অনেকটা অনাড়ম্বর আয়োজনের মধ্য দিয়ে গতকাল (৫ অক্টোবর) পালিত হলো বিশ্ব শিক্ষক দিবস। আন্তর্জাতিক দিবসটিতে অনেক গুণী শিক্ষককে ক্রেস্ট দিয়ে সম্মান জানানো হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে শোভাযাত্রা বের করা হয়। শিক্ষকদের সম্মান জানিয়ে ভালো ভালো বয়ানও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব বয়ানে কী পেট ভরে? নামমাত্র ভাড়ায় বাসা পাওয়া যায়? অল্প দামে ওষুধপত্র, পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়? শিক্ষকের জন্য কি ডাক্তার ফি কম নেন? না। এগুলোর কোনটিই হয় না। তাহলে এই বয়ান-ক্রেস্ট দিয়ে কী হবে?
জাতি গঠনের কারিগর শিক্ষকরা যুগের পর যুগ অবহেলিত। কিছু সংখ্যক শিক্ষক বাদে অন্যদের পায়ে ছেঁড়া জুতা, পুরনো শার্ট-প্যান্টই যেন তাদের নিয়তি। সমাজে সব কিছু বদলালেও শিক্ষকদের ভাগ্য বদলাল কই? এখনো তাদের নুন আনতে পানতা ফুরায়। কিন্তু এ থেকে উত্তরণের পথ যে বড় বন্ধুর। কয়েক দিন ধরেই কিছু পত্রিকা এভাবে শিরোনাম করছিল ‘শিক্ষকদের জন্য সুসংবাদ আসছে’। আমিও বেশ আগ্রহ নিয়ে সেই সুসংবাদের অপেক্ষা করলাম। গতকাল সেই সুসংবাদ পেলেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। কিন্তু এটা যে সুসংবাদের নামান্তর মাত্র। তাদের বাড়ি ভাড়া বেড়েছে ৫০০ টাকা। তারা এই ভাতা পাবেন মাসে ১৫০০ টাকা। ছোট্ট একটা প্রশ্ন রাখতে চাই। ১৫০০ টাকা ভাড়ায় দেশের কোথায় বাসা ভাড়া পাওয়া যায়? যারা এই ভাতা নির্ধারণ করেন, তারাও জানেন এই টাকায় বাসা ভাড়া পাওয়া যায় না। তারপরও তারা দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিল্ডিং-আধা পাকা ঘর নয়, অজপাড়াওয়েও ১৫০০ টাকা ভাড়ায় একটি টিনের ছাপড়াও ভাড়া পাওয়া যায় না। তাহলে বাড়ি ভাড়ার নামে শিক্ষকদের সঙ্গে এই তামাসা কেন? শিক্ষকরা ৫০০ টাকা বাড়িভাড়া বৃদ্ধিকে প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। তারা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া এবং চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করার দাবি করেছেন। এ দাবিতে ১২ অক্টোবর থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালনের ডাক দিয়েছেন তারা।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মূল বেতনের সঙ্গে মাসে ৫০০ টাকা চিকিৎসাভাতা পান। আগে বছরে ২৫ শতাংশ হারে বছরে দুটি উৎসব ভাতা পেতেন। গত মে মাসে বাড়ানোর পর তারা ও এমপিওভুক্ত কর্মচারীরা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে উৎসব ভাতা পাচ্ছেন। এর বাইরে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা বছরে একবার মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা পান।
এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, ‘৫০০ টাকা বাড়ি ভাড়া ভাতা বৃদ্ধি আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা কমপক্ষে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া চান। এর সঙ্গে আমাদের চিকিৎসাভাতা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করা এবং এমপিওভুক্ত কর্মচারীদের উৎসব ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করার দাবি জানাচ্ছি।’ সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা মাসে ১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। স্থান ভেদে তাদের বাড়িভাড়া মূল বেতনের ৪০, ৫০ ও ৬০ শতাংশ।
বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস নামে একটি ওয়েবসাইটের তথ্যানুসারে, সরকারি হাইস্কুলে সহকারি শিক্ষকের মূল বেতন শুরুতেই ১৬ হাজার টাকা। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতাসহ সব মিলিয়ে বেতন দাঁড়ায় ২৬ হাজার টাকার মতো। এটা দশম গ্রেডের চাকরি। সেখানে এমপিওভুক্ত একজন শিক্ষকের মূল বেতন শুরুতে ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এটা ১১তম গ্রেডের চাকরি (বিএড করলে দশম গ্রেড)। অর্থাৎ শুরুতেই একটা বৈষম্য। এই শিক্ষকরা এক হাজার টাকা বাড়িভাড়া এবং ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা। সব মিলিয়ে তার বেতন দাঁড়ায় ১৪ হাজার টাকা। অথচ দায়িত্বের ক্ষেত্রে একই। সরকারি স্কুলের শিক্ষকের মতো তারাও একই বই পড়ান, পরীক্ষা নেন, খাতা দেখেন। কলেজ পর্যায়েও একই বৈষম্য। চরম এই বৈষম্য তাদের মানসিক পীড়ার মধ্যেই রাখে বৈকী। কারণ বেতন বৈষম্য শুধু জীবনযাত্রা নয়, সামাজিক মর্যাদাতেও প্রভাব ফেলে। বর্তমান বাজার দর হিসেবে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও যে আহামরি বেতন-ভাতা পাচ্ছেন, তা নয়।
শিক্ষকতাকে মহান পেশা হিসেবে অভিহিত করা হলেও মান-মর্যাদার দিক দিয়ে একেবারেই পিছিয়ে রয়েছেন এ দেশের শিক্ষকরা। দেশের সব পর্যায়ের শিক্ষকই বেতন-ভাতায় সন্তুষ্ট নন। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে নিতান্ত বাধ্য না হলে কেউ এ পেশায় আসছেন না। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রবেশ পর্যায়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও প্রভাষক পদে নিয়োগের সুপারিশ পেলেও ৫ হাজার ২৮৪ জন চাকরিতে যোগ দেননি বলে জানিয়েছেন বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ষষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তিতে ৪১ হাজার ৬২৬ জন প্রার্থীকে এসব পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হলেও যোগ দিয়েছেন ৩৬ হাজার ৩৪৩ জন। (বিডিনিউজ, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫)।
দেশে ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ। তাদের মধ্যে তিন লাখের বেশি সহকারী শিক্ষক এখনো তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। তারা ১৩তম গ্রেডে বেতন পান। এই গ্রেডে ১১ হাজার টাকার স্কেলে শিক্ষকরা বেতন পাবেন সাকূল্যে ১৮ হাজার টাকা। তবে প্রধান শিক্ষকদের সম্প্রতি দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হলেও এখনো তারা সমপদের বেতন-ভাতা পাননি। তিন দফা দাবিতে আগামী ১৭ অক্টোবর থেকে অনশন কর্মসূচি পালন করবে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের মোর্চা ‘প্রাথমিক সহকারী সংগঠন ঐক্য পরিষদ’। তাদের দাবিগুলো হচ্ছে সহকারী শিক্ষকদের এন্ট্রি পদে বেতন ১১তম গ্রেডে নির্ধারণ, চাকরির শুরু থেকে ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড সমস্যার সমাধান এবং প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতি।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদের ভাষ্য, ‘আমাদের আশার বাণী দেওয়া হয়, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয় না। আমি নিজেও ১৬ বছর চাকরি করে ১৩তম গ্রেডে বেতন পাই। শিক্ষকরা যদি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী না হন, তাহলে পাঠদানে কিভাবে মনোযোগী হবেন?’
