ধর্ম ডেস্ক
০৩ অক্টোবর, ২০২৫, 6:59 PM
মানবজাতির হেদায়েতের জন্য সবশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে এ কুরআন। যারা এ কুরআন তেলাওয়াত করে, এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা, কুরআন থেকে হেদায়েত গ্রহণ করে, কুরআন শিক্ষা দেয় এবং পারস্পরিক কুরআনের চর্চা করে আল্লাহ তাদের প্রতি অত্যন্ত খুশি হন। তাদের ওপর বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন, তাদের অন্তরে প্রশান্তি ঢেলে দেন এবং তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে থাকেন। সর্বদা তাদের ওপর আল্লাহর রহমত আচ্ছাদিত করে রাখে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যারা আল্লাহর ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে এবং পারস্পরিক কুরআনের চর্চা করে, তাদের প্রতি ‘সাকিনা’ তথা এক ধরনের বিশেষ প্রশান্তি বর্ষিত হয়, রহমত তাদের আচ্ছাদিত করে নেয় এবং আল্লাহ তাঁর কাছের ফেরেশতাদের মাঝে তাদের আলোচনা করেন’ (মুসলিম : ২৬৯৯)।
পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতে রয়েছে বহুবিধ কল্যাণ ও উপকারিতা। জাগতিক, পারলৌকিক, বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক। পৃথিবীর বুকে কুরআন একমাত্র কিতাব, যার তেলাওয়াতে রয়েছে হরফে হরফে সওয়াব। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পড়বে তার জন্য একটি সওয়াব। আর একটি সওয়াব দশটা সওয়াবের সমতুল্য।’ (তিরমিজি : ২৯১০)
নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করলে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া যায় এবং প্রভূত পুণ্য অর্জন করা যায়। মুমিনগণ সেই আশায় আল্লাহর কালাম তেলাওয়াত করেন। কিন্তু তেলাওয়াতে কিছু ত্রুটির কারণে তেলাওয়াত করে সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হয়ে যায়। এর অন্যতম একটা কারণ দ্রুত কুরআন তেলাওয়াত করা। দ্রুততার কারণে মাঝেমধ্যে উচ্চারণগুলো সুন্দর হয় না, অক্ষর ও শব্দের উচ্চারণ অশুদ্ধ হয়ে যায়, কখনো অস্পষ্ট হয়ে যায়, যা মোটেই উচিত নয়। কুরআন কীভাবে তেলাওয়াত করতে হবে, তার নির্দেশনা আল্লাহ তায়ালা কুরআনেই বলে দিয়েছেন। রাসুল (সা.)-এর জীবনে সেই তেলাওয়াতের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। রাসুল (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আপনি কুরআন তেলাওয়াত করুন ধীরে ধীরে, সুস্পষ্টভাবে’ (সুরা মুজ্জাম্মিল : ৪)। হজরত আনাস (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তেলাওয়াতের পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, নবীজি (সা.) শব্দগুলোকে টেনে টেনে পড়তেন। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম’ পড়ে বললেন যে, তিনি ‘আল্লাহ’, ‘রহমান’, ‘রহিম’ শব্দগুলো দীর্ঘ করে টেনে টেনে পড়তেন’ (বুখারি : ৫০৪৬)।
উম্মে সালামা (রা.)-কেও একই প্রশ্ন করা হয়। তিনি উত্তরে বলেন, ‘নবীজি (সা.) প্রতিটি আয়াত আলাদা আলাদা করে পড়তেন এবং প্রতি আয়াত পড়ে
থামতেন। তিনি ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন’ বলে থামতেন। তারপর ‘আর-রাহমানির রাহিম’ বলে থামতেন। তারপর ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দিন’ বলে থামতেন।’ (তিরমিজি : ২৯২৭)
