CKEditor 5 Sample
ঢাকা ০২ জানুয়ারি, ২০২৬

সমাজে শান্তি, ন্যায় ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পথ

#
news image

মানুষ সামাজিক জীব। এককভাবে কেউ টিকে থাকতে পারে না। সমাজে বসবাসের জন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা, সহানুভূতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। কিন্তু আজকের বাস্তবতা হলো আমাদের সমাজে শান্তির পরিবর্তে হিংসা, ন্যায়ের পরিবর্তে অন্যায় এবং ভারসাম্যের পরিবর্তে চরমপন্থা দিন দিন বাড়ছে। অথচ ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায়নিষ্ঠ এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এই উদ্দেশ্যে ইসলাম কিছু মৌলিক নীতিমালার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে, যেগুলোর বাস্তবায়নই একটি সুন্দর ও সহনশীল সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলে। নিচে সেই মূলনীতিগুলোর আলোচনা করা হলো :
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা : ইসলামে ন্যায়বিচার একটি মৌলিক ভিত্তি। কারও প্রতি পক্ষপাত না করে, আত্মীয়স্বজন বা শত্রু যেই হোক না কেন, প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার দেওয়া ন্যায়বিচারের মূলনীতি। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের জন্য দৃঢ়ভাবে অবিচল থাক, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিপক্ষে যায়’ (সুরা নিসা : ১৩৫)। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনে ন্যায়ের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যে, এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরির অপরাধ করলে কেউ তার জন্য সুপারিশ করলে তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! যদি ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ (সা.) চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম (সহিহ বুখারি)। এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, সমাজে প্রকৃত শান্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন ন্যায়বিচার সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হবে ধনী-গরিব, পরিচিত-অপরিচিত সবার জন্য।
পরোপকার ও সদাচরণ : ইসলাম নিজের অধিকার নয়, অন্যের কল্যাণকেও গুরুত্ব দিয়েছে। শক্তিশালী ও ক্ষমতাবানদের দায়িত্ব হলো দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সাহায্য করা ও প্রয়োজনে দয়া প্রদর্শন করা। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আদেশ করেন ন্যায় এবং উপকারের’ (সুরা নাহল : ৯০)। নবী (সা.) নিজে অসহায়দের পাশে দাঁড়াতেন, ক্ষুধার্তকে খাওয়াতেন, গরিবদের সহায়তা করতেন এবং বলতেন, ‘তোমরা বন্দিকে মুক্ত করো, ক্ষুধার্তকে খাওয়াও এবং রোগীর সেবা করো’ (সহিহ বুখারি)। আজ যদি সমাজের ধনীরা গরিবদের সাহায্য করে, কর্তাব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের প্রতি সদয় হয়, তা হলে আত্মকেন্দ্রিকতা দূর হয়ে একটি মানবিক সমাজ গড়ে উঠবে।
ক্ষমা ও সহনশীলতা : ক্ষমা এক মহৎ গুণ, যা সমাজে শান্তি ও সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করে। প্রতিশোধ নয়, বরং ক্ষমার মাধ্যমে হৃদয় জয় করা ইসলামি আদর্শ। নবীজি (সা.) যখন তায়েফে গিয়েছিলেন, সেখানকার লোকেরা তাঁকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করে। তখন ফেরেশতা এসে প্রস্তাব দেন পুরো জনপদ ধ্বংস করে দিতে, কিন্তু নবীজি (সা.) বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমার কওমকে হেদায়েত দাও, তারা জানে না আমি কে।’ মক্কা বিজয়ের সময়ও তিনি তাঁর শত্রুদের ক্ষমা করে দিয়ে বলেন, ‘আজ তোমাদের কোনো তিরস্কার নেই, তোমরা সবাই মুক্ত’ (ইবনে হিশাম)। আমাদের সমাজে যদি এভাবে প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমার চর্চা হয়, তবে তা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
অসহিষ্ণুতা ও চরমপন্থার বিরুদ্ধাচরণ : বর্তমানে সমাজে যে বিশৃঙ্খলা ও ভেদাভেদ দেখা যায়, তার একটি মূল কারণ হচ্ছে অসহিষ্ণুতা ও চরমপন্থা। ইসলামে উগ্রতা ও অহিংস মনোভাব পরিত্যাজ্য। রাসুল (সা.) সবসময় সংযত, ভারসাম্যপূর্ণ ও সহানুভূতিশীল আচরণে উৎসাহ দিতেন। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি সদাচার ধারণ করো, সৎকাজে আদেশ দাও এবং মূর্খদের এড়িয়ে চলো’ (সুরা আরাফ : ১৯৯)। অন্যদিকে ইসলাম উগ্রতা ও কঠোরতার চর্চাকে নিরুৎসাহিত করে। হাদিসে এসেছে, ‘সংযমতা, নম্রতা ও সহজভাব প্রকৃত ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য’ (তিরমিজি)। আজ আমরা যে পথে হাঁটছি, তা আমাদের সমাজকে দুর্বল ও বিভক্ত করে দিচ্ছে। অন্যায়, হিংসা ও স্বার্থপরতার কারণে আমরা শান্তি ও সহানুভূতির পরিবেশ হারিয়ে ফেলেছি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের প্রত্যেকের উচিত ইসলামি নীতিমালা অনুসরণ করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, পরোপকার ও সহানুভূতির মনোভাব গড়ে তোলা, ক্ষমাশীল ও সহনশীল হওয়া। যদি আমরা ব্যক্তি ও জাতি হিসেবে এই আদর্শগুলোর চর্চা করি, তবে আমাদের সমাজ পরিণত হতে পারে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়নিষ্ঠ ও আদর্শ সমাজে। ইসলাম আমাদের সেই পথই দেখিয়েছে।

