক্তি এবং কৃষক-কেন্দ্রিক নীতিমালা। বাংলাদেশের কৃষক যদি প্রযুক্তির সাহচর্যে নিজের দক্ষতাকে পুনর্গঠন করতে পারেন, তবে ‘স্মার্ট কৃষির পথে বাংলাদেশ’ শুধু একটি প্রবন্ধের শিরোনাম নয়, বরং সময়ের দাবি ও নতুন দিগন্তের প্রতীক হয়ে উঠবে। প্রযুক্তি ও প্রজ্ঞার সম্মিলনে আমাদের কৃষি হবে আরও টেকসই, আরও মানবিক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা ও চেয়াম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।