যারা দ্রুত তেলাওয়াত করে, তাদের এ ব্যাপারে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। দ্রুত তেলাওয়াত করতে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, আমরা কুরআন তেলাওয়াত করছিলাম এমন সময় রাসুল (সা.) এলেন। তখন আমাদের সঙ্গে কিছু গ্রাম্য মানুষ ছিল, কিছু অনারব মানুষও ছিল। রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমরা কুরআন পড়ো, তোমরা প্রত্যেকেই উত্তম মানুষ। আর অচিরেই এমন সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে, যারা কুরআনকে সোজা করবে, যেভাবে তীর সোজা করা হয়। (তারা তাজবিদ নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি করবে) আর তারা কুরআন পাঠে খুব তাড়াহুড়ো করবে, অপেক্ষা করে আস্তে-ধীরে তেলাওয়াত করবে না’ (আবু দাউদ : ৮৩০)।
প্রায় একই ধরনের হাদিস সাহাবি হজরত সাহাল (রা.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা কুরআন মাজিদ তেলাওয়াত করছিলাম এমন সময় রাসুল (সা.) এলেন। তিনি বললেন, আল্লাহর কিতাব একটাই। আর তোমাদের কেউ লাল, কেউ সাদা আবার কেউ কালো। (তোমরা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ ও ভিন্ন ভিন্ন জাতির মানুষ)। তোমরা ওই সম্প্রদায়ের আবির্ভাবের পূর্বে কুরআন পড়ো, যারা কুরআন সোজা করবে যেভাবে তীর সোজা করা হয়। আর তারা কুরআন পাঠে খুব তাড়াহুড়ো করবে, অপেক্ষা করে আস্তে-ধীরে তেলাওয়াত করবে না।’ (আবু দাউদ : ৮৩১)
অনেকেই কুরআন মাজিদ দ্রুত তেলাওয়াত করেন। অন্যান্য কিছু আমলও দ্রুত করার চেষ্টা করেন। তারা মনে করেন, দ্রুত তেলাওয়াত করে যতবেশি পড়া হবে, তাড়াহুড়ো করে যতবেশি আমল করা হবে, ততবেশি সওয়াবের অধিকারী হওয়া যাবে। কেয়ামতের দিন আমল বেশি হওয়াটাই লাভজনক হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, কেয়ামতের দিন আমাদের আমল গণনা করা হবে না। কে কত পারা তেলাওয়াত করল, কত খতম শেষ করল বা কত রাকাত নামাজ পড়ল; এসব দেখা হবে না। বরং মিজানের পাল্লায় আমাদের আমলগুলো ওজন করা হবে। যেমন কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন সঠিকভাবে আমলগুলো ওজন করা হবে, সুতরাং যাদের পুণ্যের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম ও কৃতকার্য হবে’ (সুরা আরাফ : ৮)।
এ জন্য তাড়াহুড়ো করে আমলের সংখ্যা না বাড়িয়ে ধীরে-সুস্থে আমল করে আমলের গুণগত মান বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘যার পাল্লাগুলো ভারী হবে, সে সন্তোষজনক জীবনে থাকবে।’ (সুরা করিয়াহ : ৬-৭)
আমাদের আমলের সংখ্যা বাড়ানো বেশি প্রয়োজন নাকি ওজন বাড়ানো বেশি প্রয়োজন, এ ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) অনেক সুন্দর সমাধান দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমলের ওজন ইখলাস তথা আন্তরিকতা ও সুন্নতের সঙ্গে সামঞ্জস্যতার কারণে বেড়ে যায়। যার আমল আন্তরিকতাপূর্ণ ও সুন্নতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সংখ্যায় কম হলেও তার আমলের ওজন বেশি হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি সংখ্যায় অনেক আমল করবে, নামাজ, রোজা, দান-সদকা, হজ-ওমরাহ অনেক করবে, কিন্তু আন্তরিকতা ও সুন্নতের সঙ্গে সামঞ্জস্য কম হবে, তার আমলের ওজনও কম হবে। মানুষ আমলের যে পুঁজি নিয়ে আল্লাহর আদালতে আসবে তা ভারী না হালকা, তার ভিত্তিতে সেখানে ফয়সালা অনুষ্ঠিত হবে’ (মাজমুল ফাতাওয়া : ১০/৭৩৫-৭৩৬)।