ধর্ম ডেস্ক 

১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫,  4:37 PM

news image

মানুষ সামাজিক জীব। এককভাবে কেউ টিকে থাকতে পারে না। সমাজে বসবাসের জন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা, সহানুভূতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। কিন্তু আজকের বাস্তবতা হলো আমাদের সমাজে শান্তির পরিবর্তে হিংসা, ন্যায়ের পরিবর্তে অন্যায় এবং ভারসাম্যের পরিবর্তে চরমপন্থা দিন দিন বাড়ছে। অথচ ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায়নিষ্ঠ এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এই উদ্দেশ্যে ইসলাম কিছু মৌলিক নীতিমালার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে, যেগুলোর বাস্তবায়নই একটি সুন্দর ও সহনশীল সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলে। নিচে সেই মূলনীতিগুলোর আলোচনা করা হলো :
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা : ইসলামে ন্যায়বিচার একটি মৌলিক ভিত্তি। কারও প্রতি পক্ষপাত না করে, আত্মীয়স্বজন বা শত্রু যেই হোক না কেন, প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার দেওয়া ন্যায়বিচারের মূলনীতি। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের জন্য দৃঢ়ভাবে অবিচল থাক, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিপক্ষে যায়’ (সুরা নিসা : ১৩৫)। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনে ন্যায়ের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যে, এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরির অপরাধ করলে কেউ তার জন্য সুপারিশ করলে তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! যদি ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ (সা.) চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম (সহিহ বুখারি)। এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, সমাজে প্রকৃত শান্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন ন্যায়বিচার সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হবে ধনী-গরিব, পরিচিত-অপরিচিত সবার জন্য।
পরোপকার ও সদাচরণ : ইসলাম নিজের অধিকার নয়, অন্যের কল্যাণকেও গুরুত্ব দিয়েছে। শক্তিশালী ও ক্ষমতাবানদের দায়িত্ব হলো দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সাহায্য করা ও প্রয়োজনে দয়া প্রদর্শন করা। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আদেশ করেন ন্যায় এবং উপকারের’ (সুরা নাহল : ৯০)। নবী (সা.) নিজে অসহায়দের পাশে দাঁড়াতেন, ক্ষুধার্তকে খাওয়াতেন, গরিবদের সহায়তা করতেন এবং বলতেন, ‘তোমরা বন্দিকে মুক্ত করো, ক্ষুধার্তকে খাওয়াও এবং রোগীর সেবা করো’ (সহিহ বুখারি)। আজ যদি সমাজের ধনীরা গরিবদের সাহায্য করে, কর্তাব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের প্রতি সদয় হয়, তা হলে আত্মকেন্দ্রিকতা দূর হয়ে একটি মানবিক সমাজ গড়ে উঠবে।
ক্ষমা ও সহনশীলতা : ক্ষমা এক মহৎ গুণ, যা সমাজে শান্তি ও সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করে। প্রতিশোধ নয়, বরং ক্ষমার মাধ্যমে হৃদয় জয় করা ইসলামি আদর্শ। নবীজি (সা.) যখন তায়েফে গিয়েছিলেন, সেখানকার লোকেরা তাঁকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করে। তখন ফেরেশতা এসে প্রস্তাব দেন পুরো জনপদ ধ্বংস করে দিতে, কিন্তু নবীজি (সা.) বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমার কওমকে হেদায়েত দাও, তারা জানে না আমি কে।’ মক্কা বিজয়ের সময়ও তিনি তাঁর শত্রুদের ক্ষমা করে দিয়ে বলেন, ‘আজ তোমাদের কোনো তিরস্কার নেই, তোমরা সবাই মুক্ত’ (ইবনে হিশাম)। আমাদের সমাজে যদি এভাবে প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমার চর্চা হয়, তবে তা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
অসহিষ্ণুতা ও চরমপন্থার বিরুদ্ধাচরণ : বর্তমানে সমাজে যে বিশৃঙ্খলা ও ভেদাভেদ দেখা যায়, তার একটি মূল কারণ হচ্ছে অসহিষ্ণুতা ও চরমপন্থা। ইসলামে উগ্রতা ও অহিংস মনোভাব পরিত্যাজ্য। রাসুল (সা.) সবসময় সংযত, ভারসাম্যপূর্ণ ও সহানুভূতিশীল আচরণে উৎসাহ দিতেন। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি সদাচার ধারণ করো, সৎকাজে আদেশ দাও এবং মূর্খদের এড়িয়ে চলো’ (সুরা আরাফ : ১৯৯)। অন্যদিকে ইসলাম উগ্রতা ও কঠোরতার চর্চাকে নিরুৎসাহিত করে। হাদিসে এসেছে, ‘সংযমতা, নম্রতা ও সহজভাব প্রকৃত ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য’ (তিরমিজি)। আজ আমরা যে পথে হাঁটছি, তা আমাদের সমাজকে দুর্বল ও বিভক্ত করে দিচ্ছে। অন্যায়, হিংসা ও স্বার্থপরতার কারণে আমরা শান্তি ও সহানুভূতির পরিবেশ হারিয়ে ফেলেছি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের প্রত্যেকের উচিত ইসলামি নীতিমালা অনুসরণ করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, পরোপকার ও সহানুভূতির মনোভাব গড়ে তোলা, ক্ষমাশীল ও সহনশীল হওয়া। যদি আমরা ব্যক্তি ও জাতি হিসেবে এই আদর্শগুলোর চর্চা করি, তবে আমাদের সমাজ পরিণত হতে পারে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়নিষ্ঠ ও আদর্শ সমাজে। ইসলাম আমাদের সেই পথই দেখিয়েছে।