আমাদের দেশের ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বেসরকারি। প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির মাধ্যমে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীকে মূল বেতন দেয় সরকার। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও বেতন-ভাতা নিয়ে সন্তুষ্ট নন। যেসব শিক্ষকের বিএড নেই, তারা শুরুতে ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ টাকা মূল বেতন পান। আর বিএড থাকলে দশম গ্রেডে যান। এর বাইরে তারা এক হাজার টাকা বাড়িভাড়া এবং ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। এখন একজন শিক্ষক যদি দশম গ্রেডেও বেতন পান তাহলে শুধু মূল বেতন হবে ১৬ হাজার টাকা। এর বাইরে দেড় হাজার টাকা অন্যান্য ভাতা রয়েছে। অন্যদিকে কলেজ পর্যায়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নবম গ্রেডে ২২ হাজার টাকা মূল বেতন পান। তারা সরকারি চাকরিজীবীদের মতো পূর্ণাঙ্গ বাড়িভাড়া, চিকিৎসাসহ অন্যান্য ভাতা পান না। এত দিন শিক্ষকরা মূল বেতনের মাত্র ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতাও পেলেও সম্প্রতি তা ৫০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে।
দেশে সাড়ে ছয় হাজার নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী, অনার্স-মাস্টার্স কলেজের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষক ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার প্রায় ২০ হাজার শিক্ষক সরকারি বেতন পান না। দীর্ঘদিন ধরেই তারা এমপিওভুক্তির দাবি করে আসছেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও পূর্ণাঙ্গ বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতাসহ অন্যান্য দাবিতে আন্দোলন করছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া মূল বেতনের ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাদেশ শিক্ষক ইউনিয়নের সভাপতি আবুল বাশার হাওলাদারের ভাষ্য, ‘ইউনেসকো ১৯৯২ সালের এক সনদে বলেছে- শিক্ষকরা থাকবেন সব পেশার ঊর্ধ্বে। বাংলাদেশও সেই সনদে স্বাক্ষর করেছে। অথচ আমাদের দেশের শিক্ষকরা বেতন-ভাতায় সবচেয়ে পিছিয়ে। অভাব-অনটন নিয়ে তো ভালো শিক্ষাদান আশা করা যায় না। এ ছাড়া শিক্ষকদের হেনস্তা, চাকরিচ্যুতি, অবহেলা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আমাদের আশা থাকবে, আগামী দিনে যারাই সরকার গঠন করুক না কেন, তারা যেন শিক্ষা খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়।’ (কালের কণ্ঠ, ৫ অক্টোবর ২০২৫)।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বলছে, দেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১৭২টি। এর মধ্যে সরকারি ৫৬টি আর বেসরকারি ১১৬টি। বেসরকারি কয়েকটি নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ীই ভালো বেতন পান। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বেতন দেয় গড়পড়তা। বেশির ভাগেই শিক্ষক নামমাত্র বেতন পান; যা দিয়ে সংসার চালানোই কষ্টকর। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সরকারি স্কেল অনুযায়ী বেতন পান; তবে বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়।
আমাদের দেশে একজন প্রভাষকের মূল বেতন ২২ হাজার এবং অধ্যাপকের ৬৪ হাজার ৬০০ টাকা। বেশির ভাগ দেশেই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষকের পদ নেই। তাদের শুরু সহকারী অধ্যাপক দিয়ে। প্রতিবেশী ভারতে সহকারী অধ্যাপকের বেতন স্কেল ৫৫ হাজার টাকা, সহযোগী অধ্যাপক ৯০ হাজার টাকা এবং অধ্যাপকের মূল বেতন এক লাখ ১০ হাজার টাকা। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায়ও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বেশ ভালো। সেই তুলনায় আমাদের শিক্ষকরা পিছিয়ে আছেন। এ কারণে আমাদের দেশের শিক্ষকরা সাইড পেশা হিসেবে অনেক কিছু করে থাকেন। অনেকে ব্যবসা করেন। এছাড়া কোচিং বা টিউশনি তাদের আয়ের একটা পথ।
কারো মনে কষ্ট দেওয়ার জন্য বলছি না। বেতন-ভাতা সন্তোষজনক না হওয়ায় অধিকতর মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে চান না। তারা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এটা তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে আগামীতে প্রজন্মকে হতে হবে সো মাচ ট্যালেন্ট। এই ট্যালেন্ট জাতির জন্য ট্যালেন্ট শিক্ষক দরকার। সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। এ জন্য তাকে দিতে হবে সর্বোচ্চ বেতন-ভাতা ও মর্যাদা। লেখক: সম্পাদক, আন্দোলন।