সুতরাং কুরআন তেলাওয়াতসহ সব ধরনের আমলের ব্যাপারে আমাদের আন্তরিক হতে হবে। আল্লাহর নির্দেশনা ও রাসুল (সা.)-এর সুন্নত অনুযায়ী আমল করতে হবে। ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, ‘অনেক মানুষ এমন রয়েছে, তারা কুরআন তেলাওয়াত করে। কিন্তু কুরআন তাদের অভিশাপ দিতে থাকে’ (ইয়াহইয়ু উলুমিদ্দিন : ১/৩২৪)। এর ব্যাখ্যায় অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম বলেছেন, যারা দ্রুত তেলাওয়াত করে, অক্ষরগুলো স্পষ্টভাবে পড়ে না, উচ্চারণ সুন্দর করে না কুরআন তাদের অভিশাপ দেয়। আমরা কুরআনের অভিশাপ থেকে বেঁচে থাকতে চাই।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে বেশি ভালোবাসুক এবং বেশি ভালোবাসা পাক, সে যেন কুরআন মাজিদ দেখে তেলাওয়াত করে’ (বাইহাকি : ২২১৯)। হজরত আবু উমামাহ (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে এ কথা বলতে শুনেছি, ‘তোমরা কুরআন পাঠ করো। কেননা কেয়ামতের দিন কুরআন তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে আগমন করবে’ (মুসলিম : ১৯১)।
সুতরাং আমাদের কর্তব্য, আমরা এমনভাবে কুরআন মাজিদ তেলাওয়াত করব, তেলাওয়াত আমাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নৈকট্য লাভের মাধ্যম হবে। ভালোবাসা পাওয়ার উপায় হবে। মিজানের পাল্লা ভারী হওয়ার মাধ্যম হবে। যে তেলাওয়াত আমাদের জন্য সুপারিশকারী হবে। তেলাওয়াত আমাদের জন্য অভিশাপ না হোক। মহান আল্লাহ সবাইকে তওফিক দিন।
ধর্ম ডেস্ক
০৩ অক্টোবর, ২০২৫, 6:59 PM
মানবজাতির হেদায়েতের জন্য সবশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে এ কুরআন। যারা এ কুরআন তেলাওয়াত করে, এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা, কুরআন থেকে হেদায়েত গ্রহণ করে, কুরআন শিক্ষা দেয় এবং পারস্পরিক কুরআনের চর্চা করে আল্লাহ তাদের প্রতি অত্যন্ত খুশি হন। তাদের ওপর বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন, তাদের অন্তরে প্রশান্তি ঢেলে দেন এবং তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে থাকেন। সর্বদা তাদের ওপর আল্লাহর রহমত আচ্ছাদিত করে রাখে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যারা আল্লাহর ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে এবং পারস্পরিক কুরআনের চর্চা করে, তাদের প্রতি ‘সাকিনা’ তথা এক ধরনের বিশেষ প্রশান্তি বর্ষিত হয়, রহমত তাদের আচ্ছাদিত করে নেয় এবং আল্লাহ তাঁর কাছের ফেরেশতাদের মাঝে তাদের আলোচনা করেন’ (মুসলিম : ২৬৯৯)।
পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতে রয়েছে বহুবিধ কল্যাণ ও উপকারিতা। জাগতিক, পারলৌকিক, বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক। পৃথিবীর বুকে কুরআন একমাত্র কিতাব, যার তেলাওয়াতে রয়েছে হরফে হরফে সওয়াব। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পড়বে তার জন্য একটি সওয়াব। আর একটি সওয়াব দশটা সওয়াবের সমতুল্য।’ (তিরমিজি : ২৯১০)
নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করলে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া যায় এবং প্রভূত পুণ্য অর্জন করা যায়। মুমিনগণ সেই আশায় আল্লাহর কালাম তেলাওয়াত করেন। কিন্তু তেলাওয়াতে কিছু ত্রুটির কারণে তেলাওয়াত করে সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হয়ে যায়। এর অন্যতম একটা কারণ দ্রুত কুরআন তেলাওয়াত করা। দ্রুততার কারণে মাঝেমধ্যে উচ্চারণগুলো সুন্দর হয় না, অক্ষর ও শব্দের উচ্চারণ অশুদ্ধ হয়ে যায়, কখনো অস্পষ্ট হয়ে যায়, যা মোটেই উচিত নয়। কুরআন কীভাবে তেলাওয়াত করতে হবে, তার নির্দেশনা আল্লাহ তায়ালা কুরআনেই বলে দিয়েছেন। রাসুল (সা.)-এর জীবনে সেই তেলাওয়াতের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। রাসুল (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আপনি কুরআন তেলাওয়াত করুন ধীরে ধীরে, সুস্পষ্টভাবে’ (সুরা মুজ্জাম্মিল : ৪)। হজরত আনাস (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তেলাওয়াতের পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, নবীজি (সা.) শব্দগুলোকে টেনে টেনে পড়তেন। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম’ পড়ে বললেন যে, তিনি ‘আল্লাহ’, ‘রহমান’, ‘রহিম’ শব্দগুলো দীর্ঘ করে টেনে টেনে পড়তেন’ (বুখারি : ৫০৪৬)।
উম্মে সালামা (রা.)-কেও একই প্রশ্ন করা হয়। তিনি উত্তরে বলেন, ‘নবীজি (সা.) প্রতিটি আয়াত আলাদা আলাদা করে পড়তেন এবং প্রতি আয়াত পড়ে
থামতেন। তিনি ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন’ বলে থামতেন। তারপর ‘আর-রাহমানির রাহিম’ বলে থামতেন। তারপর ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দিন’ বলে থামতেন।’ (তিরমিজি : ২৯২৭)
যারা দ্রুত তেলাওয়াত করে, তাদের এ ব্যাপারে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। দ্রুত তেলাওয়াত করতে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, আমরা কুরআন তেলাওয়াত করছিলাম এমন সময় রাসুল (সা.) এলেন। তখন আমাদের সঙ্গে কিছু গ্রাম্য মানুষ ছিল, কিছু অনারব মানুষও ছিল। রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমরা কুরআন পড়ো, তোমরা প্রত্যেকেই উত্তম মানুষ। আর অচিরেই এমন সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে, যারা কুরআনকে সোজা করবে, যেভাবে তীর সোজা করা হয়। (তারা তাজবিদ নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি করবে) আর তারা কুরআন পাঠে খুব তাড়াহুড়ো করবে, অপেক্ষা করে আস্তে-ধীরে তেলাওয়াত করবে না’ (আবু দাউদ : ৮৩০)।
প্রায় একই ধরনের হাদিস সাহাবি হজরত সাহাল (রা.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা কুরআন মাজিদ তেলাওয়াত করছিলাম এমন সময় রাসুল (সা.) এলেন। তিনি বললেন, আল্লাহর কিতাব একটাই। আর তোমাদের কেউ লাল, কেউ সাদা আবার কেউ কালো। (তোমরা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ ও ভিন্ন ভিন্ন জাতির মানুষ)। তোমরা ওই সম্প্রদায়ের আবির্ভাবের পূর্বে কুরআন পড়ো, যারা কুরআন সোজা করবে যেভাবে তীর সোজা করা হয়। আর তারা কুরআন পাঠে খুব তাড়াহুড়ো করবে, অপেক্ষা করে আস্তে-ধীরে তেলাওয়াত করবে না।’ (আবু দাউদ : ৮৩১)
অনেকেই কুরআন মাজিদ দ্রুত তেলাওয়াত করেন। অন্যান্য কিছু আমলও দ্রুত করার চেষ্টা করেন। তারা মনে করেন, দ্রুত তেলাওয়াত করে যতবেশি পড়া হবে, তাড়াহুড়ো করে যতবেশি আমল করা হবে, ততবেশি সওয়াবের অধিকারী হওয়া যাবে। কেয়ামতের দিন আমল বেশি হওয়াটাই লাভজনক হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, কেয়ামতের দিন আমাদের আমল গণনা করা হবে না। কে কত পারা তেলাওয়াত করল, কত খতম শেষ করল বা কত রাকাত নামাজ পড়ল; এসব দেখা হবে না। বরং মিজানের পাল্লায় আমাদের আমলগুলো ওজন করা হবে। যেমন কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন সঠিকভাবে আমলগুলো ওজন করা হবে, সুতরাং যাদের পুণ্যের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম ও কৃতকার্য হবে’ (সুরা আরাফ : ৮)।
এ জন্য তাড়াহুড়ো করে আমলের সংখ্যা না বাড়িয়ে ধীরে-সুস্থে আমল করে আমলের গুণগত মান বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘যার পাল্লাগুলো ভারী হবে, সে সন্তোষজনক জীবনে থাকবে।’ (সুরা করিয়াহ : ৬-৭)
আমাদের আমলের সংখ্যা বাড়ানো বেশি প্রয়োজন নাকি ওজন বাড়ানো বেশি প্রয়োজন, এ ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) অনেক সুন্দর সমাধান দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমলের ওজন ইখলাস তথা আন্তরিকতা ও সুন্নতের সঙ্গে সামঞ্জস্যতার কারণে বেড়ে যায়। যার আমল আন্তরিকতাপূর্ণ ও সুন্নতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সংখ্যায় কম হলেও তার আমলের ওজন বেশি হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি সংখ্যায় অনেক আমল করবে, নামাজ, রোজা, দান-সদকা, হজ-ওমরাহ অনেক করবে, কিন্তু আন্তরিকতা ও সুন্নতের সঙ্গে সামঞ্জস্য কম হবে, তার আমলের ওজনও কম হবে। মানুষ আমলের যে পুঁজি নিয়ে আল্লাহর আদালতে আসবে তা ভারী না হালকা, তার ভিত্তিতে সেখানে ফয়সালা অনুষ্ঠিত হবে’ (মাজমুল ফাতাওয়া : ১০/৭৩৫-৭৩৬)।
সুতরাং কুরআন তেলাওয়াতসহ সব ধরনের আমলের ব্যাপারে আমাদের আন্তরিক হতে হবে। আল্লাহর নির্দেশনা ও রাসুল (সা.)-এর সুন্নত অনুযায়ী আমল করতে হবে। ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, ‘অনেক মানুষ এমন রয়েছে, তারা কুরআন তেলাওয়াত করে। কিন্তু কুরআন তাদের অভিশাপ দিতে থাকে’ (ইয়াহইয়ু উলুমিদ্দিন : ১/৩২৪)। এর ব্যাখ্যায় অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম বলেছেন, যারা দ্রুত তেলাওয়াত করে, অক্ষরগুলো স্পষ্টভাবে পড়ে না, উচ্চারণ সুন্দর করে না কুরআন তাদের অভিশাপ দেয়। আমরা কুরআনের অভিশাপ থেকে বেঁচে থাকতে চাই।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে বেশি ভালোবাসুক এবং বেশি ভালোবাসা পাক, সে যেন কুরআন মাজিদ দেখে তেলাওয়াত করে’ (বাইহাকি : ২২১৯)। হজরত আবু উমামাহ (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে এ কথা বলতে শুনেছি, ‘তোমরা কুরআন পাঠ করো। কেননা কেয়ামতের দিন কুরআন তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে আগমন করবে’ (মুসলিম : ১৯১)।
সুতরাং আমাদের কর্তব্য, আমরা এমনভাবে কুরআন মাজিদ তেলাওয়াত করব, তেলাওয়াত আমাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নৈকট্য লাভের মাধ্যম হবে। ভালোবাসা পাওয়ার উপায় হবে। মিজানের পাল্লা ভারী হওয়ার মাধ্যম হবে। যে তেলাওয়াত আমাদের জন্য সুপারিশকারী হবে। তেলাওয়াত আমাদের জন্য অভিশাপ না হোক। মহান আল্লাহ সবাইকে তওফিক দিন।